গত সেপ্টেম্বরে তরুণ প্রজন্মের (জেন জ়ি) বিক্ষোভের জেরে নেপালে পতন হয়েছিল কেপি শর্মা ওলির সরকারের। অস্থির সময়ে বিক্ষোভ, অবস্থান, প্রতিবাদের আবহে নেপালি জনগণের মুখ হয়ে উঠছেন বলেন্দ্র শাহ বা বলেন্দ্র। ৫ মার্চ নেপালের সাধারণ নির্বাচন হওয়ার পর গণনা চলছে।
প্রাথমিক গণনার পর ফলাফলের ছবি কিছুটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জেন জ়ির পছন্দের দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) বেশ কিছুটা এগিয়ে রয়েছে। দলের প্রধান, কাঠমান্ডুর প্রাক্তন মেয়র বলেন্দ্র শাহ ছ’হাজারেরও বেশি ভোটে এগিয়ে রয়েছেন। তিনি ঝাপা-৫ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
ওই একই কেন্দ্র থেকে লড়ছেন নেপালের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী তথা কমিউনিস্ট পার্টি অফ নেপাল-এর (ইউএমএল) প্রধান ওলি। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন তিনি। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বলেন্দ্রের নেতৃত্বাধীন নবীন বাহিনীই এগিয়ে রয়েছে। তাঁর দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি ২০২২ সালের সাধারণ নির্বাচনে চতুর্থ স্থানে ছিল।
প্রত্যক্ষ নির্বাচন হওয়া ১৬৫টি আসনের মধ্যে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি ৭৩টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ওলির সিপিএন (ইউএমএল) মাত্র ৬টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। অন্য দিকে, নেপালি কংগ্রেস ৮টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। প্রাথমিক গণনার পর দেখা যাচ্ছে, পুরনো কিংবা পরিচিত দলগুলির উপরে নয়, নেপাল আস্থা রাখছে তুলনায় নতুন দল এবং নতুন নেতার উপরেই।
গণনার পূর্বাভাস বলছে, নেপালের জেন জ়ি-র বড় অংশই পছন্দ করছেন প্রাক্তন র্যাপার তথা রাজধানী কাঠমান্ডুর প্রাক্তন মেয়র বলেন্দ্র ও তাঁর দলকে। ৩৫ বছর বয়সি বলেন্দ্র নির্বাচনে তরুণ তুর্কিদের মুখ হয়ে ওঠেন। বলেন্দ্রের প্রাক্-নির্বাচনী সমাবেশে বিপুল জনসমাগম ঘটেছিল, যাঁদের বেশির ভাগই ছিলেন তরুণ ভোটার।
২০১৩ সাল পর্যন্ত নেপালের রাজনীতিতে খুব একটা পরিচিত ও প্রভাবশালী মুখ ছিলেন না বলেন্দ্র। পরে তিনি রাতারাতি ‘র্যাপ সেনসেশন’ হয়ে ওঠেন। হঠাৎ করেই তরুণদের মধ্যে তাঁকে নিয়ে উন্মাদনা তৈরি হয়। ২০২২ সালে বলেন্দ্র কাঠমান্ডুর মেয়র পদে নির্দল প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সকলকে অবাক করে দিয়েছিলেন।
পেশায় ইঞ্জিনিয়ার বলেন্দ্রের রাজনৈতিক উত্থান উল্কার গতিতে। ২০২২ সালে নির্দল প্রার্থী হিসাবে রাজনীতির ময়দানে পা রাখেন বলেন্দ্র। মেয়র নির্বাচনে শাসকদলের বাঘা বাঘা প্রার্থীকে হারিয়ে নির্দল প্রার্থী হিসাবে লড়াই করে জয় ছিনিয়ে নেন।
বলেন্দ্র কাঠমান্ডুর ১৫তম মেয়রপদে জয়লাভ করার পর তরুণ প্রজন্মের কাছে বৈগ্রহিক হয়ে ওঠেন। জেন জ়ি বিক্ষোভের সময় তাঁকেই ভবিষ্যতের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ভাবতে শুরু করে দেন তরুণ প্রজন্মের নেপালিরা। নেপালের তরুণ-তুর্কিদের একাংশ ওলির আসনে বলেন্দ্রকে দেখতে চেয়েছিলেন। সেই সময় বলেন্দ্রের সমর্থনে সমাজমাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুক ভরে উঠেছিল।
কে এই বলেন্দ্র শাহ? তিনি কাঠমান্ডুর মেয়র। দেশের প্রধানমন্ত্রীর পদে নেপালি জনতার পছন্দের প্রার্থী। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার বলেন্দ্রের রাজনৈতিক উত্থান উল্কার গতিতে। ২০২২ সালে নির্দল প্রার্থী হিসাবে রাজনীতির ময়দানে পা রাখেন বলেন্দ্র। মেয়র নির্বাচনে শাসকদলের বাঘা বাঘা প্রার্থীকে হারিয়ে নির্দল প্রার্থী হিসাবে লড়াই করে জয় ছিনিয়ে নেন বলেন্দ্র।
বলেন্দ্রের পড়াশোনা নেপালের ভিএস নিকেতন উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল থেকে। হিমালয়ান হোয়াইটহাউস ইন্টারন্যাশনাল কলেজ থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। কর্নাটকের বিশ্বেশ্বরাইয়া টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি (ভিটিইউ) থেকে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন বলেন্দ্র।
