অষ্টম শ্রেণির পর পড়াশোনার পাট চুকেছিল। সেই বিদ্যে নিয়েই গড়ে তুলেছিলেন ১৭ হাজার ২৯৭ কোটি টাকার সাম্রাজ্য। তাঁর হাতে গড়া সংস্থার খাবারের স্বাদ বীকানেরের গণ্ডি ছাড়িয়ে পৌঁছে গিয়েছিল সাত সমুদ্র পারে। পারিবারিক ব্যবসার হাত ছেড়ে স্বতন্ত্র পরিচয় গ়ড়েছিলেন শিবরতন অগরওয়াল।
একটি খ্যাতনামী খাবার প্রস্তুতকারক সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শিবরতন। ২৩ এপ্রিল ৭৫ বছর বয়সে তিনি প্রয়াত হয়েছেন চেন্নাইয়ের একটি বেসরকারি হাসপাতালে। ১৯৫০ সালে রাজস্থানে জন্ম হয়েছিল তাঁর। স্কুলছুট শিবরতনের জীবনের গল্প কোনও সিনেমার চিত্রনাট্যের চেয়ে কম নয়।
নোনতা ও ভাজাভুজির নানা ব্র্যান্ডের তালিকায় নিজস্ব জায়গা করে নিতে পেরেছে শিবরতনের সংস্থা। এর পিছনে ছিল শিবরতনের কয়েক দশকের সংগ্রাম এবং দূরদৃষ্টি। পারিবারিক ব্যবসা নিয়ে বিবাদের পর তিনি একেবারে শূন্য থেকে শুরু করেছিলেন।
আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম স্ন্যাকস ব্র্যান্ড গড়ে তোলার নেপথ্য কারিগর শিবরতনের পথচলা শুরু হয়েছিল রাজস্থানের ঐতিহ্যবাহী ভুজিয়া, গাঠিয়া, চাট, প্যাকেটজাত ভাজাভুজি বিক্রি দিয়েই। কারণ এই ব্যবসাই ছিল তাঁর রক্তে।
শিবরতন আগরওয়াল উত্তরাধিকার সূত্রে জলখাবারের ব্যবসাটি পান। তিনি আরও একটি খ্যাতনামী খাবার প্রস্তুতকারক সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা গঙ্গাবিষাণ হলদিরাম আগরওয়ালের নাতি। পারিবারিক ব্যবসা বিভক্ত হয়ে যাওয়ার পর, তিনি নিজের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেন। সেই জেদ থেকে ১৯৮৬ সালে জন্ম নেয় তাঁর সংস্থা
শিবরতন অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে স্কুল ছেড়ে দেন। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানের যে ঘাটতি তাঁর ছিল, তা তিনি পুষিয়ে নিয়েছিলেন ব্যবসায়িক বুদ্ধি দিয়ে। তিনি জানতেন যে বীকানেরি ভুজিয়ার মধ্যে সেই জাদু রয়েছে, যা সঠিক ভাবে উপস্থাপন করা গেলে বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সেই লক্ষ্যে ১০০ শতাংশ সফল হয়েছিলেন শিবরতন।
১৯৮৬ সালে তিনি নিজের এবং তাঁর ছেলের নাম মিলিয়ে একটি সংস্থা শুরু করেন। ১৯৯৩ সালে এটির নাম পরিবর্তন হয়। ব্র্যান্ডটির নাম বীকানেরের প্রতিষ্ঠাতা রাও বীকাজীর নামে রাখা হয়।
তিনি ঐতিহ্যবাহী স্বাদের সঙ্গে আধুনিক ব্যবসার সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বিপণন কৌশলে (অমিতাভ বচ্চনকে প্রচারের মুখ করা) টক্কর দিয়েছিলেন পারিবারিক ব্র্যান্ডকেও। তাঁর ব্যবসায়িক দক্ষতা সংস্থাটিকে প্রতিটি ঘরে পরিচিত নাম করে তোলে।
