ফের হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধ করল ইরান। পশ্চিম এশিয়ায় সংঘর্ষ শুরুর দেড় মাসের মাথায় সংশ্লিষ্ট সামুদ্রিক রাস্তা খুলে দেয় তেহরান। ফলে অচিরেই ভারত-সহ গোটা বিশ্বে জ্বালানি-সঙ্কট মিটতে চলেছে বলে আশাবাদী ছিল ওয়াকিবহাল মহল। কিন্তু, সে গুড়ে বালি! নতুন করে সাবেক পারস্যের শিয়া ফৌজ হরমুজ় আটকানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ায় আরব দুনিয়ায় পরিস্থিতি যে জটিল হল, তা বলাই বাহুল্য। সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, সেখানে আবার আক্রমণ শানাবে আমেরিকা ও ইজ়রায়েল।
চলতি বছরের ১৮ এপ্রিল, শনিবার নতুন করে হরমুজ় অবরোধের কথা ঘোষণা করে তেহরান। এ ব্যাপারে ইতিমধ্যেই একটি বিবৃতি দিয়েছে ইরানের সামরিক কমান্ড। সেখানে বলা হয়েছে, প্রতিশ্রুতি ভেঙে সাবেক পারস্যের বিভিন্ন বন্দরে যাতায়াতকারী জাহাজগুলির উপর নৌ অবরোধ চালিয়ে যাচ্ছে আমেরিকা। আর তাই সংশ্লিষ্ট জলপথটি ফের বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। উপসাগরীয় দেশটির শিয়া ফৌজের এ-হেন পদক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্রের উপরে যে চাপ বাড়ল, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
গত ১৭ এপ্রিল, শুক্রবার ইরানকে ‘পূর্ণ শক্তিতে নৌ অবরোধ’-এর হুঁশিয়ারি দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর দেওয়া হুমকির ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই হরমুজ়ে ফের অবরোধ শুরুর কথা ঘোষণা করল শিয়া ধর্মগুরু তথা সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) মোজ়তবা খামেনেইয়ের দেশ। তেহরানের সামরিক কমান্ডের সাফ কথা, ‘‘যত ক্ষণ না আমাদের দিকে আগত সমস্ত জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা আমেরিকা দিচ্ছে, তত ক্ষণে এই সামুদ্রিক রাস্তার উপর জারি থাকবে কঠোর নিয়ন্ত্রণ।’’
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ় প্রণালী? পশ্চিম এশিয়ার সঙ্কীর্ণ সামুদ্রিক রাস্তাটিকে আরব দুনিয়ার খনিজ তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস বাণিজ্যের ‘লাইফলাইন’ বলা যেতে পারে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তরল সোনা এই পথে সরবরাহ করে থাকে যাবতীয় উপসাগরীয় রাষ্ট্র। এর মধ্যে অন্যতম হল ইরাক, কুয়েত, কাতার, বাহরিন, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, ওমান এবং সৌদি আরব। হরমুজ়কে বাদ দিলে এদের কাছে জ্বালানি বাণিজ্যের বিকল্প কোনও রাস্তা নেই বললেই চলে।
১৬৭ কিলোমিটার লম্বা এবং ৩৩ কিলোমিটার চওড়া হরমুজ় প্রণালী পারস্য উপসাগরকে যুক্ত করেছে ওমান সাগরের সঙ্গে। এর উত্তরে আছে ইরান। আর দাক্ষিণাত্যের বেলাভূমি ওমানের। তেহরানের পক্ষে কোনও ভাবেই মাস্কাটের জলসীমায় ঢুকে সামুদ্রিক রাস্তা অবরুদ্ধ করা সম্ভব নয়। তা হলে কেন ওমানের উপকূল সংলগ্ন এলাকা দিয়ে যাতায়াত করছে না পণ্যবাহী জাহাজ? সে ক্ষেত্রে তো অনায়াসেই শিয়া ফৌজের অবরোধ এড়াতে পারবে তারা!
