কেরিয়ারের ঝুলিতে রয়েছে ১০০-রও বেশি ছবি। অভিনেত্রী নন, বড়পর্দার ‘আইটেম গার্ল’ হিসাবে প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন বিস্তর। কিন্তু এক দুর্ঘটনা তাঁর স্বপ্নের কেরিয়ার ধ্বংস করে দেয়। টানা ১৫ দিন কোমায় ছিলেন মূমেইথ আবদুল রশিদ খান। এখন কী করছেন তিনি?
‘মুন্নাভাই এমবিবিএস’ ছবির ‘দেখ লে’ গানের দৃশ্যে নাচ করে বলিপাড়ায় নজর কেড়েছিলেন মূমেইথ। মুমেত এবং মুমতাজ় নামেও পরিচিত তিনি। ১৯৮৫ সালের সেপ্টেম্বরে মহারাষ্ট্রের মুম্বইয়ে জন্ম মূমেইথের। বাবা-মা এবং দুই দিদির সঙ্গে সেখানেই থাকতেন তিনি।
আর্থিক ভাবে সচ্ছল ছিল না মূমেইথের পরিবার। নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর মতো অবস্থা ছিল তাঁদের। অভাব-অনটনের সংসারের হাল ধরতে ১৩ বছর বয়স থেকে নাচ করে রোজগার করতে শুরু করেন মূমেইথ।
মূমেইথের বাবা পাকিস্তানি। তাঁর মা চেন্নাইয়ের বাসিন্দা। মুম্বইয়ে সংসার পাতার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তাঁরা। দিদির দৌলতেই নাচ নিয়ে কেরিয়ার গড়ার সুযোগ পান মূমেইথ। ছোটবেলা থেকেই নৃত্যে পটু ছিলেন তিনি। দিদির কলেজের এক অনুষ্ঠানে তাঁকে সঙ্গ দিতে গিয়েছিলেন মূমেইথ।
অনুষ্ঠান শুরুর আগে মূমেইথের দিদি তাঁকে নাচের কয়েকটি মুদ্রা শিখিয়ে দিতে বলছিলেন। সেই দৃশ্য নজরে পড়েছিল মঞ্চের আলোকসজ্জাশিল্পীর। তিনি মূমেইথকে নেপথ্য নৃত্যশিল্পী (ব্যাকগ্রাউন্ড ডান্সার) হিসাবে জনপ্রিয় কোরিয়োগ্রাফার রেমো ডি’সুজ়ার নাচের দলে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেন।
১৩ বছর বয়সে বাড়ির মেয়ে নাচের দলে যোগ দেবেন, তা শুনে প্রথমে আপত্তি জানিয়েছিলেন মূমেইথের মা। কিন্তু পরিবারের অর্থাভাবের কথা চিন্তা করে মূমেইথকে পেশাগত ভাবে নাচ করার অনুমতি দিয়েছিলেন তিনি।
নেপথ্য নৃত্যশিল্পী হিসাবে নাচ করে মূমেইথ প্রথম পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন ৭৫০ টাকা। মাত্র ১৮ বছর বয়সে জিভে ফুটো করিয়েছিলেন তিনি। তার পর ভ্রু, নাভি এবং ঠোঁটেও ফুটো করিয়েছিলেন মূমেইথ। পিঠ, পেট এবং কব্জির নানা জায়গায় উল্কি আঁকিয়েছিলেন তিনি।
২০০২ সালে ‘ইয়ে কয়া হো রহা হ্যায়?’ নামের হিন্দি ছবির মাধ্যমে বলিপাড়ায় পা রাখেন মূমেইথ। তার পর ‘মুন্নাভাই এমবিবিএস’ ছবিতে ‘আইটেম গার্ল’ হিসাবে মুখ দেখান তিনি। হিন্দি ভাষার ছবির পাশাপাশি তামিল, তেলুগু এবং কন্নড় ভাষার ছবিতে নৃত্যশিল্পী হিসাবে অভিনয় করতে দেখা গিয়েছে তাঁকে।
২০০৮ সালে হায়দরাবাদের একটি নৈশক্লাবে পারফর্ম করতে গিয়ে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছিলেন মূমেইথ। শোনা যায়, নববর্ষ উদ্যাপনের অনুষ্ঠান উপলক্ষে মঞ্চে নাচ করছিলেন তিনি। পারফরম্যান্স চলাকালীন হঠাৎ কয়েক জন দর্শক তাঁর গায়ে মদ ছিটিয়ে দেন বলে অভিযোগ। মাঝপথে নাচ থামিয়ে অনুষ্ঠান ছেড়ে বেরিয়ে যান মূমেইথ।
২০১৩ সালে ছোটপর্দার নাচের জনপ্রিয় একটি রিয়্যালিটি শোয়ে প্রতিযোগী হিসাবে অংশগ্রহণ করেন মূমেইথ। কয়েক বছরের মধ্যে খ্যাতির চূড়ায় পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এক দুর্ঘটনা তাঁর সমস্ত স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দেয়। সে কারণে ২০১৫ সালের পর থেকে নাচের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখেননি মূমেইথ।
