একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয়। আর তাতেই এক রাতের মধ্যে ধসে যায় একটি প্রধান বাঁধ-সহ অন্যান্য ৫৯টি বাঁধ। ১৯৭৫ সালের অগস্টে ঘূর্ণিঝড় নিনার আঘাতে চিনের হেনান জুড়ে ঘটে গিয়েছিল এক ‘মহাপ্রলয়’। মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়। বিপর্যয়ের ক্ষয়ক্ষতি ছিল অকল্পনীয়, যা দীর্ঘকাল পর্যন্ত বিশ্ববাসীর কাছে গোপন রাখা হয়েছিল।
ঘূর্ণিঝড় নিনার তাণ্ডবে ঘটে যাওয়া অভাবনীয় বিপর্যয়টি কেড়ে নিয়েছিল সব মিলিয়ে ২ লক্ষ মানুষের প্রাণ। বাঁধটি ভেসে যাওয়ার পর তাৎক্ষণিক ভাবে ২৬ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। পরে দুর্ভিক্ষ এবং মহামারি আরও ১ লক্ষ ৪৫ হাজার থেকে ২ লক্ষ ৩০ হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয় বলে ধারণা করা হয়েছে।
৭৫-এর অগস্ট মাসে হেনান প্রদেশে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত শুরু হয়। মাত্র ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ১,০৬০ মিমি বৃষ্টি হয়েছিল। ওই এলাকায় সারা বছরের গড় বৃষ্টিপাত ৮০০ মিলিমিটার। অস্বাভাবিক সেই বর্ষণ পুরো এক বছরের গড় বৃষ্টিপাতের চেয়েও বেশি। ঘূর্ণিঝড় নিনা যে পরিমাণ বৃষ্টি বয়ে নিয়ে এসেছিল, তা ছিল ২,০০০ বছরে এক বার ঘটা বন্যার সমান।
ভয়ঙ্কর এই দুর্যোগে প্লাবিত হয়েছিল ১২,০০০ বর্গকিলোমিটার (৩০ লক্ষ একর) এলাকা। হেনান প্রদেশের এই অংশে মোট জনসংখ্যা ১ কোটিরও বেশি ছিল। বাঁধভাঙা জলোচ্ছ্বাসে ৩০টি শহর এবং কাউন্টি ভেসে গিয়েছিল। বন্যায় ৫০ থেকে ৬০ লক্ষ ঘরবাড়িও ধসে পড়ে। প্রদেশটি সম্পূর্ণ তছনছ হয়ে যায় এক রাতের মধ্যেই।
১৯৫০ সালে নির্মিত বানকিয়াও বাঁধটিকে ‘লোহার বাঁধ’ বলে ডাকা হত চিনে। ধসে পড়া অনেক বাঁধই মূলত সোভিয়েত উপদেষ্টাদের সহায়তায় নির্মিত হয়েছিল। বানকিয়াও বাঁধটি এমন ভাবে তৈরি করা হয়েছিল যেন এটি সহস্র বছরে এক বার হতে পারে এমন বন্যা সহ্য করতে পারে। পরে তদন্তে উঠে আসে বাঁধটির নকশায় কিছু সূক্ষ্ম অথচ মারাত্মক ভুল ছিল।
এই বিপর্যয়ের ক্ষয়ক্ষতি ছিল অকল্পনীয়। এই মারাত্মক বিপর্যয়ের ঘটনাটি দীর্ঘকাল পর্যন্ত বিশ্ববাসীর কাছ থেকে আড়ালে রেখে দিয়েছিল তৎকালীন চিন সরকার। প্রায় দু’দশক ধরে এই বিপর্যয়ের প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করেনি বেজিং। ১৯৮০ সালের শেষের দিকে এবং ৯০ দশকের শুরুতে এটি নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আসার পর বিশ্ব জুড়ে হইচই পড়ে গিয়েছিল।
দুর্যোগের দিনটি ছিল ৮ অগস্ট। রাত ১টার দিকে রু নদীর উপর নির্মিত বানকিয়াও বাঁধটি ভেঙে যায়। এর ফলে প্রায় ৬০ কোটি ঘনমিটার জল ফুঁসতে ফুঁসতে প্রবল বেগে সমতলে আছড়ে পড়ে। প্রায় ৬ মিটার (২০ ফুট) উঁচু এবং ১২ কিলোমিটার প্রশস্ত জলের তোড়ে ভেসে যায় হেনান প্রদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা। দৈত্যাকার ঢেউ প্রায় প্রতি ঘণ্টায় ৫০ কিলোমিটার বেগে সমস্ত এলাকা প্লাবিত করে। নিশ্চিহ্ন করে দেয় জনবসতিকে।
বাঁধনির্মাণের সময় জল ধরে রাখার বিষয়টিতে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। বন্যা প্রতিরোধের জন্য বাঁধের ক্ষমতাবৃদ্ধির বিষয়টিকে উপেক্ষা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় নির্মিত বাঁধের নকশায় ত্রুটির ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ বলি হয়। প্রকৌশলগত নিখুঁত পরিকল্পনার চেয়ে দ্রুত নির্মাণের উপর জোর দেওয়া হয়েছিল। বাঁধের নিরাপত্তার চেয়ে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল সেই সময়।
নির্মাণকাজের ব্যর্থতার পুরোপুরি দায় চেপেছিল ‘গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড’ যুগের দ্রুত, বেপরোয়া, পরিকাঠামোগত উন্নয়নের নামে প্রকৌশলগত ত্রুটির ঘাড়ে। মাও জে দংয়ের মস্তিষ্কপ্রসূত ‘গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড’ পরিকল্পনার নেপথ্যে ছিল চিনকে দ্রুত একটি শিল্পোন্নত দেশে পরিণত করা। চিনকে কৃষিভিত্তিক সমাজ থেকে শিল্পোদ্যোগী সমাজে রূপান্তরিত করার জন্য এই অভিযান শুরু করেছিলেন সমাজতান্ত্রিক নেতা। এর ফলশ্রুতি ছিল চিনের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ।
