গান শুনতে পছন্দ করেন না এমন মানুষ খুব কমই রয়েছেন পৃথিবীতে। গান এবং সুর অনেক সময়ই মানুষের জন্য থেরাপির কাজ করে, বিষণ্ণ মন ভাল করে দেয়। তবে এমনও একটি গান রয়েছে, যার সঙ্গে জড়িয়ে অন্ধকার ইতিহাস। কারণ, সেই গান শুনলে নাকি মন প্রসন্ন হয় না, হতাশ হয়। এমনকি, শ্রোতাকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয় গানটি!
অবিশ্বাস্য মনে হলেও বিতর্কিত এবং কুখ্যাত সেই গানের নাম ‘গ্লুমি সানডে’। বাংলায় যার অর্থ, ‘বিষণ্ণ রবিবার’। সুরের স্রষ্টা হাঙ্গেরির পিয়ানোবাদক তথা সুরকার রেজসো সেরেসে। ১৯৩৩ সালে গানটিতে সুর দিয়েছিলেন তিনি।
বলা হয়, সেরেসের ‘গ্লুমি সানডে’ গানটি বিশ্ব জুড়ে আত্মহত্যার ঢেউ তুলেছিল। হয়ে উঠেছিল হতাশার প্রতীক। ‘গ্লুমি সানডে’ গানটি বিরল। ইতিহাসে অন্য কোনও গানকে নিয়ে এ রকম আতঙ্ক ছড়ানোর নজির নেই।
হাঙ্গেরীয় সঙ্গীতশিল্পী সেরেসের লেখা গানটিকে নিয়ে জল্পনা এবং গুজবের ধারা প্রায় শতাব্দীপ্রাচীন। ‘গ্লুমি সানডে’কে কেউ কেউ ‘আত্মহত্যার গান’ বলেও দাগিয়ে দিয়েছেন।
দাবি, ‘গ্লুমি সানডে’ শুনে পৃথিবীতে কয়েক ডজন মানুষ আত্মহত্যা করেছেন। বিমানে এই গান শোনা এবং বাজানো নিষিদ্ধ ঘোষণা হয়েছিল।
হাঙ্গেরির বাসিন্দা সেরেস পিয়ানো শিখেছিলেন নিজে নিজে। সুরকারও ছিলেন। ১৯৩২ সালে প্যারিসে থাকাকালীন একটি সহজ কিন্তু ভূতুড়ে সুর রচনা করেন তিনি। বলা হয়, সেরেসের নিজের প্রেমজীবনের হতাশা, বেকারত্ব এবং দারিদ্র থেকেই সেই সুরের সৃষ্টি।
গানটির প্রথম সংস্করণ অনেকটা বিলাপের মতো ছিল। কিন্তু হাঙ্গেরিতেই গানটি তার চূড়ান্ত রূপ নেয়। কবি লাসজলো জাভোর প্রেমে শোকগ্রস্ত ব্যক্তির উপর আলোকপাত করে গানের কথা নতুন ভাবে লেখেন। আবার সুর দেন সেরেস। ১৯৩৩ সালে জন্ম হয় ‘গ্লুমি সানডে’র।
গানটি খুব জনপ্রিয়তা পেয়েছিল হাঙ্গেরিতে। বুদাপেস্টের ক্যাবারেগুলিতে নিয়মিত বাজত সেই গান। কারণ, হৃদয়বিদারক পঙ্ক্তি এবং হতাশা জড়ানো সুর। ব্যক্তিগত জীবনে বা প্রেমে আঘাত পেয়েছেন এমন শ্রোতাদের মনে অনুরণন জাগিয়েছিল গানটি।
১৯৩০-এর দশকে দারিদ্র, নিরাপত্তাহীনতা এবং একাকিত্বের কারণে হাঙ্গেরিতে আত্মহত্যার হার বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ ছিল। এই আবহে দেশ জুড়ে বিভিন্ন গল্প ছড়াতে শুরু করে।
