অভিনেতা-অভিনেত্রীদের একাধিক বিয়ে করার বিষয়টি খুব একটা বিরল নয়। বলিউডে এমন অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রী রয়েছেন, যাঁরা এক, দু’বার নয়, বিয়ে করেছেন তিন থেকে চার বার।
তাঁদের মধ্যে এক জন অভিনেত্রীও রয়েছেন, যিনি বলিউডে পা দিয়েছিলেন ঋষি কপূরের নায়িকা হিসাবে। প্রথম ছবিতেই সাফল্যের শিখরে উঠেছিলেন। কিন্তু পর পর চার বার বিয়ের পর তাঁর কেরিয়ার কার্যত ধ্বংস হয়ে যায়। বর্তমানে রুপোলি পর্দা থেকে তিনি অনেক দূরে রয়েছেন।
কথা হচ্ছে অভিনেত্রী জ়েবা বখতিয়ারের। জ়েবার আসল নাম শাহিন। ১৯৭১ সালের ৫ নভেম্বর বালোচিস্তানের কোয়েটায় জন্ম তাঁর। পাকিস্তানি রাজনীতিবিদ তথা প্রাক্তন অ্যাটর্নি জেনারেল ইয়াহিয়া বখতিয়ারের কন্যা তিনি।
জ়েবা যে সময় বলিউডে পা দেন, তখন পাকিস্তানি অভিনেতা-অভিনেত্রী, গায়ক-গায়িকাদের ভারতে কাজ করা নিয়ে কড়াকড়ি ছিল না। তবে বিনোদন জগতে জ়েবা কেরিয়ার শুরু করেন পাকিস্তান থেকেই। পাকিস্তানে ছোটপর্দায় অভিনয় শুরু করেন তিনি।
১৯৮৮ সালে ‘আনারকলি’ নামে এক ধারাবাহিকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন জ়েবা। সেই শোয়ে তাঁর অভিনয় প্রশংসা কুড়িয়েছিল। সেখান থেকেই বলিউডের নজরে পড়েন তিনি।
বলিপাড়ায় ১৯৯১ সালে কাজ শুরু করেন জ়েবা। রণধীর কপূর পরিচালিত এবং প্রযোজিত ‘হেনা’ ছবিতে প্রথম অভিনয় করেন তিনি। ঋষি কপূরের বিপরীতে অভিনয় করতে দেখা গিয়ছিল তাঁকে। ‘হেনা’ ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর বলিজগতে ডাকসাইটে সুন্দরী নায়িকা হিসাবেই পরিচিতি তৈরি হয়ে যায় জ়েবার।
‘হেনা’ ছবি সুপারহিট হয়েছিল। রাতারাতি তারকার তকমাও পান জ়েবা। সেই ছবির পরে জ়েবা আরও অনেক ছবিতে কাজ করেছিলেন। কিন্তু তিনি আর সেই সাফল্য পাননি, যা তিনি এই ছবি থেকে পেয়েছিলেন।
‘হেনা’র পরে ‘মহব্বত কি আরজু’, ‘স্টান্টম্যান’, ‘জয় বিক্রান্তা’, ‘সরগম’, ‘মুকাদমা’, ‘চিফ সাহেব’ এবং ‘বিন রোয়ে’-র মতো একাধিক ছবিতে কাজ করেছিলেন জ়েবা। টেলিভিশনে আনারকলি ছাড়াও ‘তানসেন’, ‘মুলাকাত’, ‘মুকাদ্দাস’, ‘মেহমান’, ‘মুসৌরি’, ‘দূরদেশ’, ‘সমঝোতা এক্সপ্রেস’, ‘হজ়ারোঁ সাল’ এবং ‘পেহলি সি মহব্বত’-এ কাজ করেছিলেন। তবে ‘হেনা’র মতো সাফল্য আর পাননি।
শোনা যায়, জ়েবার কেরিয়ার শেষ হওয়ার নেপথ্যে ছিল তাঁর ব্যক্তিগত জীবন। চার বার বিয়ে করেছিলেন তিনি। তিন বার বিচ্ছেদ হয়। ব্যক্তিগত সম্পর্কের চাপানউতরে নাকি কেরিয়ারে বিশেষ মন দিতে পারেননি তিনি। আর সে কারণেই রুপোলি পর্দা থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যান জ়েবা।
অভিনয়ের মাধ্যমে জ়েবা যে পরিমাণ পরিচিতি পেয়েছেন, তার থেকেও বেশি পরিচিতি পেয়েছেন তাঁর জীবনের সম্পর্কগুলি নিয়ে। বার বার সম্পর্কে জড়িয়ে বিচ্ছেদের পথে হেঁটেছেন অভিনেত্রী।
অভিনয় শুরু করার আগেই প্রথম বিয়ে করেছিলেন জ়েবা। ১৯৮২ সালে সলমন ভল্লিয়ানি নামে এক পাকিস্তানি ব্যবসায়ীর সঙ্গে বিয়ে হয় তাঁর। বিয়ের পর কন্যাসন্তানের জন্ম দেন অভিনেত্রী।
