পাকিস্তানে তৈরি হবে চিনা সেনাঘাঁটি! চক্রব্যূহে ভারতকে ঘিরতে নতুন ষড়যন্ত্রে শান দিচ্ছে বেজিং। মার্কিন গোয়েন্দা রিপোর্টে সেই খবর প্রকাশ্যে আসতেই নড়েচড়ে বসেছে নয়াদিল্লি। তবে বিষয়টিতে প্রমাদ গুনছে ওয়াশিংটনও। ইসলামাবাদের ‘অন্দরমহলে’ ড্রাগনের সামরিক ছাউনি গড়ে উঠলে সেখান থেকে পাততাড়ি গোটাতে হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রকে। সে ক্ষেত্রে গোটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি যে আরও জটিল হবে, তা বলাই বাহুল্য।
গত বছরের (২০২৫ সালের) ডিসেম্বরে গণপ্রজাতন্ত্রী চিনের (পিপলস রিপাবলিক অফ চায়না) সামরিক শক্তি সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট মার্কিন পার্লামেন্ট ‘কংগ্রেস’-এ পাঠায় সেখানকার যুদ্ধ দফতরের (ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার) সদর কার্যালয় পেন্টাগন। সূত্রের খবর, ‘চিনের সামরিক ও নিরাপত্তা উন্নয়ন, ২০২৫’ (মিলিটারি অ্যান্ড সিকিউরিটি ইনভলভিং দ্য পিপলস রিপাবলিক অফ চায়না ২০২৫) শীর্ষক ওই বার্ষিক নথিতে বেজিঙের ‘পিপলস লিবারেশন আর্মি’ বা পিএলএ-র একাধিক গোপন সামরিক পরিকল্পনা ফাঁস করেছে যুক্তরাষ্ট্রের গুপ্তচরবাহিনী।
আমেরিকার গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমানে পাকভূমিতে সামরিক ঘাঁটি তৈরির জন্য একরকম মরিয়া হয়ে উঠেছে চিন। শুধু তা-ই নয়, সেখানে নৌ এবং বিমানবাহিনীকে মোতায়েন করতে চায় বেজিং। ইসলামাবাদকে বাদ দিলে ভারতের প্রতিবেশী আরও দু’টি দেশে সেনাছাউনি গড়ে তোলার অনুমতি পেতে চাইছে ড্রাগন। সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের মধ্যে বিদেশের মাটিতে মোট ২০টি সেনাঘাঁটি নির্মাণের ছাড়পত্র নিশ্চিত করতে চাইছে মান্দারিনভাষীরা, যা সত্যিই উদ্বেগের।
মার্কিন কংগ্রেসে জমা পড়া রিপোর্টটিতে বলা হয়েছে, ‘‘পিএলএ-র সামরিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির ব্যাপারে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছেন চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। সেই কারণে সম্ভবত অ্যাঙ্গোলা, বাংলাদেশ, বর্মা (বর্তমান মায়ানমার), কিউবা, নিরক্ষীয় গিনি, ইন্দোনেশিয়া, কেনিয়া, মোজ়াম্বিক, নামিবিয়া, নাইজ়েরিয়া, পাকিস্তান, পাপুয়া নিউ গিনি, সেশলস, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, শ্রীলঙ্কা, তাজ়িকিস্তান, তাইল্যান্ড, তানজ়ানিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী এবং ভানুয়াতুতে সেনাছাউনি তৈরি করতে চাইছেন তিনি।’’
অবস্থানগত দিক থেকে চিনের একটা সমস্যা রয়েছে। সেটা হল, দেশের পূর্ব দিকের প্রশান্ত মহাসাগরকে বাদ দিলে বেজিঙের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আর কোনও রাস্তা নেই। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এটা পিএলএ-র জন্য দুঃস্বপ্ন বয়ে আনতে পারে। মার্কিন গুপ্তচরদের অনুমান, সেই কারণেই মলাক্কা প্রণালীকে এড়িয়ে হরমুজ় প্রণালী, আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধির জন্য আলাদা সামুদ্রিক রাস্তা পেতে চাইছে ড্রাগন। সেই উদ্দেশ্যেই সংশ্লিষ্ট দেশগুলিতে সামরিক ঘাঁটি তৈরি করতে চাইছে মান্দারিনভাষীরা।
