কখনও ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ, কখনও ভারতীয় বংশোদ্ভূত নভোশ্চর সুনীতা উইলিয়ামস, কখনও মাইক্রোসফ্টের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস, আবার কখনও ভারতের পলাতক শিল্পপতি বিজয় মাল্য। ভারতের বেশির ভাগ ইউটিউবারেরা যে বিখ্যাত বা কুখ্যাত মানুষদের ছোঁয়ার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারেন না, তাঁদেরই সামনে বসিয়ে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তিনি। তাঁদের সঙ্গে কথা বলেছেন সাবলীল ভাবে। আর সেখানেই মুনশিয়ানা ভারতীয় ইউটিউবার তথা পডকাস্টার রাজ শমানীর।
সম্প্রতি ভারত আয়োজিত এআই সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসাবে নয়াদিল্লি এসেছিলেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট। গোটা সফরে মাক্রোঁ একটি মাত্র সাক্ষাৎকারে বসার জন্য রাজি হয়েছিলেন। না, তাবড় কোনও সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলেননি তিনি। মাক্রোঁ উপস্থিত হয়েছিলেন রাজের পডকাস্টে। ভারতীয় ইউটিউবারের সঙ্গে বেশ কিছু ক্ষণ কথা বলেন তিনি।
রাজ ইনদওরের বাসিন্দা। ২৮ বছর বয়সি এই উদ্যোগপতি, ইউটিউবার তথা পডকাস্টার একসময় সংসার চালানোর জন্য ঘরে ঘরে সাবান বিক্রি করতেন। কিন্তু এখন তিনি ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় ডিজিটাল তারকা। রাজকে ভারতের এক নম্বর পডকাস্টার বলেও দাবি করেন তাঁর অনুরাগীরা।
ইউটিউবে ‘ফিগারিং আউট উইথ রাজ শমানী’ নামে একটি পডকাস্ট অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেন রাজ। বিল গেটস, বিজয় মাল্য, আমির খান থেকে এমএস ধোনি, কর্ণ জোহর, এস জয়শঙ্কর— বিভিন্ন পর্বে রাজের অতিথি হয়ে এসেছেন দেশ-বিদেশের তাবড় তাবড় সব ব্যক্তিত্ব। রাজের পডকাস্ট অনুষ্ঠানে তারকাখচিত সেই অতিথি তালিকার নবতম সংযোজন ফরাসি প্রেসিডেন্ট মাক্রোঁ।
ইউটিউবে রাজের পডকাস্ট চ্যানেলে সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। গান, পডকাস্ট শোনার অন্যতম জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম স্পটিফাই এবং ভিডিয়ো স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ইউটিউবে তাঁর মতো সাবস্ক্রাইবার আর কোনও পডকাস্টারের নেই।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৯১-১১০ কোটি টাকার মালিক রাজ। তবে ভারতের অন্যতম তারকা ইউটিউবারের কেরিয়ারের শুরুটা ছিল অত্যন্ত সাধারণ। নিজের চেষ্টায় বর্তমানে তিনি সাফল্যের শিখরে।
১৯৯৭ সালের ২৯ জুলাই মধ্যপ্রদেশের ইনদওরে এক মধ্যবিত্ত মারোয়াড়ি পরিবারে রাজের জন্ম। রাজের বাবা নরেশ শমানীর রাসায়নিক তৈরি এবং সরবরাহের একটি ছোট ব্যবসা ছিল। রাজের বয়স যখন মাত্র ১৬, তখন তাঁর বাবা ডায়াবিটিসে আক্রান্ত হন। আর কর্মজগতে ফিরতে পারেননি তিনি।
নরেশের শারীরিক অসুস্থতার কারণে পারিবারিক ব্যবসা ভেঙে পড়ে। মাথার উপর এসে পড়ে ঋণের বোঝা। অভাব বাড়তে থাকে। রাজ তখনও স্কুলে। তবে ওই বয়সেই তিনি বুঝতে পারেন, উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে মুক্তির উপায় অর্থ উপার্জন এবং যা করতে হবে, তা করতে হবে নিজেকেই।