বেশ কিছু সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, আত্মঘাতী হওয়া একাধিক ব্যক্তির কাছে ‘গ্লুমি সানডে’ গানের পঙ্ক্তি লেখা নোট পাওয়া গিয়েছে। আগুনের মতো খবর ছড়ায়, ওই গানটি শুনেই আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে দেশ জুড়ে।
শীঘ্রই সেই তত্ত্ব হাঙ্গেরির সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরেও ছড়িয়ে পড়ে। আরও প্রলেপ পড়ে ‘গ্লুমি সানডে’ নিয়ে জল্পনার স্তরে। খবর ছড়ায়, বুদাপেস্টে এক তরুণী গানটির স্বরলিপি হাতে নিয়ে ডানিউবে আত্মহত্যা করেছেন। অন্যত্র এক রেস্তরাঁর মালিকও রেডিয়োয় গানটি শোনার পরে জীবন শেষ করে দেন বলে দাবি ওঠে।
ওই সব দাবির একটিরও সত্যতা যাচাই করা হয়নি সে সময়। তবে লোকমুখে প্রচার হতে থাকে ‘গ্লুমি সানডে’র রহস্যে মোড়া কাহিনি। গানটি আটলান্টিক অতিক্রম করার আগেই ‘হাঙ্গেরিয়ান সুইসাইড সং’ বা ‘হাঙ্গেরির আত্মহত্যা গান’ হিসাবে কুখ্যাতি অর্জন করেছিল।
১৯৪১ সালে আমেরিকার গায়িকা বিলি হলিডে নতুন জীবন দেন ‘গ্লুমি সানডে’কে। ‘কাল্ট ক্লাসিকে’ পরিণত হয় সেই গান। অনেকের মুখে মুখে ঘুরতে থাকে সেই গান।
গানটি নিয়ে আসল মোড় আসে লন্ডনে। গুজব শুনে বিচলিত হয়ে বিবিসি কয়েক দশক ধরে গানটির কথাগুলি বাজানোর ক্ষেত্রে সম্প্রচারে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। শুধুমাত্র সুর বাজানো যেতে পারত। এই বিষয়টি গানের কুখ্যাতিকে আরও বা়ড়িয়ে তুলেছিল।
হাঙ্গেরিতেও কিছু প্রতিষ্ঠান গানটিকে সাময়িক ভাবে নিষিদ্ধ করেছিল বলে শোনা যায়। গানটি নাকি বিমানে বাজানোর ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা ছিল। যদিও এ সব দাবির কোনও প্রমাণ এখনও অবধি নেই। এ ভাবেই ‘অভিশপ্ত’ গানটি আতঙ্কের এবং সমান ভাবে প্রশংসিত হয়ে ওঠে।
তবে গবেষকদের একাংশের দাবি, হাঙ্গেরিতে আত্মহত্যার যে তরঙ্গ তিরিশের দশকে ছড়িয়েছিল, তার জন্য বিজ্ঞানসম্মত ভাবে ভাবে গানটিকে কোনও মতেই দায়ী করা যায় না।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরগুলি মূলত অতিরঞ্জিত সাংবাদিকতা এবং শহুরে লোককাহিনির ফসল বলেই মনে করেন অনেকে। ওই বিশেষজ্ঞদের দাবি, হাঙ্গেরির আত্মহত্যার মড়ককে প্রকৃত অর্থে ব্যাখ্যা করে সেই সময়ের সামাজিক পরিস্থিতি— যুদ্ধ, দারিদ্র, একাকিত্ব।
গানের স্রষ্টা সেরেসের পরিণতিও ছিল করুণ। নাৎসিবাহিনীর নির্যাতন থেকে বাঁচলেও হতাশায় ডুবে গিয়েছিলেন তিনি। ১৯৬৮ সালে আত্মহত্যা করেন তিনি। মিলে যায় স্রষ্টা এবং সৃষ্টির নিয়তি।
সব ছবি: সংগৃহীত।