আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতের এক মাস ইতিমধ্যেই অতিক্রান্ত। পঞ্চম সপ্তাহে পা দিয়েছে সংঘাত। ইরানকে ঠেকাতে ইতিমধ্যেই হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ হয়ে গিয়েছে আমেরিকার। পেন্টাগনের ভাঁড়ারে টান পড়ায় ইরানকে প্রতিহত করতে তাদের অস্ত্রভান্ডারের তাবড় তাবড় শক্তিধরকে আর কাজে লাগাতে চাইছে না মার্কিন মুলুক। আর তার জন্য সস্তা বিকল্পও খুঁজে ফেলেছে ওয়াশিংটন।
প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি সাশ্রয়ী বিকল্প হিসাবে উচ্চ শক্তিসম্পন্ন লেজ়ার অস্ত্রের প্রতি ভরসা দেখাচ্ছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ঘোষণা করেছেন, এই প্রযুক্তি শীঘ্রই শত্রুদের প্রতিরোধ করতে ‘অনেক কম খরচে’ প্যাট্রিয়টের মতো ভূমি থেকে আকাশে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাকে প্রতিস্থাপন করবে। কিন্তু কী এই অস্ত্র?
তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সংঘর্ষ শুরুর মাঝামাঝি সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছিল, ইরানের সঙ্গে সংঘাত শুরুর দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যেই আনুমানিক ১৬৫০ কোটি ডলার খরচ করে ফেলেছে আমেরিকা। অর্থাৎ, যুদ্ধ চালাতে দৈনিক ব্যয় ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি বলে অনুমান করা হচ্ছিল। তার পর আরও দু’সপ্তাহ পেরিয়ে গিয়েছে। ফলে ইরানকে ঠেকাতে ওয়াশিংটনের যে প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য।
অন্য দিকে, আমেরিকা-ইজ়রায়েলি হস্তক্ষেপের জবাবে ইরান তাদের আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের উপর হামলা শুরু করেছে। আর তার জন্য তেহরানে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি শাহেদ ১৩৬-এর মতো সস্তার ড্রোন ব্যবহার করছে ইরান। শাহেদ ১৩৬ ড্রোনগুলির প্রতিটির দাম ২০,০০০-৫০,০০০ ডলার। আর সেই ড্রোন হামলা ঠেকাতে আমেরিকা যে ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে, তার দাম অনেক বেশি।
মার্কিন সামরিক বাহিনী সূত্রে খবর, শত্রুপক্ষের (পড়ুন ইরান) ছোড়া ড্রোন প্রতিহত করতে প্যাট্রিয়ট মিসাইল ইন্টারসেপ্টর থেকে যে ক্ষেপণাস্ত্রগুলি ছোড়া হয়, তার প্রতিটির খরচ ৩০ লক্ষ ডলারের বেশি। ৩০ লক্ষ ডলারের প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ছাড়াও থাড আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রগুলির দাম ১ কোটি ডলার।
ওয়াশিংটনের ৯০০০০ কোটি ডলারের সামরিক বাজেটের তুলনায় ইরানের সামরিক বাজেট নগণ্য। তা-ও যুদ্ধে আমেরিকার খরচের হিসাবে স্পষ্ট যে ওয়াশিংটনের জন্য যুদ্ধ পরিচালনার এই পদ্ধতিটি সাশ্রয়ী নয়। আর সে কারণেই এ বার খরচ কমাতে লেজ়ার প্রযুক্তির মতো সস্তা বিকল্পকে যুদ্ধের আসরে নামিয়েছে আমেরিকা।
লেজ়ার প্রযুক্তিযুক্ত আমেরিকার এই নয়া অস্ত্রের নাম হেলিওস। মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ ইউএসএস প্রিবল-এ (আর্লি বার্ক-শ্রেণির একটি ডেস্ট্রয়ার) বসানো হয়েছে এই লেজ়ার প্রযুক্তি। নতুন এই লেজ়ার অস্ত্র ব্যবহার করে বেশ কয়েকটি ইরানীয় ড্রোন ভূপতিতও করেছে আমেরিকা।
