২১ ঘণ্টা আলোচনায় ‘অশ্বডিম্ব’ প্রসব! পাকিস্তানের ইসলামাবাদে শান্তি বৈঠক ব্যর্থ হতেই ফের মুখোমুখি সংঘর্ষের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুযুধান ইরান এবং আমেরিকা। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, দ্বিতীয় দফায় আর তেহরানকে সুযোগ দিতে নারাজ ‘সুপার পাওয়ার’ যুক্তরাষ্ট্র। সাবেক পারস্যের সেনা নামার আগেই তাই হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধের ছক কষছে তারা। সেই খবর প্রকাশ্যে আসতেই ইরানি সামরিক কৌশল নিয়ে প্রকাশ্যে এসেছে একটি প্রশ্ন। আস্তিনের ভাঁজে লুকিয়ে রাখা সমস্ত তাস দেখিয়েই কি ভুল করে ফেলেছে ইরান?
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, গত কয়েক দিনে বেশ কিছু ‘চরম ভুল’ করেছে তেহরানের সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) মোজ়তবা খামেনেইয়ের নিয়ন্ত্রণাধীনে থাকা ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি। এর মধ্যে অন্যতম হল হরমুজ় অবরোধে শিথিলতা। গত ১১ এপ্রিল শান্তি বৈঠক চলাকালীন সঙ্কীর্ণ ওই জলপথ দিয়ে পার হয় দু’টি মার্কিন রণতরী। ফলে নতুন করে সংঘর্ষ বাধলে সেখানকার নিয়ন্ত্রণ কতটা ইরানের হাতে থাকবে, তা নিয়ে সন্দেহ দানা বেঁধেছে।
বিশেষজ্ঞেরা মনে করেন, মুখোমুখি লড়াইয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজ়রায়েলের মতো জোড়া শত্রুর মোকাবিলা করা তেহরানের পক্ষে বেশ কঠিন। আর তাই এত দিন সম্পূর্ণ অন্য রণকৌশল নিয়ে চলছিল তারা। সেটা হল, হরমুজ় অবরোধ। এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ খনিজ তেল এবং তরল প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ হয়ে থাকে। সেই রাস্তা আইআরজিসি বন্ধ করায় বিশ্ববাজারে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে শুরু করে তরল সোনার দর। ফলে প্রবল চাপের মুখে পড়ে যায় ওয়াশিংটন ও তেল আভিভ।
এই পরিস্থিতিতে ইসলামাবাদের শান্তিবৈঠকে অন্তত একটি সমাধানসূত্রের দিকে তাকিয়ে ছিল বিশ্ব। সকলেই ভেবেছিলেন, হরমুজ় খোলার ব্যাপারে রাজি হবে তেহরান। কিন্তু, বাস্তবে তা হয়নি। উল্টে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই ওই জলপথ আটকে ফেলার যাবতীয় পরিকল্পনায় কোমর বেঁধে নামতে দেখা গিয়েছে মার্কিন ফৌজকে। ফলে দুনিয়া জুড়ে ফের বাড়ছে জ্বালানি সঙ্কটের আতঙ্ক। শুধু তা-ই নয়, এ বার আগের চেয়ে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, বার বার হরমুজ় বন্ধ রাখায় ইরানের উপর বেশ ‘বিরক্ত’ পশ্চিম এশিয়ার প্রতিটি আরব রাষ্ট্র। এতে মারাত্মক রকম ব্যাহত হচ্ছে তাঁদের জ্বালানি ব্যবসা। পাশাপাশি, ভারত, চিন, জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার (রিপাবলিক অফ কোরিয়া) মতো দেশগুলিরও ওই সামুদ্রিক রাস্তা দিয়ে তরল সোনা ঘরের মাটিতে আনা প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তাই তেহরানের ‘বন্ধু’ থেকে শুরু করে প্রতিবেশী, প্রত্যেকেই বিকল্পের সন্ধানে লেগে পড়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না।
এ ব্যাপারে একটা সহজ সমাধানসূত্রও প্রকাশ্যে এসেছে। পশ্চিমি দুনিয়া ইতিমধ্যেই ওমানের মুসানদাম উপদ্বীপ দিয়ে ‘বাইপাস’ খাল কাটার পক্ষপাতী। প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে হরমুজ় প্রণালীকে এড়িয়ে দিব্যি পারস্য উপসাগরে পৌঁছোতে পারবে পণ্যবাহী জাহাজ। এই খাল কাটার সম্ভাব্য খরচ ১০ হাজার কোটি ডলার ধার্য করা হয়েছে। যদিও এ ব্যাপারে সরকারি ভাবে কোনও প্রতিক্রিয়া দেয়নি মাস্কাট। তা ছাড়া ওই উপদ্বীপে খাল কাটার রয়েছে একগুচ্ছ চ্যালেঞ্জ।
