শৈশব থেকে গায়িকা হওয়ার স্বপ্ন বুনেছিলেন। কিন্তু কেরিয়ারে থিতু হওয়ার আগেই পরিবারের অমতে ১৩-১৪ বছরের বড় এক কোরিয়োগ্রাফারকে বিয়ে করেছিলেন। সে কারণে পরিবার ত্যাজ্য করেছিল গায়িকাকে। অর্থাভাবে দিন কাটানোর মধ্যে দিয়েই আবার নতুন করে নিজের জীবন সাজিয়ে তুলেছিলেন বলিউডের প্রথম সারির গায়িকা সুনিধি চৌহান।
১৯৮৩ সালের অগস্টে নয়াদিল্লিতে জন্ম সুনিধির। বাবা-মা এবং বোনের সঙ্গে সেখানেই থাকতেন তিনি। সঙ্গীতজগতের সঙ্গে সুনিধির পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর বাবা। সুনিধির বাবা নাটক করতেন। মেয়ে যেন গানবাজনা নিয়ে কেরিয়ার গড়তে পারে, সে কারণে চাকরি ছেড়ে দিল্লি থেকে মুম্বই চলে গিয়েছিলেন সুনিধির বাবা।
পাঁচ বছর বয়স থেকেই গানবাজনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন সুনিধি। প্রতিষ্ঠানগত প্রশিক্ষণ না নিয়ে রেডিয়ো এবং ক্যাসেট শুনেই গান শিখতেন তিনি। ১১ বছর বয়স থেকে ইংরেজি গান গাওয়াও রপ্ত করে ফেলেছিলেন। পাড়ায় কোনও গানের অনুষ্ঠানের আয়োজন হলেই ডাক পড়ত সুনিধির।
গায়িকা হিসাবে কেরিয়ার শুরুর প্রথম দু’বছর ‘ব্যাকগ্রাউন্ড ভোকালিস্ট’ হিসাবে গান করেন সুনিধি। ১৩ বছর বয়সে হিন্দি ছবিতে প্রথম গান গাওয়ার সুযোগ পান। ১৯৯৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘শাস্ত্র’ ছবিতে গান গেয়েছিলেন কিশোরী সুনিধি। তার পর গানের একটি প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হন। সেখান থেকে আরও একটি হিন্দি ছবিতে গান গাওয়ার সুযোগ পান তিনি।
রামগোপাল বর্মার পরিচালনায় ১৯৯৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘মস্ত’ ছবিতে গান গেয়ে পরিচিতি গড়ে তোলেন সুনিধি। ২০০০ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ফিজ়া’ ছবিতে ‘মেহবুব মেরে’ গানটি গেয়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। চার বছর পর ২০০৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ধুম’ ছবিতে ‘ধুম মচালে ধুম’ গানটি গাওয়ার পর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি গায়িকাকে।
পেশাজীবনে সাফল্যের স্বাদ পেলেও ব্যক্তিগত জীবন মোটেও সুখের ছিল না সুনিধির। ২০০২ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে সঙ্গীতনির্মাতা ববি খানের সঙ্গে সাত পাকে বাঁধা পড়েন গায়িকা। বলিপাড়া সূত্রে খবর, ‘পহেলা নশা’ নামের একটি মিউজ়িক ভিডিয়োর সূত্রে ববির সঙ্গে আলাপ হয় তাঁর।
প্রযোজক এবং কোরিয়োগ্রাফার আহমেদ খানের ভাই ছিলেন ববি। সুনিধির চেয়ে ১৩-১৪ বছরের বড় ছিলেন তিনি। বয়সের পার্থক্য এবং ভিন্ধর্মী হওয়ার কারণে ববিকে বিয়ে করার সিদ্ধান্তে আপত্তি জানায় সুনিধির পরিবার। ববিকে বিয়ে করলে যে সুনিধির সঙ্গে সব সম্পর্ক ভেঙে দেবেন, সে হুমকিও দিয়েছিলেন গায়িকার বাবা-মা।
কিন্তু পরিবারের শত আপত্তি সত্ত্বেও ববিকে বিয়ে করেছিলেন সুনিধি। মেয়েকে ত্যাজ্য করেছিল সুনিধির পরিবার। অন্য দিকে, সংসারেও সুখশান্তি ছিল না গায়িকার। বিয়ের পর তাঁদের সম্পর্ক এক বছরও টেকেনি। ২০০৩ সালে বিবাহবিচ্ছেদের পথে হাঁটেন দুই তারকা।