আমেরিকার দাবি, ইরানের ড্রোন হামলা ঠেকাতে লেজ়ার প্রযুক্তির ব্যবহার যুদ্ধ পরিস্থিতিকে তাদের অনুকূলে নিয়ে আসবে। পাশাপাশি শত্রুর ড্রোন ধ্বংস করতে আমেরিকার লক্ষ লক্ষ ডলারের খরচ এক ধাক্কায় কয়েক ডলারে নামিয়ে আনবে।
আমেরিকার সামরিক সূত্রে খবর, নতুন এই লেজ়ার প্রযুক্তি দিয়ে ওই একই ড্রোন ঠেকাতে খরচ মাত্র সাড়ে তিন থেকে পাঁচ ডলার। অর্থাৎ, আমেরিকার বাজারে একটি সাধারণ কফির দামে ইরানের অত্যাধুনিক ড্রোন ঠেকাতে সক্ষম এই লেজ়ারগুলি।
অর্থাৎ, প্যাট্রিয়ট এবং লেজ়ার প্রযুক্তির অস্ত্রের দামের ফারাক স্পষ্ট। এ-ও স্পষ্ট যে ওই লেজ়ার প্রযুক্তি ব্যবহার করলে ইরানের ড্রোন ধ্বংস করতে আমেরিকার নামমাত্র টাকা খরচ হবে। ফলে এই বৈসাদৃশ্য পশ্চিম এশিয়া জুড়ে লেজ়ার প্রযুক্তিটিকে ঘিরে নতুন করে যুদ্ধের জিগির তুলেছে।
হেলিওস বা ‘হাই এনার্জি লেজ়ার উইথ ইন্টিগ্রেটেড অপটিক্যাল-ড্যাজ়লার অ্যান্ড সার্ভেইল্যান্স’ একটি ৬০ কিলোওয়াট উচ্চ শক্তির লেজ়ার অস্ত্র। যুদ্ধ ড্রোন, বিমান এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার জন্য তৈরি করা হয়েছে অস্ত্রটি। হেলিওস হল গ্রিক সূর্যদেবতার নাম।
মার্কিন প্রতিরক্ষা সংস্থা লকহিড মার্টিনের তৈরি করা অস্ত্রব্যবস্থাটি এখন ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে আত্মরক্ষার জন্য নৌবাহিনীর জাহাজ এবং উভচর (অ্যাম্ফিবিয়াস) যানগুলিতে যুক্ত করা হচ্ছে। তবে এখনও পর্যন্ত ইউএসএস প্রিবলই একমাত্র জাহাজ, যেখানে এই লেজ়ার অস্ত্রব্যবস্থাটি বসানো হয়েছে এবং বর্তমানে এটি ইরানের উপকূলে মোতায়েন রয়েছে।
২০১৮ সালের জানুয়ারিতে আমেরিকার সরকারের সঙ্গে হেলিওস তৈরির চুক্তি করে লকহিড মার্টিন। কয়েক মাস আগেই লেজ়ার অস্ত্রটি তৈরির কাজ শেষ হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে পরীক্ষাও হয়। আর সেই পরীক্ষায় সফল হওয়ার এক মাসের মধ্যে যুদ্ধেও নেমে গিয়েছে হেলিওস।
হেলিওস কম তীব্রতার লেজ়ারের মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তুকে ‘ড্যাজ়ল’ করে, যার ফলে ড্রোনের দিকনির্দেশ ব্যবস্থা বিভ্রান্ত হয় এবং তা কোথাও ধাক্কা খেয়ে ভেঙে পড়ে। উচ্চ তীব্রতার লেজ়ার নিক্ষেপের মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তুকে সরাসরি ধ্বংস করতেও সক্ষম হেলিওস।
লকহিড মার্টিনের দাবি, এই ব্যবস্থাটি সহজেই সম্প্রসারণযোগ্য এবং এর বর্তমান কাঠামোটি ইতিমধ্যেই ১২০ কিলোওয়াট শক্তির লেজ়ার তৈরি করতে সক্ষম। আমেরিকার প্রতিরক্ষা সংস্থাটি হেলিওসকে ‘একটি সমন্বিত অস্ত্রব্যবস্থা’ হিসাবেও বর্ণনা করেছে।
হেলিওসে রয়েছে থার্মাল ইমেজিং, নাইট ভিশন এবং আল্ট্রা-হাই-ডেফিনিশন ভিশন। ফলে নজরদারি এবং অনুসন্ধানের জন্যও ব্যবহার করা যেতে পারে অস্ত্রটিকে। লেজ়ার অস্ত্রটি ৮ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত, অনুসরণ এবং মূল্যায়ন করতে সক্ষম।
তবে হেলিওসের কিছু দুর্বলতাও রয়েছে। যেমন, বৃষ্টি, ধোঁয়া, ধুলো, মেঘ, কুয়াশা এবং অন্যান্য বায়ুমণ্ডলীয় প্রতিবন্ধকতার কারণে এর কার্যকারিতা সীমিত হয়ে যায়। কারণ ওই প্রতিবন্ধকতাগুলি লেজ়ার রশ্মিকে বিক্ষিপ্ত করে দেয়। এ ছাড়াও অস্ত্রটি নিক্ষেপ করতে প্রচুর শক্তির প্রয়োজন হয় এবং এর পাল্লাও সীমিত।
সব ছবি: সংগৃহীত।