মাত্র ১৭ বছর বয়সে বাবার কাছ থেকে ১০,০০০ টাকা ধার করে বাড়িতেই বাসন মাজার তরল সাবান তৈরি করা শুরু করেন রাজ। দু’টি বড় বালতিতে রোজ চলতে থাকে ওই সাবান তৈরির কাজ। সাবানটির নাম তিনি দেন ‘জাদুগর ড্রপ’। মাত্র ৪৫ টাকায় ৫০০ মিলিলিটারের ওই সাবানের বোতল বিক্রি করা শুরু করেন রাজ, যা বাজারে অন্যান্য বাসন মাজার সাবানের তুলনায় অনেকটাই সস্তা ছিল।
ইনদওরের বিভিন্ন আবাসনে গিয়ে ঘরে ঘরে নিজের তৈরি পণ্য বিক্রি শুরু করেন রাজ। দোকানেও দিয়ে আসতেন। খুব কম সময়েই জনপ্রিয়তা অর্জন করে রাজের তৈরি বাসন মাজার তরল সাবান। কয়েক মাসের মধ্যে সারা ইনদওর জুড়ে ‘জাদুগর ড্রপ’ বিক্রি শুরু হয়ে যায়।
২০১৫ সাল নাগাদ বাবার রাসায়নিক ব্যবসার সঙ্গে ‘জাদুগর ড্রপ’কে মিলিয়ে দেন রাজ। তৈরি করেন ‘শমানী ইন্ডাস্ট্রিজ়’। রাজের ভাবনার জোরেই সাবান, ডিটারজেন্ট, বাড়ির মেঝে-শৌচাগার পরিষ্কারের রাসায়নিক, স্যানিটাইজ়ার তৈরি করে সংস্থাটি।
বর্তমানে সেই শমানী ইন্ডাস্ট্রিজ় ২০০ কোটি টাকার ব্যবসা করেছে মধ্যপ্রদেশে। প্রতিবেশী রাজ্যগুলির স্থানীয় বাজারেও পণ্য সরবরাহ করে রাজের সংস্থা। তবে সাবান তৈরিতেই থেমে যাননি রাজ।
উদ্যোগপতি রাজ খুব শীঘ্রই বুঝতে পারেন যে, আসল উপার্জন পণ্য বিক্রি করে আসবে না, আসবে জ্ঞান বিক্রি করে। ব্যবসা কী ভাবে গড়ে তুলতে হয়, তা তিনি তরুণ ভারতীয়দের শেখাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সমস্যা ছিল একটাই। খুব একটা ভাল ইংরেজি বলতে পারতেন না রাজ। জনসমক্ষে কথা বলতেও ভয় পেতেন।
রাজ মূলত হিন্দিতে সাবলীল ছিলেন। পড়াশোনা করেছিলেন ইনদওরের একটি স্থানীয় স্কুলে। ফলে ইংরেজিতে কী ভাবে মানুষের সঙ্গে কথা বলবেন, এই চিন্তা তাঁকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল। কিন্তু রাজ এ-ও বুঝতে পারেন, ইনদওরের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি যদি বাইরে যেতে চান, তা হলে তাঁকে ইংরেজি বলা এবং জনসমক্ষে কথা বলা— উভয় আতঙ্ককেই কাটিয়ে উঠতে হবে।
সেই ভীতি কাটাতে বিভিন্ন বড় অনুষ্ঠান, কর্পোরেট সেমিনার, ব্যবসায়িক ফোরাম এবং বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দেন রাজ। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অনুশীলনও শুরু করেন। নিজের অনুশীলন রেকর্ড করেও রাখতেন।
২০১৬ সাল নাগাদ বিভিন্ন জায়গায় অণুপ্রেরণামূলক বক্তৃতা করতে শুরু করেন রাজ। ২০২১ সাল নাগাদ ইউটিউবে পডকাস্ট চ্যানেল খোলার চিন্তা মাথায় আসে তাঁর। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে শুরুও করে দেন ‘ফিগারিং আউট উইথ রাজ শমানী’ শো।
রাজ প্রথমে ঠিক করেন— অর্থ, ব্যবসা, সাফল্য এবং ব্যর্থতা নিয়ে তারকা এবং চিন্তাবিদদের সঙ্গে কথোপকথন করবেন তিনি। তবে পরে সেই পরিধি অন্যান্য আরও ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়। অতিথিদের নাকি কখনও আগে থেকে ঠিক করা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেন না রাজ। কোনও অতিথিকে কথা বলতে বাধাও দেন না। এটিই হয়ে ওঠে তাঁর শোয়ের মূলধন। শীঘ্রই রাজের পডকাস্ট সারা দেশের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। রাজের জনপ্রিয়তাও তুঙ্গে পৌঁছোয়।
এর পর থেকে রাজকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি। বর্তমানে দেশের অন্যতম নামী ইউটিউবার রাজ। এক জন সফল উদ্যোগপতিও। বর্তমানে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে তরুণ সমাজকে সফলতার পাঠ পড়াতেও দেখা যায় ২৮ বছর বয়সি তরুণ পডকাস্টারকে।
সব ছবি: সংগৃহীত এবং প্রতীকী।