পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের অশান্তির কারণে অবরুদ্ধ হরমুজ় প্রণালী। সমস্যার মুখে পড়েছে ভারতে তেল-গ্যাস আমদানি। বিশেষত রান্নার গ্যাস বা এলপিজি। মঙ্গলবার দু’পক্ষ সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে রাজি হলেও সমস্যা এখনও পুরোপুরি মেটেনি। কারণ দেশে প্রয়োজনের ৬০ শতাংশ এলপিজি আমদানি করতে হয়, যার ৯০ শতাংশ আসে পশ্চিম এশিয়া থেকে। তাই ইরানের সহযোগিতায় আগে এলপিজি ভর্তি জাহাজগুলিকেই বার করে আনার চেষ্টা হচ্ছে।
সম্প্রতি কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক জানিয়েছে, দেশে এলপিজি উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে। চাহিদা মেটাতে বাড়ানো হয়েছে ৫ কেজি ওজনের ছোট সিলিন্ডারের জোগানও, যা সচিত্র পরিচয়পত্র দেখিয়ে কেনা যাচ্ছে এলপিজি বণ্টনকারীদের থেকে। তবে এই সিলিন্ডারে ভর্তুকি মেলে না।
২৩ মার্চের পর থেকে দেশ জুড়ে সিলিন্ডার বিকিয়েছে ৬.৬ লক্ষ। মন্ত্রকের দাবি, পরিবহণের জন্য এলএনজি সরবরাহে কোনও সমস্যা নেই। জাহাজে করে তা আনা হচ্ছে। তার ভিত্তিতে সার কারখানাগুলিতে গড়ে যে পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস প্রয়োজন হয়, তার ৯০ শতাংশ এলএনজি সরবরাহ করা হচ্ছে।
কেন্দ্রের কাছ থেকে আশ্বাস মিললেও জ্বালানি নিয়ে আশঙ্কা কমছে না সাধারণ মানুষের মধ্যে। তবে অনেকেই জানেন না, ১৯৫৪ সালে এ রকমই এক জ্বালানি-সমস্যার হাত থেকে ভারতকে রক্ষা করেছিল বলিউড।
অবিশ্বাস্য লাগছে? লাগলেও এ কথা সত্যি। ১৯৫০-এর দশকে ভারতের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য প্রচণ্ড গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল অপরিশোধিত তেলের জোগান। সেই তেল পাওয়ার জন্য রাশিয়ার (তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন) সঙ্গে হাত মেলায় তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকার।
সোভিয়েত রাজিও হয়। তবে বিশেষ শর্তও দেওয়া হয়। কী সেই শর্ত? মস্কো জানিয়েছিল, অপরিশোধিত তেলের পরিবর্তে ভারত থেকে বলিউডি ছবি পাঠাতে হবে সোভিয়েতে।
সে সময়ে ভারতের বিদেশি মুদ্রার ভান্ডার প্রায় খালি ছিল। হাতে মার্কিন ডলারও ছিল খুব কম। ফলে ভারত প্রথমে আমেরিকার দ্বারস্থ হলেও নয়াদিল্লির আবেদনে সাড়া দেয়নি ওয়াশিংটন।
তখনই ভারতের ত্রাতা হিসাবে আগমন হয় সোভিয়েতের। ভারতের হাতে তখন রুশ রুবল ছিল না। সোভিয়েতও চাইত না ভারতীয় মুদ্রায় এই চুক্তি হোক।
ফলে সোভিয়েতের সঙ্গে অন্য এক চুক্তি করেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জহওরলাল নেহরু। ঠিক হয়, সোভিয়েতের তরফে ভারতে একটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা হবে। মস্কো থেকে তেল এবং যন্ত্রপাতি কিনবে নয়াদিল্লি। সোভিয়েতকে টাকা মেটানো হবে ভারতীয় মুদ্রায়।
