প্রতিবেশী গ্রিনল্যান্ড কব্জা করতে চেয়ে হুমকি-হুঁশিয়ারি। ইচ্ছামতো যখন-তখন বিপুল অঙ্কের শুল্ক চাপিয়ে দেওয়া। কিংবা স্বাধীনতা বিসর্জন দিয়ে আমেরিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য চাপ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘পাগলামি’তে অতিষ্ঠ কানাডা। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের উপর চাপ বাড়াতে বেজিঙের দিকে ‘বন্ধুত্ব’র হাত বাড়িয়ে দিল অটোয়া। ফলে দু’তরফে সই হয়েছে বাণিজ্যচুক্তি। কানাডা-চিনের এই ‘দোস্তি’ আগামী দিনে ট্রাম্পের রাতের ঘুম কাড়তে পারে, বলছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
সম্প্রতি বেজিঙের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তিতে সই হওয়ার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। তাঁর দাবি, ‘‘আমেরিকার চেয়ে চিনের বিদেশনীতি অনেক বেশি স্থিতিশীল ও ভরসাযোগ্য। ফলে তাদের অবিশ্বাস করার কিছু নেই।’’ তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, মাত্র এক বছর আগে অটোয়ার জন্য ‘সবচেয়ে বড় হুমকি’ হিসাবে ড্রাগনকে চিহ্নিত করেছিলেন তিনি। ট্রাম্পের জন্যই কার্নি যে ১৮০ ডিগ্রির ডিগবাজি খেয়েছেন, তাতে একরকম নিশ্চিত ওয়াকিবহাল মহল।
কানাডা-চিন বাণিজ্যচুক্তি অনুযায়ী, আগামী দিনে বেজিঙের বৈদ্যুতিন গাড়ি বা ইভির (ইলেকট্রিক ভেহিকল) উপর শুল্ক কমাবে অটোয়া। বিনিময়ে ড্রাগনের বাজারে কৃষিপণ্যের বিক্রি বৃদ্ধির সুযোগ পাচ্ছে কার্নি সরকার। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাস্তায় হেঁটে মান্দারিনভাষীদের ইভিতে চড়া শুল্ক চাপিয়ে দেয় কানাডা। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পাল্টা অটোয়ার কৃষি পণ্যে ‘প্রতিশোধমূলক’ শুল্ক আরোপ করেন চিনা প্রেসি়ডেন্ট শি জিনপিং। ফলে তাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক তলানিতে যেতে বেশি সময় লাগেনি।
দীর্ঘ দিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হল অটোয়া। কিন্তু, ২০২৪ সালের নভেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প জয়ী হওয়ার পর দ্রুত বদলাতে থাকে পরিস্থিতি। কারণ ভোটে জিতেই কানাডাকে নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেন তিনি। বলেন, ‘‘উত্তরের প্রতিবেশীটির পৃথক রাষ্ট্র হিসাবে অস্তিত্ব টিঁকিয়ে রাখার কোনও প্রয়োজন নেই।’’ আমেরিকার সঙ্গে সংযুক্তিকরণের পর যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম প্রদেশ হিসাবে গড়ে উঠবে কানাডা। গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও এ কথা বলতে শোনা গিয়েছে ট্রাম্পকে।
যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্টের এ-হেন মন্তব্যে প্রমাদ গোনেন কানাডার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। তড়িঘড়ি আমেরিকায় এসে ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করেন তিনি। তাতে অবশ্য বর্ষীয়ান রিপাবলিকান নেতার মন গলেনি। উল্টে অটোয়া সংযুক্তিকরণে রাজি হলে ট্রুডো সেখানকার গভর্নর হতে পারবেন বলে লোভ দেখান ট্রাম্প। এর পর দেশে ফেরার কয়েক দিনের মাথাতেই প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন জাস্টিন। গত বছরের (২০২৫ সাল) মার্চে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন কার্নি।
