প্রখর দাবদাহে পুড়ছে ভারতের অধিকাংশ রাজ্য। গ্রীষ্মপ্রধান দেশ হওয়ায় এখানকার বেশির ভাগ রাজ্যেরই তাপমাত্রা গরমকালে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে উঠে যায়। এরই সঙ্গে বয়ে যায় গরম হাওয়া বা লু। সব মিলিয়ে দমবন্ধ করা পরিস্থিতি হয়ে ওঠে। দিনের বেলা রাস্তার বেরোনো দায় হয়ে যায়।
চলতি বছর গরম নিয়ে দেশবাসীর মুখে অভিযোগের শেষ নেই। আবহাওয়া দফতর থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে তাপপ্রবাহের কবল থেকে জলদি রেহাই পাওয়া যাবে না। উত্তর, উত্তর-পশ্চিম এবং মধ্য ভারত এখনও গরমে পুড়বে। দেশের ওই অঞ্চলে মে মাসের শেষ পর্যন্ত তীব্র তাপপ্রবাহ চলবে।
মৌসম ভবন জানিয়েছে, মে মাসের প্রায় শেষ পর্যন্ত উত্তর-পশ্চিম এবং মধ্য ভারতে তীব্র তাপপ্রবাহ চলবে। পূর্ব ভারতেও তাপপ্রবাহের সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
তবে এ কেবল চলতি বছরের গল্প নয়। প্রতি বছরই ভারতের এ সকল অঞ্চলে গরম অসহনীয় মাত্রায় পৌঁছোয়। সেখানকার মানুষজন চাতক পাখির মতো আকাশের পানে চেয়ে বৃষ্টির অপেক্ষা করলেও, মৌসুমি বায়ু তাঁদের প্রতি দয়াবান হয় না। সেই কারণে উত্তরপ্রদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে অবস্থিত বুন্দেলখণ্ডের অন্তর্গত এক জেলায় গরমকালে ঘড়ির কাঁটায় সকাল ১০টা বাজতে না বাজতেই নেমে আসে ‘নিস্তব্ধতা’।
জেলার নাম বান্দা। উত্তরপ্রদেশের এই শহরে গ্রীষ্মে সকাল ১০টার পর মানুষজনের আর বাড়ির বাইরে বেরোনোর উপায় থাকে না। চলতি বছর ইতিমধ্যে সেই অঞ্চলের তাপমাত্রার পারদ ৪৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড পার করে ফেলেছে।
বান্দা ভারতের উষ্ণতম অঞ্চলগুলির মধ্যে অন্যতম। গ্রীষ্মের সকালে এই অঞ্চলের মানুষজনের জীবনধারা প্রায় থমকে যায় বললেই চলে। কারণ সেখানকার তীব্র তাপপ্রবাহ এবং গরম।
কোনও ‘সাহসী’ ব্যবসায়ী গরমকে উপেক্ষা করে দোকান খোলা রাখলেও কষ্ট মাটি হয়। কারণ, লোকজন খুব প্রয়োজন না পড়লে রাস্তায় বেরোন না। ফলত দোকান খুলে রাখাই সার, দেখা মেলে না গ্রাহকদের।
সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বান্দার অতারা শহরের এক স্বর্ণব্যবসায়ী লক্ষ্মণ গুপ্ত জানিয়েছেন, তিনি ভোর ৬টায় বাড়ি থেকে বেরোন যাতে বাড়ির সমস্ত কাজ বেলা গড়ানোর আগেই করে ফেলতে পারেন। সকালের দিকে দোকান খোলা রেখেও কোনও ক্রেতার দেখা পান না বলে জানিয়েছেন লক্ষ্মণ। তিনি বলেছেন, এপ্রিল থেকে তাঁর দোকানে সে ভাবে কোনও খদ্দের হয় না। সকাল ১০টা বাজতে না বাজতেই রাস্তাঘাট জনশূন্য হয়ে যায়।
বান্দার রাস্তায় সকালের দিকে কয়েক জন মানুষের দেখা পাওয়া গেলেও, বেলা বাড়লে রাস্তাঘাটে লোক প্রায় দেখা যায় না বললেই চলে। সকলে অপেক্ষা করেন সূর্য কখন অস্ত যাবে। সূর্যাস্তের পর সেই অঞ্চলের রাস্তাঘাট আবার মানুষের পায়ের স্পর্শ পায়।
কেবল তাপপ্রবাহের কষ্টই নয়, গরমকালে সেই অঞ্চলের মানুষজনের নিত্যসঙ্গী জলকষ্ট। রোদের প্রখর তাপে নদীগুলি শুকিয়ে গতিপথেই মিলিয়ে যায়। কুয়োগুলির জলস্তর এতটাই নেমে যায় যে খালি চোখে ঠাহর করা মুশকিল হয়ে পড়ে।
সেই অঞ্চলের কৃষকেরা সকালে চাষাবাদ করার বদলে রাতকেই কাজের সময় হিসাবে বেছে নিচ্ছেন। কৃষিজমিতে এলইডি আলো লাগিয়ে তাঁরা চাষের কাজ করছেন।
