আর ২০২৭ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা নয়। চলতি বছরেই সামরিক অভিযান করে তাইওয়ান তথা সাবেক ফরমোজ়া দ্বীপটিকে (রিপাবলিক অফ চায়না) কব্জা করবে গণপ্রজাতন্ত্রী চিন (পিপল্স রিপাবলিক অফ চায়না)? প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, ইতিমধ্যেই সেই ষড়যন্ত্রের জাল প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় বিছোতে শুরু করেছেন ড্রাগন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। কেন ২০২৬-কেই ‘ডেডলাইন’ হিসাবে বেছে নিচ্ছেন তিনি? নেপথ্যে একাধিক কারণ খুঁজে পেয়েছেন দুনিয়ার তাবড় সেনাকর্তারা।
চিন-তাইওয়ান সংঘাত নিয়ে ২০২১ সালে মার্কিন সরকারকে সতর্ক করেন যুক্তরাষ্ট্রের ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় কমান্ডের শীর্ষ সেনা অফিসার অ্যাডমিরাল ফিলিপ ডেভিডসন। ওই বছর আমেরিকার যুদ্ধ দফতরের (ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার) সদর কার্যালয় পেন্টাগনে একটি গোপন রিপোর্ট পাঠান তিনি। সেখানে বলা হয়, আগামী ছ’বছরের মধ্যে সাবেক ফরমোজ়া দ্বীপটি দখল করতে বেজিঙের পিপল্স লিবারেশন আর্মি বা পিএলএ ঝাঁপিয়ে পড়বে।
অ্যাডমিরাল ফিলিপের এই ভবিষ্যদ্বাণীকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছিল ওয়াশিংটন। ফলে অচিরেই পেন্টাগনের পদস্থ কর্তাদের কাছে ওই গোপন রিপোর্টটি ‘ডেভিডসন উইন্ডো’ নামে স্বীকৃতি পায়। এর ঠিক দু’বছরের মাথায় (পড়ুন ২০২২ সাল) চিনের ব্যাপারে ফের মার্কিন প্রশাসনকে সতর্ক করেন যুক্তরাষ্ট্রের গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ-র (সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি) তৎকালীন ডিরেক্টর বিল বার্নস। ২০২৭ সালকে মাথায় রেখে তাইপেতে সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি প্রেসিডেন্ট শি নিচ্ছেন বলে জানিয়ে দেন তিনি।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ‘ডেভিডসন উইন্ডো’ বা সিআইএ-র রিপোর্ট সত্যি না-ও হতে পারে বলে মনে করেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একাংশ। তাঁদের অনুমান, চলতি বছরের নভেম্বরের আগে তাইওয়ান আক্রমণের চূড়ান্ত নির্দেশ দেবেন প্রেসিডেন্ট জিনপিং। ঝটিতি অভিযানে দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে সম্পূর্ণ ফরমোজ়া দ্বীপটিকে কব্জা করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। এর নেপথ্যে প্রথম কারণ হিসাবে তাঁর রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকেই চিহ্নিত করা হচ্ছে।
১৯৪৯ সাল থেকে কমিউনিস্ট পার্টি অফ চায়নার (সিপিসি) একদলীয় শাসনে আছে চিন। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর জাতীয় কংগ্রেসের আয়োজন করে এই রাজনৈতিক দল। সেখানেই দেশের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের চেয়ারম্যানকে বেছে নেওয়ার কঠোর দলীয় নিয়ম রয়েছে। ২০২২ সালের অক্টোবরে হওয়া জাতীয় কংগ্রেসে তৃতীয় বারের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন শি। পাশাপাশি, সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পান তিনি।
আগামী বছরের (পড়ুন ২০২৭) অক্টোবরে ফের জাতীয় কংগ্রেসের আয়োজন করবে সিপিসি। পশ্চিমি বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, সেখানে প্রেসিডেন্ট পদ টিকিয়ে রাখতে পারলেও সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের চেয়ারম্যান থেকে সরতে হতে পারে শি-কে। আবার উল্টো সিদ্ধান্তও নিতে পারে চিনা কমিউনিস্ট পার্টির সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারক শাখা পলিটব্যুরো। তখন তাইওয়ান আক্রমণের মতো ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক অভিযানের দলীয় সবুজ সঙ্কেত না-ও পেতে পারেন জিনপিং।
দ্বিতীয়ত, অতীতে চেয়ারম্যান থাকাকালীন তিব্বত দখল করে চিনের অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হন কিংবদন্তি মাও জে দং। ১৯৬২ সালে তাঁর সময়েই পিএলএ-র আক্রমণে পর্যুদস্ত হয় ভারতীয় সেনা। ফলে লাদাখের বিস্তীর্ণ এলাকা চলে যায় বেজিঙের কব্জায়। বর্তমানে তা আকসাই চিন নামে পরিচিত। গত ৬৪ বছরে ওই জায়গা আর পুনরুদ্ধার করতে পারেনি নয়াদিল্লি। তাইওয়ানকে চিনের অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে চেয়ারম্যান মাওয়ের জায়গায় জিনপিং নিজেকে নিয়ে যেতে চাইছেন বলে মনে করেন অনেকেই।
