ইরান থেকে লেবানন। গাজ়া হোক বা ইউক্রেন যুদ্ধ। ২১ শতকের লড়াইয়ে রণাঙ্গনে যাবতীয় হিসাব মুহূর্তে বদলে দিচ্ছে লড়াকু জেট আর বোমারু বিমান। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, আকাশপথে সংঘর্ষের বিশেষ এই ব্রহ্মাস্ত্রের নির্মাণকৌশল আয়ত্ত করেছে হাতেগোনা কয়েকটি দেশ। সেই তালিকায় নাম আছে ফ্রান্সের। অত্যাধুনিক লড়াকু জেটের নকশা থেকে উৎপাদন, সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে পুরোটাই ঘরের মাটিতে করে থাকে প্যারিস প্রশাসন।
উদাহরণ হিসাবে রাফাল যুদ্ধবিমানের কথা বলা যেতে পারে। সাড়ে চার প্রজন্মের ফরাসি এই লড়াকু জেটের নির্মাণকারী সংস্থা হল দাঁসো অ্যাভিয়েশন। গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সাল) শেষে ভারত, মিশর, কাতার, গ্রিস, ক্রোয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, সার্বিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া মিলিয়ে মোট ৫৩৩টি যুদ্ধবিমানের বরাত পায় তারা। যদিও এই রফতানি বাণিজ্যে প্রযুক্তি হস্তান্তরে একেবারেই রাজি হয়নি ফ্রান্স। ফলে রাফালের থেকে মুখ ফিরিয়েছেন ক্রেতাদের একাংশ।
সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, প্রযুক্তি হস্তান্তরের ব্যাপারে এ-হেন ‘নাছোড়বান্দা’ মনোভাব প্যারিসের বিপদে কারণ হতে পারে। কারণ, একক ক্ষমতায় লড়াকু জেটের আরও উন্নত সংস্করণ তৈরির গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার মতো পকেটের জোর আজকের ফ্রান্সের নেই। তা ছাড়া কৃত্রিম মেধা বা এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) চলে আসার পর প্রযুক্তির দুনিয়ায় একরকম বিপ্লব ঘটে গিয়েছে বলা চলে। আর তাই অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান নির্মাণে ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রগুলির সহায়তা অস্বীকার করে এগিয়ে যাওয়া প্যারিসের পক্ষে অসম্ভব।
কিন্তু, লড়াকু জেটের ক্ষেত্রে এই বাস্তব পরিস্থিতি অস্বীকার করছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ। রাফালের প্রযুক্তি ভাগাভাগিতে আপত্তি জানানোয় আমিরশাহির সঙ্গে তাঁর ‘বন্ধুত্ব’ বর্তমানে সরু সুতোয় ঝুলে আছে বললে অত্যুক্তি হবে না। শুধু তা-ই নয়, যুদ্ধবিমান নিয়ে প্যারিসের শরীরী ভাষায় বিরক্ত জার্মানিও। ভারতীয় বিমানবাহিনীর পক্ষেও ইউরোপীয় রাষ্ট্রটিকে বিশ্বাস করা বেশ কঠিন হয়ে উঠছে।
২০২১ সালে ফ্রান্সের সঙ্গে ১,৯২০ কোটি ডলারের লড়াকু জেটের চুক্তি করে আমিরশাহি। ঠিক হয়, আরব রাষ্ট্রটিকে ৮০টি রাফাল ‘এফ৪’ শ্রেণির যুদ্ধবিমান এবং ১২টি সামরিক হেলিকপ্টার সরবরাহ করবে মাক্রোঁ প্রশাসন। ওই সময় দাঁসোর জন্য সেটাই ছিল সবচেয়ে বড় রফতানির বরাত। গত বছরের (২০২৫ সাল) জানুয়ারিতে রাফালের ‘এফ৪’ শ্রেণিকে প্রথম বার প্রকাশ্যে আনে ফরাসি বিমানবাহিনী। এ বছরের শেষে দিকে তা আবু ধাবির বায়ুসেনা হাতে পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
রাফালের ‘এম৪’ সংস্করণ তৈরি করে চুপ করে বসে নেই ফ্রান্স। লড়াকু জেটটির আরও উন্নত ভ্যারিয়েন্ট ‘এম৫’ তৈরিতে কোমর বেঁধে লেগে পড়েছেন ফরাসি প্রতিরক্ষা বিজ্ঞানীরা। তাতে নতুন ধরনের সেন্সর, ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমা, স্টেলথ প্রযুক্তি এবং পাইলটের জন্য অত্যাধুনিক সুরক্ষাবলয় থাকবে বলে জানা গিয়েছে। গোড়ার দিকে সংশ্লিষ্ট গবেষণায় টাকা ঢালতে রাজি হয় আমিরশাহি। ফলে ৫০০ কোটির এই প্রকল্পে ৩৫০ কোটি আবু ধাবির থেকে পাওয়ার কথা ছিল ফ্রান্সের।