বর্তমানে দেশের বাইরে পিএলএ-র একটি মাত্র সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। ২০১৫ সালে পূর্ব আফ্রিকার জিবুতিতে সেটা গড়ে তোলে ড্রাগন। এ ছাড়া কম্বোডিয়ায় আর একটি সামরিক ছাউনি তৈরির কথা রয়েছে তাদের। বিদেশের এই ধরনের সামরিক ঘাঁটিগুলিকে মূলত দু’ভাবে ব্যবহার করতে চায় চিন। সেনা মোতায়েনের পাশাপাশি এলাকাগুলিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কাজে ব্যবহারের ছকও কষতে দেখা গিয়েছে মান্দারিনভাষীদের, যা নিয়ে বেশ কয়েক বার বিতর্কের মুখে পড়েছে বেজিং।
গত বছরের (২০২৫ সালের) মার্চে চিনের সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ করেন গ্যাবনের প্রেসিডেন্ট ব্রাইস অলিগুই এনগুয়েমা। তাঁর দাবি, পিএলএ নৌবাহিনীর গিনি উপসাগরে একটি ঘাঁটি তৈরির প্রবল আগ্রহ রয়েছে। ২০২৪ সালে এ ব্যাপারে খোলাখুলি ভাবে তাঁর সঙ্গে কথা বলেন প্রেসিডেন্ট শি। বিষয়টিতে সবুজ সঙ্কেত পেতে বকলমে তাঁকে ‘ঘুষ’ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল বলেও দাবি করেছেন এনগুয়েমা।
পাকিস্তানের ভিতরে ঠিক কোথায় চিন সামরিক ছাউনি গড়ে তুলতে চায়, তা অবশ্য স্পষ্ট নয়। তবে গত বছরের মে মাসে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ ভারতের হাতে মার খাওয়া ইসলামাবাদের প্রতি বেজিঙের দরদ যে বেড়েছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। নয়াদিল্লির এক আঘাতে কোমর ভেঙে পড়ে থাকা রাওয়ালপিন্ডির বিমানবাহিনীকে টেনে তোলার চেষ্টা করছেন ড্রাগন প্রেসিডেন্ট। সেই লক্ষ্যে জলের দরে তাঁদের লড়াকু জেট সরবরাহের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
পেন্টাগনের রিপোর্ট অনুযায়ী, আঞ্চলিক ভারসাম্যকে নতুন করে ঢেলে সাজাতে পাকিস্তানকে ৪০টি পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ শ্রেণির জে-৩৫ যুদ্ধবিমান সরবরাহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে শি প্রশাসন। এর নির্মাণকারী সংস্থা হল চিনের ‘শেনইয়াং এয়ারক্রাফ্ট কর্পোরেশন’। সূত্রের খবর, সংশ্লিষ্ট জেটটি ওড়ানো এবং তার রণকৌশলগত প্রশিক্ষণ নীতি গত বছরের জুনে অফিসারদের একটি দলকে ড্রাগনভূমিতে পাঠায় ইসলামাবাদ। প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদেরই যুদ্ধবিমানগুলিকে নিয়ে দেশে ফেরার কথা রয়েছে।
