আর্থিক অনিয়মের মামলায় অভিযুক্ত শিল্পপতি তথা ‘রিলায়্যান্স অনিল ধীরুভাই অম্বানী গ্রুপ’ (এডিএজি)-এর কর্ণধার অনিল অম্বানীর পালী হিলের বাড়ি বাজেয়াপ্ত (অ্যাটাচ) করেছে কেন্দ্রীয় সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)।
প্রায় ৩৭১৬ কোটি টাকা মূল্যের ১৭তলার ওই বাড়িটি যাতে হস্তান্তরিত না হয় বা মালিকানা বদল করা না যায়, সেই উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ বলে ইডির সূত্রে দাবি।
কয়েক হাজার কোটি টাকা প্রতারণার অভিযোগে কালো টাকার লেনদেন প্রতিরোধ আইনে (পিএমএলএ) অনিলের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে ইডি। ইয়েস ব্যাঙ্ক এবং অন্য কিছু ক্ষেত্রে প্রতারণা, ঘুষ, অন্যত্র টাকা সরানোর অভিযোগ নিয়ে অনিলের গোষ্ঠীর কিছু সংস্থার বিরুদ্ধে তদন্ত চালাচ্ছে ইডি। একাধিক এফআইআরও নথিভুক্ত হয়েছে।
বিভিন্ন ব্যাঙ্ক থেকে নেওয়া ঋণের টাকা অন্যত্র সরানোর অভিযোগ রয়েছে রিলায়্যান্স এডিএজি গোষ্ঠীর বিভিন্ন সংস্থা এবং তার কর্ণধার অনিলের বিরুদ্ধে। এ জন্য তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদও করছে তদন্তকারী সংস্থাগুলি। সেই মামলায় নতুন করে অনিল ও তাঁর গোষ্ঠীকে গত মাসে নোটিস পাঠিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। ‘এটাই শেষ সুযোগ’ বলেও স্পষ্ট করে শীর্ষ আদালত জানিয়ে দিয়েছিল।
পাশাপাশি, এই অভিযোগের তদন্ত কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে, ১০ দিনের মধ্যে সিবিআই, ইডি-কে সেই তথ্য জানাতেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কেন্দ্রের দুই তদন্তকারী সংস্থার জবাব শুনে উষ্মা প্রকাশ করে গত ৪ ফেব্রুয়ারি প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি বিপুল এম পঞ্চোলীকে নিয়ে গঠিত শীর্ষ আদালতের বেঞ্চ জানতে চেয়েছিল, ‘‘তদন্তে কেন দেরি হচ্ছে! এমন বিলম্বের কোনও যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা নেই।’
ঘটনাচক্রে, তার পরেই অনিলের বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়েছে ইডি। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি শীর্ষ আদালতে এই মামলার শুনানি পর্বে অনিল হলফনামা দিয়েছিলেন, আদালতের অনুমতি ছাড়া দেশের বাইরে যাবেন না তিনি। দুই কেন্দ্রীয় সংস্থা ইডি এবং সিবিআইয়ের তদন্তে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করবেন বলেও হলফনামায় জানান প্রয়াত ধীরুভাই অম্বানীর পুত্র।
এই নিয়ে তাঁর ১৫,৭০০ কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করল ইডি। গত নভেম্বরে এই মামলায় দিল্লি, নয়ডা, গাজ়িয়াবাদ, পুণে, মুম্বই, ঠাণে, হায়দরাবাদ, চেন্নাই এবং অন্ধ্রপ্রদেশে অনিল এবং তাঁর সংস্থার বেশ কিছু সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছিল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাটি।
