হরমুজ় প্রণালী আটকে রেখে লাগাতার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা। অদ্ভুত এই ইরানি রণকৌশলে ‘সুপার পাওয়ার’ আমেরিকার ত্রাহিমাম দশা! তেহরানের চালে পাঁকে পড়েছে ইজ়রায়েলও। অন্য দিকে যুদ্ধের কারণে বিশ্ব জুড়ে তীব্র হচ্ছে জ্বালানি-সঙ্কট। এ-হেন পরিস্থিতিতে কিছুটা বাধ্য হয়েই সাবেক পারস্যের তেল বিক্রির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা সাময়িক ভাবে প্রত্যাহার করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যাকে শিয়া ফৌজের ‘নৈতিক জয়’ হিসাবেই দেখছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের বড় অংশ।
পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান বনাম আমেরিকা-ইজ়রায়েলের সংঘাতের উপর কড়া নজর রেখেছে চিন। মার্কিন ফৌজের দুর্বলতা খুঁজে বার করাই বেজিঙের উদ্দেশ্য। দীর্ঘ দিন ধরেই প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র তাইওয়ানকে (রিপাবলিক অফ চায়না বা আরওসি) কব্জা করার ছক কষছেন ড্রাগন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। সাবেক ফরমোজ়া দখলে তাঁর ‘পিপল্স লিবারেশন আর্মি’ বা পিএলএ ঝাঁপিয়ে পড়লে ওয়াশিংটন যে চুপ করে থাকবে না, তা ভালই জানেন তিনি।
সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, তাইওয়ান বা ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার দখলকে কেন্দ্র করে চিন-আমেরিকা মুখোমুখি হলে, একটা জায়গায় এগিয়ে থাকবে বেজিং। সেটা হল ‘হাইপারসনিক’ ক্ষেপণাস্ত্র। শব্দের পাঁচ গুণের চেয়ে গতিশীল এই ‘ব্রহ্মাস্ত্র’ বিপুল সংখ্যায় রয়েছে পিএলএ-র কাছে। ফলে সেগুলির সাহায্যে অনায়াসেই যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলীয় শহরগুলিকে নিশানা করতে পারবে ড্রাগন। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না।
সংঘর্ষ শুরুর আগেই পশ্চিম এশিয়ার একাধিক ঘাঁটিতে বিভিন্ন ধরনের অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মজুত করে আমেরিকা। এর মধ্যে প্যাট্রিয়ট, টার্মিনাল হাই অলটিচ্যুড এরিয়া ডিফেন্স (থাড) এবং এএন/এফপিএস-১৩২ আপগ্রেডেড আর্লি ওয়ার্নিং রেডার উল্লেখ্যযোগ্য। এ ছাড়া আরব, ভূমধ্যসাগর এবং লোহিত সাগরে মোতায়েন থাকা রণতরীগুলিকে মাঝারি পাল্লার এয়ার ডিফেন্সে সুরক্ষিত করেন মার্কিন সেনা কমান্ডারেরা। এতে আবার আছে এজিএস এসএম-২ ও এসএম-৬ ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র।
সূত্রের খবর, যুদ্ধের সময় এগুলির কোনওটাই সে ভাবে কাজে আসেনি। সংশ্লিষ্ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলিকে দিব্যি ফাঁকি দিয়ে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার, কুয়েত, বাহারিন, ইরাক এবং ওমানের মার্কিন সেনাঘাঁটি, তৈল শোধনাগার ও গ্যাসক্ষেত্রগুলিতে ‘হাইপারসনিক’ ক্ষেপণাস্ত্রে হামলা চালায় ইরানের ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি। শুধু তা-ই নয়, তাঁদের আক্রমণে বাহারিনের যুক্তরাষ্ট্রীয় নৌসেনা ছাউনিতে বিধ্বংসী আগুন লেগে যায়।
এর পাশাপাশি ইজ়রায়েলের তেল আভিভ এবং হাইফার মতো শহরগুলিকেও নিশানা করে আইআরসিজি। ইহুদিদের নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষার পাশাপাশি সেখানে মোতায়েন আছে থাড ও প্যাট্রিয়ট। কিন্তু, তা সত্ত্বেও ইজ়রায়েলের ভিতরে ইরানি ‘হাইপারসনিক’ ক্ষেপণাস্ত্রের মুহুর্মুহু আছড়ে পড়ার ভিডিয়ো প্রত্যক্ষ করেছে গোটা দুনিয়া। এ ছাড়া তেহরানের ‘ব্রহ্মাস্ত্রের’ ঘা খেয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয় বেশ কয়েকটা মার্কিন রণতরী। এর মধ্যে রয়েছে বিমানবাহী যুদ্ধপোত ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন।
মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষার সবচেয়ে বিপজ্জনক এবং কদর্য চেহারা দেখা গিয়েছে আমিরশাহির আকাশে। ইরানে হামলা চালিয়ে সেখানকার ঘাঁটিতে ফিরছিল যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটা এফ-১৫ লড়াকু জেট। কিন্তু, পাল্লার মধ্যে আসতেই ওই যুদ্ধবিমানগুলির মধ্যে অন্তত তিনটিকে ধ্বংস করে আমেরিকারই এয়ার ডিফেন্স। তবে জরুরি ভিত্তিতে ককপিট থেকে বেরিয়ে গিয়ে কোনও মতে প্রাণে বাঁচান জেট পাইলটেরা। এই ইস্যুতে পড়ে ঢোঁক গিলে বিবৃতি দেয় ওয়াশিংটনের যুদ্ধ দফতরের (ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার) সদর কার্যালয় পেন্টাগন।
দ্য ইউরেশিয়ান টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধে আমেরিকার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে ‘কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি’ শিরোনামে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে চিনা সামরিক গবেষকদের একটি দল। সেখানে বলা হয়েছে, থাড বা প্যাট্রিয়টের মতো হাতিয়ার ‘হাইপারসনিক’ অস্ত্রকে চূড়ান্ত পর্যায়ে বাধা দিতে অক্ষম। সেই কারণে তাদের ১০টা ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রকে এড়িয়ে ইজ়রায়েলের বেন-গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে তেহরান।
‘হাইপারসনিক’ ক্ষেপণাস্ত্রকে বাদ দিলে ইরানের ‘কামিকাজ়ে’ বা আত্মঘাতী ড্রোনও চিনা সামরিক গবেষকদের চোখ টেনেছে। সস্তার এই হাতিয়ার ব্যবহার করে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের মার্কিন রেডার উড়িয়ে দেওয়ার দাবি করেছে আইআরজিসি। যদিও সেটা অস্বীকার করেছে আমেরিকা। তবে মাঝেমধ্যেই আক্রমণে ঝড় তুলতে ঝাঁকে ঝাঁকে পাইলটবিহীন যান ছুড়তে দেখা যায় তেহরানকে। পশ্চিম এশিয়ার আরব মুলুকগুলির তৈলক্ষেত্রগুলিতে আগুন জ্বালানোর কাজটা সুচারু ভাবে সম্পন্ন করেছে সেগুলি।
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের কাছে এ ব্যাপারে মুখ খুলেছেন হ্যান শেনং নামের এক চিনা সামরিক গবেষক। তাঁর কথায়, ‘‘ইরানি দূরপাল্লার ড্রোন ঠেকাতে আকাশ প্রতিরক্ষার কয়েক কোটি মূল্যের ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে আমেরিকা। এতে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে যুদ্ধের খবর।’’ আর তাই সস্তায় ড্রোন ঠেকানোর পদ্ধতি অবিষ্কারে যে বেজিং কোমর বেঁধে লেগে পড়েছে, তার ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
যুদ্ধের মধ্যে ইরান আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গর্বের পঞ্চম প্রজন্মের ‘স্টেলথ’ প্রযুক্তির লড়াকু জেট এফ-৩৫ লাইটনিং টু ধ্বংসের দাবি তুলেছে। কাতারে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কমান্ড ‘সেন্টকম’ যদিও সে কথা মানতে চায়নি। একটি বিবৃতিতে তারা জানিয়েছে, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এফ-৩৫কে জরুরি অবতরণ করতে হয়েছে। জেটটির শরীরে কোনও ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের আঘাত সে ভাবে লাগেনি। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ওয়াশিংটনের হাতে দূরপাল্লার ড্রোন থাকলেও পাইলটবিহীন যানগুলির সামনে পারফর্ম করতে ব্যর্থ হয় তারা।
