হাঙরও নাকি নেশার ‘প্রেমে’ আসক্ত। কেবল মাদকের নেশা নয়, কফি আর ব্যথার ওষুধের নেশাতেও মজেছে সেই সামুদ্রিক হিংস্র প্রাণীর মন। এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এল একদল ব্রাজ়িলিয়ান বিজ্ঞানীর গবেষণায়। সেই গবেষণার বিষয়বস্তু প্রকাশ পেয়েছে ‘এনভায়রোমেন্টাল পলিউশন’ নামক একটি জার্নালে।
সুদূর বাহামার অ্যালিউথ্রা দ্বীপ এবং তৎসংলগ্ন পর্যটনকেন্দ্রিক সামুদ্রিক অঞ্চল থেকে কমবেশি ৮৫টি হাঙরের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেন। মোট পাঁচটি প্রজাতির হাঙরদের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন তাঁরা।
তালিকায় ছিল টাইগার হাঙর, ব্ল্যাকটিপ হাঙর, ক্যারিবিয়ান রিফ হাঙর, আটলান্টিক নার্স হাঙর এবং লেমন হাঙর। এরা সকলেই বাহামার সমুদ্রের বাসিন্দা।
সংগৃহীত রক্তের নমুনাগুলিকে প্রথমে লিকুইড ক্রোম্যাটোগ্রাফির সঙ্গে টেনডেম মাস স্পেকটোমেট্রি পদ্ধতিতে পরীক্ষা করা হয়। লিকুইড ক্রোম্যাটোগ্রাফি পদ্ধতিতে জটিল মিশ্রণকে ভেঙে অণুগুলিকে আলাদা করে। তার সঙ্গে স্পেকটোমেট্রি পদ্ধতি প্রয়োগের দ্বারা অণুগুলিকে ভেঙে তাদের শনাক্ত করা হয় এবং পরিমাণ সম্পর্কেও একটি ধারণা পাওয়া যায়। সেই পরীক্ষায় মাদকের উপস্থিতি লক্ষ করা গেলে বিজ্ঞানীদল পুনরায় নিশ্চিত হওয়ার জন্য তেজস্ক্রিয় বিকিরণের দ্বারা স্পেকটোফোটোমেট্রি পদ্ধতিতে পরীক্ষা করে দেখেন। স্পেকটোফোটোমেট্রি পদ্ধতিতে অণুগুলির মধ্য দিয়ে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ পাঠানোর দ্বারা সেগুলির স্বচ্ছতা সম্বন্ধে আরও নিশ্চিত হওয়া যায়।
পাঁচ প্রজাতির ৮৫টি হাঙরের মধ্যে তিন প্রজাতির ২৮টি হাঙরের রক্তেই মাদক, ক্যাফেইন এবং ব্যথার ওষুধের নমুনা পাওয়া গিয়েছে। এর ফলে বিজ্ঞানীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।
টাইগার এবং ব্ল্যাকটিপ প্রজাতির হাঙরেরা পরীক্ষায় ‘বেকসুর খালাস’ পেলেও, বাকি তিন প্রজাতির দেহে মাদক, ক্যাফেইন এবং ব্যথার ওষুধের নমুনা পাওয়া গিয়েছে। সায়েন্সডিরেক্ট নামক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত প্রতিবেদন অণুযায়ী, হাঙরগুলির রক্তে ডাইক্লোফেনাক, ক্যাফেইন, কোকেন এবং অ্যাসিটামিনোফেনের মতো রাসায়নিক উপাদানের উপস্থিতি লক্ষ করা গিয়েছে। যদিও ২৮টির মধ্যে কেবল দু’টি হাঙরের দেহেই কোকেনের উপস্থিতি দেখা গিয়েছে।
সামুদ্রিক জীবনের কাছে যা ‘ভিন্গ্রহী’, সে সকল বস্তুর নমুনা হাঙরের রক্তে পাওয়াকে স্বাভাবিক বিষয় বলে গবেষকেরা মনে করছেন না। গবেষণার সঙ্গে যুক্ত থাকা বিজ্ঞানীদল এটিকে সমুদ্রজীবনের জন্য একটি আসন্ন বিপদের শঙ্কা বলে দাবি করছেন।
