নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ভারতীয় টেলিভিশনের প্রথম সারির অভিনেত্রী। বলিউডের অনেকেই তাঁকে অভিনেত্রী মাধুরী দীক্ষিতের হুবহু মনে করতেন। কিন্তু বড়পর্দায় তেমন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পৌঁছোতে না পারলেও টেলি অভিনেত্রী হিসাবে দর্শকের মনে এখনও রয়ে গিয়েছেন নিকি আনেজা ওয়ালিয়া।
১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বরে মহারাষ্ট্রের মুম্বইয়ে জন্ম নিকির। সেখান থেকেই স্কুল-কলেজের পড়াশোনা শেষ করেছেন তিনি। পাইলট হওয়ার স্বপ্ন ছিল তাঁর। হিউস্টন থেকে বিমানচালনা বিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করতে চেয়েছিলেন নিকি। কিন্তু বিদেশে পড়াশোনার খরচ বহন করার মতো সামর্থ্য ছিল না নিকির বাবার।
নিজে টাকা জমিয়ে বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন নিকি। কিন্তু কম সময়ে এত টাকা তিনি জোগাড় করবেন কী ভাবে! নিকিকে বুদ্ধি বাতলে দিয়েছিলেন তাঁর তুতো ভাই পরমীত শেট্টি। মডেলিং করে যে প্রচুর উপার্জন করা যায়, নিকিকে সেই বুদ্ধিই দিয়েছিলেন পরমীত।
পরমীতের কথা মতো ফোটোশুট করে নিজের পোর্টফোলিয়ো তৈরি করেছিলেন নিকি। ছবি তোলার সময় পরমীতের স্ত্রী অর্চনা পূরণ সিংহের কাছে পোশাক ধার করতে হয়েছিল তাঁকে। পরমীতের পরামর্শ মেনে হাতেনাতে ফল পেয়েছিলেন নিকি।
নিকির প্রতি নজর পড়েছিল খ্যাতনামী রূপটানশিল্পী মিকি কন্ট্রাক্টরের। নিকির মুখের গড়নের সঙ্গে যে মাধুরীর মিল রয়েছে, তা উল্লেখ করেছিলেন মিকি। সেই দৌলতেই একের পর এক বিজ্ঞাপনে মডেলিং করার সুযোগ পেতে শুরু করেন নিকি।
মডেলিংজগতে কম সময়ের মধ্যেই পরিচিতি গড়ে তোলেন নিকি। ১৯৯১ সালে নামকরা সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে দ্বিতীয় স্থানের অধিকারী হয়েছিলেন তিনি। ঐশ্বর্যা রাই বচ্চন এবং সুস্মিতা সেন ১৯৯৪ সালে যে সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছিলেন, সেই প্রতিযোগিতার বিচারকের আসনে দেখা গিয়েছিল নিকিকে।
রাতারাতি বড়পর্দায় অভিনয়ের সুযোগও পেয়ে যান নিকি। পাইলট হওয়ার স্বপ্ন ভুলে গিয়ে অভিনয় নিয়ে কেরিয়ার গড়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। বলি প্রযোজক পাহলাজ নিহালানি মারফত ‘মিস্টার আজাদ’ ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব পান নিকি। ১৯৯৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই ছবিতে অনিল কপূরের সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন তিনি।
বেশ কয়েকটি মিউজ়িক ভিডিয়োতেও অভিনয় করেন নিকি। মাত্র ১৯ বছর বয়সে বলিপাড়ায় পা দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আলোর রোশনাইয়ের অন্ধকার দিকের সঙ্গেও পরিচিত হতে শুরু করেন তিনি। সে কারণেই বলিউড থেকে বাধ্য হয়ে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন নিকি।
নিকির অভিযোগ, প্রযোজক পাহলাজ বার বার তাঁকে ফিল্ম ডিস্ট্রিবিউটরদের সঙ্গে মাঝরাতে পার্টিতে যেতে বলতেন। নিকি এই প্রস্তাবে কখনওই রাজি হননি। তা নিয়ে প্রযোজকের সঙ্গে অশান্তিও হয় তাঁর। কারণ জিজ্ঞাসা করে প্রযোজক নাকি তাঁকে পাল্টা প্রশ্ন করেছিলেন, ‘‘নিজের ছবি বিক্রি করার ইচ্ছা নেই নাকি তোমার?’’
নিকির দাবি, শাহরুখ খান অভিনীত ‘ইয়েস বস্’ ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। পাঁচ দিন শুটিংও করে ফেলেছিলেন। কিন্তু শুটিং চলাকালীন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছিল অভিনেত্রীর। বাবার মৃত্যুর খবর জানতে পারেন নিকি। তাঁর পরিবার যে ঋণের বোঝায় ডুবে যাচ্ছিল তাতে মানসিক ভাবে আরও ভেঙে পড়েন তিনি।
কঠিন সময়ে পরিবারের পাশে থাকবেন বলে ‘ইয়েস বস্’ ছবি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন নিকি। অগ্রিম হিসাবে যে দেড় লক্ষ টাকা নিয়েছিলেন, তা-ও ছবিনির্মাতাদের ফিরিয়ে দেন তিনি। পরে উপার্জনের জন্য ছোটপর্দার দিকে ঝুঁকে পড়েন নিকি।
১৯৯৫ সালে টেলিভিশনের ধারাবাহিকে প্রথম অভিনয় নিকির। ‘বাত বন জায়ে’, ‘আখির কৌন’, ‘দস্তান’, ‘অন্দাজ’, ‘সি হকস’, ‘সমানদার’, ‘ঘরওয়ালি উপরওয়ালি’-সহ বিভিন্ন ধারাবাহিকে অভিনয় করেন তিনি। চার বছর ধরে একটি ধারাবাহিকে অভিনয় করেও তার প্রাপ্য মর্যাদা পাননি তিনি।
চ্যানেল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে নিকির অভিযোগ, আরও একটু গুরুত্ব দিলে ধারাবাহিকটির জনপ্রিয়তা আরও অনেক দূর পৌঁছোত। বিষয়বস্তুর দিক দিয়ে ‘কিঁউকি সাস ভি কভি বহু থি’ বা ‘জসসি জ্যায়সি কোই নহিঁ’-র মতো প্রবল জনপ্রিয় ধারাবাহিকের থেকে তাঁর ধারাবাহিক অনেক এগিয়ে ছিল। একমাত্র চ্যানেল কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে তাঁর ধারাবাহিক পিছনে পড়ে ছিল বলে নিকির দাবি।
২০০২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত ভারতীয় ব্যবসায়ী সোনি ওয়ালিয়াকে বিয়ে করেন তিনি। বিয়ের পর ব্রিটেনে পাড়ি দেন তিনি। যমজ সন্তানের জন্ম দেন নিকি। সংসার সামলে অনায়াস দক্ষতায় কেরিয়ার এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন তিনি।
শোনা যায়, একটি ধারাবাহিকের শুটিং চলাকালীন গাড়ির ধাক্কায় গুরুতর আহত হয়ে পড়েছিলেন নিকি। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চিকিৎসারত অবস্থায় ছিলেন তিনি। সেই সময় তিনি যে ধারাবাহিকগুলিতে অভিনয় করেছিলেন, সমস্ত কাজ মাঝপথে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
নিকি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘‘হাসপাতালে ভর্তি থাকার সময় আমি দেখতে পাচ্ছিলাম, মাঝরাতে আমার পাশে শাহরুখ খান বসে রয়েছেন। প্রথমে ভেবেছিলাম, চোখের ভুল। তার পর দেখলাম, শাহরুখ সত্যি সত্যিই এসেছেন।’’
শাহরুখের কাছেই নাকি নিজের দুর্ঘটনার সম্পর্কে বিস্তারে জানতে পেরেছিলেন নিকি। তাঁকে একটি লাল গাড়ি ধাক্কা মেরেছে শুনে শাহরুখ বলেছিলেন, ‘‘ফিল্ম সিটির কাছে লাল গাড়িটিকে আমিও দেখেছিলাম। যিনি গাড়িটি চালাচ্ছিলেন, তিনি সদ্য গা়ড়ি চালানো শিখছেন।’’ নিকিকে প্রযোজনা সংস্থার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ করতে বলেছিলেন শাহরুখ। সেই পরামর্শ মেনে নিকি পদক্ষেপও করেছিলেন। পরে প্রযোজনা সংস্থার তরফে নিকির চিকিৎসার যাবতীয় খরচ মেটানো হয়।
দীর্ঘ সময় বড়পর্দায় দেখা পাওয়া যায়নি নিকির। ২১ বছর পর আবার হিন্দি ছবিতে অভিনয় করা শুরু করেন তিনি। বড়পর্দার চেয়ে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে বেশি সক্রিয় হয়ে পড়েন নিকি। ‘শানদার’, ‘গিল্টি’, ‘তারা ভার্সেস বিলাল’, ‘ডবল এক্সএল’-এর মতো একাধিক ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। বর্তমানে স্বামী এবং দুই সন্তানের ভরপুর সংসার নিয়ে লন্ডনে রয়েছেন মাধুরীর হুবহু।
সব ছবি: সংগৃহীত।