ঝাঁ-চকচকে শহর। উন্নত অত্যাধুনিক জীবনযাত্রার সুযোগ। সঙ্গে মোটা মাইনের চাকরি। দেশের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি আয়ের হাতছানি। বিশ্বের অন্যতম সেরা দেশগুলিতে দেখা দিয়েছে দক্ষ কর্মীসঙ্কট। সেই সুদক্ষ কর্মীদের অভাব পূরণের জন্য ভরসাস্থল হয়ে উঠছেন ভারতীয়েরাই।
দক্ষ ভারতীয় পেশাদারদের জন্য তাদের দরজা খুলে দিচ্ছে এশিয়া ও ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ। এই চারটি দেশের গড় বেতন ভারতের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ বেশি। বিশেষ করে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং গণিতের ক্ষেত্রগুলিতে ভারতীয়দের কাজের সুযোগ বাড়ছে।
বিনিয়োগ ব্যাঙ্কার এবং পেশা উপদেষ্টা সার্থক আহুজা লিঙ্কডইনে জানিয়েছেন, এই চারটি দেশে প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং নাগরিক পরিকাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পক্ষেত্রগুলিতে ব্যাপক কর্মীঘাটতি লক্ষ করা গিয়েছে। সেই শূন্যস্থান পূরণের জন্য ভারতীয় কর্মীদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছে দেশগুলি। অতএব বাক্সপ্যাঁটরা গুছিয়ে নেওয়ার অপেক্ষা।
এই দেশগুলির মধ্যে, ভারতীয় পেশাদারদের জন্য সবচেয়ে পছন্দের গন্তব্য জার্মানি। দেশটি বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষ শ্রমিকের বড়সড় ঘাটতির মুখোমুখি হয়েছে। তাই বিভিন্ন প্রযুক্তি ও বৈদ্যুতিন সংস্থাগুলি কর্মীঘাটতি মেটাতে ভারতীয় কর্মী নিয়োগের দিকে ঝুঁকছে বলে সূত্রের খবর।
২০১২ সাল থেকে জার্মানিতে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং গণিতের পেশায় নিযুক্ত ভারতীয়দের সংখ্যা প্রায় ন’গুণ বেড়েছে। দেশটির ২৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সি চাকুরিজীবীর মধ্যে এক তৃতীয়াংশই ভারতীয়। রাইন নদীর দেশে ক্রমাগত দক্ষ কর্মীর অভাব ঘটছে। এখানকার কর্মীদের বেতনকাঠামোও অন্য দেশের তুলনায় উন্নত। ভারতীয় কর্মীরাই ইউরোপের এই দেশটির কর্মীবাহিনীর সবচেয়ে উৎপাদনক্ষম ও অর্থনৈতিক কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
জার্মানি প্রতি বছর ভারতীয়দের জন্য ৯০ হাজার পর্যন্ত দক্ষ কাজের চাহিদা মেটানোর জন্য ভিসা প্রদানের পরিকল্পনা করছে। ইতিপূর্বে এই সংখ্যাটি ছিল ২০,০০০। ভিসার পরিমাণ চার গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এই চিত্রই বলে দেয় যে জার্মানির বিদেশি দক্ষতা কতটা জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, জার্মানিতে বর্তমানে স্বাস্থ্যসেবা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং উৎপাদন খাতে ৭ লক্ষের বেশি চাকরির সুযোগ রয়েছে।
হিটলারের দেশে ইঞ্জিনিয়ারেরা প্রতি মাসে ৬ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন। নার্স এবং স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত পেশাদারেরা মাসে ৩ থেকে ৪ লক্ষ টাকা পান। প্রযুক্তিবিদ বা ইঞ্জিনিয়ারেরা বছরে ৪০ লক্ষ থেকে ৯০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বেতনের সুযোগ পেতে পারেন জার্মানিতে। ভারতের তুলনায় জার্মানিতে জীবনযাত্রার খরচ তুলনামূলক ভাবে বেশি। কিন্তু আয়ের সম্ভাবনা, জীবনযাত্রার মান এবং পেশাদারিত্বের নানা সুবিধার কারণে ভারতীয় তরুণদের কাছে স্বপ্নের গন্তব্য হয়ে উঠছে জার্মানি।
একই ভাবে সূর্যোদয়ের দেশে পাড়ি দিলে খুলে যেতে পারে ভারতীয়দের সৌভাগ্যের ঝাঁপি। জাপানে স্বাস্থ্যসেবা এবং কারিগরি কর্মীদের চাহিদা ক্রমবর্ধমান। বয়স্ক জনসংখ্যার কারণে দক্ষ যত্নশীল এবং হাসপাতাল কর্মীদের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে জাপানে।
সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুসারে, জাপান ভারতের সঙ্গে একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে। সেই চুক্তির লক্ষ্যই হল আগামী পাঁচ বছরে ৫ লাখ ভারতীয় কর্মীকে সে দেশে অভিবাসনের সুযোগ করে দেওয়া। জাপানে তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে শূন্যস্থান পূরণের সুযোগ কাজে লাগাতে পারবেন ভারতীয়েরা। ৫ লক্ষের মধ্যে ২০ শতাংশ ভারতীয় এই সুযোগ পেতে পারেন। এই ধরনের চাকরির ক্ষেত্রে গড় বার্ষিক বেতন আনুমানিক ৪০ লক্ষ টাকা।