দুই ইঞ্জিন বিশিষ্ট ‘স্টেলথ’ শ্রেণির জে-৩৫ যুদ্ধবিমান প্রথম বার আকাশে ওড়ে ২০১২ সালে। যে কোনও পরিবেশে সমান দক্ষতায় হামলা চালানোর সক্ষমতা রয়েছে এই লড়াকু জেটের। ‘স্টেলথ’ শ্রেণির হওয়ায় সহজে এটি শত্রুর রাডারের নাগালে আসবে না। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে এর জে-৩৫এ ভ্যারিয়েন্টটি তৈরি করে ‘শেনইয়াং’। পাকিস্তানই প্রথম দেশ, যাকে এই যুদ্ধবিমান রফতানি করছে বেজিং।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, পাক বিমানবাহিনীকে পঞ্চম শ্রেণির লড়াকু জেট সরবরাহের সিদ্ধান্ত নিয়ে মতাদর্শের বদল ঘটাচ্ছে চিন। কারণ, এত দিন পর্যন্ত এই ধরনের অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানগুলিকে জাতীয় সম্পদ হিসাবে বিবেচনা করছিল জিনপিং প্রশাসন। সেখান থেকে ১৮০ ডিগ্রি সরে এসে এগুলিকে ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করতে চাইছে বেজিং, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা ব্যবস্থার যাবতীয় হিসাব বদলে দিতে পারে, বলছেন তাঁরা।
গত বছরের মে মাসে ‘সিঁদুর’ অভিযান শেষ হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই বেজিং সফরে যান পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজ়া আসিফ। তিনি ড্রাগনভূমিতে থাকাকালীনই জে-৩৫ লড়াকু জেট নিয়ে প্রকাশ্যে আসে একটি বিস্ফোরক তথ্য। জানা যায়, যুদ্ধবিমানগুলির দামে ইসলামাবাদকে ৫০ শতাংশ ছাড় দিতে রাজি হয়েছে জিনপিং সরকার। যদিও সরকারি ভাবে এই নিয়ে কোনও তথ্য প্রকাশ করেনি চিন। মুখে কুলুপ এঁটে রয়েছে ইসলামাবাদও।
সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি জে-৩৫র সঙ্গে প্রায়শই মার্কিন যুদ্ধবিমান এফ-৩৫ লাইটনিং টু-র তুলনা টেনে থাকে চিন। যদিও বেজিঙের জেটটির প্রকৃত শক্তি নিয়ে সাবেক সেনাকর্তাদের মনে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। এর পাশাপাশি ইসলামাবাদের জন্য যৌথ উদ্যোগে জেএফ-১৭ থান্ডার নামের একটি হালকা যুদ্ধবিমান তৈরি করেছে ড্রাগন। বিশ্বের অস্ত্রবাজারে যার চাহিদা দিন দিন বাড়ছে বলে ইতিমধ্যেই গলা ফাটাতে শুরু করেছে পাকিস্তান।
সাবেক সেনাকর্তাদের একাংশ অবশ্য মনে করেন, বেজিংকে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের সবুজ সঙ্কেত দেওয়া রাওয়ালপিন্ডির সেনা সর্বাধিনায়ক বা সিডিএফ (চিফ অফ ডিফেন্স ফোর্সেস) ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের পক্ষে একেবারেই সহজ নয়। কারণ, এতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইসলামাবাদের নতুন করে সম্পর্কের অবনতি হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে দেউলিয়ার দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা পাকিস্তানের পক্ষে ‘আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডার’ বা আইএমএফের (ইন্টারন্যাশনাল মরিটারি ফান্ড) থেকে ঋণ পাওয়া কঠিন হতে পারে।
স্বাধীনতার পর থেকেই কৌশলগত অবস্থানের কারণে বার বার ইসলামাবাদকে নানা ভাবে ব্যবহার করেছে আমেরিকা। গত শতাব্দীর ‘ঠান্ডা যুদ্ধের’ (কোল্ড ওয়ার) সময় মার্কিন নেতৃত্বাধীন ‘কেন্দ্রীয় চুক্তি সংস্থা’ বা সেন্টো (সেন্ট্রাল ট্টিটি অর্গানাইজ়েশন) এবং ‘দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া চুক্তি সংস্থা’ বা সিয়াটোতে (সাউথ-ইস্ট এশিয়া ট্রিটি অর্গানাইজ়েশন) যোগ দেয় পাকিস্তান। বিনিময়ে হাত উপুড় করে ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশীকে সামরিক এবং আর্থিক সহযোগিতা দিয়েছিল ওয়াশিংটন।
