যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে দেশে শান্তি ফিরুক, চাইছেন রাজনৈতিক নেতৃত্ব। অন্য দিকে জোড়া শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে মরিয়া কট্টরপন্থী শিয়া ফৌজ। আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের সঙ্গে সংঘর্ষের দেড় মাসের মাথায় কি ক্রমশ ‘আড়াআড়ি’ ভাবে ভেঙে যাচ্ছে ইরানি নেতৃত্ব? পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দ্বিতীয় দফার শান্তিবৈঠকের মুখে দুনিয়া জুড়ে তুঙ্গে উঠেছে সেই জল্পনা। যদিও গোটা বিষয়টিকে পশ্চিমি দুনিয়ার ‘অপপ্রচার’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে তেহরান।
ইরানি রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং ফৌজের মধ্যে ‘ভাঙন’ ধরার একাধিক ইঙ্গিত ইতিমধ্যেই প্রকাশ্যে এনেছেন বিশ্লেষকদের একাংশ। তাঁদের দাবি, মুখে হুঙ্কার ছাড়লেও অবিলম্বে আমেরিকার সঙ্গে শান্তিচুক্তি সেরে ফেলতে আগ্রহী তেহরানের প্রথম সারির রাজনীতিকেরা। অন্য দিকে এ ব্যাপারে ঘোরতর আপত্তি আছে সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিল লিডার) মোজ়তবা খামেনেইয়ের নেতৃত্বাধীন ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসির। আর তাই চাপ তৈরি করতে নতুন করে হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধ করেছে তারা।
এর পাশাপাশি ক্ষমতার ভরকেন্দ্র নিজেদের হাতে রাখতে ‘নরমপন্থী’ রাজনৈতিক নেতাদের ধীরে ধীরে ‘কোণঠাসা’ করছে আইআরজিসি। উদাহরণ হিসাবে মাসুদ পেজ়েশকিয়ানের কথা বলা যেতে পারে। বর্তমানে ইরানের প্রেসিডেন্ট পদে রয়েছেন তিনি। কিন্তু, চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি থেকে বিদেশনীতি বা যুদ্ধের ব্যাপারে একটা শব্দও উচ্চারণ করতে দেখা যায়নি তাঁকে। উল্টে সেই জায়গায় অনেক বেশি দায়িত্ব নিচ্ছেন তেহরান পার্লামেন্টের স্পিকার মহম্মদ বাকের গালিবাফ এবং বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।
পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির দাবি, ইরানি কট্টরপন্থীদের তালিকায় বরাবর প্রথম সারিতে থেকেছে গালিবাফের নাম। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের যৌথ অভিযানে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেইয়ের মৃত্যু হলে, ওই পদের অন্যতম দাবিদার হয়ে ওঠেন তিনি। যদিও শেষ পর্যন্ত খামেনেই-পুত্র মোজ়তবাকে বেছে নেয় তেহরানের শিয়া ধর্মগুরুদের কাউন্সিল। তাতে অবশ্য আইআরজিসির সঙ্গে গালিবাফের সম্পর্কে এতটুকু চিড় ধরেনি।
এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে পাক মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদে হওয়া শান্তিবৈঠকে যোগ দেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স। সেখানে ইরানের তরফে ছিলেন গালিবাফ। আলোচনা ভেস্তে গেলে একে অপরের ঘাড়ে দোষ চাপান তাঁরা। তা দেখে বিশ্লেষকদের দাবি, মূলত আইআরজিসির কড়া শর্তগুলি তুলে ধরার কারণেই আমেরিকার সঙ্গে কথাবার্তা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেননি তেহরানের স্পিকার। আর তাতে আখেরে লোকসান হয়েছে পারস্য উপসাগরের ওই শিয়া মুলুকের।
বিশেষজ্ঞেরা অবশ্য ইরানি রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং ফৌজি জেনারেলদের মধ্যে ‘ভাঙনের’ নেপথ্যে একাধিক কারণ খুঁজে পেয়েছেন। তাঁদের দাবি, প্রথম দলের ‘নরমপন্থী’রা চাইছেন শান্তি আলোচনার মাধ্যমে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার থেকে নিষ্কৃতি। এতে একরকম রাজি আছে আমেরিকা। সে ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেল এবং তরল প্রাকৃতিক গ্যাস বিক্রির মেগা সুযোগ পাবে তেহরান। ফলে খুব দ্রুত ভেঙে পড়া অর্থনীতির চাকাকে নতুন করে ঘোরাতে সমর্থ হবে তারা।
