বর্তমানে ভারতের ‘কমেডি কুইন’-এর খেতাব পেয়েছেন। ভারতের অন্যতম ধনী কৌতুকশিল্পীর তালিকার প্রথম সারিতেই নাম লিখিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু হাজার হাজার দর্শকের মুখে হাসি ফোটানোর পিছনে ছিল ভারতী সিংহের কঠিন জীবন। চরম দারিদ্র্য এবং সামাজিক গঞ্জনা এড়িয়ে তিনি সফল হয়েছেন।
১৯৮৪ সালের জুলাইয়ে পঞ্জাবের অমৃতসরে জন্ম ভারতীর। তাঁর বাবা ছিলেন নেপালের বাসিন্দা। মা ছিলেন পঞ্জাবি বংশোদ্ভূত। আর্থিক অনটনের কারণে নাকি ভারতীর মা সন্তানের জন্ম দিতে চাননি। ভারতীর যখন মাত্র দু’বছর বয়স, তখন তাঁর বাবা মারা যান। তিন সন্তানকে নিয়ে অথৈ জলে পড়েন ভারতীর মা।
সংসারের খরচ চালাতে ভারতীর বাবা অনেকের কাছে টাকা ধার করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর বাড়িতে নাকি মাঝেমধ্যেই পাওনাদারেরা এসে অশান্তি করতেন। ধার মেটানোর পাশাপাশি তিন সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতে ভারতীর মা গভীর রাত পর্যন্ত সেলাই মেশিনের সামনে বসে কম্বল তৈরি করতেন।
সারা দিন কম্বল তৈরির কারখানায় কাজ করার পর বাড়তি মজুরির জন্য সেই কাজ বাড়িতেও নিয়ে আসতেন ভারতীর মা। পরিবারে কোনও পুরুষ অভিভাবক না থাকায় সমাজ তাঁর পরিবারকে বাঁকা চোখে দেখত। অভাবের সঙ্গে ভারতীর আরও এক দুঃখের জায়গা ছিল তাঁর চেহারা।
স্কুলে বন্ধুদের মাঝে নিয়মিত ঠাট্টা-ইয়ার্কির শিকার হতেন ভারতী। চেহারা নিয়ে কটু মন্তব্য শুনতে শুনতে কেঁদেও ফেলতেন তিনি। অনেকেই তাঁকে ‘মোটা’ অথবা ‘হাতি’ বলে সম্বোধন করতেন। মনখারাপ হলেও স্থূলতাকে কখনও বাধা হিসাবে দেখেননি তিনি।
তিরন্দাজি এবং রাইফেল শুটিংয়ের মতো স্পোর্টসে ভারতী হয়ে উঠেছিলেন জুড়িহীন। রাজ্য এবং জাতীয় স্তরে তিনি এই দু’টি খেলায় স্কুলের তরফে প্রতিনিধিত্বও করেছিলেন। ‘স্পোর্টস কোটা’য় কলেজেও ভর্তি হয়েছিলেন ভারতী।
খেলাধুলা নিয়ে কেরিয়ার গড়ে তোলার স্বপ্ন ছিল ভারতীর। কিন্তু অর্থাভাবের কারণে সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারেননি। কম বয়সেই পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয়েছিল তাঁকে। ডায়েট মেনে চলা এবং খেলাধুলার জন্য আধুনিক সরঞ্জাম কেনার মতো সামর্থ্য ছিল না তাঁর।
কলেজে ভর্তি হওয়ার পর জীবন বদলে যায় ভারতীর। তাঁর কলেজের ছাত্র ছিলেন কপিল শর্মাও। কয়েক জন বন্ধুর সঙ্গে নাটকের দল চালাতেন কপিল। ‘মিমিক্রি’র (অনুকৃতি) জন্যও প্রশিক্ষণ দিতেন পড়ুয়াদের। এক নাটকে যমরাজের চরিত্রের জন্য ভারতীকে বেছে নিয়েছিলেন কপিল এবং তাঁর বন্ধুরা।
কিন্তু অভিনয়ে ভারতীর কোনও আগ্রহই ছিল না। প্রথমে তিনি রাজি না হলেও পরে যখন জানতে পেরেছিলেন যে, মহড়াপ্রতি ১০ টাকার কুপন পাওয়া যাবে, তখনই তিনি অভিনয়ের জন্য রাজি হয়ে যান।
ভারতীর পারফরম্যান্স দেখে খুশি হয়ে কপিল তাঁকে নাটকের দলে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। পারিশ্রমিকের কথা ভেবে আর আপত্তি জানাননি ভারতী। ধীরে ধীরে থিয়েটারই হয়ে উঠেছিল তাঁর জীবন। তার পর কপিলের অনুরোধে তিনি ‘লাফটার চ্যালেঞ্জ’-এ অংশ নিতে অডিশন দিয়েছিলেন।
অমৃতসরের এক হোটেলে অডিশন দিতে যাওয়ার কথা শুনে খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন ভারতী। একা হোটেলে গেলে যদি কোনও বিপদ হয়, সে কারণে কয়েক জন বন্ধুকে নিয়ে গিয়েছিলেন সেখানে। অডিশনের দু’সপ্তাহ পরে ভারতীর কাছে ফোন আসে। মুম্বই যাওয়ার বিমানের টিকিটও পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। জীবনে সেই প্রথম বিমানে ওঠা ভারতীর। সঙ্গে ছিলেন তাঁর মা-ও।