তরুণ রাজনীতিবিদ হিসাবে জনপ্রিয়তা লাভ করলেও আরও একটি পরিচয় আছে তাঁর। খ্যাতনামী র্যাপার হিসাবে নেপালে পরিচিত বলেন্দ্র। বলেন্দ্র প্রধানমন্ত্রী পদের দৌড়ে থাকা সবচেয়ে কমবয়সি রাজনীতিকও বটে।
নেপালি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বলেন্দ্রের নাম জায়গা করে নিয়েছিল বিশ্বখ্যাত টাইম ম্যাগাজ়িনে। পৃথিবীর জনপ্রিয়তম ১০০ ব্যক্তিত্বের তালিকায় ঠাঁই পেয়েছিল তাঁর নাম। এমনকি ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর মতো বিখ্যাত সংবাদপত্রের শিরোনামে উঠে এসেছিল বলেন্দ্রের নাম। সেই প্রতিবেদনে তাঁর স্বচ্ছতা এবং তৃণমূল পর্যায়ের রাজনীতির প্রশংসা করা হয়েছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জেন জ়ি-র আন্দোলনের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন বলেন্দ্র। অস্থির পরিস্থিতির মাঝেই রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির ২১ জন সাংসদ গণইস্তফার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে নতুন করে নির্বাচনের ডাক দেয় রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি। সেপ্টেম্বরে ছাত্র-যুবদের বিক্ষোভে ওলি সরকারের পতনের পর নেপালের পরবর্তী শাসনভার কার হাতে তুলে দেওয়া হবে সেই নিয়ে প্রবল চর্চা শুরু হয় নেপাল জুড়ে।
যুব আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া অন্যতম মুখ তথা কাঠমান্ডুর মেয়র সেই বলেন্দ্র শাহ এ বার শামিল হন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার লড়াইয়ে। নির্দল হিসাবে নির্বাচনে লড়াইয়ের পথে না হেঁটে নেপালের নামী টিভি উপস্থাপক তথা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব রবি লামিছানের রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টিতে নাম লেখান তিনি। নেপালের নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি জয়ী হলে প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসবেন বলেন্দ্র। খবর, এই মর্মে রবি লামিছানের সঙ্গে একটি চুক্তিও হয়ে গিয়েছে বলেন্দ্রের।
ভারতের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করলেও বেশ কিছু মন্তব্যের জেরে ইতিমধ্যেই বলেন্দ্রের নামের সঙ্গে ভারত-বিরোধী তকমা জুড়ে গিয়েছে। ২০২৩ সালে তিনি নেপালে ভারতীয় সিনেমা নিষিদ্ধ করার দাবি জানাতেই বিতর্ক শুরু হয়। একটি বলিউড সিনেমায় হিন্দু ধর্মের দেবী সীতাকে ‘ভারতের কন্যা’ বলে উল্লেখ করায় প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন বলেন্দ্র।
বিষয়টি নিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘দৈনিক ভাস্কর’কে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে বলেন্দ্র জানান, বলিউডের ছবিতে পাকিস্তানকে সর্বদা ‘সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র ও বোমা-বন্দুকে ভরা দেশ’ হিসাবে দেখানো হয়। এই কারণে, শ্রীলঙ্কা এবং নেপালের নাগরিকেরা পাকিস্তানে যেতে ভয় পান, তাঁরা ভাবেন যে সে দেশে কেবল সন্ত্রাসীরা বাস করে। এর বিরোধিতা করা উচিত বলে দাবি করেন বলেন্দ্র।
২০২৩ সালে নিজের অফিসে ‘বৃহত্তর নেপালের’ একটি মানচিত্র রাখার পর বলেন্দ্রকে নিয়ে বিতর্ক দানা বাঁধে। সেই মানচিত্রে নেপালের সীমানা বর্তমান সীমানা ছাড়িয়ে বিস্তৃত দেখানো হয়েছিল। সেই মানচিত্রে ১৮১৬ সালের ‘সুগৌলির চুক্তি’র আগে নেপালের শাসনের অধীনে থাকা অঞ্চলগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি ছিল ভারতের সংসদ ভবনে প্রদর্শিত ‘অখণ্ড ভারত’ ম্যুরালের প্রতীকী প্রতিবাদ, যেখানে নেপালের অনেক অংশকে ভারতের অংশ হিসেবে দাবি করা হয়েছিল।
এই বিষয়ে বলেন্দ্রের প্রতিক্রিয়া ছিল, “আমি কখনও এমন কিছু বলিনি যার জন্য আমাকে ক্ষমা চাইতে হবে। ভারত তার সংসদীয় মানচিত্রকে সাংস্কৃতিক বলে অভিহিত করেছে, তাই আমরা বৃহত্তর নেপালের একটি ঐতিহাসিক মানচিত্র তৈরি করেছি। কারও আপত্তি থাকা উচিত নয়।”
ছবি: পিটিআই ও সংগৃহীত।