কোনও ছবির বক্সঅফিসের ফলাফল নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করা যেমন প্রায় অসম্ভব, তেমনই অসম্ভব চলচ্চিত্রজগতের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের ভাগ্যনির্ধারণও। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ চেষ্টা, কঠোর পরিশ্রম এবং ভাগ্যের উপর ভর করে সিনেমাজগতে জায়গা করে নেন। কেউ আবার সারা জীবন চেষ্টা করেও তেমন নাম করতে পারেন না। তবে ব্যর্থতার পর ঘুরে দাঁড়ানোর নজিরও কম নেই বিনোদনের দুনিয়ায়।
তেমনই একটি নাম রনি স্ক্রুওয়ালা। প্রযোজনা সংস্থা ‘আরএসভিপি মুভিজ়’-সহ অনেকগুলি সংস্থার মালিক তিনি। প্রথম কয়েকটি ছবি পর পর ফ্লপ করার পরেও ভাগ্য ফিরেছিল তাঁর। এখন তিনি বলিউডের অন্যতম ধনী ব্যক্তিত্ব। ধারাবাহিক ব্যর্থতার পরেও যে ভাগ্য পরিবর্তনের ফলে কেউ সাফল্যের শীর্ষে উঠতে পারেন, তার অন্যতম নিদর্শন রনি।
রনি শুরু করেছিলেন প্রায় শূন্য থেকে। এখন প্রযোজক হিসাবে, ব্যবসায়ী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত। তাঁর সম্পত্তির পরিমাণও তাকলাগানো। রনির উত্থানের কাহিনি রূপকথার মতো।
মুম্বইয়ে কেব্ল টেলিভিশনের জনক বলা যায় রনিকে। ১৯৮১ সালে এক জন সাধারণ কেব্ল অপারেটর হিসাবে কাজ শুরু করেছিলেন রনি। তারও আগে ১৯৮০ সালে তিনি ‘লেজ়ার ব্রাশেস’ নামের একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। অল্প দিনের মধ্যেই সেটি দেশের সবচেয়ে বড় দাঁতের ব্রাশ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে।
পরের বছর তিনি কেব্ল পরিষেবা প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন। মুম্বইয়ের বহুতলের বেসমেন্টে ভিডিয়ো মেশিন বসানোর কাজ করত তাঁর সংস্থা।
নব্বইয়ের দশকে দূরদর্শন প্রযোজনা সংস্থা হিসাবে রনি ইউটিভি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তখন তাঁর সম্বল ছিল ৩৭,৫০০ টাকা।
আস্তে আস্তে প্রতিষ্ঠানের প্রচার-প্রসার হয়। তৈরি হয় ছবি প্রযোজনা এবং পরিবেশনা সংস্থা ‘ইউটিভি মোশন পিকচার্স’। তবে প্রযোজনা সংস্থা খুলেই ক্ষতির মুখে পড়েন রনি।
প্রযোজক হিসাবে ‘দিল কে ঝরোখে মেঁ’ (১৯৯৭) নামে একটি ছবির মাধ্যমে বলিউডে প্রবেশ করেন রনি। মনীষা কৈরালা, মামিক সিংহ এবং বিকাশ ভল্লা অভিনীত সেই ছবি বক্সঅফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে।
সিনেমাটি প্রসঙ্গে রনি এক বার বলেছিলেন, ‘‘ওই ছবি বিরাট ব্যর্থ। সিনেমার একটি দৃশ্যে গোখরোর দুধ পান করার দৃশ্য ছিল। সাধারণত গোখরো দুধ পান করে না, কিন্তু আমাদেরটা করত। তা দেখে পরিচালক বলেছিলেন যে, সিনেমাটি সুপারহিট হবে। চিন্তামুক্ত থাকতেও বলেন। কিন্তু সিনেমাটি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থ ছবি হয়ে ওঠে।’’
তবে ব্যর্থতা একটি ছবিতেই আটকে ছিল না। রনি প্রযোজিত পর পর পাঁচটি ছবি বক্সঅফিসে ফ্লপ করে। তবু হাল ছাড়েননি তিনি। রনির কথায়, ‘‘আমার জন্ম মধ্যবিত্ত পরিবারে। আমার কাছে কোনও ‘প্ল্যান বি’ ছিল না। এ-ও জানতাম যে আর্থিক সঙ্কটের মুখে বাবা আমাকে সাহায্য করতে পারবেন না। তবুও ঠিক করি, যা করছি তা-ই করব। আত্মবিশ্বাসের উপর ভর করে আমি আমার সংস্থা, ব্যবসা এবং ব্র্যান্ড তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।’’