কানাঘুষো শোনা যায়, ববির পরিবারের সঙ্গে অধিকাংশ সময় আদর্শগত পার্থক্য ধরা পড়ত সুনিধির। মতের অমিল হওয়ায় মাঝেমধ্যে অশান্তিও হত সুনিধি এবং ববির। তাই বিবাহবিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন দু’জনে। বিচ্ছেদের পর বাপের বাড়িতে ফিরে যাওয়ারও কোনও উপায় ছিল না সুনিধির।
বলিপাড়া সূত্রে খবর, ববির সঙ্গে সম্পর্কে ফাটলের পর বলি অভিনেতা অন্নু কপূর এবং তাঁর স্ত্রী অরুণিতা মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে থাকতে শুরু করেন সুনিধি। অর্থাভাবে দিন কাটাতেন তিনি। কেরিয়ারের দিক থেকে সঙ্গীতনির্মাতা অনু মালিক যথেষ্ট সাহায্য করেছিলেন সুনিধিকে।
বিচ্ছেদ প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে সুনিধি জানিয়েছিলেন, প্রথম বিয়েকে নিজের জীবনের ‘বড় ভুল’ হিসাবে দেখেন তিনি। গায়িকা বলেছিলেন, ‘‘আমি জীবনে অনেক ভুল করেছি। কিন্তু আমি সেই ভুলগুলির প্রতি কৃতজ্ঞ। এত কম বয়সে আমার উপর এত ঝড় বয়ে গিয়েছে সেই জন্য কিন্তু ভগবানকে আমি প্রতি মুহূর্তে ধন্যবাদ জানাই।’’
সুনিধির দাবি, জীবনে ভুল করেছেন বলেই বর্তমানে সফল হতে পেরেছেন তিনি। গায়িকা বলেছিলেন, ‘‘আমি যে জীবনের অন্ধকার অধ্যায়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলাম তা নিয়ে অবগত ছিলাম। আমি জানতাম যে আমি ভুল জায়গায় রয়েছি। কিন্তু তার পাশাপাশি এ-ও জানতাম যে এমন অবস্থায় বেশি দিন থাকব না আমি। ঠিক বেরিয়ে আসব। সেই ভরসাটা ছিল।’’
ববির সঙ্গে বিচ্ছেদের পর সঙ্গীতনির্মাতা হিতেশ সোনিকের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান সুনিধি। তাঁরা দু’জনে ছোটবেলার বন্ধু ছিলেন। ১৫ বছরের সেই বন্ধুত্বই পরে প্রেমে পরিণতি পায়।
দু’বছর সম্পর্কে থাকার পর ২০১২ সালের এপ্রিলে হিতেশের সঙ্গে সাত পাকে বাঁধা পড়েন সুনিধি। বিয়ের পর ২০ কেজি ওজন বৃদ্ধি পেয়েছিল গায়িকার। মঞ্চে পারফর্ম করতে অসুবিধা হবে বুঝে ডায়েটের পাশাপাশি শরীরচর্চা করতে শুরু করেছিলেন তিনি। রাতারাতি ১২ কিলোগ্রাম ওজন কমিয়েও ফেলেছিলেন।
বিয়ের দু’বছর পর কানাঘুষো শোনা যেতে থাকে যে, হিতেশের সঙ্গে সম্পর্কে চিড় ধরেছে সুনিধির। সুনিধির। কিন্তু সে সব ভুয়ো খবর বলে জানিয়েছিলেন গায়িকা নিজেই। হিতেশের সঙ্গে বিয়ের ছ’বছর পর ২০১৮ সালে পুত্রসন্তানের জন্ম দেন সুনিধি।
গানের পাশাপাশি সমাজসেবার সঙ্গে যুক্ত সুনিধি। বলিপাড়া সূত্রে খবর, কোনও কোনও অনুষ্ঠানের উপার্জনের সমস্ত টাকাই সমাজসেবার জন্য দান করে দেন তিনি। কেরিয়ারের শুরুর দিকে তিনি নাকি ছবিতে গান গেয়েও টাকা পেতেন না।
পারিশ্রমিক নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে সুনিধি বলেছিলেন, ‘‘অনেক ছবিতে আমি গান গেয়েও টাকা পাইনি। আসলে, কখনও কখনও এমন পরিস্থিতি জীবনে আসে। তখন মনে হয়, উপার্জনের চেয়ে গান গাওয়ার সুযোগ যে পাচ্ছি, সেটাই মুখ্য। এখন যেমন কোনও কোনও ছবিতে গান গাইলেও আমি পারিশ্রমিক নিই না। তবে, সেটা আমার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।’’
সব ছবি: সংগৃহীত।