শিবরতন আগরওয়াল উপলব্ধি করেছিলেন যে হাতে তৈরি ভুজিয়ার কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তিনি ভারতে ভুজিয়া উৎপাদনে বৃহৎ পরিসরের যন্ত্রপাতি এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার প্রচলন করেন। তাঁর দূরদৃষ্টির ফলস্বরূপ সংস্থা এখন প্রতি দিন কয়েকশো টন জলখাবার ও মিষ্টি তৈরি করে।
বিখ্যাত ‘হলদিরাম’ পরিবারের সদস্য হওয়া সত্ত্বেও ৮০-এর দশকের শেষের দিকে পারিবারিক ব্যবসা থেকে আলাদা হওয়ার সাহসী সিদ্ধান্ত নেন শিবরতন। সেই সময় বীকানেরি ভুজিয়াকে আঞ্চলিক জলখাবার থেকে বিশ্বমানের ব্র্যান্ডে রূপান্তরিত করার স্বপ্ন দেখেছিলেন রাজস্থানের ভূমিপুত্র। তাঁর এই উদ্যোগকে কুর্নিশ জানিয়ে শিবরতনকে ‘ভুজিয়া ব্যারন’ বলে ডাকতেন অনেকেই।
সেই স্বপ্ন সার্থক হয়েছিল শিবরতনের। বর্তমানে, সংস্থাটি ২৫০-এরও বেশি ধরনের ভুজিয়া, নোনতা খাবার, পাঁপড়, মিষ্টি এবং ফ্রোজ়েন ও ইনস্ট্যান্ট খাবার তৈরি করে। সংস্থার ছ’টি উৎপাদনকেন্দ্র রয়েছে, যার মধ্যে চারটি বীকানেরে অবস্থিত। এ ছাড়াও কলকাতায় তাদের একটি চুক্তিভিত্তিক উৎপাদনকেন্দ্র রয়েছে।
বাণিজ্যনগরী মুম্বইয়ে রয়েছে সংস্থার রেস্তরাঁ। একটি বৃহৎ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সংস্থার পণ্য ইউরোপ, উপসাগরীয় এবং আমেরিকার দেশগুলিতে রফতানি করা হয়। লুলু ও ওয়ালমার্টের মতো বিশ্বব্যাপী খুচরো চেনগুলিতেও পাওয়া যায় খাঁটি রাজস্থানি স্বাদের জলখাবার ও মিষ্টি। দেশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা সংস্থার ছ’টি উৎপাদনকেন্দ্রে বার্ষিক ৫৭,৬০০ মেট্রিক টন ভুজিয়া, ৯২,৫২০ মেট্রিক টন নোনতা খাবার এবং ৬০,৪৮০ মেট্রিক টন মিষ্টি উৎপাদিত হয়।
২০২২ সালের নভেম্বরে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয় শিবরতনের সংস্থা। তালিকাভুক্ত হওয়ার সময় থেকেই এটি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। মৃত্যুর আগে ২০২৬ সালের মার্চ মাসের হিসাব অনুযায়ী, শিবরতনের ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৪০ কোটি ডলার (১৩ হাজার ১৮৫ কোটি টাকারও বেশি), যা তাঁকে বিশ্বসেরা ধনীদের তালিকায় স্থান করে দেয়।
২০২৪ সালে বিশ্বের শতকোটিপতিদের তালিকায় স্থান করে নেন শিবরতন। একটি সাধারণ পারিবারিক নোনতা খাবারের ব্যবসাকে ভারতের অন্যতম পরিচিত প্যাকেটজাত জলখাবারের ব্র্যান্ডে পরিণত করেছিলেন তিনি। বীকানেরের ঐতিহ্যবাহী স্বাদকে দেশ ও দেশের বাইরে সুপারমার্কেটের তাক পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিলেন শিবরতন।
ছবি: সংগৃহীত, ইনস্টাগ্রাম ও এআই সহায়তায় প্রণীত।