দ্বিতীয়ত, ইরানে ‘শাসক বদলের’ (রেজ়িম চেঞ্জ) লক্ষ্য নিয়ে লড়াইয়ে নেমেছে মার্কিন ও ইহুদি ফৌজ। কিন্তু, শান্তিচুক্তিতে তেহরান রাজি হয়ে গেলে আপাতত সেখান থেকে সরতে হবে তাদের। তখন অনায়াসেই সাবেক পারস্যের কুর্সি আঁকড়ে থাকতে পারবেন পেজ়েশকিয়ান বা গালিবাফরা। তা ছাড়া যুদ্ধে পারস্য উপসাগরের কোলের শিয়া মুলুকটির ক্ষয়ক্ষতি নেহাত কম হয়নি। সেই ক্ষত ভরে নেওয়ার জন্য সময় কিনতে চাইছেন সেখানকার ‘নরমপন্থী’ রাজনৈতিক নেতারা।
যদিও এ ব্যাপারে অন্য যুক্তি আছে আইআরজিসির। তাদের দাবি, শান্তিচুক্তির শর্ত হিসাবে ইরানের হাতে থাকা ৬০ শতাংশ পরিশুদ্ধ (এনরিচ্ড) ইউরেনিয়াম হাতিয়ে নিতে চাইছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তা ছাড়া হরমুজ় প্রণালীর নিয়ন্ত্রণও নিজের কাছে রাখতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। আমেরিকার সেনা একবার সেটা পেয়ে গেলে ‘আম ও ছালা’ দুটোই হারাবে তেহরান। তখন সম্মুখসমরে ওয়াশিংটনের সঙ্গে এঁটে ওঠা যে দুঃসাধ্য হবে, তা ভালই জানেন পারস্যের শিয়া জেনারেলরা।
দ্বিতীয়ত, শান্তি আলোচনায় আমেরিকাকে বিশ্বাস করা ইরানের পক্ষে বেশ কঠিন। অতীতে বহু বার যুক্তরাষ্ট্রের কথার জাদুতে মজে গিয়ে বিপদে পড়তে হয়েছে তাদের। সুযোগ বুঝে নতুন করে তেহরানের উপর নিষেধাজ্ঞা চাপাতে কসুর করেনি ওয়াশিংটন। তা ছাড়া সমঝোতা হয়ে গেলেও ইহুদিরা যে সেটা মেনে চলবে, সেই নিশ্চয়তা নেই। তাই আপাতত জোড়া শত্রুর উপর চাপ বজায় রাখতে চাইছেন আইআরজিসির কমান্ডারেরা।
চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার লেবানন-ইজ়রায়েলের মধ্যে সংঘর্ষবিরতির কথা ঘোষণা করেন ট্রাম্প। তার পরই হরমুজ়ের ব্যাপারে কিছুটা নরম মনোভাব দেখায় ইরান। ১৭ এপ্রিল, শুক্রবার তেহরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়ে দেন, সমস্ত জাহাজের জন্য পুরোপুরি খুলে দেওয়া হচ্ছে ওই সামুদ্রিক রাস্তা। লড়াই বন্ধ থাকা অবস্থায় এই পরিস্থিতি বজায় থাকবে বলে আশ্বাস দেন তিনি। প্রাথমিক ভাবে তেহরানের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট। যদিও সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
অন্য দিকে গত ১৭ এপ্রিল, শুক্রবার হরমুজ় নিয়ে অবশ্য একের পর এক বিস্ফোরক পোস্ট করেন ট্রাম্প। তাঁর দাবি, সংশ্লিষ্ট সঙ্কীর্ণ জলপথটি খুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ইরান। শুধু তা-ই নয়, আগামী দিনে সংঘাত পরিস্থিতিতে সামুদ্রিক রাস্তাটিকে নাকি কখনওই ঢাল হিসাবে ব্যবহার করবে না তেহরান। পাশাপাশি, সাবেক পারস্যের যাবতীয় ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আসতে চলেছে বলেও ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ জানিয়ে দেন তিনি। তবে এর কোনওটাই মানেনি উপসাগরীয় দেশটির শিয়া সরকার।
এর পর ১৮ এপ্রিল, শনিবার নতুন করে হরমুজ় অবরোধের কথা ঘোষণা করে তেহরান। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই একটি বিবৃতি দিয়েছে ইরানের সামরিক কমান্ড। সেখানে বলা হয়েছে, প্রতিশ্রুতি ভেঙে সাবেক পারস্যের বিভিন্ন বন্দরে যাতায়াতকারী জাহাজগুলির উপর নৌ অবরোধ চালিয়ে যাচ্ছে আমেরিকা। আর তাই সংশ্লিষ্ট জলপথটি ফের বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। উপসাগরীয় দেশটির শিয়া ফৌজের এ-হেন পদক্ষেপে সেখানকার পরিস্থিতি যে আরও ঘোরালো হল, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
আইআরজিসির নতুন করে হরমুজ় অবরোধের পর ওই জলপথ পেরোতে গিয়ে বাধার মুখে পড়ে দু’টি ভারতীয় ট্যাঙ্কার। সেগুলি হল, ‘জগ অর্ণব’ এবং ‘সানমার হেরাল্ড’। প্রথম জাহাজটি ২০ লক্ষ ব্যারেল খনিজ তেল নিয়ে সৌদি আরব থেকে এ দেশের পশ্চিম উপকূলে আসছিল। অন্য দিকে ইরাক থেকে তরল সোনা আনতে যাচ্ছিল ‘হেরাল্ড’। তখনই তাদের উপর গুলি চালায় ইরানি আধাসেনা। এতে ট্যাঙ্কারের গায়ে গুলি লাগলেও বিশেষ ক্ষতি হয়নি। অক্ষত রয়েছেন সেখানকার ক্যাপ্টেন-সহ সমস্ত ক্রু।