তবে নিজেদের খামতির দিকটাই ওই গবেষণা রিপোর্টে তুলে ধরেছেন চিনা সামরিক গবেষকেরা। ইরান যুদ্ধের শুরুতেই ইহুদি ও মার্কিন ফৌজের আক্রমণে উড়ে যায় বেজিঙের তৈরি এইচকিউ-৯পি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। গত বছর (২০২৫ সাল) ‘অপারেশন সিঁদুর’ চলাকালীনও পাক ফৌজের ওই এয়ার ডিফেন্সকে উড়িয়েছিল ভারতীয় সেনা। ফলে এই ক্ষেত্রে উন্নতি করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন তাঁরা।
এ দিকে চুপ করে বসে নেই আমেরিকাও। কৃত্রিম মেধা ভিত্তিক ড্রোন প্রযুক্তিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে ওয়াশিংটন। বিশেষত, কম খরচে পাইলটবিহীন যানের ঝাঁক তৈরির দিকে অচিরেই পেন্টাগন নজর দিতে পারে বলে সূত্র মারফত মিলেছে খবর। বিমানবাহী রণতরীর পাশাপাশি আগামী দিনে ড্রোনবাহী যুদ্ধজাহাজ বাহিনীর বহরে শামিল করতে পারে তারা। তবে ‘হাইপারসনিক’ ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষেত্রে এখনও অনেকটা পিছিয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্র।
২১ শতকের শুরুতেই ‘হাইপারসনিক’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি নিয়ে কাজ শুরু করে আমেরিকা। বর্তমানে এই শ্রেণির তিন ধরনের হাতিয়ার তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। সেগুলি হল, স্থলবাহিনীর দূরপাল্লার হাইপারসনিক অস্ত্র বা এলআরএইচডব্লিউ (লং রেঞ্জ হাইপারসনিক ওয়েপন), নৌসেনার কনভেনশনাল প্রম্পট স্ট্রাইক (সিপিএস) এবং বিমানবাহিনীর হাইপারসনিক অ্যাটাক ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র। গত বছর (২০২৫ সালে) এগুলির মধ্যে একটি পরীক্ষায় অসফল হন মার্কিন সামরিক গবেষকেরা।
‘হাইপারসনিক’ অস্ত্র তৈরিতে ২০২২ সালে ৩৮০ কোটি ডলার বরাদ্দ করে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দফতর। ২০২৩ সালে সেই অঙ্ক বেড়ে দাঁড়ায় ৪৭০ কোটি ডলার। গত বছর এই প্রকল্পে ৬৯০ কোটি ডলার সামরিক গবেষকদের হাতে তুলে দেয় পেন্টাগন। তার পরেও এতে ব্যর্থতা আসায় ট্রাম্প প্রশাসন বেশ ‘হতাশ’ হয়েছে বলে সূত্র মারফত মিলেছে খবর।
সামরিক গবেষকদের একাংশ মনে করেন, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার খামতি অতি দ্রুত পূরণ করে ফেলবে আমেরিকা। কারণ, ইতিমধ্যেই ‘গোল্ডেন ডোম’ নামে কৃত্রিম উপগ্রহভিত্তিক একটি এয়ার ডিফেন্স প্রায় তৈরি করে ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন গণমাধ্যমগুলি জানিয়েছে, ওই ‘রক্ষাকবচের’ একটা নমুনা চাক্ষুষ করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ফলে চিনের পক্ষে ‘সুপার পাওয়ার’ দেশটিতে হামলা চালানো মোটেই সহজ হবে না।
বেজিঙের দাবি, তাদের ভান্ডারে আছে স্ক্র্যামজেট-চালিত ‘হাইপারসনিক’ ক্ষেপণাস্ত্র। এর মধ্যে অন্যতম হল ডিএফ-১৭। ড্রাগনকে বাদ দিলে রাশিয়ার ‘হাইপারসনিক’ ক্ষেপণাস্ত্রের বহরও চিন্তায় রেখেছে আমেরিকাকে। এর মধ্যে কিনজ়েল, জ়েরকন এবং আভানগার্ড উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া ওরেশনিক নামের একটি মাঝারি পাল্লার ‘হাইপারসনিক’ ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যাপক উৎপাদন শুরু করেছে মস্কো।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের কথায়, আগামী দিনে যুদ্ধের ময়দানে তাঁরা যে একে অপরের মুখোমুখি হতে চলেছে, সে বিষয়ে একরকম নিশ্চিত হয়ে গিয়েছে চিন ও আমেরিকা। আর তাই ইরানের লড়াই থেকে শিক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করছে দু’পক্ষই। এর ফলে কে কত দ্রুত রণকৌশল এবং সামরিক সরঞ্জামে আমূল বদল আনতে পারে, সেটাই এখন দেখার।
সব ছবি: সংগৃহীত।