ওমানের মুসানদাম উপদ্বীপের জমি কিন্তু সমতল নয়। বেলাভূমি থেকে হাজ়র পাহাড় সেখানে খাড়া ভাবে উঠে গিয়েছে। আর তাই গোটা এলাকাটা অত্যন্ত রুক্ষ। এ-হেন উপদ্বীপে হরমুজ়ের ‘বাইপাস’ খাল নির্মাণ করতে হলে, সরাতে হবে কয়েক লক্ষ পাথর। তা ছাড়া পাহাড় ফাটিয়ে এই ধরনের উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্প কতটা পরিবেশবান্ধব, তা নিয়েও উঠতে পারে প্রশ্ন। পাশাপাশি, শুষ্ক জলবায়ুর কারণে নাব্যতা ঠিক রাখতে প্রস্তাবিত খালের জলের জোগান ঠিক রাখা বেশ কঠিন।
দ্বিতীয় বিকল্প হিসাবে অনেকে আবার ওমানের ফুজ়াইরাহ বন্দরকে আঁকড়ে ধরতে চাইছেন। এর অবস্থানও হরমুজ় প্রণালীর বাইরে। তা ছাড়া সংশ্লিষ্ট বন্দর পর্যন্ত রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির জ্বালানি তেলের পাইপলাইন। ফলে সেখান থেকে ট্যাঙ্কারভর্তি তরল সোনা ঘরের মাটিতে পরিবহণে ভারত, চিন-সহ বিশ্বের অন্য দেশগুলির সমস্যা নেই। পাশাপাশি, পশ্চিম এশিয়ার বাকি আরব রাষ্ট্রগুলির তেল সংশ্লিষ্ট বন্দরের মাধ্যমে সরবরাহ হোক, চাইছে তারা।
এই তালিকায় তৃতীয় বিকল্পটির ব্যবহার অবশ্য শুরু করে দিয়েছে সৌদি আরব। বাইপাস হিসাবে রিয়াধের ভরসা ‘পূর্ব-পশ্চিম অপরিশোধিত তেল পাইপলাইন’ নেটওয়ার্ক। এর মাধ্যমে লোহিত সাগর এবং বাব এল মান্দেব প্রণালী দিয়ে খনিজ তেল দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে পাঠাচ্ছে ওই উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্র। সংঘর্ষ নতুন করে তীব্রতা পেলে এই রাস্তা যে সৌদির তেল ব্যবসার ‘লাইফলাইন’ হয়ে উঠবে, তা বলাই বাহুল্য।
আরব দুনিয়ায় রিয়াধের ‘পূর্ব-পশ্চিম অপরিশোধিত তেল পাইপলাইন’ আবার পেট্রোলাইন নামে বেশি পরিচিত। প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার লম্বা ওই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আবকাইক তেল প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করেছে সৌদি সরকার। গত শতাব্দীর ৮০-এর দশকে ইরাক-ইরান যুদ্ধ চলাকালীন এর নির্মাণ পরিকল্পনা করে রিয়াধ।
১৯৮১ সালে পেট্রোলাইনের প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ হয়। ওই বছর থেকেই হরমুজ়ের পাশাপাশি লোহিত সাগর দিয়ে ইউরোপ, আফ্রিকা, ভারতীয় উপমহাদেশ এবং প্রাচ্যের দূর দেশগুলিতে খনিজ তেল পাঠানো শুরু করে সৌদি সরকার। যদিও বেশির ভাগ তরল সোনা হরমুজ় দিয়েই সরবরাহ করত রিয়াধ। তবে ভাগ্যের ফেরে ৪৫ বছর পর ‘পূর্ব-পশ্চিম অপরিশোধিত তেল পাইপলাইন’ই সংশ্লিষ্ট আরব মুলুকটির রফতানি বাণিজ্যের প্রধান রাস্তা হয়ে উঠেছে।
গোড়ার দিকে সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কটির মাধ্যমে ইয়ানবু বন্দরে আসত ১৮ লক্ষ ৫০ হাজার ব্যারেল খনিজ তেল। কারণ, পেট্রোলাইনে ৪৮ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপ ব্যবহার করা হয়েছিল। গত শতাব্দীর ৯০-এর দশকে এই ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করে রিয়াধ। সেই লক্ষ্যে ৪৮-এর বদলে সেখানে লাগানো হয় ৫৬ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপ। পাশাপাশি, দ্বিতীয় একটি লাইন যুক্ত করে ওই নেটওয়ার্ককে আরও সম্প্রসারিত করে সৌদি প্রশাসন। এর জেরে বৃদ্ধি পেয়েছে পেট্রোলাইনটির ধারণক্ষমতা।
