কেরিয়ারের গোড়াতেই একনিষ্ঠ তরুণী ভক্তকে মন দিয়ে ফেলেছিলেন। তিন বছরের প্রেমের পর তাঁর সঙ্গেই সংসার বেঁধেছিলেন তামিল ইন্ডাস্ট্রির ‘থলপতি’। কিন্তু ২৭ বছরের সংসারে ভাঙন ধরল। জনপ্রিয় তামিল অভিনেতা বিজয় থলপতির বিরুদ্ধে তাঁর জীবনসঙ্গিনীর অভিযোগ, অভিনেতা-রাজনীতিক স্বামী অন্য নায়িকার সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছেন। আইনি বিচ্ছেদের আবেদনও করেছেন তিনি।
তিন দশকের কেরিয়ারে মোট ৬৯টি ছবিতে অভিনয় করে ভারতের সর্বোচ্চ উপার্জনকারী অভিনেতাদের তালিকায় নাম লিখিয়ে ফেলেছেন তামিল অভিনেতা বিজয় থলপতি। তাঁর আসল নাম অবশ্য জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর। ১৯৮৪ সালে ‘ভেত্রি’ নামের তামিল ভাষার ছবিতে শিশু অভিনেতা হিসাবে তাঁর যাত্রা শুরু।
বিজয়ের বাবা দক্ষিণী ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক ছিলেন। সেই সূত্রে বেশ কয়েকটি দক্ষিণী ছবিতে শিশু অভিনেতা হিসাবে অভিনয় করার সুযোগ পান বিজয়। ১৯৯২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘নালাইয়া থিরপু’ ছবির মাধ্যমে প্রথম মুখ্যচরিত্রে অভিনয়। তখন বিজয়ের বয়স মাত্র ১৮ বছর।
কয়েক বছরের মধ্যেই উঠতি তারকা হিসাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন বিজয়। ১৯৯৬ সালে ‘পুভে উনাক্কাগা’ ছবিটি বক্সঅফিস কাঁপিয়ে তোলে। জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর তখন হয়ে ওঠেন ‘ইলয়থলপতি’। বাংলায় যার অর্থ ‘তরুণ সেনাপতি’। দক্ষিণী দর্শকের অধিকাংশ আবার বিজয়কে দক্ষিণের সুপারস্টার রজনীকান্তের পরেই স্থান দিয়ে ফেলেছিলেন। ২০১৭ সালে ‘মেরসাল’ ছবিটির মুক্তির পর থেকে তিনি আনুষ্ঠানিক ভাবে কেবল ‘থলপতি’ হিসাবে পরিচিতি পান। বিজয়কে এই জনপ্রিয়তা ছোঁয়ার আগেই তাঁর জীবনে এসেছিলেন তাঁর স্ত্রী সঙ্গীতা সোরনালিগম।
শ্রীলঙ্কার তামিল পরিবারের কন্যা সঙ্গীতা। তাঁর বাবা পেশায় শিল্পপতি। সঙ্গীতার বেড়ে ওঠা লন্ডনে। তবে বিদেশে থাকলেও দক্ষিণী ছবি নিয়মিত দেখতেন তিনি। বিজয় তখন উঠতি তারকা। সঙ্গীতা প্রথম থেকেই বিজয়ের অভিনয়ের একনিষ্ঠ অনুরাগী। ‘পুভে উনাক্কাগা’ ছবির সাফল্যের পর আর নিজেকে আটকাতে পারেননি সঙ্গীতা। বিজয়ের সঙ্গে দেখা করতে সুদূর লন্ডন থেকে চেন্নাইয়ে পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি।
১৯৯৬ সালে বিজয়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন সঙ্গীতা। তখন বিজয় চেন্নাইয়ের এক ফিল্ম স্টুডিয়োয় শুটিংয়ের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। সেই সেটেই পৌঁছে গিয়েছিলেন সঙ্গীতা। বিজয়কে দেখে তাঁর অভিনয়ের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছিলেন তিনি। প্রথম দেখায় তরুণী ভক্তের সরলতার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন বিজয়। মনে মনে স্থির করে ফেলেছিলেন, সঙ্গীতাকেই বিয়ে করবেন।
সেট থেকে সঙ্গীতাকে নিয়ে সোজা বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করাতে নিয়ে গিয়েছিলেন বিজয়। সঙ্গীতাকে দেখামাত্রই অভিনেতার পরিবারেরও তাঁকে পছন্দ হয়ে যায়। বিজয়ের পরিবারের তরফ থেকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়। সঙ্গীতার পরিবারেরও কোনও আপত্তি ছিল না। তিন বছর সম্পর্কে থাকার পর বিয়ে করেন বিজয় এবং সঙ্গীতা।
১৯৯৯ সালের অগস্টে সঙ্গীতাকে বিয়ে করেন বিজয়। চেন্নাইয়ে আড়ম্বরপূর্ণ ভাবে তাঁদের বিয়ের অনুষ্ঠান হয়। বিয়ের এক বছরের মাথায় পুত্রসন্তানের জন্ম দেন সঙ্গীতা। ২০০৫ সালে সঙ্গীতার কোল আলো করে আসে তাঁদের কন্যাসন্তান।
স্বামী এবং দুই সন্তানের সংসার নিয়ে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছিলেন সঙ্গীতা। তবে, বিজয়ের কোনও ছবির প্রচারানুষ্ঠান থেকে শুরু করে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তারকার সর্ব ক্ষণের সঙ্গী হয়ে থাকতেন তিনি। কিন্তু বিগত কয়েক বছর বেশ কিছু অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত ছিলেন সঙ্গীতা। এমনকি, বিজয়ের পারিবারিক অনুষ্ঠানেও দেখা যেত না তাঁকে।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আনুষ্ঠানিক ভাবে রাজনীতিতে যোগ দেন বিজয়। নিজের দল ‘তামিলাগা ভেটরি কাজ়াগম’ (টিভিকে) প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। আসন্ন তামিলনাড়ু নির্বাচনেও দাঁড়াবেন তিনি। রাজনীতির মাঠে নামার পর সঙ্গীতা এবং বিজয়ের বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে মাঝেমধ্যেই কানাঘুষো শোনা যেত। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সঙ্গীতার অনুপস্থিতিই সেই কানাঘুষো জোরালো হওয়ার কারণ। গুঞ্জন শোনা যেত, সন্তানদের পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে অধিকাংশ সময় লন্ডনে থাকতেন সঙ্গীতা।