তৃতীয়ত, এ বছরের ২ জানুয়ারি হঠাৎ করেই লাটিন (দক্ষিণ) আমেরিকার দেশ ভেনেজ়ুয়েলায় আক্রমণ শানায় মার্কিন ফৌজ। শুধু তা-ই নয়, সংঘর্ষ চলাকালীন রাজধানী কারাকাসে ঢুকে সেখানকার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ‘অপহরণ’ করে যুক্তরাষ্ট্রের ডেল্টা ফোর্স। ওয়াশিংটনের এই অভিযানের খবর প্রকাশ্যে আসতেই দুনিয়া জুড়ে পড়ে যায় হইচই। এই পরিস্থিতিতে তাইওয়ানকে নিশানা করা চিনের পক্ষে সুবিধাজনক। কারণ, ভেনেজ়ুয়েলার উদাহরণ দিয়ে আন্তর্জাতিক মহলকে সে ক্ষেত্রে নিজের দিকে টানতে পারবেন জিনপিং।
চতুর্থত, গত বছরের (পড়ুন ২০২৫) জানুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প শপথ নেওয়ার পর থেকেই ইউরোপীয় ‘বন্ধু’দের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্কের অবনতি লক্ষ করা গিয়েছে। কুর্সিতে বসা ইস্তক কানাডা ও গ্রিনল্যান্ড দখল করার ব্যাপারে নাছোড় মনোভাব দেখাচ্ছেন তিনি। ফলে পুরনো অবস্থান থেকে সরে এসে চিনসফর করেছেন অটোয়ার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। ড্রাগনের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করার কথা বলতে শোনা গিয়েছে ফ্রান্স এবং জার্মানিকেও।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-’৪৫) পরবর্তী সময়ে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের (বর্তমান রাশিয়া) সঙ্গে ‘ঠান্ডা লড়াই’য়ে (কোল্ড ওয়ার) জড়িয়ে পড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ওই সময় মস্কোর সম্ভাব্য আক্রমণ ঠেকাতে পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলিকে নিয়ে একটি সামরিক জোট গড়ে তোলে আমেরিকা। এর পোশাকি নাম নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজ়েশন বা নেটো। বর্তমানে এর সদস্যসংখ্যা ৩২। এর মধ্যে ওয়াশিংটনকে বাদ দিলে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের কাছে আছে পরমাণু হাতিয়ার।
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, তাইওয়ান আক্রমণের ক্ষেত্রে চিনের সবচেয়ে বড় বাধা হল আমেরিকা। কারণ, সাবেক ফরমোজ়া দ্বীপ বেজিঙের কব্জায় গেলে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার ‘বেতাজ বাদশা’ হয়ে উঠবে ড্রাগন। ফলে তাইপেকে বাঁচাতে এগিয়ে আসতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। সে ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের পাশাপাশি নেটো-ভুক্ত দেশগুলির আক্রমণও সামলাতে হবে শি জিনপিংকে। অতীতে ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধে তাদের মার্কিন ফৌজের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়তে দেখা গিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, ট্রাম্প জমানায় যে ভাবে নেটো-ভুক্ত দেশগুলির সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক খারাপ হয়েছে, তাতে চিন-তাইওয়ান সংঘর্ষে তারা নাক না-ও গলাতে পারে। সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রটির জন্য বেজিঙের মতো মহাশক্তির সঙ্গে মুখোমুখি লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া বেশ কঠিন। ফলে এ বছর হামলা চালালে জিনপিঙের ফৌজ যে একরকম বিনা বাধায় তাইপে দখল করতে পারবে, তা বলাই বাহুল্য।
এ বছরের নভেম্বরে আমেরিকায় রয়েছে মধ্যবর্তী (মিড টার্ম) ভোট। সেখানে মার্কিন পার্লামেন্ট কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সেনেট এবং নিম্নকক্ষ হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভের সদস্যেরা নির্বাচিত হবেন। এই ভোটে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশনীতিতে আসবে বড় বদল। কারণ, বিরোধী ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নেতা-নেত্রীরা তাইওয়ানের স্বাধীনতা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ফলে ঝুঁকি না নিয়ে নভেম্বর আসার আগেই শি ওই দ্বীপটি কব্জা করতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে।
