ইরান যুদ্ধের আঁচে এ দেশের আমজনতার হেঁশেলে আগুন! হরমুজ় প্রণালী বন্ধ থাকায় তীব্র হচ্ছে রান্নার গ্যাস-সহ পেট্রোপণ্যের সঙ্কট। এই পরিস্থিতিতে কালোবাজারি ঠেকাতে ‘অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন’ বা একা (এসেনশিয়াল কমোডিটিজ় অ্যাক্ট) জারি করেছে কেন্দ্র।
বর্তমানে ইরান যুদ্ধের জেরে বিশ্ব জুড়ে একরকম খনিজ তেল সরবরাহ বন্ধ রেখেছে পশ্চিম এশিয়ার প্রায় সমস্ত আরব মুলুক। ফলে পেট্রল-ডিজ়েল, রান্নার গ্যাস থেকে বিমানের জ্বালানির সঙ্কট তৈরি হচ্ছে।
মোদী সরকারের বাণিজ্য ও পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক সূত্রে খবর, বর্তমানে আলজ়েরিয়া, অ্যাঙ্গোলা, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম, ব্রাজ়িল, ব্রুনাই, কানাডা, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, মিশর, নিরক্ষীয় গিনি, ঘানা, গ্রিস, গিনি, ইজ়রায়েল, দক্ষিণ কোরিয়া (রিপাবলিক অফ কোরিয়া), লিবিয়া, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, নেদারল্যান্ডস, নাইজ়েরিয়া, নরওয়ে, ওমান, পানামা, সেনেগাল, টোগো, তুরস্ক, ব্রিটেন, আমেরিকা এবং ভেনেজ়ুয়েলা-সহ ৪০টি দেশ থেকে ঘুরপথে তেল আনা হচ্ছে। তালিকায় রয়েছে রাশিয়ার নামও।
তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির কোনও পরিবর্তন না হলে জ্বালানি নিয়ে দেশে সঙ্কট বৃদ্ধি পেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। ইজ়রায়েল এবং আমেরিকার সঙ্গে ইরানের সংঘাতে তৈরি হওয়া জ্বালানি সঙ্কট ভারত ছাড়াও প্রভাব ফেলতে পারে চিন এবং পূর্ব এশিয়ার উপর।
চিন বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক। পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত দীর্ঘমেয়াদি এবং আরও বড় আকার ধারণ করলে তেলবিভ্রাটের ফলে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে চিনও। তবুও, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং তাইওয়ানের তুলনায় চিন সেই ধাক্কা ভাল ভাবে সামলে নেবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা।
বিপুল পরিমাণে তেল উৎপাদন করে চিন। ফলে তেলসঙ্কট চিনকে বিপদে ফেললেও আঞ্চলিক প্রতিবেশী এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় শক্তিশালী থাকবে বেজিঙের অবস্থান। তেমনটাই মত বিশেষজ্ঞদের।
এর কারণ চিনের জ্বালানি মজুতের পরিমাণ। চিনের আনুমানিক পেট্রোলিয়াম মজুতের পরিমাণ ৪০-৫০ কোটি ব্যারেল। তা ছাড়াও চিনের জাতীয় পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন, সিনোপেক এবং সিএনওওসি-র মতো চিনা তেল সংস্থাগুলির মাধ্যমে প্রায় ৬০-৯০ কোটি ব্যারেল বাণিজ্যিক তেল মজুত রাখে। সব মিলিয়ে মোট প্রায় ১২০-১৩০ কোটি ব্যারল।
চিনে তেলের চাহিদা প্রতি দিন প্রায় ১.৫ কোটি ব্যারেল। ফলে বিশেষজ্ঞেরা মনে করছেন, পশ্চিম এশিয়া থেকে তেলের আমদানি বন্ধ থাকলেও তাদের হাতে থাকা মজুত তেলের পরিমাণের কারণে ৮০-৯০ দিন জ্বালানি নিয়ে চিন্তা করতে হবে না বেজিংকে।