কারিগরি পেশার পাশাপাশি, জাপানে স্বাস্থ্যসেবা খাতেও বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে আগামী দিনে। ভারতীয় নার্সদের জীবিকার সুযোগ তৈরি হচ্ছে জাপানে। দ্বীপরাষ্ট্রের এই পেশায় প্রতি মাসে ৩-৪ লক্ষ টাকা আয় করা সম্ভব বলে জানাচ্ছেন আহুজা। ভারতীয় দক্ষ স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের চাহিদা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে জাপানে।
জাপানি কর্মসংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম পেশাদারদের জন্য বেশ কিছু বাছাই করা কাজের সুযোগ দিচ্ছে টোকিয়ো। আকর্ষণীয় বেতনের পাশাপাশি জাপানের উচ্চমানের জীবনধারা, শৃঙ্খলা এবং নিরাপত্তার কারণে অনেক পেশাদারই আমেরিকা বা ইউরোপের দেশগুলিকে বাদ দিয়ে এশীয় দেশকেই বেছে নিচ্ছেন। জাপানে উচ্চশিক্ষা বা চাকরির ক্ষেত্রে জাপানি ভাষা সম্পর্কিত জ্ঞান থাকলে বাড়তি সুবিধা পাবে ভারতীয়েরা, এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।
উৎপাদনক্ষেত্রে দক্ষ কর্মীর জন্য ভারতের দিকে তাকিয়ে আছে আরও এক প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র। ২০২৪ সালে দুই দেশের মধ্যে একটি শ্রম সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সেই চুক্তিমাফিক প্রথম পর্যায়ে প্রায় ১,০০০ ভারতীয়কে নিয়োগের লক্ষ্য রয়েছে তাইওয়ানের। পরে উভয় সরকারের অংশীদারির মাধ্যমে কর্মসংস্থান আরও বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা রয়েছে তাইওয়ানের। ভারতের তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় তুলনামূলক ভাবে বেশি হলেও এখানকার আয়ের সম্ভাবনা এবং সঞ্চয়ের সুযোগও বেশি।
সাংস্কৃতিক মিলের কারণে এই দেশটি ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলি থেকে কর্মীনিয়োগে বিশেষ ভাবে আগ্রহী। চিনের প্রতিবেশী রাষ্ট্রটি উৎপাদন ক্ষেত্রে কাজ করতে পারেন এমন ভারতীয় কর্মীদের অভিবাসনের সুযোগসুবিধা দিতে চায়।
‘সবচেয়ে সুখী দেশ’ বলে পরিচিত নর্ডিক দেশ ফিনল্যান্ড। ভারতের মতো উদীয়মান শক্তির সঙ্গে অর্থপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে ইউরোপীয় দেশটি। ভারতীয় পেশাদারদের জন্য দ্রুত আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠছে ছবির মতো সাজানো-গোছানো দেশটি। ফিনিশ বা সুইডিশ ভাষার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের জন্য এখন স্থায়ী আবাসনের সুবিধা দিয়ে থাকে এই রাষ্ট্র।
গত কয়েক দশকে ফিনল্যান্ডে ভারতীয়দের সংখ্যা ৩৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন আহুজা। ফিনল্যান্ড সরকার স্বাস্থ্যসেবা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দক্ষ পেশাদারদের জন্য একটি ‘ইইউ ব্লু কার্ড’ দিয়ে থাকে। ফলে তাঁদের জন্য কাজের সুযোগ খোঁজা এবং ইউরোপে দীর্ঘমেয়াদি বসবাস করা সহজ হয়।
ভ্লাদিমির পুতিনের দেশেও কমছে দক্ষ কর্মী। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৩১ লক্ষ দক্ষ-অদক্ষ কর্মীর প্রয়োজন পড়তে চলেছে ভারতের ‘বন্ধু’ দেশের। ভবিষ্যতের কর্মীসঙ্কটের মোকাবিলায় মস্কোর ভরসাস্থল হয়ে উঠতে চলেছে নয়াদিল্লি। রাশিয়া বিভিন্ন প্রযুক্তি ও বৈদ্যুতিন সংস্থাগুলির কর্মীঘাটতি মেটাতে ভারতীয় কর্মীদের নিয়োগের দিকে ঝুঁকছে বলে সরকারি সূত্রে খবর।
অবজ়ারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন কর্তৃক একটি সমীক্ষার তথ্য বলছে, রাশিয়ায় ভারতীয় কর্মীর সংখ্যা নাটকীয় ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যেখানে ২০২১ সালে ৫ হাজার ৪৮০ জন ভারতীয় ওয়ার্ক পারমিট পেয়েছিলেন, সেখানে ২০২৪ সালে এই সংখ্যা বেড়ে ৩৬ হাজার ২০৮ জনে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৭ গুণ।
আমেরিকার এইচওয়ানবি ভিসার দীর্ঘসূত্রিতা, গ্রিন কার্ডের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষার মতো সমস্যা ভারতীয়দের জন্য আমেরিকায় চাকরির বাজারে টিকে থাকা দুষ্কর করে তুলছে। বাকি বিকল্প দেশগুলির মধ্যে ইংল্যান্ড ও কানাডায় চাকরি করতে যাওয়া নিয়েও নানা বাধাবিপত্তির সম্মুখীন হতে হচ্ছে ভারতের নাগরিকদের। এই অবস্থায় ভারতের দক্ষ কর্মীদের ত্রাতা হয়ে দাঁড়াতে পারে ভারতের এই ক’টি ‘বন্ধু দেশ’।
সব ছবি: সংগৃহীত ও এআই সহায়তায় প্রণীত।