ট্রুডোর পতনে কানাডা-আমেরিকা সম্পর্কের উন্নতি হবে বলে মনে করা হয়েছিল। কারণ অটোয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে দু’চোখে দেখতে পারতেন না ট্রাম্প। যদিও বাস্তবে তা হয়নি। কুর্সিতে বসেই কার্নি জানিয়ে দেন, কোনও অবস্থাতেই স্বাধীনতা হারিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্তি মেনে নেবেন না কানাডার মানুষ। ‘পোটাস’ (প্রেসিডেন্ট অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস) অবশ্য তাঁর ওই মন্তব্যকে একেবারেই গুরুত্ব দেননি। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে তিনি বলেন, ‘‘যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম প্রদেশ হতে মুখিয়ে আছে ওখানকার জনতা।’’
কার্নি ক্ষমতায় আসার কয়েক দিনের মাথাতেই কানাডার উপর ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে দেন ট্রাম্প। পরে সেই অঙ্ক আরও বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশ করেন। এ ছাড়া ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের পণ্যের উপর ৫০ শতাংশ শুল্ক ধার্য করে আমেরিকা। ফলে মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় অটোয়ার রফতানি বাণিজ্য। কানাডার শত অনুরোধের পরেও নিজের অবস্থানে অটল থাকেন ট্রাম্প। এর জেরে কিছুটা বাধ্য হয়েই বিকল্প অংশীদারের খোঁজে লেগে পড়ে কার্নি সরকার। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ঠিক তখনই অটোয়ার সামনে হাজির হয় চিন।
এ বছরের গোড়ায় ট্রাম্পের নির্দেশে ভেনেজ়ুয়েলায় সামরিক অভিযান চালায় মার্কিন ডেল্টা ফোর্স। লাটিন (দক্ষিণ) আমেরিকার দেশটির রাজধানী কারাকাসে ঢুকে সস্ত্রীক সেখানকার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে আনে তারা। মাদুরোদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে দায়ের হয়েছে মাদকপাচার, নির্বাচনে কারচুপি-সহ একাধিক মামলা। মাদুরো ‘অপহরণ’কাণ্ডের পর মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেয় কানাডা। কার্নি সরকারের বক্তব্য ছিল, এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইন ভেঙেছে ওয়াশিংটন।
মাদুরো অভিযানে সাফল্য আসতেই গ্রিনল্যান্ডের দিকে নজর দেন ট্রাম্প। ২০২৪ সালে নির্বাচনে জেতার ঠিক পরেই পৃথিবীর বৃহত্তম দ্বীপটিকে কব্জা করার কথা বলতে শোনা গিয়েছিল তাঁকে। গ্রিনল্যান্ড উত্তর আমেরিকায় অবস্থিত হলেও এর মূল মালিকানা আছে ডেনমার্কের কাছে। তবে সেখানকার বাসিন্দাদের স্বায়ত্তশাসনমূলক সরকার চালানোর অধিকার দিয়েছে কোপেনহেগেন। ট্রাম্পের মুখে দখলের কথা শুনেই ফুঁসে ওঠে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সরকার।
পৃথিবীর বৃহত্তম দ্বীপ দখলের স্বপ্ন কিন্তু ‘পোটাস’-এর আজকের নয়। ২০১৭-’২১ সাল পর্যন্ত প্রথম দফায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন ডেনমার্কের থেকে গ্রিনল্যান্ড কিনে নিতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু, সে বারও ‘বিক্রি নেই’ বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেয় কোপেনহেগেন। এ বার অবশ্য ট্রাম্পের শরীরী ভাষায় কিছুটা মরিয়া ভাব রয়েছে। গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়েছেন তিনি। আর তাই সেখানে তিনি সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশ দিতে পারেন বলে তুঙ্গে উঠেছে জল্পনা।
ট্রাম্পের এই নাছোড় মনোভাবই মেনে নিতে পারছে না ডেনমার্ক-সহ পশ্চিম ইউরোপের একাধিক দেশ। ফলে তড়িঘড়ি ‘সবুজ দ্বীপে’ বাহিনী পাঠিয়েছে তারা। কোপেনহেগেন ছাড়াও সেখানে আছে ফ্রান্স, জার্মানি ও সুইডেনের ফৌজ। গ্রিনল্যান্ডে সামরিক মহড়া শুরু করেছে তারা। একে খোলাখুলি ভাবে সমর্থন জানিয়েছে কানাডা। শুধু তা-ই নয়, ‘সবুজ দ্বীপে’ একটি দূতাবাস খোলার পরিকল্পনাও রয়েছে অটোয়ার।
