পাকিস্তানে হওয়া শান্তিবৈঠক ডাহা ফেল! ফলে যে কোনও মুহূর্তে আবার মুখোমুখি সংঘাতে জড়াতে পারে ইরান ও আমেরিকা। প্রথম দফায় সংঘর্ষে অপূরণীয় ক্ষতি সত্ত্বেও ‘সুপার পাওয়ার’ যুক্তরাষ্ট্রকে পাল্টা মার দিতে দ্বিধা করেনি তেহরান। সাবেক পারস্যের সেই প্রত্যাঘাতে বিপুল লোকসানের মুখে পড়েছে ওয়াশিংটন। অন্য দিকে সংশ্লিষ্ট লড়াইয়ে মার্কিন ফৌজের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ইজ়রায়েল কিন্তু অনেকটাই এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে ক্ষয়ক্ষতি। একযাত্রায় পৃথক ফল কী ভাবে? উঠছে প্রশ্ন।
‘দ্য ইউরেশিয়ান টাইম্স’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ইরান যুদ্ধে একগুচ্ছ লড়াকু জেট, বেশ কয়েকটা মাঝ-আকাশে জ্বালানি ভরার ট্যাঙ্কার-বিমান, ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সক্ষম ড্রোন এবং কয়েক কোটি মূল্যের আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) সিস্টেমের রেডার হারিয়েছে মার্কিন ফৌজ। সেখানে ইহুদিদের ক্ষয়ক্ষতির তালিকায় আছে মাত্র ১৮টা ‘আত্মঘাতী’ পাইলটবিহীন যান। শুধু তা-ই নয়, এখনও পর্যন্ত ইজ়রায়েলের একটা জেটকেও গুলি করে নামাতে পারেনি তেহরান।
পশ্চিম এশিয়ার রণাঙ্গনে লোকসানের অঙ্ক অবশ্য সরকারি ভাবে ঘোষণা করেনি মার্কিন যুদ্ধ দফতরের (ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার) সদর কার্যালয় পেন্টাগন। তবে সেখানকার বেশ কিছু সূত্রকে উদ্ধৃত করে এই সংক্রান্ত বহু তথ্য গত দেড় মাসে প্রকাশ্যে এনেছে যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম। তাঁদের দাবি, সংশ্লিষ্ট লড়াইয়ে একটি পঞ্চম প্রজন্মের ‘স্টেলথ’ শ্রেণির এফ-৩৫ লাইটনিং টু এবং চতুর্থ প্রজন্মের অন্তত ৭-৮টি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল লড়াকু জেট ধ্বংস হয়েছে আমেরিকার।
সূত্রের খবর, এ ছাড়া ইরান যুদ্ধে ট্যাঙ্ক ও সাঁজোয়া গাড়ি ধ্বংসকারী একটি এ-১০ থান্ডারবোল্ট টু যুদ্ধবিমান এবং মাঝ-আকাশে জ্বালানি ভরার ছ’টি কেসি-১৩৫ ট্যাঙ্কার বিমান হারিয়েছে আমেরিকার বায়ুসেনা। পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রের ১৭টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোনকেও মাঝ-আকাশে ধ্বংস করে তেহরানের আধা সেনা ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি। রহস্যজনক ভাবে হরমুজ় প্রণালীতে টহলদারির সময় গায়েব হয়ে গিয়েছে মার্কিন নৌবাহিনীর একটি এমকিউ-৪সি ট্রিটন নজরদারি ড্রোন।
মার্কিন ফৌজের বহরে থাকা বিভিন্ন পাইলটবিহীন যানের মধ্যে এমকিউ-৪সি ট্রিটন সবচেয়ে দামি। এর এক একটি ইউনিটের নির্মাণখরচ প্রায় ২০ কোটি ডলার। সূত্রের খবর, পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ় প্রণালীতে ঘণ্টা তিনেক নজরদারি চালানোর পর সংশ্লিষ্ট ড্রোনটি ইটালির সিগোনেলা নৌঘাঁটিতে ফিরছিল। কিন্তু তার আগেই রহস্যজনক ভাবে সেটি উধাও হয়ে যায়। তবে ড্রোনটি ভেঙে পড়েছে না কি গুলি করে সেটিকে নামানো হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।
ফ্লাইটরেডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন ড্রোনটি ইরানি বেলাভূমির দিকে সামান্য বাঁক নিয়েছিল। ঠিক তখনই জরুরি বার্তা যায় সেটি থেকে। সূত্রের খবর, সংশ্লিষ্ট ড্রোনটি সিগোনেলা ঘাঁটিতে ৭৭০০ কোড পাঠাচ্ছিল। এটি প্রকৃতপক্ষে জরুরি ভিত্তিতে অবতরণের সঙ্কেত। ওই কোড পাঠানোর কিছু ক্ষণের মধ্যেই পাইলটবিহীন যানটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর। গোটা ঘটনার নেপথ্যে তেহরানের হাত থাকার আশঙ্কাই প্রবল, বলছেন বিশ্লেষকেরা।
এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ইরানের আকাশে ধ্বংস হয় দু’টি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল মার্কিন লড়াকু জেট। যদিও শেষ মুহূর্তে ককপিট থেকে বেরিয়ে প্রাণ বাঁচান যোদ্ধা-পাইলটেরা। সাবেক পারস্যের ভিতরেই আত্মগোপন করে ছিলেন তাঁরা। কয়েক ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস অভিযান চালিয়ে শত্রুভূমি থেকে তাঁদের উদ্ধার করে যুক্তরাষ্ট্রের কমান্ডো বাহিনী। সেই অপারেশন চলাকালীন আইআরজিসির গুলিতে তিনটি সিকোরস্কি ইউএইচ-৬০ ব্ল্যাক হক সামরিক হেলিকপ্টার মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
এই সংঘর্ষের একেবারে গোড়ায় পশ্চিম এশিয়ার আরব দেশগুলিতে মোতায়েন আমেরিকার চারটি ‘টার্মিনাল হাই-অল্টিচ্যুড এরিয়া ডিফেন্স’ বা থাড আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থা এবং কয়েক কোটি ডলারের একটি এএন/এফপিএস-১৩২ ব্লক ৫ আপগ্রেডেড আর্লি ওয়ার্নিং রেডারকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় উড়িয়ে দেয় আইআরজিসি। এর মধ্যে দ্বিতীয় অস্ত্রটিকে আবার কাতারের ঘাঁটিতে রেখেছিল মার্কিন ফৌজ।
এর পাশাপাশি একটি ই-৩ সেন্ট্রি অ্যাওয়াক্স উড়ন্ত রেডার ধ্বংস হয়েছে আমেরিকার। অন্য দিকে ইজ়রায়েল হারিয়েছে এলবিট হার্মিস ৪৫০/৯০০ এবং আইএআই হেরনের মতো ১৮টা ধীরগতির ড্রোন। এ ছাড়া ইহুদিভূমিতে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় তিনটি অসামরিক বিমানকেও উড়িয়েছে আইআরজিসি। হামলার সময় সেগুলিতে অবশ্য কোনও যাত্রী ছিলেন না। ফলে কেউ নিহত বা আহত হননি।
বিশ্লেষকদের দাবি, ইরান যুদ্ধে ইজ়রায়েলের তুলনায় মার্কিন সামরিক সম্পদ বেশি ধ্বংস হওয়ার নেপথ্যে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, ইহুদি বিমানবাহিনী ইলেকট্রনিক লড়াইয়ে বেশি পটু। ফলে শত্রুর ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন অকেজো করে ফেলার মুনশিয়ানা আছে তাদের। অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্রের যোদ্ধা পাইলটদের বার বার তেহরানের পাতা ফাঁদে পা দিতে দেখা গিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, কিছু ক্ষেত্রে নিজেদের জেট নিজেরাই ধ্বংস করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
দ্বিতীয়ত, ইজ়রায়েল এবং আমেরিকার উপর প্রত্যাঘাতের জন্য মূলত রাশিয়া এবং চিনের থেকে গোয়েন্দা তথ্য পাচ্ছে তেহরান। মস্কো ও বেজিঙের ‘শত্রুতা’ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যতটা, ইহুদিদের ক্ষেত্রে ততটা নেই। পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের সুযোগ নিয়ে ওয়াশিংটনের সামরিক সম্পদ ধ্বংস করাই তাদের মূল লক্ষ্য। আর তাই মার্কিন যুদ্ধবিমান, ড্রোন বা রেডার সংক্রান্ত খবরই বেশি করে আইআরজিসিকে দিয়ে চলেছে ক্রেমলিন ও ড্রাগন প্রশাসন, বলছেন বিশ্লেষকেরা।