চিনের নির্মাণ শ্রমিকদের প্রধান জলাধার নির্মাণের কোনও অভিজ্ঞতা ছিল না। ফলস্বরূপ, নকশা এবং নির্মাণ সম্পূর্ণ রূপে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে পরিচালিত হয়েছিল। নির্মাণ বিষয়ক বহু বিশেষজ্ঞ এবং ভিন্নমত পোষণকারী বাঁধের নকশার ত্রুটি সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন, কিন্তু তাঁদের পরামর্শে কর্ণপাত করেনি মাও সে তুংয়ের সরকার। তাঁদের অনেকের মতই উপেক্ষা করা হয়েছিল। আবার কারও কারও ঘাড়ে নেমে এসেছিল শাস্তির খাঁড়া।
মূল বাঁধে বানকিয়াওয়ের সঙ্গে প্রায় ৫৯টি ছোট-বড় বাঁধ সংযুক্ত ছিল। সেই শৃঙ্খলও ভেঙে পড়ে। প্রায় ৬০ লক্ষ ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে যায়। বানকিয়াও ছিল ওই এলাকার প্রধান বাঁধ। এটি যখন ভেঙে যায়, তখন এর থেকে আছড়ে পড়া বিশাল জলের তোড়ে নীচের দিকে থাকা আরও ৫৮টি ছোট-বড় বাঁধ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। একে প্রযুক্তির ভাষায় ‘ক্যাসকেড ফেলিয়োর’ বলা হয়।
সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তায় তৈরি এই বাঁধটির শক্তি নিয়ে কর্তৃপক্ষের এতটাই আত্মবিশ্বাস ছিল যে, তাঁরা বন্যার চরম মাত্রার পূর্বাভাসকে গুরুত্ব দেননি। বেজিং-গুয়াংজু রেললাইন-সহ বহু সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। বন্যার প্রবল স্রোতে এবং ঝড়ে টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল। ফলে নিচু এলাকার বাসিন্দাদের সঠিক সময়ে সতর্ক করা সম্ভব হয়নি।
বাঁধটির জল বার করার জন্য পর্যাপ্ত স্লুইস গেট ছিল না। মূল নকশায় ১২টি গেট রাখার কথা থাকলেও খরচ কমাতে মাত্র ৫টি গেট তৈরি করা হয়েছিল। বিপর্যয়ের সময় পলির কারণে এই গেটগুলো আংশিক ভাবে আবদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। জল বার হওয়ার গতি ছিল অত্যন্ত ধীর।
প্রকৃতিও যেন হেনান প্রদেশের বাসিন্দাদের প্রতি বিরূপ হয়ে গিয়েছিল সেই অভিশপ্ত দিনটিতে। নিনা সাধারণ ঘূর্ণিঝড়ের মতো দ্রুত চলে না গিয়ে হেনান প্রদেশের উপর স্থির হয়ে যায়। ঝড়টি প্রথমে চিনের উপকূলীয় এলাকা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও এটি দিক পরিবর্তন করে মূল ভূখণ্ডের গভীরে ঢুকে পড়ে এবং পাহাড়ে বাধা পেয়ে ওই অঞ্চলে আটকে যায়।
টাইফুনের কারণে টেলিফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। বাঁধের দায়িত্বে থাকা কর্মীরা যখন বুঝতে পারেন যে বাঁধটিকে আর রক্ষা করা সম্ভব না, তখন সাহায্যের জন্য বার্তা পাঠানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। পরিস্থিতি সম্পর্কে রিপোর্ট করার জন্য বানকিয়াও শহরের কর্মকর্তারা ঝুমাদিয়ানে পৌঁছোনোর পরও তাঁদের উদ্বেগে আমল দিতে রাজি হননি বাঁধের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট দফতর। বাঁধটি কোনও ভাবেই ভেঙে পড়তে পারে না বলে মনে করে শহরের প্রশাসকের উদ্বেগ উড়িয়ে দেওয়া হয়।
বন্যার জল যখন জনপদ ডুবিয়ে দেয়, তখন বৃষ্টির তীব্রতা এত বেশি ছিল যে হেলিকপ্টার বা নৌকা দিয়েও উদ্ধারকাজ চালানো সম্ভব হয়নি। বন্যাকবলিত মানুষ গাছের মগডালে বা ঘরের চালে দিনের পর দিন না খেয়ে আটকে ছিলেন। দশ লক্ষেরও বেশি মানুষ আটকে পড়েছিলেন। আকাশ থেকে ফেলা খাবারের অর্ধেক জলে পড়ে নষ্ট হয়ে যায়। বন্যার জল নামার পর সর্বত্রই দেখা গিয়েছিল মৃতদেহের স্তূপ।
বন্যা থেকে যাঁরা বেঁচে ফিরেছিলেন, তাদের জন্য বড় শত্রু হয়ে দাঁড়ায় ক্ষুধা। পরবর্তী কালে দূষিত জল থেকে টাইফয়েড, কলেরা এবং আমাশয়ের মতো মহামারি ছড়িয়ে পড়ে, যা তাৎক্ষণিক ভাবে বন্যার চেয়েও বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়। এই ঘটনাটি পরবর্তী কালে চিনের ‘থ্রি গর্জেস ড্যাম’-সহ অন্যান্য বড় বাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং নিষ্কাশন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে বাধ্য করে।
ছবি: সংগৃহীত ও এআই সহায়তায় প্রণীত।