এই পরিস্থিতিতে আমেরিকার গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের দাবি সমর্থন না করায় ইউরোপের আটটি দেশের পণ্যে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন ট্রাম্প। এর বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং সেখানকার একাধিক রাষ্ট্রনেতা। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাতিল হতে পারে ইইউ-এর বাণিজ্যচুক্তি। ২০২৫ সালে সংশ্লিষ্ট সমঝোতাটি হলেও ইউরোপীয় দেশগুলি তাতে এখনও চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়নি।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের অনুমান, ট্রাম্পের আগ্রাসী নীতিতে আতঙ্কিত হয়েই চিনের দিকে ঝুঁকেছেন কার্নি। কারণ, সহজে গ্রিনল্যান্ড হাতে চলে এলে তাঁর পরবর্তী নিশানায় যে অটোয়া থাকবে, তা বলাই বাহুল্য। আর তাই সংশ্লিষ্ট চুক্তিতে বিরাট লাভের সুযোগ না থাকা সত্ত্বেও ঘরোয়া ইভির বাজার বেজিঙের সামনে খোলার বিষয়ে রাজি হয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী। এতে ঘরের মাটিতে সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে তাঁকে।
দ্বিতীয়ত, কানাডার সঙ্গে আমেরিকার একটি মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি রয়েছে। একে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ বলেছেন ট্রাম্প। ফলে ওই সমঝোতা নতুন করে পর্যালোচনার কাজ শুরু করেছে তাঁর প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট চুক্তি ভেঙে ফেললে মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে অটোয়ার বৈদেশিক বাণিজ্য। তাই আগে ভাগেই বিকল্প হিসাবে চিনের উপর কার্নি বাজি ধরলেন বলে মনে করা হচ্ছে।
চিনের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি হওয়ার পর অটোয়া-বেজিং সম্পর্ককে এখন অনেক বেশি ‘প্রেডিক্টেবল’ বা অনুমানযোগ্য বলে উল্লেখ করেন কার্নি। তাঁর কথায়, ‘‘বর্তমান বিশ্ব যেমন আছে, আমাদের ঠিক সে ভাবেই তাঁকে গ্রহণ করতে হবে। আমাদের ইচ্ছামতো বদল করে তাকে গ্রহণ করা উচিত নয়।’’ এটাই অটোয়ার নতুন বিদেশনীতির মূলমন্ত্র হতে চলেছে বলে স্পষ্ট করেছেন তিনি।
বাণিজ্যচুক্তির পাশাপাশি কানাডার পর্যটকদের ভিসা দেওয়ার নিয়মে শিথিলতা আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জিনপিং সরকার। অটোয়ার কৃষি সমৃদ্ধ প্রদেশ সাসকাচোয়ানের মন্ত্রী স্কট মো বেজিঙের সঙ্গে সমঝোতার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। যদিও ওই চুক্তির তীব্র সমালোচনা করেছেন অন্টারিও প্রদেশের মন্ত্রী ডগ ফোর্ড। তাঁর দাবি, এর জেরে অচিরেই ধ্বংস হবে কানাডার ইভি নির্মাণ শিল্প। সেটা পুরোপুরি চলে যাবে ড্রাগনের কব্জায়।
কানাডা-চিন সমঝোতা নিয়ে গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার। সংশ্লিষ্ট চুক্তিটিকে তিনি সমস্যাজনক বলে উল্লেখ করেছেন। সম্প্রতি, একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন এই সমঝোতার জন্য ভবিষ্যতে অটোয়াকে অনুশোচনা করতে হবে। যদিও আশ্চর্যজনক ভাবে চুক্তিটিকে স্বাগত জানিয়েছেন ট্রাম্প।
‘পোটাস’-এর বক্তব্য, ‘‘চিনের সঙ্গে কোনও বাণিজ্যচুক্তি লাভজনক হলে সেটা অবশ্যই করা উচিত। এতে দোষের কিছু নেই।’’ আগামী এপ্রিলে ড্রাগনভূমিতে যাওয়ার কথা আছে তাঁর। সেখানে প্রেসিডেন্ট শি-র সঙ্গে বৈঠক করবেন ট্রাম্প। তার পর বিশ্ব রাজনীতির পাল্লা কোনদিকে ঘোরে সেটাই এখন দেখার।
সব ছবি: সংগৃহীত।