রনি প্রযোজিত বেশ কয়েকটি ছবি ভাল গল্প এবং বড় তারকা থাকা সত্ত্বেও বক্সঅফিসে সে ভাবে লাভের মুখ দেখতে পায়নি। তার মধ্যে অন্যতম শাহরুখ খান অভিনীত ‘স্বদেশ’ এবং ঋত্বিক রোশন অভিনীত ‘লক্ষ্য’।
যদিও দু’টি ছবিই সমালোচকদের নজর কেড়েছিল। তবে ইউটিভি প্রযোজিত এবং আমির খান অভিনীত ‘রং দে বসন্তী’ ছবিটি বক্সঅফিসেও যেমন ভাল ফল করেছিল, তেমন সমালোচকদেরও প্রশংসা কুড়িয়েছিল।
রনি পরে জানিয়েছিলেন, ‘লক্ষ্য’, ‘স্বদেশ’ এবং ‘রং দে বসন্তী’র মধ্যে তিনটি ছবির চিত্রনাট্যই ভাল ছিল। কিন্তু কোনটি বক্সঅফিসে সাফল্যের মুখ দেখবে জানতেন না তিনি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, “মূলত আমরা অন্য রকম কাজ করতে চেয়েছিলাম। গল্পগুলিকে ভিন্ন ভাবে বলতে চেয়েছিলাম। তরুণ রক্ত চেয়েছিলাম। আমরা নতুন পরিচালকদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করি। অভিনেতা-অভিনেত্রীর থেকে চিত্রনাট্যকে অগ্রাধিকার দিতে চেয়েছিলাম।”
‘রং দে বসন্তী’র পর আর সে ভাবে ফিরে তাকাতে হয়নি রনিকে। অনেক জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবির পরিবেশক তাঁর সংস্থা। ‘রং দে বসন্তী’ এবং ‘স্বদেশ’ ছাড়াও ‘হায়দর’ ও ‘বরফি’র মতো প্রশংসিত ছবির পরিবেশনার দায়িত্বেও ছিল রনির সংস্থা।
২০১২ সালে ৩ হাজার ৭১২ কোটি টাকার বিনিময়ে ডিজ়নি রনির সংস্থাটি কিনে নেয়। নাম হয় ডিজ়নি ইউটিভি। তখন অবশ্য ২৩ শতাংশ শেয়ার ছিল রনির। ২০১৪ সালে তিনি বেরিয়ে আসেন প্রতিষ্ঠান থেকে।
২০১৪ সালে নতুন করে চলচ্চিত্র ব্যবসায় ফেরেন রনি। নতুন প্রযোজনা সংস্থা খোলেন। নাম দেন ‘আরএসভিপি মুভিজ়’। সমালোচকদের প্রশংসাধন্য ছবি ‘রাত অকেলি হ্যায়’, ‘মর্দ কো দর্দ নেহি হোতা’র মতো ছবির প্রযোজক তারা। ভিকি কৌশল অভিনীত সফল ছবি ‘উরি: দ্য সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ এবং ‘স্যাম বাহাদুর’ তৈরি হয়েছে এই সংস্থার ব্যানারেই।
রনি একটি শিক্ষামূলক সংস্থারও অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং চেয়ারপার্সন। আরও নানা ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করেছেন তিনি। একটি ক্রীড়ামূলক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মালিক তিনি। আর একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানও তৈরি করেছেন।
হুরুন ইন্ডিয়ার ‘রিচ লিস্ট ২০২৫’ অনুযায়ী, রনি বলিউডের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। মোট সম্পত্তির পরিমাণ ১৩,৩১৪ কোটি টাকা। সম্পত্তির নিরিখে বলিউডের বাদশা শাহরুখের স্থানও রনির পরে। একবিংশ শতাব্দীর প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তালিকায় ৭৫ জনের মধ্যেও নাম আছে রনির। তাঁর মুকুটে নিত্য যুক্ত হচ্ছে সাফল্যের নতুন নতুন পালক।
সব ছবি: সংগৃহীত।