কিন্তু কন্যাসন্তান জন্মের পর জ়েবার সঙ্গে সলমনের সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু করে। ১৯৮৬ সালে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা। বিচ্ছেদের পর তাঁদের কন্যাসন্তানকে জ়েবার বোন দত্তক নেন।
বিচ্ছেদের পর অভিনয়জগতে পা বাড়ান জ়েবা। ১৯৮৮ সালে ‘আনারকলি’ ধারাবাহিকে মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। তার পরেই বলিউডি ফিল্মজগতে অভিনয়ের সুযোগ পান জ়েবা।
বলিউডি ফিল্মজগতে আসার আগে বলিউডের কৌতুকাভিনেতা জাভেদ জাফরিকে বিয়ে করেন জ়েবা। ১৯৮৯ সালে জাভেদের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধেন অভিনেত্রী। কিন্তু বিয়ের খবর পুরোপুরি গোপন রেখেছিলেন জাভেদ।
পরে জ়েবা নিজেই তাঁর সঙ্গে জাভেদের বিয়ের কথা জনসমক্ষে প্রকাশ করেন। জাভেদও বিয়ের কথা স্বীকার করেন। কিন্তু তাঁদের বিয়েও বেশি দিন টেকেনি। বিয়ের এক বছরের মাথায় বিচ্ছেদ হয়ে যায় তাঁদের।
বলিউড ছেড়ে আবার পাকিস্তানে ফিরে যান জ়েবা। সেখানে গিয়ে বড়পর্দা এবং ধারাবাহিকে কাজ করতে থাকেন তিনি। পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের জায়গা তৈরি করে ফেলেন অভিনেত্রী।
ইতিমধ্যেই পাকিস্তানি ধারাবাহিকে অভিনয় করে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন জ়েবা। এই সময়ে গায়ক আদনান সামির সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন তিনি। জাভেদের সঙ্গে বিচ্ছেদের তিন বছরের মধ্যে আদনানকে বিয়ে করেন তিনি। জ়েবার চেয়ে ন’বছরের ছোট ছিলেন আদনান। বয়সের ফারাক থাকা সত্ত্বেও জ়েবার প্রেমে পড়েন গায়ক।
১৯৯৩ সালে আদনানকে বিয়ে করেছিলেন জ়েবা। কিন্তু অভিনেত্রীর সেই সম্পর্কও টেকেনি। আদনানকে বিয়ের পরেও কয়েকটি হিন্দি ছবিতে অভিনয় করেছিলেন জ়েবা। কিন্তু ‘হেনা’ যে জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছিল, তার ছিটেফোঁটাও আর মেলেনি জ়েবার ভাগ্যে।
১৯৯৫ সালে একটি উর্দু ছবি পরিচালনা করেন জ়েবা। কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে আদনানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কে তিক্ততা আসে। ১৯৯৭ সালে তাঁদের বিচ্ছেদ হয়ে যায়। আদনান এবং জ়েবার এক পুত্রসন্তানও রয়েছে।
আদনানের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর অভিনয় নিয়ে নিজেকে আরও ব্যস্ত করে ফেলেন জ়েবা। অভিনয়ের পাশাপাশি ছবি পরিচালনা এবং প্রযোজনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।
আদনানের সঙ্গে বিচ্ছেদের পরে অনেক দিন আর কোনও সম্পর্কে জড়াননি জ়েবা। অবশেষে ২০০৮ সালে পাকিস্তানের বাসিন্দা সোহেল খান লেঘরিকে বিয়ে করেন তিনি। ১৮ বছর ধরে সোহেলের সঙ্গেই ঘর করছেন অভিনেত্রী।
বর্তমানে পাকিস্তানেই থাকেন জ়েবা। তবে আলোচনার আলোকবৃত্ত থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন তিনি। অভিনয় থেকেও সরে এসেছেন। মনে করা হয়, বিনোদন জগতে জ়েবার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ থাকা সত্ত্বেও ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণেই কেরিয়ারে মনোযোগ দিতে পারেননি। প্রথম ছবিতে তারকার তকমা মিললেও তা ধরে রাখতে ব্যর্থ হন তিনি।
সব ছবি: সংগৃহীত।