ধার্য মূল্য ভারতীয় টাকাতেই সোভিয়েতের ওই ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা হবে। কিন্তু সেই টাকা সোভিয়েত নিজেদের মুদ্রায় রূপান্তর করবে না। পরিবর্তে ওই টাকা দিয়েই আবার ভারতীয় পণ্য কিনবে তারা।
ভারতীয় যে সব পণ্যের তখন সোভিয়েত ইউনিয়নে চাহিদা ছিল তা হল, পাট, মশলা, চা এবং বলিউডি ছবি। ফলে ব্যাপক ভাবে বলিউডি ছবি পাঠানো শুরু হয় সোভিয়েতে। তবে এই পুরো বিষয়টি খুব আকস্মিক ছিল না। সোভিয়েতের রাষ্ট্রায়ত্ত চলচ্চিত্র সংস্থা মুম্বইয়ে নিজেদের অফিস চালু করেছিল ১৯৪৬ সালে।
ভারতীয় চলচ্চিত্রনির্মাতাদের সস্তায় ছবি তৈরির সরঞ্জাম এবং রিল সরবরাহ করত সংস্থাটি। পরিবর্তে বলিউডি ছবি সোভিয়েতে রফতানি করত তারা। লক্ষ্য ছিল, দেশের জনগণের কাছে পশ্চিমি ছবির বিকল্প পৌঁছে দেওয়া।
সে সময় বিভিন্ন সামাজিক বিষয় নিয়ে ছবি তৈরি হত বলিউডে। আর সেই সব ছবিতে নাটকীয় চিত্রনাট্যের পাশাপাশি থাকত নাচ-গানের দৃশ্য, যা সোভিয়েতের জনগণের কাছে ছিল অত্যন্ত মনোরঞ্জক। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই সোভিয়েতে বলিউডি ছবির চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছিল।
ছবির মাধ্যমেই সোভিয়েতের সঙ্গে ভারতের সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান শুরু হয়। এর মধ্যে ১৯৫১ সালে মুক্তি পাওয়া রাজ কপূর অভিনীত ছবি ‘আওয়ারা’ ব্যাপক সাফল্য পায় সোভিয়েতে।
এর পর রাজ কপূর সোভিয়েত সফরে গেলে, তাঁকে সেখানে ছেঁকে ধরেন সোভিয়েত জনতা। তাঁকে লক্ষ্য করে ভিড় বাড়তে থাকলে সেখান থেকে চলে যাওয়ার চেষ্টা করেন রাজ। কিন্তু সে সময় সোভিয়েতের উত্তেজিত জনগণ রাজের গাড়ি ঘিরে ধরে গাড়িটিকে শূন্যে তুলে দিয়েছিলেন বলে শোনা যায়।
এ ছাড়াও বলিউডি ছবির মহিলা চরিত্রের নামে রাশিয়ার মহিলাদের নামকরণ সে সময় সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। হিন্দি ভাষাও সমান জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল সে দেশে। দেশের অন্দরে বলিউডি ছবির লাগাতার চাহিদা দেখে বর্ধিত ভারতকে প্রযুক্তিগত দক্ষতা, তেল এবং যন্ত্রপাতি সরবরাহ করতে সম্মত হয় সোভিয়েত।
সোভিয়েত বিশেষজ্ঞেরা ভারতে ২৬টিরও বেশি তেলক্ষেত্র শনাক্ত করতেও সাহায্য করেছিলেন। এর ফলে ১৯৫৮ সালে গুজরাতের অঙ্কেলেশ্বরে তেলক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়। ১৯৬০-এর দশকে শোধনাগারও স্থাপন করা হয় সেখানে।
ভারতে তেলের রফতানি এবং জোগান বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক দিক থেকেও ফুলেফেঁপে উঠতে শুরু করে ভারত। বলিউডি ছবির জনপ্রিয়তাও বৃদ্ধি পেতে থাকে দেশ-বিদেশে।
সব ছবি: সংগৃহীত।