সম্প্রতি ইন্ডিগোর কয়েক হাজার উড়ান বাতিলের ফলে দেশ জুড়ে চরম হয়রানির মুখে পড়েছিলেন বহু যাত্রী। তার পরেই ভারতের উড়ান পরিষেবার ক্ষেত্রে মাত্র দু’টি বিমানসংস্থার আধিপত্য নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
সে সময় খোদ বিমান পরিবহণমন্ত্রী উড়ান ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার পরিবেশ বহাল রাখতে আরও বেশি পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। সেই আবহে সম্পূর্ণ নতুন দু’টি সংস্থাকে যাত্রী পরিষেবা শুরুর ছাড়পত্র দিল বিমান পরিবহণ মন্ত্রক। নাম আল হিন্দ এয়ার এবং ফ্লাই এক্সপ্রেস।
মন্ত্রকের ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ পেয়েছে তারা। ২০২৫-এ ওই ছাড়পত্র পেয়েছে উত্তরপ্রদেশের সংস্থা শঙ্খ এয়ার-ও। সূত্রের খবর, চলতি বছরেই চালু হচ্ছে তাদের উড়ান।
তবে এই তিন বিমানসংস্থার মধ্যে শঙ্খ এয়ার-কে নিয়ে মানুষের মধ্যে কৌতূহল বেশি। কারণ, ওই বিমানসংস্থার মালিক একসময় ছিলেন টেম্পোচালক। শঙ্খ এয়ারের উত্থান আধুনিক ভারতের অন্যতম আকর্ষণীয় উদ্যোক্তার সাফল্যের গল্প হিসাবে উঠে এসেছে।
শঙ্খ এয়ারের মালিক শ্রবণকুমার বিশ্বকর্মা। উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা তিনি। মাত্র সাত বছর আগেও কানপুরের রাস্তায় লোডার এবং টেম্পোচালক হিসাবে কাজ করছিলেন ৩৫ বছর বয়সি শ্রবণকুমার।
দৃঢ় সংকল্প এবং ইস্পাত, সিমেন্ট এবং পরিবহণের ব্যবসায় বিপুল লাভ করে বিমানসংস্থা চালু করেছেন শ্রবণকুমার। ধীরে ধীরে পূরণ করেছেন শৈশবের স্বপ্ন। উত্তরপ্রদেশের প্রথম স্থানীয় ভাবে তৈরি বিমানসংস্থা চালু করেছেন তিনি।
অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রক থেকে অনাপত্তিপত্র পাওয়ার পর ২০২৬ সালের গোড়ার দিকে শঙ্খ এয়ারের কার্যক্রম শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। চেয়ারম্যান শ্রবণকুমার জানিয়েছেন, জানুয়ারির প্রথমার্ধে লখনউকে দিল্লি, মুম্বই এবং অন্যান্য শহরের সঙ্গে আকাশপথে সংযুক্ত করার জন্য তিনটি এয়ারবাস বিমানের মাধ্যমে উড়ানযাত্রা শুরু করবে বিমানসংস্থাটি।
কিন্তু কী ভাবে টেম্পোচালক থেকে বিমানসংস্থার মালিক হয়ে উঠলেন শ্রবণকুমার? সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তরপ্রদেশের কানপুরে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে শ্রবণকুমারের জন্ম। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি বিশেষ আগ্রহ ছিল না তাঁর।
শ্রবণকুমার নিজেই স্বীকার করেছেন, কাজের সূত্রে তিনি টেম্পোয় ভ্রমণ করতেন। শুধু তা-ই নয়, টেম্পোচালক হিসাবেও কাজ করতেন। তাঁর কথায়, “শূন্য থেকে শুরু করা এক জন মানুষকে জীবনে সাইকেল, বাস, ট্রেন, টেম্পো— সব কিছুই দেখতে হয়।’’
শ্রবণকুমার আরও বলেন, ‘‘জীবনযাপনের জন্য আমি অটোও চালিয়েছি। কয়েকটি ছোট ব্যবসাও শুরু করেছিলাম, যার মধ্যে অনেকগুলি ব্যর্থ হয়।”
এর পর ২০১৪ সালে সিমেন্ট ব্যবসা শুরু করার মাধ্যমে শ্রবণকুমারের ব্যবসায়িক যাত্রা গতি পায়। ব্যবসায় পা দিয়ে ধীরে ধীরে নিজের জন্য জায়গা তৈরি করে ফেলেন শ্রবণ।
ব্যবসায় শ্রবণের প্রথম বড় সাফল্য আসে টিএমটি রড শিল্পে। সেই সাফল্যের উপর ভিত্তি করে তিনি সিমেন্ট, খনি এবং পরিবহণ খাতেও টাকা ঢালেন। শুরু করেন নতুন নতুন ব্যবসা।