হাস্যকৌতুক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে তৃতীয় স্থান অধিকার করেন ভারতী। পুরস্কারস্বরূপ বড় একটি টেলিভিশন সেট পেয়েছিলেন তিনি। যে পরিবারে দু’বেলা খাবার জোগাড় করাই কঠিন ছিল, সেই বাড়িতে বড় টিভি দেখে হকচকিয়ে গিয়েছিলেন পড়শিরা। কিন্তু টিভিতে কেব্ল সংযোগ নেওয়ার ক্ষমতা ছিল না তাঁদের।
অভাবের সংসারে দিন কাটাচ্ছিলেন ভারতী। কয়েক সপ্তাহ পর আবার মুম্বই থেকে ফোন পেয়েছিলেন তিনি। একটি অলঙ্কার বিপণির জন্য স্ট্যান্ড আপ শো করেছিলেন ভারতী। পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন ১৫ লক্ষ টাকা। টাকার এই অঙ্ক সে সময় তাঁর কাছে ছিল অকল্পনীয়।
পারিশ্রমিক পেয়ে সবার আগে পাওনাদারদের টাকা শোধ করেছিলেন ভারতী। তাঁর সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে যেতে শুরু করেছিল পারিপার্শ্বিকও। পরে অন্য এক কমেডি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন ভারতী। ক্রমশ টেলিভিশনে সঞ্চালনা এবং কৌতুকশিল্পী হিসাবে প্রথম সারিতে চলে আসেন তিনি।
ছবিতে অভিনয়েরও সুযোগ পেতে শুরু করেন ভারতী। ‘খিলাড়ি ৭৮৬’, ‘সনম রে’-সহ বেশ কিছু হিন্দি, পঞ্জাবি এবং কন্নড় ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। তবে তাঁর মূল জায়গা ছিল ছোটপর্দাই। অর্থাভাবে একসময় বাসি রুটি খেয়ে দিন কাটাতে হত তাঁকে। ধীরে ধীরে তিনিই লক্ষ লক্ষ টাকার মালিক হয়ে উঠতে শুরু করলেন।
যে চেহারার জন্য সমাজে গঞ্জনার শিকার হতেন, সেই স্থূল চেহারাকেই কমেডির প্রধান অস্ত্র বানিয়ে ফেলেছিলেন ভারতী। মঞ্চে তাঁর ‘লল্লি’ চরিত্রটিও দর্শকের কাছে কম সময়ের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।
খ্যাতির মধ্যগগনে ভারতীর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল উঠতি চিত্রনাট্যকার হর্ষ লিম্বাচিয়ার। তিনি কমেডি সার্কাসে ভারতীর জন্য স্ক্রিপ্ট লিখতেন। প্রথমে সেই চিত্রনাট্য সফল না হলেও পরে ভারতীর পারফরম্যান্সে সুপারহিট হয়েছিল সেই চিত্রনাট্য।
ভারতী এবং হর্ষের পেশাগত আলাপ ক্রমে প্রেমে পরিণতি পায়। টানা ৬ বছর প্রেমপর্ব চলেছিল দু’জনের। ভারতীর পাশাপাশি হর্ষও এগোতে থাকেন কেরিয়ারের পথে। সহকারী চিত্রনাট্যকার থেকে তিনি হয়ে ওঠেন সহকারী সৃজনশীল পরিচালক। দীর্ঘ কাল ডেট করার পর ২০১৭ সালে বিয়ে করেন হর্ষ-ভারতী।
বিয়ের তিন বছর পর ২০২০ সালে ভারতী এবং হর্ষের মুম্বইয়ের ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালিয়ে ৮৬.৫ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করেছিলেন নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরোর (এনসিবি) আধিকারিকেরা। জিজ্ঞাসাবাদে ভারতী এবং তাঁর স্বামী হর্ষ দু’জনেই গাঁজা খাওয়ার কথা স্বীকার করেছিলেন বলে দাবি এনসিবির তদন্তকারীদের। প্রায় দেড় দিন এনসিবির হেফাজতে ছিলেন তাঁরা।
ভারতী এবং হর্ষের আইনজীবী বিরোধিতা করে জানিয়েছিলেন, নারকোটিক্স ড্রাগস এবং সাইকোট্রপিক সাবস্ট্যান্স (এনডিপিএস) আইন অনুযায়ী যে পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধার হয়েছে তাঁদের ফ্ল্যাট থেকে তা এতটাই কম যে, সে ক্ষেত্রে কোনও মামলা দায়ের হয় না।
২০২৬ সালের সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতী সিং-এর মোট সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ৮০ কোটি টাকা। তিনি মূলত টেলিভিশন শো, স্টেজ পারফরম্যান্স এবং বিজ্ঞাপনী সংস্থার প্রচার থেকে অর্থ উপার্জন করেন।
ছোটপর্দায় সঞ্চালনার জন্য পর্বপ্রতি প্রায় ১০ থেকে ১২ লক্ষ টাকা পারিশ্রমিক নেন তিনি। ইউটিউবে নিজস্ব চ্যানেল থেকেও আয় করেন ভারতী। তা ছাড়া বিভিন্ন নামী সংস্থার বিজ্ঞাপনী প্রচারের জন্য মোটা অঙ্কের টাকা উপার্জন করেন তিনি। বর্তমানে স্বামী এবং দুই পুত্রসন্তান নিয়ে সুখের সংসার ‘কমেডি কুইন’-এর।
সব ছবি: সংগৃহীত।