‘দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে জায়েঙ্গে’ ছবিতে একটি গানের দৃশ্যে দেখা গিয়েছিল, কাজল গায়ে তোয়ালে জড়িয়ে নাচ করছেন। স্নান করে বেরিয়ে হঠাৎ সেই দৃশ্যের কথা মনে পড়েছিল মূমেইথের। বাড়িতে নিজের মতোই তোয়ালে পরে নাচ করছিলেন তিনি। হঠাৎ পা পিছলে পড়ে যান। খাটে লেগে মাথায় আঘাত পান মূমেইথ। সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
মূমেইথ এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, মাথায় লাগার ফলে মস্তিষ্কের কয়েকটি শিরা ফেটে গিয়েছিল তাঁর। জটিল অস্ত্রোপচার করানো হয়েছিল মূমেইথের। টানা ১৫ দিন কোমায় ছিলেন তিনি।
মূমেইথের শারীরিক অবস্থার এতই অবনতি হয়েছিল যে, চিকিৎসকেরা তাঁকে নাচ, এমনকি শরীরচর্চা করতেও বারণ করেছিলেন। অস্ত্রোপচারের পর বেশ কয়েক বছর শয্যাশায়ী ছিলেন তিনি। ধীরে ধীরে সুস্থ হলেও তাঁর কেরিয়ার নষ্ট হয়ে যায়। আর কোনও দিন নাচ করতে দেখা যায়নি মূমেইথকে।
২০২০ সালের অক্টোবরে মূমেইথের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের করেন এক ক্যাবচালক। চালকের দাবি, তাঁর গাড়িতে চেপেই গোয়ায় যাতায়াত করেছিলেন মূমেইথ। কিন্তু শেষে আর গাড়িভাড়া মেটাতে চাননি তিনি।
চালকের বিরুদ্ধেও পাল্টা অভিযোগ দায়ের করেন মূমেইথ। থানায় প্রমাণ দেখিয়ে জানান যে, তিনি সমস্ত ভাড়া মিটিয়ে দিয়েছেন। বরং, তাঁকে মানসিক হেনস্থা করার জন্য চালকের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন তিনি।
২০১৭ সালে ‘বিগ বস্ তেলুগু’র প্রথম সিজ়নে প্রতিযোগী হিসাবে অংশগ্রহণ করতে দেখা যায় মূমেইথকে। কিন্তু মাদকপাচারের সঙ্গে নাম জড়িয়ে যাওয়ায় তাঁকে তলব করে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। ইডির তলব পেয়ে মাঝপথে প্রতিযোগিতা ছেড়ে বেরিয়ে যান মূমেইথ।
২০১৭ সালের জুলাইয়ের গোড়ার দিকে মাদকপাচারের মাথা কেলভিন মাসকারেনহাসকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পুলিশের জালে ধরা পড়ার পর তেলুগু ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক পুরী জগন্নাথ, চিত্রগ্রাহক শাম কে নাইডুকে জেরা করা হয়। যদিও প্রত্যেকেই মাদকপাচারকাণ্ডের সঙ্গে তাঁদের যোগসূত্র অস্বীকার করেছিলেন।
সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর, প্রায় সাত ঘণ্টা ধরে জেরা করা হয়েছিল মূমেইথকে। জেরার পর নির্দোষ প্রমাণিত হন মূমেইথ। তাঁকে ক্লিন চিট দিয়েছিল ইডি। পরে আবার ‘বিগ বস্ তেলুগু’তে দেখা গিয়েছিল মূমেইথকে। তবে আর প্রতিযোগী হিসাবে নন, অতিথিশিল্পী হিসাবে যোগদান করেছিলেন তিনি।
কানাঘুষো শোনা যেতে থাকে, দক্ষিণী পরিচালক পুরী জগন্নাথের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন মূমেইথ। একটি তেলুগু ছবিতে মূমেইথকে কাজের সুযোগ দিয়েছিলেন পুরী। তার পর থেকেই তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে জল্পনা শুরু হয়ে যায়। কিন্তু পরে মূমেইথ জানান, পরিচালকের সঙ্গে শুধুমাত্র পেশাগত সম্পর্ক রয়েছে তাঁর।
মূমেইথ এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, তিনি এখনও পর্যন্ত মোট চারটি সম্পর্কে জড়িয়েছেন। কোনও সম্পর্কই হালকা ভাবে নেননি তিনি। কিন্তু কোনও প্রেমই বিয়ে পর্যন্ত গড়ায়নি। বর্তমানে ‘সিঙ্গল’ রয়েছেন মূমেইথ।
নাচ থেকে সরে এলেও নতুন ভাবে কেরিয়ার গড়ে তুলেছেন মূমেইথ। হায়দরাবাদে রূপটান এবং কেশসজ্জা সংক্রান্ত একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তুলেছেন। হায়দরাবাদেই পরিবারের সঙ্গে থাকছেন ‘আইটেম গার্ল’।
সব ছবি: সংগৃহীত।