তাঁর সন্তানের পিতা ইলন মাস্ক। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে সন্তানের পিতৃত্বের দাবি তুলে গোটা বিশ্বের নজর কেড়ে নিয়েছিলেন মার্কিন নেটপ্রভাবী এবং লেখিকা অ্যাশলে সেন্ট ক্লেয়ার। সেই সময় এক্স হ্যান্ডলের একটি পোস্টে অ্যাশলে ঘোষণা করেন যে, তাঁর পাঁচ মাস বয়সি সন্তানের বাবা স্বয়ং মাস্ক। সেই শিশুর বয়স এখন দেড় বছরের কাছাকাছি।
সুন্দরী ও লাস্যময়ী এই তরুণী সন্তানের পিতৃপরিচয়ের দাবিতে গত বছর মাস্কের বিরুদ্ধে আদালতে নালিশ ঠুকতেও পিছপা হননি। সেই দাবিতে মুখে কুলুপ আঁটলেও সম্প্রতি বোমা ফাটিয়েছেন ইলন নিজেই। মাস্ক প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন অ্যাশলের গর্ভজাত তাঁর পুত্রসন্তানের সম্পূর্ণ হেফাজত পেতে চান তিনি।
আদালতে মামলা করে অ্যাশলে জানিয়েছেন, তাঁর পুত্রসন্তানকে একার দায়িত্বে বড় করে তুলতে চান তিনি। সন্তানের জীবনে ইলনের কোনও প্রভাব পড়ুক এমনটা তিনি চান না। তিনি সমাজমাধ্যমে লিখেছিলেন, ‘‘স্বাভাবিক, নিরাপদ পরিবেশে সন্তানকে বড় করতে চাই। সংবাদমাধ্যমের কাছে অনুরোধ, সন্তানের গোপনীয়তা রক্ষার অধিকারকে সম্মান করুন।’’
জন্মের পর দীর্ঘ কয়েক মাস সন্তানের পরিচয় গোপন রেখেছিলেন এই সমাজমাধ্যম প্রভাবী। তার কারণও জানিয়েছেন অ্যাশলে। বলেছিলেন, সন্তানের পরিচয়ের গোপনীয়তা রক্ষা করতেই এই সিদ্ধান্ত। কিন্তু সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন তিনি। মামলা করে দাবি জানান, ইলনই যে তাঁর সন্তানের পিতা, তা নিশ্চিত করে দিতে হবে আদালতকে।
সম্প্রতি সন্তানের লিঙ্গপরিচয় নিয়ে সমাজমাধ্যমে একটি বিবৃতি দিতে দেখা গিয়েছে অ্যাশলেকে। আর তাতেই টনক নড়েছে মাস্কের। রক্ষণশীল প্রভাবশালী এবং লেখক অ্যাশলে সমাজমাধ্যমে রূপান্তরকামী সম্প্রদায়কে সমর্থন করে একটি পোস্ট করেছিলেন। সেই পোস্ট দেখেই সন্তানের হেফাজতের জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন টেসলাকর্তা। তাঁর মনে হয়েছে, অ্যাশলে নিজের সন্তানের লিঙ্গ পরিবর্তনের বিষয়ে ভাবনাচিন্তা করছেন।
সেই বিবৃতির পরিপ্রেক্ষিতে পাল্টা পোস্ট করে জবাব দিয়েছেন স্পেসএক্স ও টেসলার কর্ণধার। এক্স-এর একটি পোস্টের প্রতিক্রিয়ায় মাস্ক ঘোষণা করেছেন, তিনি সন্তানের হেফাজতের প্রক্রিয়া শুরু করবেন। মাস্কের যুক্তি, অ্যাশলে তাঁদের এক বছর বয়সি সন্তানের লিঙ্গ পরিবর্তন করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
সেই পোস্টে পিতামাতার কর্তব্য এবং সন্তানের সুস্থতার বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মাস্ক। এই প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত মাস্কের হেফাজত নেওয়ার প্রক্রিয়া আদালত পর্যন্ত পৌঁছেছে কি না তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। যদিও অ্যাশলে তাঁদের পুত্রসন্তানের ভিন্ন লিঙ্গে রূপান্তরের ইচ্ছাপ্রকাশ করেছেন, এই বিষয়টিও স্পষ্ট নয়।
রক্ষণশীল রাজনৈতিক মনোভাবের জন্য বিশেষ ভাবে পরিচিত ৩১ বছর বয়সি অ্যাশলে। রক্ষণশীল মতাদর্শের প্রতি তাঁর সমর্থন বরাবরই। প্রায়শই বিশিষ্ট রক্ষণশীল ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে অনুষ্ঠানে হাজির হতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। মাঝে তিনি এই অনুষ্ঠানগুলি থেকে সরে গিয়েছিলেন। দীর্ঘ বিরতির পর সম্প্রতি আবার সমাজমাধ্যমে সক্রিয় হয়েছেন অ্যাশলে।
রূপান্তরকামী সম্প্রদায় সম্পর্কে অ্যাশলের অবস্থান জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। তাতে অ্যাশলে জানিয়েছিলেন যে, তিনি আগে স্পষ্টতই ‘ট্রান্সফোবিয়া’র (রূপান্তরকামী মানুষদের প্রতি ভয়, ঘৃণা, অস্বস্তি বা বিদ্বেষমূলক মনোভাব ও আচরণ) কবলে পড়েছিলেন। অ্যাশলের সেই মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সমালোচনার ঝড় উঠতেই ঢোক গিলে নেন এই মার্কিন নেটপ্রভাবী।
