খুঁজলে বাতিল বৈদ্যুতিন যন্ত্রপাতি মিলবে না এমন বাড়ি বোধহয় খুব কমই আছে। বিশেষ করে ল্যাপটপ ও স্মার্টফোন। দু’-তিন বছরের মধ্যেই স্মার্টফোনের আয়ু ফুরিয়ে যায়। ল্যাপটপের মতো দামি গ্যাজেটও কয়েক বছর চলার পর বৈদ্যুতিন বর্জ্যের রূপ নেয়। আর এই ফেলে দেওয়া বর্জ্যের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে বহুমূল্য উপাদান।
এমনই এক নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন বিজ্ঞানীরা। তা দিয়ে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব উপায়ে ই-বর্জ্য থেকে সোনা বার করে আনা সম্ভব, এমনটাই দাবি তাঁদের। পুরনো মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, রিমোট কন্ট্রোল এবং ক্ষতিগ্রস্ত সার্কিট বোর্ডগুলি প্রায়শই অকেজো আবর্জনা হিসাবে ফেলে দেওয়া হয়। বেশির ভাগ লোকজনই হয়তো জানেন না এই ই-বর্জ্যের মধ্যে একটি মূল্যবান উপাদান লুকিয়ে আছে।
সেই উপাদান হল সোনা। পুরনো, বাতিল, ফেলে দেওয়া বৈদ্যুতিন যন্ত্রের মধ্য থেকে অন্তত ২৫ শতাংশ হলুদ ধাতু নিষ্কাশন করা সম্ভব বলে দাবি বিজ্ঞানীদের। ডিজিটাল এই যুগে প্রতি দিন যে লক্ষ লক্ষ টন ইলেকট্রনিক বর্জ্য জমছে তা সোনার একটি ভাল উৎস হয়ে উঠতে পারে বলে ধারণা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের একাংশের।
মোবাইল ফোনে সোনা থাকে। সোনা বিদ্যুতের সুপরিবাহী হওয়ায় মোবাইলে তা ব্যবহার করা হয়। একই সঙ্গে সহজে সোনার ক্ষয় হয় না। এতে মরচেও ধরে না। এই সব কারণেই মোবাইল ফোনের ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট (আইসি) বোর্ডের ছোট্ট কানেক্টারগুলিতে সোনা ব্যবহৃত হয়। মোবাইল ফোনের মতো, কম্পিউটার ও ল্যাপটপের আইসিতেও সোনা ব্যবহৃত হয়। সে সব থেকেও সংগ্রহ করা যায় সোনা।
কী ভাবে পাওয়া যায় এই সোনা? বিজ্ঞানীরা নতুন সহজ এক পন্থা আবিষ্কার করেছেন। এই পদ্ধতিতে পুরনো মোবাইল ফোন এবং কম্পিউটারের ফেলে দেওয়া সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট (সিপিইউ) এবং গৃহস্থালির বৈদ্যুতিন যন্ত্রপাতি থেকে সরানো প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড বা পিসিবি থেকে ২০ মিনিটেরও কম সময়ে মূল্যবান ধাতু বার করা সম্ভব।
এই পদ্ধতিতে পটাশিয়াম পেরোক্সিমোনোসালফেট এবং পটাশিয়াম ক্লোরাইডের একটি সহজ দ্রবণ ব্যবহার করা হয়। যখন এই দ্রবণটি সোনা বা প্যালাডিয়ামের মতো ধাতুর সংস্পর্শে আসে, তখন ধাতুগুলি নিজেরাই বিক্রিয়া আরম্ভ করে। এই দ্রবণ ধাতব পরমাণুগুলিকে ভেঙে দেয়। ফলে সোনা বা মূল্যবান ধাতুকে সহজেই আলাদা করা যায়।
তিনটি ধাপে এই ধাতু নিষ্কাশন পদ্ধতিটি সম্পন্ন করা হয়। প্রথম ধাপে ট্রাইক্লোরোইসোসায়ানিউরিক অ্যাসিড ব্যবহার করে সোনাকে দ্রবীভূত করা হয়। ই-বর্জ্য পদার্থ থেকে সোনাকে জারিত করার জন্য হ্যালাইড অনুঘটকের মাধ্যমে সক্রিয় করা হয়।