হরমুজ় প্রণালীতে ভারতীয় জাহাজ আক্রান্ত হওয়ার পর ইরানি রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ফাতালিকে তলব করে নয়াদিল্লির বিদেশ মন্ত্রক। এ ব্যাপারে তাঁর সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন বিদেশ সচিব বিক্রম মিস্রী। অতীতে হরমুজ় দিয়ে এ দেশের জাহাজের নিরাপদ যাতায়াতে তেহরানের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি। সাবেক পারস্য থেকে সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে কোনও আশ্বাস পাওয়া গিয়েছে কি না, তা অবশ্য স্পষ্ট নয়।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের বড় অংশই মনে করেন, ঠিক এই কারণেই দ্রুত শান্তি চুক্তি সেরে ফেলতে চাইছেন ইরানের ‘নরমপন্থী’ রাজনৈতিক নেতৃত্ব। তাঁদের দাবি, হরমুজ় আটকাতে গিয়ে বার বার এই ধরনের ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রের জাহাজে গুলি চললে, দুনিয়া জুড়ে কূটনৈতিক স্তরে ছড়িয়ে পড়বে খারাপ বার্তা। এতে বিপদের সময় কাউকেই পাশে পাবে না তেহরান। আর তাই এ ব্যাপারে আইআরজিসির অনেক বেশি সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
গত ১৭ মার্চ বিমানহামলায় মৃত্যু হয় ইরানের সাবেক স্পিকার ও নিরাপত্তা উপদেষ্টা আলি লারিজানির। ওই দিনই আইআরজিসির বাসিজ় বাহিনীর প্রধান গোলামরেজা সোলেইমনিকে উড়িয়ে দেয় মার্কিন-ইহুদিদের যৌথ ফৌজ। এ ছাড়া ২৬ মার্চ তাঁদের হামলায় সাবেক পারস্যের নৌসেনা প্রধান আলিরেজ়া তাংসিরির মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছে ইজ়রায়েল। তাঁর পরিকল্পনার উপর ভিত্তি করেই গোড়ার দিকে হরমুজ়ে ‘বারুদ-সুড়ঙ্গ’ (ওয়াটার মাইন) খোঁড়ে শিয়া ফৌজ।
সংবাদসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, লারিজানির মৃত্যুতে পুরোপুরি ছন্নছাড়া হয়ে গিয়েছে ইরানের রাজনৈতিক এবং সামরিক নেতৃত্ব। এত দিন এই দুইয়ের মধ্যে সেতুবন্ধনের কাজ করছিলেন তিনি। বর্তমানে পেজ়েশকিয়ানদের মতো রাজনীতিকদের কথা আইআরজিসির কমান্ডারদের কাছে তুলে ধরার কেউ নেই। উল্টো দিকে ফৌজির শক্তি সম্পর্কেও পুরোপুরি অন্ধকারে রয়েছেন তেহরানের নেতারা।
এ-হেন পরিস্থিতিতে দ্বিতীয় দফার শান্তিবৈঠকে যুযুধান দুই পক্ষকে বসানোর মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে পাকিস্তান। তার মধ্যেই ১৯ এপ্রিল, রবিবার একটি টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দেন গালিবাফ। সেখানে তিনি বলেন, ‘‘আলোচনার জন্য আমরা সম্পূর্ণ ভাবে প্রস্তুত। যদি ওরা (আমেরিকা) সামান্য ভুলচুকও করে, তা হলে পুরো শক্তি দিয়ে তার মোকাবিলা করব।’’ ইরানি পার্লামেন্ট স্পিকারের এই হুঁশিয়ারিকে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
সাক্ষাৎকারে গালিবাফ এটাও বলেছেন, ‘‘অর্থনৈতিক ভাবে অনেক মজবুত আমেরিকা। সামরিক দিক থেকেও তারা এগিয়ে। বিশ্ব জুড়ে অনেক সামরিক অভিযানের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাদের। তবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার মতো ক্ষমতা রয়েছে আমাদের।’’ তাঁর কথায়, ‘‘আমরা একটা অসম যুদ্ধ লড়ছি। অভিজ্ঞতা, অস্ত্র, পরিকল্পনা সব প্রয়োগ করে শত্রুপক্ষকে পিছু হটতে বাধ্য করেছি। শত্রুপক্ষের হাতে ক্ষমতা, অর্থ রয়েছে বিপুল পরিমাণে। কিন্তু ওরা তার অপব্যবহার করছে।’’
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ইরানে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং ফৌজের মধ্যে ‘ভাঙন’ তীব্র হলে, তার সুবিধা পাবে আমেরিকা ও ইজ়রায়েল। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দেশের শাসনব্যবস্থার প্রায় প্রতিটি স্তর রয়েছে আইআরজিসির কব্জায়। ফলে তেহরানের রাজনীতিকদের পক্ষে তাঁদের বিরুদ্ধাচরণ করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে।