তাপমাত্রার উপর বাজি ধরে এক দিনে হাজার হাজার ডলার কামিয়ে নিলেন জুয়াড়িরা। একটি নির্দিষ্ট দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা কত হবে? এই বিষয়ের উপর বাজি ধরা হয়েছিল পলিমার্কেট নামে আমেরিকার এক সাট্টাবাজারে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ওপর পলিমার্কেটে কয়েক লাখ ডলারের বাজি ধরা হয়েছিল।
মার্চ এবং এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে প্যারিসের তাপমাত্রা কত থাকবে, তা নিয়ে অনলাইন জুয়াড়িদের মধ্যে বাজির লড়াই হয়। এই লড়াইয়ে প্যারিসের ‘শার্ল দ্য গল’ বিমানবন্দরে অবস্থিত মেটিও-ফ্রান্সের একটি আবহাওয়া কেন্দ্রের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছিল।
একাধিক মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে, যেখানে দাবি করা হয়েছে, ফ্রান্সের আবহাওয়া সেন্সরে কারচুপির মাধ্যমে বাজিগুলি জেতা হয়েছিল। প্যারিসের ‘শার্ল দ্য গল’ বিমানবন্দরের তাপমাত্রা পরিমাপক যন্ত্রে অস্বাভাবিকতা ধরা পড়ার পর ফ্রান্সের সরকারি আবহাওয়া ও জলবায়ু দফতর ‘মোতেও ফ্রান্স’ পুলিশের কাছে আনুষ্ঠানিক একটি অভিযোগ দায়ের করেছে।
পূর্বাভাস অনুযায়ী মার্চ ও এপ্রিলে ফ্রান্সের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি থাকার কথা। কিন্তু ১৫ এপ্রিল সন্ধ্যার দিকে মাত্র ১২ মিনিটের ব্যবধানে ‘শার্ল দ্য গল’ বিমানবন্দরের সেন্সরের রিডিংয়ে তাপমাত্রা নাটকীয় ভাবে ১৬.৯ ডিগ্রি থেকে এক লাফে ২১.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়ে যায়। একই সঙ্গে বাতাসে আর্দ্রতা হঠাৎই কমে যায়। কিন্তু অদ্ভুত ভাবে অল্প কিছু ক্ষণ পর তাপমাত্রা আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়।
বিমানবন্দরের তাপমাত্রার অস্বাভাবিকতা একটি বেসরকারি আবহাওয়া সংস্থার নজরে পড়েছিল। এত দ্রুত তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার নজির সে দেশে প্রায় নেই বললেই চলে। ইনফোক্লাইমেট (বেসরকারি আবহাওয়া সংগঠন) যখন মোতেও ফ্রান্সকে এই অদ্ভুত তাপমাত্রা বৃদ্ধির কথা বার বার জানায় তখন থেকেই সন্দেহ তীব্র হতে শুরু করে।
ইনফোক্লাইমেটের ফোরামে আবহবিদ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞেরা প্রথম হিসাব কষে দেখান যে, এত কম সময়ে রানওয়ের মতো খোলা জায়গায় তাপমাত্রা ৫ ডিগ্রি বাড়াতে হলে সেন্সরের ঠিক পাশে কোনও বহনযোগ্য তাপ উৎপাদনকারী বস্তু ব্যবহার করতে হবে। উল্লেখ্য, বিমানবন্দর রানওয়ের কাছে থাকা ওই আবহাওয়া সেন্সরটির চারপাশ খুব একটা সুরক্ষিত ছিল না।
তদন্তকারী এবং আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের অনুমান, এ ক্ষেত্রে তাপমাত্রার হেরফের ঘটাতে ব্যাটারিচালিত হেয়ার ড্রায়ার ব্যবহার করা সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর উপায়। কোনও ব্যক্তি সরাসরি সেখানে গিয়ে একটি বহনযোগ্য হেয়ার ড্রায়ার বা লাইটার জাতীয় বস্তু সেন্সরটির একদম কাছে ধরে রেখেছিলেন। এর ফলে সেন্সরটি সাময়িক ভাবে চারপাশের বাতাসের তাপমাত্রা রেকর্ড করে। পরবর্তী কালে সরকারি সিস্টেমে ভুল তথ্য চলে যায়।
সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তথ্য বলছে, বিশেষ দু’টি দিনে পলিমার্কেটে ধরা বাজিগুলিতে ৫,০০,০০০ ডলারের (৩,৭১,০০০ পাউন্ড) বেশি লেনদেন হয়েছিল। বেশ কয়েক জন জুয়াড়ি পকেটে পুরেছেন মোটা মুনাফাও। তিনটি পৃথক ওয়ালেট এই বাজি ধরে ২,৮০,০০০ ডলারের বেশি আয় করা হয়েছে ১৫ এপ্রিল। এ দিনের রেকর্ড করা তাপমাত্রা কয়েক মিনিটের মধ্যে ১৮ ডিগ্রি থেকে বেড়ে ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়ে আবার কমে গিয়েছিল।
একটি অ্যাকাউন্ট থেকে মাত্র ১১৯ ডলার বাজি ধরে ২১,০০০ ডলারেরও বেশি লাভ করেন এক জুয়াড়ি। তিনি বাজি ধরেছিলেন যে, সে দিন তাপমাত্রা ১৮ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যাবে। অথচ সেই সময় বাজির চুক্তির মূল্য অনুযায়ী এর সম্ভাবনা ছিল প্রায় ০.৫ শতাংশ।
