আবার বিদ্রোহী হামলার ঘটনা পাকিস্তানের বালোচিস্তান প্রদেশে। বালোচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)-র নতুন করে আক্রমণ এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সামরিক অভিযান শুরুর পর আবার বিশ্বের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে বালোচিস্তান। এই অস্থিরতার মূলে রয়েছে একটি দীর্ঘস্থায়ী অভিযোগ। বালোচদের দাবি, তাদের মাটি ইসলামাবাদ নয়, বরং বহিরাগত শক্তি, মূলত চিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
বালোচিস্তান পাকিস্তানের অংশ হলেও সমালোচকেরাও যুক্তি দেন যে, সেই প্রদেশ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় চিনের স্বার্থ মাথায় রেখে। বালোচেরা একই দাবি করে বন্দর শহর গ্বদর নিয়েও।
পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশ বালোচিস্তান প্রাকৃতিক ভাবে সবচেয়ে সম্পদশালী। কিন্তু ধীরে ধীরে তা বালোচ নাগরিকদের বেহাত হয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ, ‘চিন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর’ (সিপিইসি) তৈরির পরে গত কয়েক বছরে সেই লুট আরও বেড়েছে।
পশ্চিম চিনের শিনজিয়াং প্রদেশের কাশগড় থেকে শুরু হওয়া ওই রাস্তা কারাকোরাম পেরিয়ে ঢুকেছে পাকিস্তানে। প্রায় ১,৩০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে শেষ হয়েছে বালোচিস্তান প্রদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে চিন নিয়ন্ত্রিত গ্বদর বন্দরে। গ্বদরকে সিপিইসি প্রকল্পের ‘মুকুটের রত্ন’ও বলা হয়।
ওই রাস্তা ব্যবহার করেই ইসলামাবাদ এবং বেজিংয়ের শাসকেরা বালোচিস্তানের প্রাকৃতিক সম্পদ লুট করছে বলে ‘বালোচ ন্যাশনালিস্ট আর্মি’ (বিএনএ), ‘বালোচিস্তান লিবারেশন আর্মি’ (বিএলএ)-র মতো স্বাধীনতাপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির অভিযোগ। এমনকি, বছর দু’য়েক হল গ্বদর উপকূলের মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে মাছ ধরাও চিনাদের আপত্তিতে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
এর প্রতিবাদে দীর্ঘ দিন ধরেই সশস্ত্র লড়াই চালাচ্ছে স্বাধীনতাপন্থী বালোচ সংগঠনগুলি। তবে এখন নয়, উপকূলীয় শহর গ্বদর অনেক দিন ধরেই অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার প্রতীক হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
একসময় জেলে এবং ব্যবসায়ীদের একটি শান্ত বসতি ছিল গ্বদর। হাতুড়ির মতো আকৃতির উপদ্বীপটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মূলত আধুনিক শক্তিগুলির অলক্ষেই ছিল। কিন্তু বর্তমানে এটি পাকিস্তানের তৃতীয় বৃহত্তম বন্দর এবং সিপিইসি প্রকল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা।
২০১৭ সালে চিনা সংস্থা ‘চায়না ওভারসিজ় পোর্ট হোল্ডিং কোম্পানি (সিওপিএইচসি)’-কে ৪০ বছরের জন্য গ্বদর বন্দরের লিজ় দিয়েছিল ইসলামাবাদ। ফলে বন্দরটির পরিচালনার ক্ষমতাও চিনের ওই সংস্থার কাছে চলে যায়।
সিওপিএইচসি সংস্থাটি গ্বদর বন্দরের পরিচালনা, উন্নয়নমূলক কাজ এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করে। প্রতিবেদন অনুসারে, বন্দরের রাজস্বের ৯১ শতাংশ চিনের সংস্থার কাছে যায়। মাত্র ৯ শতাংশ পায় পাকিস্তান। বালোচিস্তান আলাদা করে কিছু পায় না।
বিষয়টি স্থানীয় বালোচ সম্প্রদায়গুলির মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। বিক্ষুদ্ধ ওই গোষ্ঠীগুলির যুক্তি, তারা তাদের নিজস্ব জমিতে উন্নয়ন প্রকল্প থেকে খুবই কম সুযোগ-সুবিধা পায়।
পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই ইসলামবাদের উপর ক্ষোভ রয়েছে বালোচদের। গ্বদর চিন-পরিচালিত বন্দরে পরিণত হওয়ার পর ক্ষোভ তীব্রতর হয়। স্থানীয়েরা জমি অধিগ্রহণ, সীমিত কর্মসংস্থানের সুযোগ, পরিবেশগত ক্ষতি এবং নিরাপত্তার অভিযোগ তুলে সরব হন।
অনেক বালোচ গোষ্ঠীর মতে, বালোচিস্তানের সম্পদের উপর স্থানীয়দের যে কোনও অধিকার নেই, তার জলজ্যান্ত উদাহরণ গ্বদর। গত কয়েক বছরে ওই বন্দর-সহ চিন নিয়ন্ত্রিত পরিকাঠামোগুলিতে ধারাবাহিক ভাবে হামলা চালাচ্ছে বিদ্রোহী বিএলএ।
তবে অনেকেই যেটা জানেন না, তা হল— এই গ্বদর কোনও দিন পাকিস্তানের ছিলই না। পাকিস্তান স্বাধীনতা পাওয়ার পর বালোচিস্তানের মতো গ্বদর সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানের অংশ হয়ে ওঠেনি। গ্বদরকে অনন্য করে তোলে এর রাজনৈতিক ইতিহাস।