ব্যবসায়ী অনিল ভারতীয় ধনকুবের মুকেশ অম্বানীর ভাই। একসময় বিশ্বের ষষ্ঠ ধনী ব্যক্তি ছিলেন অনিল। কিন্তু বিগত কয়েক বছর ধরে তিনি চরম আর্থিক সঙ্কটের সম্মুখীন।
অনিলের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পত্তিগুলির মধ্যে অন্যতম হল তাঁর মুম্বইয়ের পালী হিলের বাসভবন। সেই বাড়িটিই বাজেয়াপ্ত করেছে ইডি।
মুম্বইয়ের বিত্তশালী অঞ্চল পালী হিলের যে বাড়িতে অনিল বাস করেন সেটি ১৭তলা। বিলাসবহুল সেই বাড়ির নাম ‘অ্যাবোড’। ‘অ্যাবোড’-এর অর্থ এমন একটি জায়গা, যেখানে বসবাস করা হয়।
অনিলের ওই বহুতলটির উচ্চতা প্রায় ৬৬ মিটার। ‘অ্যাবোড’কে ভারতের অন্যতম বিলাসবহুল বাড়ি বলে গণ্য করা হয়।
‘অ্যাবোড’ ১৬ হাজার বর্গফুট এলাকা জুড়ে তৈরি। বাড়ির মধ্যেই রয়েছে একটি হেলিপ্যাড। রয়েছে একাধিক সুইমিং পুল এবং জিম। রয়েছে সিনেমা দেখার জন্য বিশেষ ব্যবস্থাও। অনিলের বাড়ির অন্দরসজ্জার নেপথ্যে রয়েছেন নামীদামি বিদেশি শিল্পীরা। বাড়ির প্রতিটি আসবাবের দামও আকাশছোঁয়া।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘অ্যাবোড’ মুম্বইয়ের তৃতীয় বিলাসবহুল বাড়ি, যার মূল্য প্রায় ৩,৭১৬ কোটি টাকা। অন্য দিকে, তাঁর দাদা মুকেশের বাসভবন ‘অ্যান্টিলিয়া’র মূল্য ১৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
অনিলের কাছে রোলস রয়েস, লেক্সাস এক্সইউভি, পোর্শে, অডি কিউ ৭, মার্সিডিজ় জিএলকে ৩৫০-এর মতো একাধিক বিলাসবহুল গাড়ি রয়েছে। গাড়িগুলি রাখার জন্য বিশাল গ্যারেজ রয়েছে বাড়িতেই।
বিলাসবহুল বাড়ির মালিক হওয়া সত্ত্বেও অনিল বার বার দাবি করেছেন, তাঁর জীবনযাত্রা খুবই সাধারণ এবং শৃঙ্খলাপরায়ণ। অনিলের এক মুখপাত্রের দাবি, অনিল নিরামিষাশী। কোনও নেশা নেই তাঁর। পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধ। বাইরে যাওয়ার চেয়ে বাড়িতে সন্তানদের সঙ্গে সিনেমা দেখতেই নাকি বেশি আগ্রহী অনিল।
অনিল প্রাক্তন বলিউড অভিনেত্রী টিনা মুনিমকে বিয়ে করেছেন। তাঁদের দুই ছেলে। জয় অনমোল অম্বানী এবং জয় অনশুল অম্বানী। বর্তমানে প্রচারের আলোকবৃত্তের বাইরে থাকলেও একসময় অনিলের সঙ্গে নাম জড়িয়েছিল বহু বলি অভিনেত্রীর।
বলিপাড়ায় গুঞ্জন উঠেছিল শিল্পপতি অনিলের সঙ্গে সম্পর্কে রয়েছেন ঐশ্বর্যা রাই (তখনও তিনি বচ্চন পরিবারের বধূ হননি)। ব্রহ্মাণ্ডসুন্দরী সুস্মিতা সেনের সঙ্গেও অনিলের সম্পর্ক নিয়ে গুঞ্জন ছড়িয়েছিল।
অভিনেত্রী প্রীতি জ়িন্টার সঙ্গেও অনিলের বিশেষ সম্পর্ক ছিল বলে গুঞ্জন শোনা গিয়েছিল। কিন্তু ঐশ্বর্যা-সুস্মিতার সঙ্গে সম্পর্কের মতো তা-ও রয়ে যায় রটনার স্তরেই। উল্লেখ্য, সম্প্রতি যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টিনের ফাইলেও নাম দেখা গিয়েছে অনিলের।
সব ছবি: সংগৃহীত এবং ফাইল।