পাল্টা পোস্ট করেন, ‘‘আমার বক্তব্যের জন্য আমি প্রচণ্ড অপরাধবোধ অনুভব করছি। আরও বেশি অপরাধবোধ এই কারণে যে, অতীতে আমি যা বলেছি তা আমার ছেলের বোনকে আরও বেশি কষ্ট দিয়েছে।’’ সম্ভবত তিনি মাস্কের রূপান্তরিত কন্যা ভিভিয়ান জেনা উইলসনের কথা উল্লেখ করেছেন বলে মনে করছেন সমাজমাধ্যম ব্যবহারকারীরা। রূপান্তরিত হওয়ার পরই ইলনের সঙ্গে সব সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ভিভিয়ানের।
১৬ বছর বয়সে ভিভিয়ান নিজেকে রূপান্তরকামী হিসাবে প্রকাশ্যে পরিচয় দেন। ইলন নিজের প্রথম সন্তানের এ-হেন পরিচয় মেনে নিতে পারেননি। আর তাতেই ধীরে ধীরে তাঁদের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে বলে শোনা যায়। ২০২২ সালে ভিভিয়ান লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টি সুপিরিয়র কোর্টে নিজের নাম এবং লিঙ্গ পরিবর্তনের জন্য আবেদন করেন। আবেদনে জানান, তিনি পুরুষ থেকে নারীতে রূপান্তরিত হতে চান।
২০২৩ সালে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি মিম নিয়ে মতবিনিময়ের পর মাস্ক এবং অ্যাশলের মধ্যে আলাপচারিতার শুরু। অ্যাশলে জানান, ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে সেন্ট বার্থসে বেড়াতে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানেই ইলনের সঙ্গে শারীরিক ভাবে ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলেন। সেই মিলনের ফলে অন্তঃসত্ত্বা পড়েন অ্যাশলে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে সন্তানের নিরাপত্তার কারণে তাঁর গর্ভাবস্থা ও সন্তানের পিতৃপরিচয় গোপন রাখতে বলেছিলেন স্বয়ং মাস্কই, দাবি তাঁর সঙ্গিনীর।
আদালতে উপস্থিত হয়ে লেখিকা জানিয়েছেন, সন্তানের জন্মের সময় ইলন তাঁর পাশে ছিলেন না। সব মিলিয়ে মাত্র তিন বার সদ্যোজাত সন্তানের সঙ্গে দেখা করেছেন মাস্ক। দু’বার ম্যানহ্যাটনে, এক বার টেক্সাসে। শিশুর জন্মের খবর পেলেও সন্তানের ছবি পর্যন্ত দেখতে চাননি ইলন। সন্তান কোলে নিয়ে বসে থাকা ইলনের একটি ছবিও আদালতে জমা করেছেন অ্যাশলে।
পিতৃত্বের দাবিতে সরব হওয়ার কয়েক মাস পর অ্যাশলে একটি পডকাস্টে দাবি করেন যে, মাস্ক তাঁর সন্তানের জন্য মাসে মাসে যে আর্থিক সাহায্য করেন তা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। প্রথমে তাঁদের জন্য ১ লক্ষ ডলার বরাদ্দ করলেও পরে সেটি কমে গিয়ে ৪০ হাজার ডলারে ঠেকে। তার পরে সন্তানপালনের জন্য অর্থের পরিমাণ তলানিতে চলে যায়। অ্যাশলে ও তাঁর সন্তানের ভরণপোষণের জন্য বরাদ্দ হয় ২০ হাজার ডলার। তার পর থেকেই আর্থিক টানাটানির মধ্যে চলতে হচ্ছে তাঁকে।
বিশ্বের সেরা ধনী তিনি। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও চোখধাঁধানো। দুই স্ত্রী এবং প্রেমিকা ছাড়া আরও কত জনের সঙ্গে ইলন সম্পর্কে জড়িয়েছেন তা নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, স্পেসএক্সের অন্তত দু’জন কর্মীর সঙ্গে যৌনসম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন প্রতিষ্ঠানের সিইও মাস্ক।
বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ইলন দু’বার বিয়ে করেছেন। দু’বার বিচ্ছেদের পর ২০২১ সাল থেকে তাঁর সঙ্গিনী শিভন জ়িলিস। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের পর তারকাখচিত পার্টিতে শিভনকে নিয়ে হাজির হন মাস্ক। ২০০২ সালে প্রথম পিতৃত্বের সুখ লাভ করেন ইলন। প্রথম স্ত্রী জাস্টিন উইলসনের পাঁচ সন্তান রয়েছে। ২০২৪ সালেও ১৩তম সন্তানের বাবা হন তিনি। তবে অ্যাশলের সন্তানের পিতৃত্ব স্বীকার করলে ১৪তম সন্তানকে পরিবারে স্বাগত জানাবেন মাস্ক।
সব ছবি: সংগৃহীত।