তা ছাড়া ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় বারের জন্য ক্ষমতার আসার পর প্রাথমিক ভাবে চিনকে নিয়ে একটা ‘যুদ্ধং দেহী’ মনোভাব ছিল ট্রাম্পের। মাত্র চার মাসের মাথায় এপ্রিলে বেজিঙের সঙ্গে শুল্ক-সংঘাতে নেমে পড়েন তিনি। পাল্টা পদক্ষেপ হিসাবে আমেরিকাকে বিরল খনিজ রফতানি বন্ধ করেন ড্রাগন প্রেসিডেন্ট জিনপিং। ওই সময় হুমকি দিয়েও মান্দারিনভাষীদের তেমন কোনও সুবিধা করতে পারেননি বর্ষীয়ান মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এর পরই ১৮০ ডিগ্রি বেঁকে ‘নরমপন্থী’ পদক্ষেপ করতে থাকেন ট্রাম্প।
গত ৩০ অক্টোবর রিপাবলিক অফ কোরিয়া বা আরওকের (পড়ুন দক্ষিণ কোরিয়া) বুসান শহরে চিনা প্রেসিডেন্ট শি-র সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন ট্রাম্প। প্রায় দু’ঘণ্টার রুদ্ধদ্বার আলোচনার পর নিজের সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একটি তাৎপর্যপূর্ণ পোস্ট করেন ‘প্রেসিডেন্ট অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস’ অর্থাৎ পোটাস। সেখানেই প্রথম বার ‘জি-২’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেন তিনি। এর পর অনেকেই দাবি করেন, বেজিংকে সঙ্গে নিয়ে দ্বিপাক্ষিক ভাবে বিশ্ব জুড়ে আধিপত্য বজায় রাখার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
সেই কারণে ট্রাম্পের হাতে চূড়ান্ত ক্ষমতা থাকাকালীন জিনপিং যে তাইওয়ান দখল করতে চাইবেন, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। সংশ্লিষ্ট দ্বীপরাষ্ট্রটিতে তাঁর সমর্থকের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে উস্কানি দিয়ে তাঁদের ক্ষমতায় আনা প্রেসিডেন্ট শি-র পক্ষে খুব কঠিন নয়। কিন্তু সাবেক ফরমোজ়ায় জাতীয়বাদী চরম বেজিং-বিরোধী দল কুর্সি পেলে অনেক বেশি প্রতিরোধের মুখে পড়বে তাঁর পিপল্স লিবারেশন আর্মি বা পিএলএ।
তবে এগুলির পাল্টা যুক্তিও রয়েছে। গোড়া থেকেই চিনা ‘আগ্রাসনের’ চরম বিরোধিতা করে চলেছে জাপান। গত নভেম্বরে তাইওয়ান ইস্যুতে মুখ খোলেন টোকিয়োর প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘‘বেজিং ওই দ্বীপরাষ্ট্র দখল করতে গেলে আমরা চুপ করে বসে থাকব না।’’ ড্রাগনের আগ্রাসন রুখতে এ বছরের জানুয়ারিতে ফিলিপিন্সের সঙ্গে একটি সামরিক সমঝোতায় সই করেছেন তিনি। ম্যানিলায় স্বাক্ষরিত ওই চুক্তির নাম ‘অ্যাকুইজ়িশন এবং ক্রস-সার্ভিসিং এগ্রিমেন্ট’।
ফিলিপিন্সের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা অনুযায়ী, যৌথ সামরিক প্রশিক্ষণ এবং আপৎকালীন পরিস্থিতিতে গোলাবারুদ, জ্বালানি, খাদ্য এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা ও চিকিৎসা সরঞ্জাম করমুক্ত ভাবে ঘরের মাটিতে আনতে পারবে জাপান। ফিলিপিন্স ছাড়াও ভিয়েতনাম, ব্রুনেই, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলির সঙ্গে বেজিঙের সীমান্ত সংঘাত রয়েছে। তাদের একাধিক দ্বীপ প্রায়ই নিজেদের বলে দাবি করে ড্রাগন। ফলে তাইওয়ান ইস্যুতে জিনপিঙের বিরুদ্ধে তাদেরও এককাট্টা হতে দেখা যেতে পারে।
চিন-তাইওয়ান সংঘাতে ভারতের স্বার্থও জড়িয়ে আছে। ২০২৪ সালে চেন্নাই-ভ্লাদিভস্তক মেরিটাইম করিডর চালু করে নয়াদিল্লি। এটি রাশিয়ায় পণ্য লেনদেনের বিকল্প পথ হিসাবে কাজ করছে। কিন্তু সাবেক ফরমোজ়া বেজিঙের কব্জায় গেলে ওই রাস্তা বন্ধ করতে পারে ড্রাগন। ফলে সংঘাত পরিস্থিতিতে জাপান, ফিলিপিন্স বা ভিয়েতনামের মতো ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রগুলিকে হাতিয়ার ও গোলা-বারুদ সরবরাহের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ‘ট্রাম্প-কার্ড’ থাকছে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকারের হাতে।
এ বছর চিন যাওয়ার কথা রয়েছে ট্রাম্পের। তিনি প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন তাইওয়ান আক্রমণের দুঃসাহস বেজিং দেখাবে না বলেই মনে করেন পোটাস। এ বার কি তাঁকে মিথ্যা প্রমাণ করবেন জিনপিং? উত্তর দেবে সময়।
সব ছবি: সংগৃহীত ও এআই সহায়তায় প্রণীত।