চলতি বছরের শুরুতে রাফাল ‘এম৫’-এর ব্যাপারে আমিরশাহির প্রেসিডেন্ট মহম্মদ বিন জ়ায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেন মাক্রোঁ। কিন্তু, সেখানেই ভেস্তে যায় তাঁর যাবতীয় পরিকল্পনা। সূত্রের খবর, ফরাসিদের কাছে অপট্রনিক্স, অর্থাৎ আলো শনাক্ত এবং নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তি চেয়েছিল সংশ্লিষ্ট আরব রাষ্ট্র। এতে পত্রপাঠ ‘না’ বলে দেয় প্যারিস। ফলে রাফালের উন্নত সংস্করণ ‘এম৫’-এর জন্য ব্যয়বরাদ্দের থেকে পিছিয়ে এসেছে আমিরশাহি প্রশাসন।
ফরাসি গণমাধ্যম লা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আবু ধাবি সরে যাওয়ায় রাফালের উন্নত সংস্করণ ‘এম৫’ নির্মাণপ্রক্রিয়া বেশ ধাক্কা খেয়েছে। বর্তমানে পুরোটাই নিজস্ব উদ্যোগে করতে হবে দাসোঁকে। প্যারিসের সংস্থাটির অবশ্য আশা, সংশ্লিষ্ট প্রকল্পটির জন্য নতুন করে বিপুল অর্থ বরাদ্দ করবেন প্রেসিডেন্ট মাক্রোঁ। যদিও সেখানকার প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের থেকে এখনও সেই ইঙ্গিত মেলেনি।
অন্য দিকে ভারতীয় বিমানবাহিনীর বহরেও রয়েছে ৩৬টি রাফাল লড়াকু জেট। ২০১৬ সালে সেপ্টেম্বরে হওয়া চুক্তির নিরিখে দাসোঁর যুদ্ধবিমানগুলি হাতে পেয়েছে নয়াদিল্লি। পরবর্তী সময়ে বিমানবাহী রণতরীর জন্য আরও ২৬টি রাফাল-মেরিনের বরাত দেয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। এ ছাড়া চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বায়ুসেনার জন্য আরও ১১৪টি রাফাল কেনার প্রস্তাবে সবুজ সঙ্কেত দিয়েছে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার।
এ দেশের ঐতিহ্যশালী শিল্পগোষ্ঠী টাটার সঙ্গে ইতিমধ্যেই একটি চুক্তি করেছে দাসোঁ। সেই সমঝোতা অনুযায়ী, বছরে ২৫টি রাফাল জেটের কাঠামো এ দেশের মাটিতে তৈরি করবে ওই ফরাসি প্রতিরক্ষা সংস্থা। আগামী দিনে ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ প্রকল্পের আওতায় আরও বেশি যুদ্ধবিমান তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। তা ছাড়া ভারতে রাফালের রক্ষণাবেক্ষণ এবং মেরামতি কেন্দ্র তৈরিতেও আপত্তি দেখাচ্ছে না তারা।
কিন্তু, এ ব্যাপারে দু’টি জায়গায় সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, জেট ইঞ্জিনের প্রযুক্তি, যা কোনও ভাবেই হস্তান্তর করতে রাজি নয় ফ্রান্স। দ্বিতীয়ত, ভারতকে রাফাল জেটের মৌলিক সোর্স কোড দিতে অস্বীকার করেছে মাক্রোঁ প্রশাসন। সম্প্রতি এ কথা জানিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে প্যারিসের গণমাধ্যম ‘ল’এসেনশিয়েল দে লইকো’। অর্থাৎ, কখনওই সংশ্লিষ্ট যুদ্ধবিমানে ঘরের মাটিতে তৈরি কোনও হাতিয়ার ব্যবহার করতে পারবে না নয়াদিল্লি।
সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, রাফাল ব্যবহারের ক্ষেত্রে কখনওই জেটটির থ্যালেস আরবিই২ এইএসএ রেডার, মডিউলার ডেটা প্রসেসিং ইউনিট এবং স্পেকট্রা ইলেকট্রিক ওয়ারফেরা স্যুটের সোর্স কোড পাবে না ভারতীয় বিমানবাহিনী। এর মধ্যে প্রথম দু’টিকে দাসোঁর যুদ্ধবিমানটির মস্তিষ্ক বলা যেতে পারে। শেষেরটিও আকাশের লড়াইয়ে নিমেষে ‘খেলা ঘোরানো’র জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