দ্বিতীয় ধাপে দ্রবণ থেকে দ্রবীভূত সোনাকে বেছে বেছে জমাট বাঁধানোর জন্য বিশেষ ভাবে তৈরি পলিসালফাইড পলিমার সরভেন্ট ব্যাবহার করা হয়। তৃতীয় ধাপে সোনার বিশুদ্ধতাকে পুনরুদ্ধার করা হয় পলিমারটিকে পাইরোলাইজ়িং বা ডিপলিমারাইজ় করে।
বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক অনুমান, এই পদ্ধতি অনুসরণ করে ১০ কেজি পুরনো সার্কিট বোর্ড থেকে প্রায় ১.৪ গ্রাম সোনা পাওয়া যায়। ঘরের তাপমাত্রায় বর্জ্য সিপিইউ এবং পিসিবি থেকে ৯৮.২ শতাংশেরও বেশি সোনা দ্রবণের সাহায্যে আলাদা করা যায়। পাশাপাশি প্যালাডিয়ামের নিষ্কাশন হার ৯৩.৪ শতাংশ। চলতি পদ্ধতির তুলনায় এই রাসায়নিক দ্রবণটি অনেক কম দূষণ উৎপন্ন করে।
গবেষকদের মতে, এই পদ্ধতিতে প্রতি বছর ফেলে দেওয়া প্রায় ৫ কোটি টন ই-বর্জ্যের কিছু অংশ ব্যবহার করেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মূল্যবান ধাতু নিষ্কাশন করা সম্ভব। পরিবেশ গবেষণা বলছে, বিশ্ব জুড়ে টন টন ই-বর্জ্যের মাত্র ২০ শতাংশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে তোলা হয়।
ই-বর্জ্য সঠিক ভাবে পুনর্ব্যবহার না করার দরুন প্রতি বছর পাঁচ গুণ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধুমাত্র ২০২২ সালের রেকর্ড অনুসারে ৬২ মিলিয়ন টন ই-বর্জ্য উৎপন্ন হয়েছে। ২০১০ সালের পর থেকে ৮২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিমাণ আরও ৩২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে ৮২ মিলিয়ন টনে পৌঁছোবে বলে আশঙ্কা পরিবেশবিজ্ঞানীদের, যা যথেষ্ট উৎকণ্ঠার।
ছোট পরিসরের খনিতে সোনা বার করে আনতে সবচেয়ে বেশি যে ধাতু ব্যবহৃত হয় তা হল পারদের সঙ্গে সোনার বিক্রিয়ায় তৈরি হয় একটি ভারী মিশ্রণ। সেটি উত্তপ্ত করে হলুদ ধাতুকে আলাদা করা হয়। কিন্তু এই রাসায়নিক প্রক্রিয়া শ্রমিক ও পরিবেশ উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর।
বিশ্বে পারদ দূষণের সবচেয়ে বড় উৎসই হল ছোট ছোট খনি শিল্পগুলি। তাই ই-বর্জ্য থেকে মূল্যবান ধাতু বার করে আনার জন্য লাভজনক এবং টেকসই হতে পারে নতুন পদ্ধতি। প্রচলিত পদ্ধতিগুলিতে প্রায়শই অত্যন্ত ক্ষতিকারক বা বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। পরিবেশ এবং স্বাস্থ্যের জন্য যা ঝুঁকি তৈরি করে।
নয়া কৌশলটি চিনা বিজ্ঞান অ্যাকাডেমির গুয়াংজু ইনস্টিটিউট অফ এনার্জি কনভার্সনের বিজ্ঞানীরা এবং দক্ষিণ চিন প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা যৌথ ভাবে আবিষ্কার করেছেন। এই পদ্ধতিতে সোনা বার করতে প্রতি আউন্সে ১৪৫৫ ডলার খরচ পড়ে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম আউন্সপ্রতি ৪৬০০ ডলারের আশপাশে ঘোরাফেরা করছে।
সুতরাং বলাই যায় আমরা সকলেই প্রায় পকেটে সোনা নিয়ে ঘুরছি। যদি কোনও ইলেকট্রনিক জিনিস খারাপ হয়ে যায়, তা থেকে যেটুকু সোনা বা রুপো পাওয়া যাবে, তাই বা কম কী!
সব ছবি:সংগৃহীত।