১৭৮৩ সাল থেকে প্রায় ২০০ বছর ধরে ওমানের সুলতানের নিয়ন্ত্রণে ছিল গ্বদর। এই অঞ্চলটি কালাতের খান বা শাসক মির নূরী নাসির খান বালোচ উপহার দিয়েছিলেন মাস্কাটের সুলতানকে।
১৯৪৭ সালের ১১ অগস্ট ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়েছিল দেশীয় রাজ্য কালাত। ১২ অগস্ট কালাতের শাসক মির সুলেমান দাউদ স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু সেই স্বাধীনতার মেয়াদ ছিল মাত্র সাত মাস। ১৯৪৮-এর ২৭ মার্চ পর্যন্ত।
বালোচিস্তানের মানুষের কাছে সেই দিনটা আজও যন্ত্রণার ‘পরাধীনতা দিবস’! সাত দশক আগে ওই দিনেই পাকিস্তানি সেনা দখল করেছিল বালোচিস্তান। অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তৎকালীন শাসককে বাধ্য করেছিল পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হতে।
১৯৪৮ সালে বাকি বালোচিস্তান পাকিস্তানের দিকে চলে গেলেও, গ্বদর ওমানের অধীনেই ছিল। তবে স্বাধীনতার পর থেকেই কৌশলগত উপকূলরেখার কারণে গ্বদর অধিগ্রহণ করতে আগ্রহী ছিল পাকিস্তান। তবে গ্বদর-সহ মাকরান নামে পরিচিত উপকূলীয় অঞ্চলটি ১৯৫০-এর দশকের শেষ দিক পর্যন্ত পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণের বাইরেই ছিল।
১৯৫৮ সালের ১ অগস্ট গ্বদরের নিয়ন্ত্রণ ব্রিটিশদের হাতে তুলে দেয় ওমান। এর এক সপ্তাহের মধ্যেই আবার গ্বদরকে পাকিস্তানের কাছে হস্তান্তর করে ব্রিটিশেরা। ১৯৫৮ সালের ৮ অগস্ট লেফটেন্যান্ট ইফতিখার আহমদ সিরোহির নেতৃত্বে পাকিস্তান নৌবাহিনীর একটি প্লাটুন গ্বদরে পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করেন। পরে পাক নৌবাহিনীর প্রধান হন ইফতিখার।
এই চুক্তির জন্য সে সময় পাকিস্তানকে খরচ করতে হয়েছিল প্রায় ৩০ লক্ষ পাউন্ড, যা পেয়েছিল ওমান। তবে অনেকেরই অজানা যে, এই গ্বদর বন্দর এক বার ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সেই চুক্তি হলে দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস চিরতরে বদলে যেতে পারত।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে ওমানের সুলতান ১৯৫৬ সালে ভারতকে গ্বদর নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ভারতীয় সেনার অবসরপ্রাপ্ত অফিসার ব্রিগেডিয়ার গুরমিত কানওয়াল জানিয়েছেন, ওই সময় নয়াদিল্লি ও ওমানের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত মধুর। তবে গ্বদর বিক্রির প্রস্তাব সম্ভবত মৌখিক ভাবে দিয়েছিলেন সেখানকার সুলতান। প্রধানমন্ত্রী নেহরু বিষয়টিতে আমল না দেওয়ায় যথেষ্ট হতাশই হন তিনি।
ইতিহাসবিদদের একাংশের দাবি, এই সিদ্ধান্তের জন্য নেহরুকে একা দায়ী করা ঠিক নয়। কারণ, সরকারি নথি অনুযায়ী তৎকালীন বিদেশ সচিব সুবিমল দত্ত এবং ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো বা আইবি প্রধান বিএন মল্লিক ওমানের সুলতানের প্রস্তাবে তাঁকে রাজি হতে নিষেধ করেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, মূল ভূখণ্ড থেকে অনেকটা দূরে পাকিস্তানের মধ্যে থাকা ওই বন্দরকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়াদিল্লির পক্ষে সম্ভব হবে না। উল্টে এর জন্য পশ্চিমের প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে সংঘাত তীব্র হওয়ার আশঙ্কা বাড়বে।
ভারত প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার ঠিক দু’বছর পরে গ্বদর পাকিস্তানি ভূখণ্ডে পরিণত হয়। ভারত যদি সেই প্রস্তাব গ্রহণ করত, তা হলে আরব সাগরের কৌশলগত মানচিত্র এবং ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক এখন অনেকটাই আলাদা হতে পারত বলেই মত ওই বিশেষজ্ঞদের।
গ্বদর কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? সমুদ্রপথে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহণ পথ হরমুজ প্রণালীর একদম কাছে গ্বদরের অবস্থান। ফলে এর কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। চিনের জন্য এটি আরব সাগরে প্রবেশপথ। আর পাকিস্তানের জন্য এটি অর্থনৈতিক ভাবে লাভবান হওয়ার রাস্তা।
তবে পাকিস্তানের জন্য গ্বদর রাজনৈতিক দুর্বলতাও বটে। বালোচিস্তানের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির লাগাতার হামলা, স্থানীয় প্রতিরোধ, জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং বিশ্বব্যাপী ক্ষমতার রাজনীতির মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে গ্বদর।
সব ছবি: সংগৃহীত।