১৯৭৯ সালে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন (বর্তমান রাশিয়া) আফগানিস্তান আক্রমণ করলে ‘পাক প্রেম’ বৃদ্ধি পায় যুক্তরাষ্ট্রের। হিন্দুকুশের কোলের দেশ থেকে তখন মস্কোর ফৌজকে সরাতে কোমর বেঁধে নেমে পড়ে মার্কিন গুপ্তচরবাহিনী সিআইএ (সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি)। পঠানভূমিতে বিদ্রোহী গোষ্ঠী গড়ে তোলে তারা, যাঁদের বলা হত ‘মুজ়াহিদিন’। সিআইএ-র এই অপারেশনের কোড নাম ছিল ‘সাইক্লোন’, যাতে তাদের সঙ্গেই ছিল ইসলামাবাদের গুপ্তচরবাহিনী ‘ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স’ বা আইএসআই।
২০০১ সালে ৯/১১ জঙ্গিহামলার পর আফগানিস্তান আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয় আমেরিকা। কারণ, ওই সময় পঠানভূমিতেই লুকিয়ে ছিলেন গোটা ঘটনার ‘মাস্টারমাইন্ড’ তথা ‘আল-কায়দা’ সন্ত্রাসী সংগঠনের মাথা ওসামা বিন-লাদেন। ওই সময় স্থলবেষ্টিত হিন্দুকুশের কোলের দেশটিকে নিশানা করতে পাকিস্তানের উপর দিয়েই সেনা নিয়ে যেতে হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রকে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, নিজেদের স্বার্থেই ইসলামাবাদের গদিতে সব সময় গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত সরকারের তুলনায় সেনাশাসকদের পছন্দ করেছে আমেরিকা। ফিল্ড মার্শাল মুনিরের উল্কার গতিতে উত্থানের নেপথ্যেও প্রচ্ছন্ন মদত আছে ওয়াশিংটনের। অন্য দিকে চিনের সঙ্গে ক্রমশ যুক্তরাষ্ট্রের কমছে সামরিক ব্যবধান। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন সরকারের পক্ষে পাকভূমিতে পিএলএ-র মোতায়েন মেনে নেওয়া একরকম অসম্ভব।
মার্কিন ‘কংগ্রেস’-এ পেন্টাগনের এই রিপোর্ট জমা পড়তেই পাল্টা প্রতিক্রিয়া দিয়েছে চিন। বেজিঙের প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের মুখপাত্র ঝাং জ়িয়াওগাং বলেছেন, ‘‘ইসলামাবাদের সঙ্গে আমরা অবশ্যই কিছু দ্বিপাক্ষিক সামরিক সম্পর্ক রেখে চলি। তবে সেটা আন্তর্জাতিক আইনের বাইরে নয়। পাকিস্তানে কোনও সামরিক ঘাঁটি তৈরির পরিকল্পনা করেনি পিএলএ।’’
চিনের অভিযোগ, এই ধরনের মিথ্যা রিপোর্ট প্রকাশ করে পর্দার আড়ালে থেকে ভারতকে নানা ভাবে উস্কানি দিচ্ছে ওয়াশিংটন। নয়াদিল্লির সঙ্গে বেজিঙের সম্পর্কের চিড় ধরানোর গোপন অভিসন্ধি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। ড্রাগন মুখে যাই বলুক না কেন, তাদের পুরোপুরি বিশ্বাস করা বেশ কঠিন। আর তাই পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখছে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার, খবর সূত্রের।
সব ছবি: সংগৃহীত।