পর্যটনস্থান হিসাবে বাহামা দ্বীপপুঞ্জের অ্যালিউথ্রা দ্বীপটি যথেষ্ট বিখ্যাত। বিশ্বের নানা প্রান্তের মিলেনিয়াল থেকে জেন জ়ি, এমনকি তারকারাও সেই দ্বীপে ছুটি কাটাতে যান। সেখানে যে নেশার আসর বসে তা বলাই বাহুল্য। তারই ফল ভোগ করছে বাহামার সামুদ্রিক প্রাণীরা, এমনটাই দাবি করছেন গবেষণার সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীরা।
বাকি পাঁচটা সমুদ্রসৈকতের মতো অ্যালিউথ্রার সমুদ্রেও প্রায় প্রত্যেক পর্যটকই স্পিডবোট, জাহাজ, প্রমোদতরী প্রভৃতি করে সমুদ্রে ঘুরতে যান। বিজ্ঞানীদের ধারণা, সে সকল নৌযানেও পর্যটকেরা মাদক সেবন করেন। আর সেই স্পিডবোট, জাহাজ, প্রমোদতরী প্রভৃতি থেকে ক্ষতিকারক রাসায়নিক মিশ্রিত দূষিত জল বেরিয়ে সমুদ্রের জলে মিশছে। এর ফলে সমুদ্রের জলে দূষণের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিজ্ঞানীরা এ-ও দাবি করছেন যে, মাদক ব্যবহার করার পর তার খালি প্যাকেট পর্যটকেরা সমুদ্রেই ফেলে দিচ্ছেন। সেটিও সমু্দ্রের জলে অযাচিত রাসায়নিকের উপস্থিতির অন্যতম কারণ বলে জানাচ্ছেন তাঁরা।
পর্যটকের বাড়বাড়ন্ত ছাড়া, বাহামার দ্বীপগুলিতে ক্রমাগত ঘটে চলা নগরায়নকেও সামুদ্রিক জীবনের ক্ষতির জন্য দায়ী করছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের মতে, সেখান থেকেও বহু ক্ষতিকারক রাসায়নিক এসে সমুদ্রের জলের সঙ্গে মিশে সেটির স্বচ্ছতা নষ্ট করছে।
বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, ক্রমবর্ধমান জলদূষণের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছে না সামুদ্রিক প্রাণীরা। তাদের মধ্যে উদ্বেগ এবং চাপের সৃষ্টি হচ্ছে। এ সকল ক্ষতিকারক রাসায়নিকের উপস্থিতি হাঙরদের মানসিক চাপ দিন দিন বাড়িয়ে দিচ্ছে। কারণ তারা কেউই এ সকল রাসায়নিকের সঙ্গে পরিচিত নয়।
যে ২৮টি হাঙরের দেহে এ সকল ক্ষতিকারক রাসায়নিকের উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছে, তাদের দেহের ট্রাইগ্লিসারাইড, ইউরিয়া এবং ল্যাকটেটের পরিমাণ বাকি হাঙরদের সঙ্গে মিলছে না।
বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, বাহামার উপকূলে থাকা হাঙরদের দেহে এই প্রথম বার কোকেনের উপস্থিতি লক্ষ করা গেল। এর আগে কখনও এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন তাঁরা হননি।
ক্যাফেইনের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা অনেকটা সে রকম। গবেষকদের মতে, বিশ্বে প্রথম হাঙরদের রক্তে তাঁরা ক্যাফেইনের উপস্থিতির খোঁজ পেলেন।
সমুদ্রের জলে এ সকল ক্ষতিকারক রাসায়নিকের উপস্থিতিকে বিজ্ঞানীরা সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য ভয়াল সঙ্কেত হিসাবে দেখছেন। তাঁদের মতে, এর থেকেই বোঝা যায় যে বাহামার সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খল, উপকূলীয় পরিকাঠামো এবং পর্যটন একে অপরের সঙ্গে ঠিক কতটা ওতপ্রোত ভাবে জড়িত।
সব ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত এবং সংগৃহীত।