ব্যবসায় সাফল্য আসার পর একসঙ্গে প্রচুর ট্রাক কেনেন শ্রবণ। সেগুলি ব্যবসায় লাগিয়ে আরও দৃঢ় ভাবে তাঁর ব্যবসায়িক পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেন। তৈরি করেন শঙ্খ এয়ার-সহ ভবিষ্যতের উদ্যোগের ভিত্তি। ব্যবসায় পা রাখার পরেও অনেক দিন টেম্পো চালিয়েছিলেন শ্রবণ।
কিন্তু কেন এবং কী ভাবে বিমানসংস্থা চালু করার কথা ভাবলেন শ্রবণ? সংবাদমাধ্যমকে তিনি জানিয়েছেন, বিমান পরিবহণ খাতে প্রবেশের চিন্তা তাঁর মাথায় আসে বছর চারেক আগে।
শ্রবণ জানিয়েছেন, জনসাধারণের জন্য বিমান ভ্রমণকে আরও সহজলভ্য করতে চেয়েছিলেন তিনি। চেয়েছিলেন, মানুষকে যেন বিমানে চড়ার আগে সাত-পাঁচ ভাবতে না হয়। আর সে ভাবনা থেকেই বিমানসংস্থা চালু করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
সংবাদসংস্থা পিটিআইকে শ্রবণ বলেন, ‘‘এক বার যখন এই চিন্তা আমার মাথায় ঢুকে যায়, তখন আমি পুরো প্রক্রিয়াটি বোঝার জন্য উঠেপড়ে লাগি। বিমানসংস্থা চালু করার জন্য কী ভাবে ছাড়পত্র পেতে হয়, নিয়মকানুন কী এবং কী ভাবে বিমানসংস্থা কাজ করে তা নিয়ে খোঁজখবর করতে শুরু করি। রীতিমতো গবেষণা শুরু করেছিলাম আমি। আর চার বছর আগের সেই চিন্তা এখন বাস্তবের রূপ নিয়েছে।”
মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা শ্রবণ আরও জানিয়েছেন, একসময় বড় স্বপ্ন দেখার অধিকার সবাইকে দেওয়া হত না। অবাস্তব বলে বিবেচিত হত। কিন্তু সেই ধারণার খোলনলচে একেবারে বদলে দিয়েছেন শ্রবণ।
শ্রবণের কথায়, ‘‘আমরা যে পরিস্থিতিতে বড় হয়েছি, সেখানে কেবল জীবিকা নির্বাহ করাই যথেষ্ট বলে মনে করা হত। এর বাইরে স্বপ্ন দেখাই অসম্ভব ছিল।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘একটি বিমান কেবল পরিবহণের একটি মাধ্যম, যেমন একটি বাস বা টেম্পো। এটিকে একচেটিয়া কিছু হিসাবে দেখা উচিত নয়।’’
শ্রবণকুমারের সঙ্গে অনেকে মিল পেয়েছেন ক্যাপ্টেন জি আর গোপীনাথের। কম খরচের বিমান পরিষেবা চালু করা নিয়ে তাঁর ভাবনা ভারতবাসীর জীবন বদলে দিয়েছিল। গোপীনাথের প্রকল্প বাস্তবায়িত হওয়ার পর মধ্যবিত্তের নাগালে চলে আসে বিমান পরিষেবা।
১৯৯৬ সাল থেকে বিমান পরিষেবা ব্যবসায় যুক্ত হন গোপীনাথ। প্রথমে চার্টার্ড হেলিকপ্টার পরিষেবা চালু করেন। নাম রাখেন ডেকান এভিয়েশন। শুধুমাত্র ভিআইপিদের গন্তব্যে পৌঁছে দিত তাঁর সংস্থা। এর পর তিনি মনস্থ করেন, মধ্যবিত্তদের জন্য কিছু করবেন। ২০০৩ সালে ৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে তিনি বেঙ্গালুরু থেকে হুবলি পর্যন্ত কম খরচের বিমান পরিষেবা চালু করেন। মধ্যবিত্তের কাছে সেটা স্বপ্নের মতো ছিল। সেই প্রথম নিজের খরচে বিমানের টিকিট কাটার কথা ভাবতে শুরু করেন মধ্যবিত্তেরা।
অন্য এয়ারলাইন্সের থেকে প্রায় অর্ধেক টাকায় টিকিট দিত গোপীনাথের সংস্থা। তাঁর এই দ্বিতীয় পরিকল্পনাও সফল হয়েছিল। তিনি প্রায় সাড়ে তিনশো ফ্লাইট চালু করেন দেশের মধ্যেই বিভিন্ন রুটে। কিন্তু পরে ক্ষতির মুখে পড়ে সংস্থা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন গোপীনাথ।
শ্রবণকুমার যেমন টেম্পো চালাতেন, তেমনই গোপীনাথ যাতায়াত করতেন গরুর গাড়ি চেপে। তিনিও একাধিক ব্যবসা শুরু করে অসফল হয়েছিলেন। শেষে বিমান পরিষেবায় মনোনিবেশ করেন।
সব ছবি: সংগৃহীত।