হরমুজ় অবরুদ্ধ হওয়ার আগে পর্যন্ত পূর্ব-পশ্চিম অপরিশোধিত তেল পাইপলাইন দিয়ে দিনে ২৮ লক্ষ ব্যারেল তেল পৌঁছোচ্ছিল লোহিত সাগরের বন্দরে। সৌদি প্রশাসনের দাবি, এর সর্বাধিক ধারণক্ষমতা ৭০ লক্ষ ব্যারেল। ধীরে ধীরে তরল সোনার পরিবহণকে সেই পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে রিয়াধ। যদিও ওমানের বন্দর এবং সৌদির পেট্রোলাইন, দু’টি বিকল্পের ক্ষেত্রেই রয়েছে আলাদা আলাদা ঝুঁকি, যেটা সংঘর্ষ পরিস্থিতিতে তেহরানের জন্য ‘গেম চেঞ্জার’ হয়ে উঠতে পারে।
সামরিক বিশ্লেষকদের কথায়, আইআরজিসির আত্মঘাতী ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্রের ভান্ডার ফুরিয়ে গিয়েছে ভাবলে ভুল হবে। ফলে হরমুজ়কে এড়িয়ে ওমানের বন্দরে ট্যাঙ্কার চলাচল বৃদ্ধি পেলে সেখানে হামলা চালাতে পারে তেহরান। আর তাই ধ্বংস হতে পারে আমিরশাহির পাইপলাইন পারিকাঠামো। অন্য দিকে বাব এল মান্দেব প্রণালী বন্ধ করতে সাবেক পারস্যের হাতে রয়েছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠী। পর্দার আড়ালে থেকে তাদের ক্রমাগত মদত জোগানোর যথেষ্ট ‘বদনাম’ রয়েছে ইরানের।
পাকিস্তানে শান্তিবৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর তেহরানকে ফের হুঁশিয়ারি দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর দাবি, ১৩ এপ্রিল থেকে হরমুজ় আটকাবে যুক্তরাষ্ট্র। আমেরিকার গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের চারটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা অবরুদ্ধ করার পরিকল্পনা রয়েছে ওয়াশিংটনের নৌবাহিনীর। সেগুলি হল, খার্গ দ্বীপ, জাস্ক টার্মিনাল, বন্দর আব্বাস এবং বন্দর খুমেইনি। বর্তমানে এগুলির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আইআরজিসির হাতে।
এ ব্যাপারে একটি বিবৃতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড। তাতে বলা হয়েছে, হরমুজ়ে অবরোধ নিরপেক্ষ ভাবে সকল দেশের উপরেই প্রয়োগ করা হবে। যে সমস্ত জাহাজ ইরানের কোনও না কোনও বন্দরে প্রবেশ করার চেষ্টা করবে বা সেখান থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করবে, সেগুলিকেই আটকানো হবে। তবে ইরানের বন্দরের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ না-রেখে যে জাহাজগুলি হরমুজ় দিয়ে যাতায়াত করবে, তাদের বাধা দেবে না মার্কিন সেনা।
তবে হরমুজ় অবরুদ্ধ করা যে আমেরিকার পক্ষে সহজ হবে না, ইতিমধ্যেই তার প্রমাণ মিলেছে। কারণ, ওই জলপথের কাছে আসা একটি মার্কিন রণতরীকে সরিয়ে দেওয়ার ভিডিয়ো প্রকাশ করেছে আইআরজিসি। সেখানে তাদের হুমকির মুখে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজটিকে পড়তে দেখা গিয়েছে। এর জেরে শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয় ওই রণতরী। যদিও, সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিয়োটির সত্যতা যাচাই করেনি আনন্দবাজার ডট কম।
বিশ্লেষকদের বড় অংশই মনে করেন, ওমানে খাল কাটার পরিকল্পনাটি বিকল্প হিসাবে সবচেয়ে ভাল। তবে এর জন্য অপেক্ষা করতে হবে আগামী কয়েক দশক। তার মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষ তীব্র হলে আরব রাষ্ট্রগুলি এককাট্টা হয়ে তেহরানের বিরুদ্ধে নতুন কোনও ফ্রন্ট খোলে কি না, সেটাই এখন দেখার।
সব ছবি: সংগৃহীত।