সোমবার ৪ মে ঘোষিত হল পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল। এপ্রিলের ২৩ এবং ২৯ তারিখ এই দু’দফায় পশ্চিমবঙ্গে সম্পন্ন হয় ভোটপ্রক্রিয়া। মোট ২৯৪টি আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সাক্ষী থেকেছেন রাজ্যবাসী। প্রথম দফায় গত ২৩ এপ্রিল ১৬টি জেলার ১৫২টি আসনে ভোটগ্রহণ হয়েছিল। দ্বিতীয় দফায় সাত জেলার ১৪২টি আসনে ভোট হয়েছে। যদিও ফলতায় নতুন করে ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। ফলে আপাতত ২৯৩টি আসনের ফলঘোষণা করা হবে।
মোটের উপর শান্তিপূর্ণ ও অবাধ নির্বাচনে ৯০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে রাজ্যে। এ বছরের নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নজরে রয়েছেন বেশ কয়েক জন হেভিওয়েট প্রার্থী। তাঁদের মধ্যে থেকে বিজেপির কয়েক জনকে বেছে নিল আনন্দবাজার ডট কম। তাঁদের কে, কেমন ফল করলেন, এই প্রতিবেদনে রইল তার হদিস।
বিজেপির প্রার্থিতালিকার প্রথমেই রয়েছেন মেদিনীপুরের ভূমিপুত্র দিলীপ ঘোষ। ২০১৬-র পর ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে আবার তাঁকে খড়্গপুর সদরে প্রার্থী করেছে বিজেপি। ২০১৯ সালে লোকসভা ভোটে মেদিনীপুর থেকে লড়েছিলেন দিলীপ। তাঁর বিরুদ্ধে প্রার্থী হিসাবে প্রদীপ সরকারকে দাঁড় করিয়েছিল তৃণমূল। কংগ্রেসের মনোনীত প্রার্থী পাপিয়া চক্রবর্তী ও সিপিএমের হয়ে লড়েছিলেন মধুসূদন রায়।
২০১৯ সালে তাঁর নেতৃত্বে রাজ্যে বিজেপি ১৮টি লোকসভা আসন জিতেছিল। মেদিনীপুর থেকে দিলীপ নিজেও সাংসদ হয়েছিলেন। তার পরে ২০২৪ সালে বিজেপি লোকসভা ভোটে দিলীপকে লড়তে পাঠিয়েছিল বর্ধমান-দুর্গাপুর কেন্দ্রে। সেখানে হেরে যান দিলীপ। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের প্রার্থীর চেয়ে ২৬ হাজারের বেশি ভোটে এগিয়ে সঙ্ঘের একান্ত অনুগত দিলীপ।
একদা তৃণমূল শিবিরের ভরসা এখন কেন্দ্রীয় শাসক দলের লড়াইয়ের অন্যতম প্রধান মুখ শুভেন্দু অধিকারী। ২০২১ সাল থেকে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা। নন্দীগ্রামের পাশাপাশি ভবানীপুর আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন শুভেন্দু। ভবানীপুরে এ বারের নির্বাচন গত নির্বাচনগুলির চেয়ে আলাদা। মুখ্যমন্ত্রী মমতার বিরুদ্ধে ভোট ময়দানে ‘প্রেস্টিজ ফাইটে’ বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু। লড়াইয়ে ছিলেন সিপিএমের শ্রীজীব বিশ্বাস এবং কংগ্রেসের প্রদীপ প্রসাদ। এই কেন্দ্রে গণনা আপাতত স্থগিত। এখনও দু’রাউন্ড গণনা বাকি। পিছিয়ে রয়েছেন শুভেন্দু।
এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দুর বিরুদ্ধে তাঁরই একদা ঘনিষ্ঠ পবিত্র করকে প্রার্থী করেছে তৃণমূল। তিনি ১৭ মার্চ বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে যোগদান করেই নন্দীগ্রামে শাসক দলের প্রার্থী হন। একদা দলীয় সতীর্থের বিরুদ্ধে লড়াই করে নন্দীগ্রামে বিজেপির জয়ের পতাকা ওড়ালেন শুভেন্দু। নন্দীগ্রামে জিতলেন শুভেন্দু। ১০ হাজারের বেশি ভোটে জিতেছেন তিনি।
বিধানসভা নির্বাচনের জন্য বিজেপির দ্বিতীয় দফা প্রার্থিতালিকায় বড় চমক ছিলেন আরজি করে নির্যাতিতার মা। পানিহাটি থেকে বিজেপির হয়ে নির্বাচনী লড়াই লড়েছেন তিনি। এই কেন্দ্রে তাঁর সঙ্গে টক্কর দিয়েছেন আরজি করের প্রতিবাদ আন্দোলনের অন্যতম মুখ বামনেতা কলতান দাশগুপ্ত। পানিহাটি কেন্দ্র থেকে এ বার তৃণমূল প্রার্থী করেছে বিদায়ী বিধায়ক নির্মল ঘোষের পুত্র তীর্থঙ্কর ঘোষকে।
গোটা রাজ্যের নজরে থাকা পানিহাটি বিধানসভা কেন্দ্রে ভোটগণনার পর দেখা গিয়েছে, জনমত গিয়েছে আরজি করে নির্যাতিতার মার পক্ষেই। বিজেপি প্রার্থী আরজি করে নির্যাতিতা চিকিৎসকের মা নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর তৃণমূল প্রার্থীর থেকে এগিয়ে রয়েছেন বড় ব্যবধানে। দ্বিতীয় স্থান পেয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হতে পারে বিদায়ী বিধায়কের পুত্র তৃণমূল প্রার্থী তীর্থঙ্করকে। পানিহাটির বাসিন্দারা তাঁদের বিধায়ক হিসাবে কলতানকে বেছে নেয়নি। তৃতীয় স্থান পেতে চলেছেন তিনি।
কলকাতার কোনও কেন্দ্র নয়, এ বার পিতৃভূমি থেকে ভোটে লড়েছেন অভিনেতা রাজনীতিক রুদ্রনীল ঘোষ। হাওড়া শিবপুরে বিজেপির প্রার্থী তিনি। ২০২১ সালে ভবানীপুর কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী ছিলেন। তৃণমূলের শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের কাছে পরাজিত হন। দ্বিতীয় বারের লড়াইয়ে ঘরের ছেলেকে নিরাশ করল না শিবপুরের জনতা। তৃণমূল শিবিরের প্রতিদ্বন্দ্বী চিকিৎসক ও বালির বিদায়ী বিধায়ক রানা চট্টোপাধ্যায়কে ঘরের মাঠে হারালেন ‘রুডি’।
সোনারপুর দক্ষিণে জয়ী বিজেপি প্রার্থী রূপা গঙ্গোপাধ্যায়। দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুর দক্ষিণে এ বার ছিল তারকা প্রার্থীর ছড়াছড়ি। ছিল ‘অভিনেত্রী বনাম অভিনেত্রী’র লড়াই। দুই যুযুধান পক্ষের লড়াইয়ে শামিল ছিলেন রুপোলি পর্দার দুই অভিনেত্রী। বিজেপির রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ের বিপক্ষে ছিলেন তৃণমূলের অরুন্ধতী (লাভলি) মৈত্র। এই কেন্দ্রের বাম প্রার্থী ছিলেন পারমিতা দাশগুপ্ত। সকলকে হারিয়ে জয় ছিনিয়ে নিয়েছেন সোনারপুরের ‘ঘরের মেয়ে’ বিজেপি প্রার্থী রূপা। বিধানসভায় ময়দানে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে তৃণমূলের লাভলিকে পরাস্ত করেছেন রূপা।
রাজ্যসভা ছেড়ে বিধানসভার লড়াইয়ের ময়দানে নেমেছিলেন প্রাক্তন সাংবাদিক স্বপন দাশগুপ্ত। ২০২১ সালের বিধানসভায় ‘লড়াকু প্রার্থী’কে এ বার বিজেপি টিকিট দিয়েছে দক্ষিণ কলকাতার রাসবিহারী কেন্দ্র থেকে। ২০১৬ সালে বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ হন সাংবাদিক স্বপন। গত বিধানসভা ভোটে তাঁকে হুগলির তারকেশ্বরের মানুষ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। প্রায় সাত হাজার ভোটে হেরে গিয়েছিলেন সে বার। এ বার ভাগ্যে শিকে ছিঁড়ল প্রবীণ এই রাজনীতিবিদের। তৃণমূলের ‘গড়ে’ গেরুয়া নিশান ওড়ালেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূলের দেবাশিস কুমার পরাজিত হয়েছেন স্বপনের কাছে।
উত্তর কলকাতার মানিকতলা বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপির টিকিটে লড়ছেন প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা তাপস রায়। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ছিলেন বরাহনগরে তৃণমূলের প্রার্থী। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে তৃণমূলের তাপস যোগ দেন বিজেপিতে। তাঁর বিরুদ্ধে তৃণমূলের প্রার্থী ছিলেন তরুণ মুখ ও প্রয়াত সাধন পাণ্ডের মেয়ে শ্রেয়া পাণ্ডে। বাবার জয়ের ধারা বজায় রাখতে পারলেন না শ্রেয়া। প্রবীণ-নবীনের যুদ্ধে জিতেছেন প্রবীণ। তরুণ তুর্কিকে পরাজিত হতে হল পোড়খাওয়া রাজনৈতিক নেতা তাপসের কাছে। এককালের রাজনৈতিক সতীর্থের মেয়েকে হারালেন বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদ। ১৫৬৪৪ ভোটে জিতেছেন তিনি।
দলবদলের অভ্যাস পোশাক পাল্টানোর মতোই। কখনও তৃণমূল, কখনও বিজেপি। ২০১৯ সালের আগে তৃণমূল থেকে বিজেপি। টিকিট পেয়ে সাংসদ। পদ্মের সাংসদ থাকতে থাকতেই ২০২২ সালে তৃণমূলে যোগ। ২০২৪-এ টিকিট না পেয়ে গোসা করে আবার ব্যাক টু বিজেপি। ভাটপাড়ার ‘রাজকার্যের’ ভার পুত্র পবন সিংহের হাতে তুলে দিয়ে নোয়াপাড়া থেকে বিজেপির প্রতীক চিহ্নে লড়ছেন অর্জুন সিংহ। রাজনীতিতে তুলনামূলক ভাবে ‘অপরিপক্ব’ তৃণমূলের তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্যের সঙ্গে ছিল তাঁর টক্কর। সেই লড়াইয়ে এগিয়ে অর্জুন।
২০২৬-এর নির্বাচনে আসানসোল দক্ষিণের বিজেপি প্রার্থী, বিদায়ী বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পাল। ২০২১ সালে আসানসোল দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রে তাঁকে টিকিট দিয়েছিল বিজেপি। প্রথম বার ভোটে দাঁড়িয়েই বাজিমাত। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূলের তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়কে ৪০৮৩৯ হাজার ভোটে হারিয়ে জয়লাভ করলেন বিজেপির ‘অগ্নিদিদি’। তাঁর মোট প্রাপ্ত ভোট ১১৯৫৮২।
২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে কোচবিহার থেকে জয়ী হয়ে সংসদে পা রাখেন বিজেপির নিশীথ প্রামাণিক। পরে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব এসে পড়ে কাঁধে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে মন্ত্রিত্ব হাতছাড়া হয়। এ বার কোচবিহারের মাথাভাঙা বিধানসভা আসনে বিজেপির প্রার্থী তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে তৃণমূলের প্রার্থী ছিলেন সাবলু বর্মণ। উত্তরবঙ্গে বিজেপির হাত শক্ত করে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছেন নিশীথ।
শিলিগুড়ির মেয়র ও তৃণমূল প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিধানসভা ভোটে লড়েছেন বিজেপি প্রার্থী শঙ্কর ঘোষ। একসময়ের সিপিএমের দাপুটে যুবনেতা। আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বাম বাহুতে আঁকান চে গেভারার উল্কি। মার্ক্সবাদী থেকে হিন্দুত্ববাদীতে বদলালেও উল্কির রং ফিকে হয়নি। ২০২১ সালে প্রথম বার ভোটের ময়দানে পা রেখেই সাফল্য। যাঁকে গুরু বলে মানতেন সেই অশোক ভট্টাচার্যকে হারিয়ে জয় ছিনিয়ে এনেছিলেন শিলিগুড়ির বিদায়ী বিধায়ক। বিদায়ী বিধানসভায় বিজেপি পরিষদীয় দলের মুখ্যসচেতক ছিলেন শঙ্কর। ২০২৬-এ লড়াইয়ে দুই যুযুধানের জোর টক্কর। শেষমেশ তৃণমূলকে পর্যুদস্ত করে গেরুয়া পতাকা ওড়ালেন শঙ্কর ঘোষ।
বরাহনগরে বিজেপি প্রার্থী করেছিল সজল ঘোষকে। এ বার তাঁর লড়াই তৃণমূলের বিদায়ী বিধায়ক সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সিপিএমের সায়নদীপ মিত্রের বিরুদ্ধে। এর আগে বরাহনগরে উপনির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন সজল-সায়ন্তিকা। ২০২৬-এর ভোটেও তৃণমূল টিকিট দিয়েছিল অভিনেত্রী সায়ন্তিকাকে। তাঁর সমর্থনে পদযাত্রা করেছেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রচারে নজর কাড়লেও মমতা-ম্যাজিক কাজ করেনি এই আসনে। তৃণমূলের এই জেতা আসনও হাতছাড়া। এই কেন্দ্রে শেষ হাসি হাসলেন বিজেপির দুঁদে নেতা সজলই।
কলকাতা বন্দরে রাজ্যের দাপুটে মন্ত্রী ফিরহাদ ‘ববি’ হাকিমের বিরুদ্ধে নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছেন রাকেশ সিংহ। রাজ্য রাজনীতির পোড়খাওয়া তৃণমূল নেতার বিরুদ্ধে জামিনে মুক্ত রাকেশকে প্রার্থী করেছিল বিজেপি। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কলকাতার ট্যাংরা এলাকা থেকে বিজেপি নেতা রাকেশ গ্রেফতার হন। কংগ্রেস ভবনে তাণ্ডব চালানোর অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। প্রার্থীপদ ঘোষণার ৪৮ ঘণ্টা আগে জামিন। বিজেপির টিকিট পাবেন কি না তা নিয়ে দলের অন্দরেই ছিল প্রবল জল্পনা। দল তাঁর উপর আস্থা রাখলেও ভোট বৈতরণী পার করতে ব্যর্থ হলেন রাকেশ। ববি হাকিমের গড়ে দাঁত ফোটাতে পারল না বিজেপি। ধরাশায়ী হলেন রাকেশ।
সতীর্থ মনোজ তিওয়ারি যোগ দিয়েছিলেন তৃণমূলে। সেই একই দিনে বিজেপি শিবিরে যোগ দেন প্রাক্তন ক্রিকেটার অশোক দিন্ডা। পাঁচ বছর আগে, ২০২১ সালে। দলে যোগ দিয়েই ময়না থেকে বিজেপির প্রতীকে ভোটে লড়েন অশোক। প্রথম লড়াইয়ে বিধানসভার সদস্যপদ। এ বারের বিধানসভা ভোটেও তাঁকে ময়না থেকে প্রার্থী করেছে বিজেপি। তাঁর বিরুদ্ধে তৃণমূল দাঁড় করিয়েছে চন্দন মণ্ডলকে। ময়নার বিপুল জনসমর্থন এ বারও অশোকের পক্ষে।
গত জানুয়ারিতে দ্বিতীয় বিয়ে করে বিতর্কের মুখে পড়েন অভিনেতা তথা বিজেপি বিধায়ক হিরণ চট্টোপাধ্যায়। স্ত্রীর সঙ্গে আইনি বিচ্ছেদ না হওয়া সত্ত্বেও বিয়ে। মামলা ঠুকে দেন প্রথম স্ত্রী অনিন্দিতা চট্টোপাধ্যায়। আগাম জামিন নিতে হয় হিরণকে। বিতর্ক হলেও এ বারের নির্বাচনে টিকিট পান হিরণ্ময় ওরফে হিরণ। এই নিয়ে তৃতীয় বার। বিধানসভা, লোকসভা এবং বিধানসভা। ২০২১ সালে খড়্গপুর বিধানসভা থেকে বিজেপির টিকিটে লড়েছিলেন। তিন বছর পরে ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে ঘাটাল থেকে তৃণমূলের দেবের বিপক্ষে বিধায়ক হিরণকে প্রার্থী করে বিজেপি। এ বার হাওড়ার শ্যামপুর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে নির্বাচনে লড়েছেন তিনি। যদিও হিরণ নির্বাচনী হলফনামায় উল্লেখ করেননি দ্বিতীয় বিয়ের কথা। হাওড়ার ভূমিপূত্র হিরণ প্রতিপক্ষ তৃণমূলের নদেবাসী জানাকে হারিয়ে বিধানসভায় এ বার জয় সুনিশ্চিত করেছেন।
২০২৬ সালের নির্বাচনে বিজেপির মতুয়া ভোটের অন্যতম মুখ সুব্রত ঠাকুর। যদিও ঠাকুরনগরে ঠাকুরবাড়ির দুই ভাইয়ের অন্তর্দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসতেই অস্বস্তিতে পড়েছিল বিজেপি। মতুয়া ভোটের দিকে নজর রেখে এ বারও গাইঘাটা থেকে লড়েছেন সুব্রত। বিপক্ষে দাঁড়ানো তৃণমূলের প্রার্থী নরোত্তম দাসকে পরাজিত করেছেন সুব্রত।
বীরভূমের গুরুত্বপূর্ণ আসন সিউড়ি বিধানসভা কেন্দ্রে আরও এক প্রাক্তন সাংবাদিক জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়কে প্রার্থী করেছে বিজেপি। দলের রাজ্য সহ-সভাপতির পদে রয়েছেন জগন্নাথ। ২০২১-এর লড়াইও লড়েছিলেন সিউড়ি থেকে। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূলের উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়কে পরাজিত করলেন তিনি।
২০২১ সালে বিধানসভার ভোটে এন্টালিতে তৃণমূলের স্বর্ণকমল সাহার কাছে হেরেছিলেন ৫৮ হাজার ২৫৭ ভোটে। আর তার পাঁচ মাস বাদে ভবানীপুরের উপনির্বাচনে মমতার বিরুদ্ধে লড়াই করে হেরেছিলেন ৫৮ হাজার ৮৩৫ ভোটে। দু’বার হারার পর বিজেপির এই আইনজীবী প্রার্থী ২৬-এর ভোটে এন্টালি কেন্দ্র থেকে লড়েছেন। ’২১ সালের ভোট-পরবর্তী সন্ত্রাসে আক্রান্তদের, সন্দেশখালিতে নির্যাতিতাদের হয়ে তাঁর আইনি লড়াই নিয়ে সোচ্চার হলেও ভোটবাক্সে তার প্রতিফলন ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছেন প্রিয়ঙ্কা টিবরেওয়াল। এন্টালি কেন্দ্রে জিতেছেন তৃণমূল প্রার্থী সন্দীপন সাহা। গেরুয়া ঝড়েও ভোটের বৈতরণী পেরোতে পারলেন না বিজেপির প্রতিবাদী মুখ প্রিয়ঙ্কা।
রাজারহাট গোপালপুরে প্রথম বারের জন্য প্রার্থী হয়েছিলেন বিজেপির তরুণ তুর্কি ব্রিগেডের সদস্য তরুণজ্যোতি তিওয়ারি। তিনিও পেশায় আইনজীবী। বিধানসভা এলাকার উন্নয়ন নিয়ে কোমর বেঁধে প্রচার চালিয়ে গিয়েছেন। আক্রমণের মূল লক্ষ্য বিদায়ী তৃণমূল বিধায়ক ও সঙ্গীতশিল্পী অদিতি মুন্সী। তবে এ বছরের বিধানসভা নির্বাচনে বিদায়ী বিধায়ক অদিতির পাশে দাঁড়ালেন না রাজারহাট-গোপালপুর কেন্দ্রের মানুষ। প্রথম লড়াইয়ে সাফল্য ধরা দিল তরুণজ্যোতিকে। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই জিতলেন বিজেপির তরুণজ্যোতি।
তৃণমূলের হেভিওয়েট নেতা অরূপ বিশ্বাসের বিপক্ষে টালিগঞ্জ কেন্দ্রে প্রার্থী হয়েছেন পাপিয়া দে অধিকারী। এ ছাড়াও কংগ্রেসের মানস সিংহ রায় এবং সিপিএম প্রার্থী পার্থপ্রতিম বিশ্বাসের সঙ্গেও লড়াই রয়েছে তাঁর। আগে ছিলেন বামপন্থী। বিজেপিতে যোগ দিয়েই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার টিকিট পেয়েছিলেন ২০২১-এ। গণনার শুরু থেকেই একে অপরকে জোর টক্কর দিয়েছিলেন উভয়েই। দক্ষিণ কলকাতার এই গড় কাদের দখলে থাকবে তা নিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না কোনও যুযুধান পক্ষই। এখনও পর্যন্ত এই কেন্দ্রে এগিয়ে বিজেপি প্রার্থী পাপিয়া। তিনি প্রায় ৪০০০ হাজার ভোটে এগিয়ে।
২০১৬ সালে দাদা শুভেন্দু অধিকারীর ছেড়ে যাওয়া আসন তমলুকের উপনির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থী হয়েছিলেন ভাই দিব্যেন্দু অধিকারী। জিতে সাংসদ হন তিনি। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে ফের তমলুকে তৃণমূলের টিকিটে জিতেছিলেন দিব্যেন্দু। ২০২০ সালে শুভেন্দু বিজেপিতে যাওয়ার পরে দিব্যেন্দুও তৃণমূলের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ান। তবে তখন তিনি আনুষ্ঠানিক ভাবে বিজেপিতে যোগ দেননি। দীর্ঘ দিন তৃণমূলে নিষ্ক্রিয় থাকার পর ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের আগে দিল্লিতে গিয়ে বিজেপিতে যোগ দেন। ২০২৬ সালে পূর্ব মেদিনীপুরের এগরা থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন তিনি। এ বার তাঁর বিরুদ্ধে তৃণমূল প্রার্থী ছিলেন তরুণকুমার মাইতি। সিপিএম ও কংগ্রেসের প্রার্থীরা যথাক্রমে সুব্রত পন্ডা এবং অঞ্জনকুমার পট্টনায়ক। সকলকে ধরাশায়ী করে বিজেপির আসন পাওয়া নিশ্চিত করেছেন শুভেন্দু-সহোদর দিব্যেন্দু।
সব ছবি: সংগৃহীত।