চাঁদিফাটা গরম বান্দার শ্রমিক শ্রেণির মানুষদেরও গলা তুলতে বাধ্য করেছে। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টার মধ্যে কাজ করার কথা বললে তাঁরা সাধারণ সময়ের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি বেতন দাবি করছেন। এর ফলে তাঁদের অনেককেই কাজ হারাতে হচ্ছে। কেউ কেউ আবার মালিক কথা কানে তুলবে না ভেবে রোদ মাথায় নিয়েই কাজ করে চলেছেন।
প্রতি গ্রীষ্মে বান্দার তাপমাত্রার পারদ ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও চলতি বছরে সেখানকার তাপমাত্রা অন্য বছরগুলিকে ছাপিয়ে গিয়েছে। সেই কারণে এই বছর সেখানকার গ্রামের লোকজনদের মধ্যে ঘরছাড়ার সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে।
পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, গরমের জন্য প্রতি বছরই ভারতের বান্দা-সহ বুন্দেলখণ্ড, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান প্রভৃতি গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলগুলির বহু মানুষ নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে চলে আসেন। শান্তিতে বাঁচার জন্য সে সকল অঞ্চলের বাসিন্দারা শান্তির নীড় ছেড়ে পাড়ি দেন অন্য কোথাও।
চলতি বছর সে সকল অঞ্চলের বাসিন্দাদের ঘরছাড়া হওয়ার সময় স্বাভাবিকের তুলনায় এগিয়ে এসেছে। ঘরছাড়াদের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। তার জন্য দায়ী করা হচ্ছে ঊর্ধ্বমুখী তাপমাত্রার পারদকেই।
প্রবল তাপপ্রবাহের জন্য বান্দার বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাও সমস্যার মুখে পড়েছে। অতিরিক্ত গরম এবং চাপের জন্য সেখানকার ট্রান্সফর্মারগুলি বার বার বিকল হয়ে পড়ছে। সেই কারণে সে অঞ্চলের বিদ্যুৎকর্মীরা সেগুলিকে ঠান্ডা রাখার জন্য অভিনব পন্থা নিয়েছেন।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞেরা মনে করছেন, বিন্ধ্য পর্বতমালা জুড়ে হয়ে চলা খনির কাজের জন্য নদীগুলির জল কমে যাচ্ছে, যা গরমে সেগুলির শুকিয়ে যাওয়ার প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করছে। এই কারণে সেখানকার ভূগর্ভস্থ জলস্তরও দিন দিন কমে যাচ্ছে। অতীতে বেলেপাথরের তৈরি পাহাড়গুলি থেকে জল চুঁইয়ে ভূগর্ভে প্রবেশ করত। এর ফলে ভূগর্ভস্থ জলস্তর বৃদ্ধি পেত। কিন্তু ক্রমাগত খননকার্যের ফলে সেই প্রক্রিয়াও আগের থেকে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
বান্দা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিভাগের প্রধান অধ্যাপক দীনেশ সাহা সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, জঙ্গল সাফ করা, পাহাড় কেটে ফেলা, শিল্পকাজের ফলে সৃষ্টি হওয়া ধূলিকণা প্রভৃতি কারণে সে অঞ্চলে তাপপ্রবাহের পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
২০২৫ সালে করা এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে ২০০৫ সাল থেকে বান্দার বনভূমি ১৫ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে। অচিরেই এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে এই অঞ্চল আরও ভয়ঙ্কর গ্রীষ্মকালের চিত্র দেখতে পাবে বলে মনে করছেন বিজ্ঞজনেরা।
সব ছবি: সংগৃহীত।