হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত লাহুল-স্পিতি। যাঁরা ট্রেকিং বা পায়ে হেঁটে বেড়াতে পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য এটি পছন্দের জায়গা। অ্যাডভেঞ্চারের পাশাপাশি যাঁরা বৌদ্ধবিহার ঘুরে দেখেন, তাঁদের কাছেও জায়গাটি স্বর্গের থেকে কিছু কম নয়।
স্পিতি উপত্যকায় রয়েছে পাহাড়ঘেরা স্বচ্ছ, নীলচে সবুজ চন্দ্রতাল হ্রদ। এর উচ্চতা ১৪ হাজার ১০০ মিটার। চাঁদের আকৃতির সঙ্গে প্রভূত মিল এই হ্রদের।
প্রতি বছর হিমাচল প্রদেশের এই হ্রদ দেখার জন্য ভিড় জমান বহু পর্যটক। তবে অনেকেই জানেন না, সমতল থেকে অনেক উঁচুতে থাকা ওই হ্রদকে ঘিরে রয়েছে অনেক রহস্য।
রাতের অন্ধকারে যখন চাঁদের আলো চন্দ্রতালে এসে প়ড়ে, তখন এক অপরূপ এবং নৈসর্গিক দৃশ্য দেখা যায়। স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী, রাতের অন্ধকারে চন্দ্রতালে নাকি ভিড় জমায় আকাশের পরিরা। আর দিনের বেলা খেলা করতে আসে জলপরিরা।
স্থানীয়েরা অনেকেই মনে করেন মানুষকে সম্মোহিত করার অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে চন্দ্রতালের। অনেকেই নাকি হ্রদটির ‘ডাকে’ সাড়া দিয়ে বিপদে পড়েছেন। জলে ডুবে নাকি মারাও গিয়েছেন অনেকে।
চন্দ্রতালকে হিন্দু ধর্মের পবিত্র হ্রদগুলির মধ্যে একটি হিসাবে বিবেচনা করা হয়। হিমালয়ের নদী চন্দ্রার উৎপত্তি চন্দ্রতাল থেকে। চন্দ্রা নদী চন্দ্রভাগার অন্যতম উপনদীও বটে।
জনশ্রুতি আছে, চন্দ্র দেবতার কন্যা চন্দ্রা এবং সূর্য দেবতার পুত্র ভাগা, এই দুই পৌরাণিক যুগলের মিলনের সাক্ষী ছিল ওই এলাকা।
মনে করা হয়, চন্দ্রা এবং ভাগা একে অপরের প্রেমে পাগল ছিলেন। কিন্তু দুই পরিবার তাঁদের প্রেম মেনে নেয়নি। তাই তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন যে বড়লাচা লা থেকে পালিয়ে যাওয়ার। এই বড়লাচা লা-তেই নাকি প্রথম দেখা হয়েছিল পৌরাণিক যুগলের।
দুর্ভাগ্যবশত, চন্দ্র এবং ভাগার নাকি যেখানে দেখা হওয়ার কথা ছিল, সেখানে দেখা হয়নি। তাই তাঁরা চন্দ্রভাগা নদীর তীরে দেখা করেছিলেন। সেখানেই নাকি স্বর্গীয় মিলন হয় তাঁদের। সে সময় সূর্যতাল এবং চন্দ্রতাল হ্রদও তৈরি করেছিলেন চন্দ্র এবং ভাগা, যা এখনও তাঁদের প্রেমের চিহ্ন বহন করে নিয়ে যাচ্ছে বলেই মত স্থানীয়দের।
হিন্দু পুরাণেও বিখ্যাত চন্দ্রতাল হ্রদের উল্লেখ আছে। মহাভারতের যুদ্ধে কৌরবদের পরাজিত করার পর বেশ কিছু দিন হস্তিনাপুরের সিংহাসনে রাজত্ব করেন পাণ্ডবেরা। এর পর তাঁরা অন্তিম যাত্রা শুরু করেন। পথেই একে একে মারা যান চার পাণ্ডব। শুধু যুধিষ্ঠির বেঁচে যান। কথিত রয়েছে, ইন্দ্র এই চন্দ্রতালের কাছ থেকেই যুধিষ্ঠিরকে স্বর্গে নিয়ে যান।
লোককথা অনুযায়ী, চন্দ্রতালের নিকটবর্তী হংস গ্রামের এক রাখাল এক বার গবাদি পশু চরাতে হ্রদের ধারে এসেছিলেন। সেখানে তিনি নাকি এক জলপরিকে দেখতে পান। একে অপরের প্রেমেও পড়েন তাঁরা।
রাখাল বিবাহিত ছিলেন। কিন্তু ভালবাসা হারানোর ভয়ে সে কথা জলপরিকে বলতে পারেননি তিনি। এর পর মাঝেমধ্যেই নাকি চন্দ্রতালের কাছে দেখা করতেন ওই রাখাল এবং জলপরি।
কিন্তু জলপরি এক দিন রাখালের বিবাহিত থাকার বিষয়টি জেনে যায়। সঙ্গে সঙ্গে প্রেমিককে ছেড়ে চলে যায় সে। প্রেমিকার দুঃখে পাগল হয়ে যান রাখাল। জলপরির অপেক্ষায় বাঁশি বাজাতে বাজাতে পাগল হয়ে হ্রদের তীরেই মারা যান তিনি।
কথিত আছে, এখনও নাকি রাতে হ্রদের কাছে গেলে রাখালের কণ্ঠস্বর এবং বাঁশির আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায়। অনেকে আবার ওই রাখালকে দেখতে পেয়েছিলেন বলেও দাবি করেন।
চন্দ্রতালকে ঘিরে রহস্য রয়েছে আরও। হ্রদটির কাছে ভিন্গ্রহীদের যান দেখতে পাওয়া গিয়েছে বলে জল্পনা ছড়ানোর পরে খবরের শিরোনামে উঠে এসেছিল চন্দ্রতাল। বিশ্বব্যাপী অনেক পর্যটক এবং ভ্রমণকারী চন্দ্রতালে ক্যাম্পিং করার সময় ভিন্গ্রহীদের যান এবং অন্য রহস্যময় বস্তু দেখেছেন বলে দাবি করেছেন।
২০০৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর কয়েক জন বিজ্ঞানী তাঁবু ছেড়ে বেরোনোর সময় পার্শ্ববর্তী শৈলশিরার দূর প্রান্তে একটি সাদা বস্তু দেখতে পেয়েছিলেন বলেও শোনা যায়।
চন্দ্রতালকে নিয়ে যত রহস্যই থাক না কেন, হ্রদটির সৌন্দর্যের কথা মানুষের মুখে মুখে ঘোরে। চন্দ্রতাল হ্রদ পরিদর্শনের সর্বোত্তম সময় হল জুন মাস। এই সময় আশপাশের বরফ গলে যায়। এই মরসুমে বটাল থেকে চন্দ্রতাল হ্রদ পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার রাস্তা হেঁটে যাওয়া যায়।
সব ছবি: সংগৃহীত এবং এআই সহায়তায় প্রণীত।