এই ঘটনার আগে ৬ এপ্রিল, একটি অ্যাকাউন্ট ৩০ ডলারেরও কম বাজি ধরে ১৩ হাজার ৯৯০ ডলার লাভ করে। তখন জুয়াড়িরা বাজি ধরেছিলেন যে প্যারিসের তাপমাত্রা ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছোবে। এপ্রিলে সদ্য খোলা অ্যাকাউন্টটির বাজিটি প্যারিসের স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টার ঠিক আগে ধরা হয়েছিল। ঠিক তখনই ওই তাপমাত্রার উপর বাজির পরিমাণ বেড়ে যায়।
পলিমার্কেট হল বিশ্বের বৃহত্তম ব্লকচেন-ভিত্তিক ভবিষ্যদ্বাণীমূলক জুয়ার প্ল্যাটফর্ম। এখানে ব্যবহারকারীরা রাজনীতি, খেলাধুলা, পপ কালচার, অর্থনীতি এবং আবহাওয়ার মতো বাস্তব জগতের বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে শেয়ার কেনাবেচা বা পূর্বাভাস দিতে পারেন। পলিমার্কেটের মতো প্ল্যাটফর্মে কোনও বিষয়ের পক্ষে যত বেশি টাকা খাটানো হয়, সেই ঘটনাটি ঘটার সম্ভাবনা তত বেশি দেখায়।
অবাক করার মতো তথ্য হল, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুত্র ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রের আর্থিক লগ্নিকারী সংস্থা ‘১৭৮৯ ক্যাপিটাল’ পলিমার্কেটের মতো প্ল্যাটফর্মে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে। তিনি নিজে এর উপদেষ্টা হিসাবে যুক্ত রয়েছেন।
পলিমার্কেট সম্পর্কিত চ্যানেলগুলিতে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জুয়াড়িরা একটি এআই-নির্মিত ছবিও শেয়ার করেছেন। সেখানে এক ব্যক্তিকে বিমানবন্দরের রানওয়ের পাশের একটি আবহাওয়া কেন্দ্রের দিকে হেয়ার ড্রায়ার তাক করে থাকতে দেখা গিয়েছে।
এই জালিয়াতির কথা প্রকাশ্যে আসতেই পলিমার্কেট কর্তৃপক্ষ ‘শার্ল দ্য গল’ বিমানবন্দরের আবহাওয়া সেন্সরের তথ্য ব্যবহার করা বন্ধ করে দেয়। ১৯ এপ্রিল থেকে তারা প্যারিসের তাপমাত্রা নির্ধারণের জন্য তুলনামূলক সুরক্ষিত প্যারিস-লে বোর্জেট বিমানবন্দরের তথ্য ব্যবহার করা শুরু করেছে।
তথ্যবিকৃতির অভিযোগ ওঠার পর মোতেও ফ্রান্স তাদের সেন্সরটি পরীক্ষা করে। সেখানে বাহ্যিক ভাবে হস্তক্ষেপের প্রমাণও মিলেছে। এর পর তারা এয়ার ট্রান্সপোর্ট জেন্ডারমারি ব্রিগেড (এয়ারপোর্ট পুলিশ)-এর কাছে একটি ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করে। ফ্রান্সে কোনও সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বয়ংক্রিয় তথ্যভান্ডারে অবৈধ হস্তক্ষেপের অপরাধ অত্যন্ত গুরুতর। দোষী প্রমাণিত হলে অপরাধীর সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড এবং তিন লক্ষ ইউরো জরিমানা হতে পারে।
ফরাসি পুলিশ ও মোতেও ফ্রান্স ঘটনাটিকে ‘ডেটা প্রসেসিং সিস্টেম’-এ অবৈধ অনুপ্রবেশ ও জালিয়াতি বলে তদন্ত করলেও, তারা এখনও সুনির্দিষ্ট ভাবে কোনও অপরাধীকে হাতেনাতে শনাক্ত করতে পারেনি বলেই খবর।
প্রেডিকশন মার্কেট বা ভবিষ্যদ্বাণীমূলক সাট্টাবাজারের মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের সম্মিলিত বুদ্ধিমত্তাকে ব্যবহার করে নিখুঁত পূর্বাভাস দেওয়া। কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, যাঁদের হাতে বিপুল অর্থ বা ভিতরের তথ্য রয়েছে তাঁরা বাজি ধরে বাজারের পাল্লা নিজেদের দিকে ঘুরিয়ে দিচ্ছেন। অনলাইন বেটিং প্ল্যাটফর্ম পলিমার্কেটের সম্প্রসারণ ক্রমশ উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলছে। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বাস্তব সত্য থেকে সরে গিয়ে মার্কেটের প্রচারিত তথ্য অনলাইন জুয়াড়িদের নৈরাজ্যবাদী সম্প্রদায়ের খেয়ালখুশির অধীন হয়ে উঠছে।
সম্প্রতি ২০২৬ সালের শুরুতে ভেনেজ়ুয়েলায় মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ বা ইরানের যুদ্ধ পরিস্থিতির মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ভূ-রাজনৈতিক বিষয়ে কিছু ওয়ালেট থেকে আগেভাগেই লক্ষ লক্ষ ডলারের নিখুঁত বাজি ধরা হয়েছিল। পরে তদন্তে দেখা যায়, মার্কিন সামরিক বাহিনীর এক সদস্য গোপন তথ্য ব্যবহার করে এই বাজি ধরেছিলেন। অর্থাৎ, বাস্তব জগতের বড় বড় বিপর্যয় এখন জুয়াড়িদের মুনাফার উৎসে পরিণত হয়েছে।
ছবি: সংগৃহীত ও এআই সহায়তায় প্রণীত।