বিষয়টি নিয়ে দ্য ইউরেশিয়ান টাইমসের কাছে মুখ খুলেছেন বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত অফিসার স্কোয়াড্রন লিডার বিজয়েন্দর কে ঠাকুর। তাঁর কথায়, ‘‘রাফালের মতো জেটের ৩০-৪০ শতাংশ পুরোপুরি ভাবে সফ্টঅয়্যার নির্ভর। সোর্স কোড হাতে না পাওয়ার অর্থ হল যুদ্ধবিমানটির ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যবহার করা যাবে। অথচ দাম ১০০ শতাংশই মিটিয়ে দেওয়া হচ্ছে। জটিল পরিস্থিতিতে এটা আমাদের জন্য সমস্যার হতে পারে।’’
এ বছরের মার্চে ষষ্ঠ প্রজন্মের লড়াকু জেট নিয়ে কেন্দ্রের মোদী সরকারকে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করে প্রতিরক্ষা বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। বর্তমানে ওই যুদ্ধবিমান নিয়ে গবেষণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে দু’টি ইউরোপীয় কনসোর্টিয়াম। একটির নাম ‘গ্লোবাল কমব্যাট এয়ার প্রোগ্রাম’ বা জিক্যাপ। এতে আছে ব্রিটেন, ইটালি এবং জাপান। অন্যটি ‘ফিউচার কমব্যাট এয়ার সিস্টেম’ বা এফসিএএস নামে পরিচিত। সেখানে কাজ করছেন ফ্রান্স, জার্মানি এবং স্পেন।
প্রতিরক্ষা বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশে বলা হয়েছে, অবিলম্বে এই দুইয়ের মধ্যে যে কোনও একটিতে ঢুকে পড়ুক ভারতীয় বিমানবাহিনী। তা হলে ষষ্ঠ প্রজন্মের লড়াকু জেটের নকশা এবং রণকৌশলের প্রযুক্তি অনায়াসেই হাতে পাবে তারা। তা আগামী দিনে চিন বা পাকিস্তানের মতো শত্রুর মোকাবিলায় নয়াদিল্লিকে যে কয়েক যোজন এগিয়ে দেবে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। সূত্রের খবর, খুব দ্রুত ‘ফিউচার কমব্যাট এয়ার সিস্টেম’-এর অংশ হতে পারেন এখানকার বায়ুসেনার ইঞ্জিনিয়ারেরা।
কিন্তু, এফসিএএস কনসোর্টিয়ামের অংশ হওয়া কতটা লাভজনক, তা নিয়ে সাবেক সেনাকর্তাদের মনে বেশ ধন্দ রয়েছে। তাঁদের যুক্তি, জটিল প্রযুক্তি কোনও ভাবেই হস্তান্তর করতে রাজি নয় দাসোঁ। ফলে বিরক্ত হয়ে এ ব্যাপারে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না জার্মানি। স্পেনের অবস্থাও তথৈবচ। যদিও প্রেসিডেন্ট মাক্রোঁর দাবি, সমাধানসূত্র বার করার চেষ্টা চলছে। খুব দ্রুত ষষ্ঠ প্রজন্মের লড়াকু জেট তৈরির গবেষণা শুরু করবেন তাঁরা।
ফ্রান্সের দিক থেকে অবশ্য প্রযুক্তি হস্তান্তর না করার নেপথ্যে একাধিক যুক্তিও রয়েছে। তাদের অভিযোগ, গোপনে জিক্যাপ প্রকল্পটির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে জার্মানি। তা ছাড়া অস্ত্র রফতারিকারী দেশ হিসাবে ধীরে ধীরে উঠে আসছে ভারতও। ফলে প্রযুক্তিকে আঁকড়ে রেখে নিজেদের বাজার ধরে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট মাক্রোঁ।
সুইডিশ থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘স্টকহলোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ বা সিপ্রি জানিয়েছে, বর্তমানে হাতিয়ার রফতানির নিরিখে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ হল ফ্রান্স। আন্তর্জাতিক অস্ত্রবাজারের প্রায় ১০ শতাংশ রয়েছে তাদের দখলে। সেখানে প্যারিসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পণ্য হল রাফাল। কিন্তু, ২১ শতকে আকাশযুদ্ধের যাবতীয় অঙ্ককে পাল্টে দিচ্ছে ড্রোন। যে প্রযুক্তি আঁকড়ে থেকে ‘বন্ধু’দের সাহায্য না নেওয়ার খেসারিত দিতে হবে ‘নেপোলিয়ানের দেশ’কে? উত্তর দেবে ভবিষ্যৎ।
সব ছবি: সংগৃহীত।