তেলের মতো বেজিঙের হাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাসও মজুত রয়েছে। কিন্তু কেন এত তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস মজুত করে রেখেছে চিন? উত্তর, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরে ইউরোপ জুড়ে প্রাকৃতিক গ্যাসের সঙ্কট দেখা দিয়েছিল।
ভবিষ্যতে এশিয়াতেও এই ধরনের সঙ্কট হলে কী হবে? সেই ভাবনা থেকেই নিজেদের জ্বালানি নীতিতে বদল আনার সিদ্ধান্ত নেয় চিনের শি জিনপিং সরকার। শুরু হয় তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত বৃদ্ধি।
তার পর থেকে যেখানেই সস্তা এবং অপরিশোধিত তেল পাওয়া যাচ্ছিল, তা বেশি পরিমাণে কিনে নিতে শুরু করে চিন। ভরাতে থাকে জ্বালানির ভান্ডার। একই সঙ্গে জ্বালানি মজুত করার ক্ষমতাও বৃদ্ধি করতে শুরু করে বেজিং।
দেশের অর্থনীতি এবং অন্যান্য ক্ষেত্র সচল রাখতে যত জ্বালানির প্রয়োজন, তার থেকেও বেশি জ্বালানি আমদানি এবং মজুত করতে শুরু করে বেজিং। ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী মনে করা হচ্ছে, চিন প্রতি দিনের হিসাবে প্রায় ১০ লক্ষ ব্যারেল করে মজুতের পরিমাণ বাড়িয়েছে।
২০২৪-এর শেষে চিনের মোট ২৩০ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল মজুত করার ক্ষমতা ছিল। কিন্তু ২০২৫-’২৬ অর্থবর্ষে চিন আরও ১০০ কোটি ব্যারেল তেল মজুত করার ক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে বলে খবর। তবে ক্ষমতা অনেক বেশি থাকলেও বর্তমানে ১২০-১৩০ কোটি ব্যারল অপরিশোঝিত তেলই মজুত রয়েছে বেজিঙের।
চিনের শরডং, ফুজিয়ান, জেজিয়ং, গোয়েডং এবং তিনজিয়াঙে এই তেল মজুতের নতুন ভান্ডারগুলি তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি খবর, তেল মজুতের জন্য চলতি বছরে ১১টি নতুন মজুতকেন্দ্র তৈরি করছে চিন। সেই ভান্ডারগুলিতে আনুমানিক ১৭ কোটি ব্যারেল তেল মজুত করা যাবে বলেও জানা গিয়েছে।
জ্বালানি নিয়ে চিনের এই রণনীতির কারণে সবচেয়ে বেশি লাভ হয়েছে রাশিয়ার। পশ্চিমি বিশ্বের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে রাশিয়ার তেল রফতানি কিছু সময়ের জন্য মুখ থুব়ড়ে পড়েছিল। এর পর বেজিংকে বেশি করে অপরিশোধিত তেল সরবরাহ শুরু করে মস্কো। ২০২৪-’২৫ সালে চিনে প্রায় প্রতি দিন ২০ লক্ষ ব্যারেলেরও বেশি তেল সরবরাহ করেছে রাশিয়া।
তেলের পাশাপাশি প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুতও বাড়িয়েছে চিন। ২০২৫ সালের শেষ দিকে চিনের প্রাকৃতিক গ্যাস মজুতের পরিমাণ ৫৫০০-৬০০০ কোটি কিউবিক মিটারে পৌঁছে গিয়েছে।
গ্যাস মজুতের জন্য একাধিক নতুন কাঠামোও তৈরি করছে চিন। তবে এই ভান্ডারগুলি তৈরি হচ্ছে মূলত মাটির তলায় এবং পাহাড়ি প্রান্তরে।
হরমুজ় প্রণালীর মতো মলাক্কা প্রণালী বা দক্ষিণ চিন সাগরে একই রকম সঙ্কট যদি দেখা দেয়, সে কথা মাথায় রেখেই জ্বালানির ভান্ডার ভর্তি করে রাখতে উদ্যত হয়েছে বেজিং। ফলে পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের আবহে এখন যেখানে এশিয়ার একাধিক দেশে জ্বালানি সঙ্কট দেখা দিয়েছে, সে সময় নিজেদের জ্বালানির ভাঁড়ার ভরে রাখছে চিন।
সব ছবি: রয়টার্স এবং ফাইল থেকে।