তা ছাড়া ইজ়রায়েল এবং মার্কিন ফৌজের আক্রমণের ধরনেও আকাশ-পাতাল ফারাক রয়েছে। ইরান যুদ্ধের প্রথম দিনে (পড়ুন ২৮ ফেব্রুয়ারি) যৌথ ভাবে তেহরানের গুপ্তঘাঁটিতে হামলা চালায় তারা। তাতে প্রাণ হারান সাবেক পারস্যের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই। কিন্তু, পরবর্তী সময়ে সে ভাবে আর তাদের একসঙ্গে অভিযান করতে দেখা যায়নি। আলাদা আলাদা ভাবে অবশ্য আইআরজিসিকে নিশানা করে যাচ্ছে তেল আভিভ ও ওয়াশিংটন।
এ বছরের গোটা মার্চ এবং এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ জুড়ে পশ্চিম ও মধ্য ইরানের বিভিন্ন সামরিক ঠিকানায় হামলা চালিয়ে গিয়েছে ইহুদি বিমানবাহিনী। মূলত তেহরানের ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলি উড়িয়ে দেওয়াই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। পাশাপাশি, তেহরানের অসামরিক শাসকগোষ্ঠীর গুপ্তঘাঁটি, খনিজ তেল উত্তোলন কেন্দ্র এবং পারমাণবিক পরিকাঠামো ধ্বংসে তেল আভিভকে মনোযোগী হতে দেখা গিয়েছে।
অন্য দিকে মার্কিন বিমান ও নৌবাহিনী সর্বাধিক আক্রমণ চালিয়েছে দক্ষিণ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলিতে। পাশাপাশি, তেহরানের নৌসেনাকেও নিশানা করতে দেখা গিয়েছে তাদের। সাবেক পারস্যের রণতরী ডোবাতে ডুবোজাহাজ ব্যবহার করতেও পিছপা হয়নি পেন্টাগন। এ ছাড়া পাহাড়ের ভূগর্ভস্থ আণবিক হাতিয়ারের গবেষণা ও নির্মাণকেন্দ্র উড়িয়ে দিতে দূরপাল্লার কৌশলগত ‘স্টেলথ’ বোমারু বিমান পর্যন্ত নামিয়েছে ওয়াশিংটন।
সাবেক সেনাকর্তাদের বড় অংশই মনে করেন, আইআরজিসির শক্তিকে গুরুত্ব না দিয়েই ইরান যুদ্ধে নেমে পড়ে আমেরিকা। এর বড়সড় খেসারত দিতে হচ্ছে তাদের। তেহরানে প্রথম আঘাতের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়ে দেন সাবেক পারস্যের যাবতীয় আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। যদিও গোয়েন্দা সূত্রকে উদ্ধৃত করে এ ব্যাপারে বিস্ফোরক প্রতিবেদন প্রকাশ করে সিএনএন। সেখানে দাবি করা হয়, ইরানি সেনার ৫০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন অক্ষত রয়েছে।
তা ছাড়া পশ্চিম এশিয়ার প্রায় প্রতিটা আরব দেশেই রয়েছে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রত্যাঘাত শানাতে সংশ্লিষ্ট ছাউনিগুলি যে আইআরজিসি বেছে নিতে পারে সেটা যুক্তরাষ্ট্রের কমান্ডারেরা কল্পনাও করতে পারেননি। যদিও বাস্তবে ঠিক সেটাই হয়েছিল। ফলে সেখানে মোতায়েন থাকা রেডার বা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে গোড়াতেই হারিয়ে বসে আমেরিকা।
সব শেষে অবশ্যই বলতে হবে ইরানের ‘হাইপারসনিক’ ক্ষেপণাস্ত্রের কথা। শব্দের পাঁচ গুণের চেয়ে গতিশীল এই ব্রহ্মাস্ত্র ঠেকানোর কোনও কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর হাতে নেই। এর জেরে ‘চরম মূল্য’ দিতে হচ্ছে তাদের। তা ছাড়া মার্কিন ফৌজের কাছে যুদ্ধের কারণ স্পষ্ট নয়। কারণ, কখনও তেহরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের কুশাসন, কখনও আবার সেখানকার খনিজ তেল কব্জা করার কথা প্রকাশ্যে বলছেন ট্রাম্প।
ইহুদিদের মনে কিন্তু ইরান আক্রমণের কারণ নিয়ে কোনও রকমের ধোঁয়াশা নেই। ইজ়রায়েলকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে ফেলতেই তেহরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে চাইছে বলে মনে করে তেল আভিভ। আর তাই সেখানে ক্ষমতাবদল না হওয়া পর্যন্ত এই লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন ইহুদি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।
ছবি: সংগৃহীত ও এআই সহায়তায় প্রণীত।