দীর্ঘ ২৭ বছরের সংসারের পর চেন্নাইয়ের চেঙ্গলপাট্টুর পরিবার আদালতে আইনি বিচ্ছেদের আবেদন জানিয়েছেন সঙ্গীতা। তাঁর অভিযোগ, ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে এক সহ-অভিনেত্রীর সঙ্গে বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছেন বিজয়। যদিও সেই নায়িকার নাম উল্লেখ করেননি তিনি। তবে সঙ্গীতার দাবি, এই সম্পর্কের কারণে তিনি মানসিক যন্ত্রণা এবং বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েছেন। তার প্রভাব পড়েছে দুই সন্তানের উপরেও।
বিচ্ছেদের পাশাপাশি স্থায়ী খোরপোশ, তাঁদের বৈবাহিক আবাসে থাকার অধিকার এবং গোপনীয়তা রক্ষার জন্য রুদ্ধদ্বার বিচার প্রক্রিয়ার আবেদন জানিয়েছেন সঙ্গীতা। এখনও পর্যন্ত বিজয় বা তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি।
জনশ্রুতি, দক্ষিণী নায়িকা তৃষা কৃষ্ণনের সঙ্গেই নাকি বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কে রয়েছেন বিজয়। ২০০৪ সালে ‘গিল্লি’ ছবির মাধ্যমে তাঁদের রসায়ন দর্শকের মন জয় করে। এর পর তাঁরা ‘থিরুপাচি’, ‘আথি’ এবং ‘কুরুভি’-র মতো একাধিক ছবিতে একসঙ্গে কাজ করেন।
বিজয় এবং তৃষার সম্পর্ক নিয়ে গুঞ্জন বহু দিনের। ২০০৮ সালের পর একসঙ্গে কোনও ছবিতে অভিনয় করা বন্ধ করে দেন তাঁরা। কারণ, তাঁদের রসায়ন ছায়া ফেলেছিল বিজয়ের সংসারে। তৃষার সঙ্গে ছবি না করার শর্ত চাপিয়েছিল অভিনেতার পরিবার। সেই সময় তাঁরা ঘোষণাও করেন, সবটাই রটনা। তাঁরা শুধুমাত্রই বন্ধু। দীর্ঘ ১৪ বছরের বিরতির পর ২০২৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘লিও’ ছবিতে তাঁদের আবার স্বামী-স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যায়।
২০২৪ সাল থেকে একাধিক বার বিজয় এবং তৃষাকে পর্দার বাইরেও আবিষ্কার করেছেন ছবিশিকারিরা। কখনও বিমানবন্দরে, কখনও আবার বিজয়ের বাড়িতে। কখনও আবার একই অনুষ্ঠানে তাঁরা আলাদা ভাবে উপস্থিত হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু দুই তারকার পোশাকে ধরা পড়ত রংমিলান্তি! কানাঘুষো শোনা যায়, বিজয় এবং তৃষা একান্তে সময় কাটাতে নরওয়েও ঘুরতে গিয়েছিলেন। অনুমান, তৃষার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাই বিজয়-সঙ্গীতার বিবাহবিচ্ছেদের কারণ।
তৃষাই প্রথম নন, বিজয়ের সঙ্গে নাম জড়িয়েছিল দক্ষিণী ইন্ডাস্ট্রির অন্য এক অভিনেত্রীরও। ‘ভৈরব’ এবং ‘সরকার’ ছবিতে বিজয়ের সঙ্গে কীর্তি সুরেশের রসায়ন দর্শকের মনে ধরেছিল। তার পর থেকে দুই তারকার সম্পর্ক নিয়ে জলঘোলা শুরু হয়। কানাঘুষো শোনা যেতে থাকে যে, কীর্তির সঙ্গে একান্তে সময় কাটাচ্ছেন বিজয়। কারও দাবি, কীর্তির কেরিয়ার গঠনে সাহায্য করছেন অভিনেতা। কিন্তু এই সব রটনাকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছিলেন বিজয়ের নায়িকা। বিজয়কে যে তিনি ‘দাদা’র মতো দেখেন, তা-ও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে কীর্তির বিয়ের অনুষ্ঠানে অতিথি হিসাবে উপস্থিতও ছিলেন বিজয়।
আগামী ২০ এপ্রিল বিজয় এবং সঙ্গীতার বিবাহবিচ্ছেদের মামলার পরবর্তী শুনানি। আদালতের তরফে বিজয়কে ব্যক্তিগত ভাবে হাজিরা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নায়কের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ইতিমধ্যেই কাঁটাছেড়া শুরু হয়ে গিয়েছে। বর্তমানে বিজয় তাঁর সাম্প্রতিক ছবি ‘জন নায়গন’ এবং তাঁর রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী প্রচারণা নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন। তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে এই ব্যক্তিগত সঙ্কট ‘থলপতি’র রাজনৈতিক জীবনে কতখানি প্রভাব পড়বে সেটাই দেখার।
সব ছবি: সংগৃহীত।