সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে উত্তাল ইরান। প্রাথমিক ভাবে দেশের আর্থিক অবস্থার প্রতিবাদে বিক্ষোভ চললেও বর্তমানে তা ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক বিক্ষোভে পরিণত হয়েছে। সরকার উল্টে দেওয়ার ডাক দিচ্ছেন আন্দোলনকারীরা।
গত দেড় সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভ চলছে ইরানে। আন্দোলনের শুরু গত বছর ২৮ ডিসেম্বর। ইরানি মুদ্রার দাম ব্যাপক ভাবে কমে যাওয়া, মুদ্রাস্ফীতি, অর্থনৈতিক বিপর্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলে রাজধানী তেহরানে বিক্ষোভ দেখানো শুরু করেন সাধারণ মানুষ। স্লোগান ওঠে বেকারত্ব ও জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে।
ক্রমে বিক্ষোভের আঁচ ছড়িয়ে পড়ে সে দেশের অন্যান্য প্রান্তেও। তাতে রাজনীতির রংও লাগে। বিক্ষোভকারীদের দাবি, শাসনক্ষমতায় পরিবর্তন। তাঁদের দাবি, ইসলামিক রিপাবলিক ব্যবস্থার অবসান। অঞ্চল-জাতি-গোষ্ঠী নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষ দেশের অন্তত ১০০ শহরে বিক্ষোভ শুরু করে।
ইরানের সরকারবিরোধী আন্দোলনে রাস্তায় নেমেছেন হাজার হাজার মানুষ। দিকে দিকে আগুন জ্বলে উঠেছে। ইসফাহান শহরে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘ইসলামিক রিপাবলিক অফ ইরান ব্রডকাস্টিং’ (আইআরআইবি) ভবনে আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। কৌশলগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর শহর বান্দার আব্বাসের রাস্তাও আন্দোলনকারীদের ভিড়ে স্তব্ধ।
ইরানের সরকারবিরোধী আন্দোলনের বহু ছবি এবং ভিডিয়ো ইতিমধ্যেই প্রকাশ্যে এসেছে। সেই সব ছবি, ভিডিয়োয় দেখা গিয়েছে, আন্দোলনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছেন মহিলারা। একদম সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
এর মধ্যে একটি ছবিতে দেখা গিয়েছে, খামেনেইয়ের ছবি পুড়িয়ে সেই আগুন থেকে সিগারেট ধরাচ্ছেন ইরানের তরুণীরা। অন্য একটি ভিডিয়োয় দেখা গিয়েছে, সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান তুলে চিৎকার করছেন ইরানের এক বৃদ্ধা। চিৎকার করতে করতে তাঁর মুখ দিয়ে রক্ত উঠে এসেছে। তবুও থামছেন না তিনি।
এ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে স্লোগান তুলে প্রতিবাদ করতে দেখা গিয়েছে বিক্ষোভকারীদের। প্রতিবাদী মহিলাদের অনেককে হিজাব না পরেই আন্দোলন করতে দেখা গিয়েছে রাস্তায়। ছবিও সেই সব ছবি এবং ভিডিয়োর সত্যতা যাচাই করেনি আনন্দবাজার ডট কম।
অন্য দিকে বিদ্রোহ দমনে খামতি রাখছে না সরকারও। কড়া হাতে বিদ্রোহ দমনের নির্দেশ রয়েছে বাহিনীর কাছে। জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে জায়গায় জায়গায় কাঁদানে গ্যাস ছোড়া হচ্ছে। গুলি, গণহারে গ্রেফতারি কিছুই বাদ রাখছে না তারা।
এখনও পর্যন্ত যা তথ্য মিলেছে, ইরানের সরকারবিরোধী আন্দোলনে অন্তত ৪২ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে বাচ্চাও রয়েছে। ২২৭০ জনের বেশি বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলি জানিয়েছে, এই সংখ্যা আরও অনেক বাড়বে এবং সরকার সেই তথ্য কিছুতেই বাইরে আসতে দেবে না।
বিক্ষোভ তীব্র রূপ ধারণ করার পরে ইরানের প্রশাসন ইন্টারনেট এবং টেলিফোন পরিষেবাও বন্ধ করে দিয়েছে। তাবরিজ় বিমানবন্দরেও বিমান চলাচল আপাতত বন্ধ।
পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলি জানাচ্ছে, ইরান সরকার ইন্টারনেট ব্ল্যাক আউট করে দেওয়ায় বিদ্রোহ কিংবা তা নিষ্ঠুর ভাবে দমনের ছবি-ভিডিয়ো বাইরের দুনিয়ার সামনে আসছে না। এটাই একমাত্র হাতিয়ার, যা সরকারের হাতে রয়েছে। এর পাশাপাশি মানুষকে শান্ত করতে তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভর্তুকি দেওয়ার কথাও ঘোষণা করেছে।
তবে তাতেও সামগ্রিক ক্ষোভ মিটছে না। এখনও পর্যন্ত সেই বিক্ষোভ থামার লক্ষণ নেই। রাস্তায় সেনাবাহিনী নামিয়ে দেওয়ার পরেও ভীত নন সাধারণ মানুষ। প্রতিবাদ জারি রয়েছে।
বরং বিক্ষোভের আঁচ ক্রমশ বেড়ে চলেছে। এর মধ্যেই ইরানের নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভি (প্রাক্তন শাসক রেজা শাহ পাহলভির পুত্র) জনগণকে গণপ্রতিবাদে নামার ডাক দেওয়ায় নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে সে দেশে।
সমাজমাধ্যমে একটি পোস্ট করে যুবরাজ পাহলভি খামেনেই প্রশাসনকে তোপ দাগেন। তিনি লেখেন, “লাখ লাখ ইরানবাসী আজ স্বাধীনতা চেয়ে মিছিল করেছেন। তার জবাব দিতে প্রশাসন ইরানে যোগাযোগের সমস্ত মাধ্যম বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে।”
ওই পোস্টেই নির্বাসিত যুবরাজ ইরানের প্রতিবাদী জনতার পাশে দাঁড়ানোর জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। পাশাপাশি ইউরোপের দেশগুলিকে নীরবতা ভেঙে এই বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
ইরানের পরিস্থিতি নিয়ে প্রথম থেকেই একে অপরের প্রতি সুর চড়িয়ে আসছেন খামেনেই এবং ট্রাম্প। ইরানের গোঁড়া ধর্মীয় শাসনতন্ত্রকে অতি কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ট্রাম্প আগেই হুঁশিয়ারির সুরে বলেছিলেন, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা চলবে না। বৃহস্পতিবার আরও এক ধাপ এগিয়ে তিনি বলেন, “যদি তারা (ইরান প্রশাসন) মানুষ মারতে শুরু করে, তা হলে আমরা তাদের উপর খুব কঠিন আঘাত হানব।”
ট্রাম্পের ধারাবাহিক হুঁশিয়ারির পর সম্প্রতি সুর নরমের ইঙ্গিত দিয়েছে তেহরান। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজ়েশকিয়ান ইরানের নিরাপত্তাবাহিনীকে জানিয়েছেন, বিক্ষোভকারীদের দেখামাত্রই তাঁদের প্রতি কঠোর পদক্ষেপ করা চলবে না।
যদিও খামেনেই চুপ থাকেননি। তাঁর হুঁশিয়ারি, দেশের মধ্যে থেকে কেউ যদি বিদেশি শক্তির হয়ে ‘ভাড়াটে সৈন্যের’ কাজ করে, তবে তা সহ্য করবে না ইরান। পাশাপাশি, ট্রাম্পকে নিজের দেশের দিকে মনোযোগ দেওয়ার ‘উপদেশ’ দিয়েছেন তিনি। বিক্ষোভকারীদেরও সতর্ক করেছেন।
শুক্রবার নিজের বক্তৃতায় দফায় দফায় ট্রাম্পকে আক্রমণ করেছেন খামেনেই। সংবাদসংস্থা এএফপি সূত্রে খবর, ট্রাম্পকে ‘অহঙ্কারী’ বলে উল্লেখ করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা। তাঁর অভিযোগ, মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাতে ইরানিদের রক্ত লেগে রয়েছে। খামেনেই দাবি করেন, ট্রাম্পের পতন হবেই! তিনি স্পষ্ট করেছেন, বিক্ষোভের মুখে পিছপা হবেন না।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের উদ্দেশে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা বলেন, ‘‘আপনি নিজের দেশের দিকে মনোযোগ দিন!’’ খামেনেইয়ের পরামর্শ, আমেরিকার অভ্যন্তরীণ সমস্যা নিয়ে ভাবা উচিত ট্রাম্পের। একই সঙ্গে বলেন, ‘‘বিক্ষোভকারীরা অন্য দেশের প্রেসিডেন্টকে খুশি করার জন্য নিজেদের পথ ধ্বংস করছেন।’’ দেশের তরুণদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা।
সব ছবি: সংগৃহীত।