সমুদ্র-বিজ্ঞানীদের দাবি, ভূ-প্রাকৃতিক কারণেই ওমান উপকূল সংলগ্ন এলাকা দিয়ে জাহাজ নিয়ে যাওয়া অসম্ভব। প্রথমত, সেখানকার নাব্যতা মালবাহী জলযান চলার অনুপযুক্ত। দ্বিতীয়ত, এলাকাটিতে জলের তলায় রয়েছে অসংখ্য ছোট-বড় এবড়ো-খেবড়ো পাথর, যাতে ধাক্কা লাগলেই মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে জাহাজ। শুধু তা-ই নয়, সামান্য অসাবধানতায় ডুবে যেতে পারে তেল বা তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের ট্যাঙ্কার। এই ঝুঁকি নিতে রাজি নয় কেউই।
হরমুজ় প্রণালীর যে কোনও অংশ দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করে, এ কথা ভাবলে ভুল হবে। এর জন্য সেখানে আছে দু’টি সুনির্দিষ্ট পথ। তার একটা দিয়ে জাহাজ পারস্য উপসাগরের দিকে যায়। অপরটিতে ফিরে আসে ওমান সাগরে। দু’টি রাস্তার প্রতিটি মাত্র ৩ কিলোমিটার চওড়া। মজার বিষয় হল, পুরোপুরি ভাবে ইরানি উপকূলের গা ঘেঁষেই গিয়েছে এই সামুদ্রিক পথ। ফলে সংঘাত পরিস্থিতিতে বার বার সেটা অবরুদ্ধ করার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে তেহরান।
গত কয়েক দশক ধরে হরমুজ়ের জোড়া রুটে নির্বিঘ্নে চলাচল করছে সমস্ত পণ্যবাহী জাহাজ। তিন কিলোমিটার চওড়া দুই লেনের এ-হেন সামুদ্রিক রাস্তা তৈরির সময় একগুচ্ছ বিষয়ের উপর নজর দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে অন্যতম হল জাহাজের নিরাপত্তা। অতীতে ওমান উপকূলের গা ঘেঁষে জাহাজ নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা যে কেউ করেননি, এমনটা নয়। তবে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসেনি। ফলে রণে ভঙ্গ দিয়ে শেষ পর্যন্ত চেনা রুটেই ফিরতে হয়েছে অভিজ্ঞ ক্যাপ্টেনদের।
এ বছরের ১৬ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার লেবানন-ইজ়রায়েলের মধ্যে সংঘর্ষবিরতির কথা ঘোষণা করেন ট্রাম্প। তার পরই হরমুজ়ের ব্যাপারে কিছুটা নরম মনোভাব দেখায় ইরান। ১৭ এপ্রিল, শুক্রবার তেহরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়ে দেন, সমস্ত জাহাজের জন্য পুরোপুরি খুলে দেওয়া হচ্ছে ওই সামুদ্রিক রাস্তা। লড়াই বন্ধ থাকা অবস্থায় এই পরিস্থিতি বজায় থাকবে বলে আশ্বাস দেন তিনি। প্রাথমিক ভাবে তেহরানের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট। যদিও সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
ইরান হরমুজ় খোলার কথা ঘোষণা করতেই গণমাধ্যমে বিবৃতি দেন ট্রাম্প। বলেন, ‘‘গোটা বিশ্বের জন্য এটা একটা দারুণ দিন।’’ কিন্তু, এর পাশপাশি তেহরানকে নিয়ে তাঁর গলায় ছিল হুঁশিয়ারির সুর। সাবেক পারস্যের সঙ্গে আমেরিকার লেনদেন ১০০ শতাংশ সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ়ে মার্কিন নৌসেনা অবরোধ চালিয়ে যাবে বলে স্পষ্ট করেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গেই পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ক্ষোভ উগরে দেন শিয়া মুলুকটির পার্লামেন্টের স্পিকার মহম্মদ বাকের কালিবাফ।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, হরমুজ় নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যকে খোঁচা দিয়ে ইতিমধ্যেই ‘এক্স’ হ্যান্ডলে (সাবেক টুইটার) পোস্ট করেছে দক্ষিণ আফ্রিকার (সাউথ আফ্রিকা) ইরানি দূতাবাস। তাদের কথায়, ‘‘পারস্য উপসাগরে ঢোকা-বেরোনোর অনুমতি শুধু সমাজমাধ্যমে ঘোষণা করলেই পাওয়া যায় না।’’ অন্য দিকে, আরও এক ধাপ এগিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের পাশাপাশি ইহুদি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে কটাক্ষ করতে দেখা গিয়েছে জিম্বাবোয়ের ইরানি দূতাবাসকে।
ট্রাম্পকে নিশানা করে জিম্বাবোয়ের ইরানি দূতাবাস ‘এক্স’ হ্যান্ডলে লিখেছে, ‘‘নিজেকে এত খুশি দেখানোর চেষ্টা করবেন না। একটু আত্মসম্মানবোধ রাখুন। ভুলেও ভাববেন না যে হরমুজ় প্রণালীতে আপনাদের নিয়ম-কানুন চালু হবে। তা হলে আমরাও তার জন্য প্রস্তুত থাকব। নিজের ফোন বন্ধ করুন। একটু বিশ্রাম নিন। সমাজমাধ্যমে পোস্ট দেবেন না। এক সপ্তাহের জন্য বিবিকে (নেতানিয়াহুর ডাক নাম) ব্লক করে দিন। হালকা খাবার খান। আর নিশ্চিন্তে ঘুম দিন।’’
গত ১৭ এপ্রিল হরমুজ় নিয়ে একের পর এক বিস্ফোরক পোস্ট করেন ট্রাম্প। তাঁর দাবি, সংশ্লিষ্ট সঙ্কীর্ণ জলপথটি খুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ইরান। শুধু তা-ই নয়, ট্রাম্প দাবি করেন, আগামী দিনে সংঘাত পরিস্থিতিতে সামুদ্রিক রাস্তাটিকে নাকি কখনওই ঢাল হিসাবে ব্যবহার করবে না তেহরান। পাশাপাশি, সাবেক পারস্যের যাবতীয় ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আসতে চলেছে বলেও ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ জানিয়ে দেন তিনি। এর কোনওটাই মানেনি উপসাগরীয় দেশটির শিয়া সরকার।
পাল্টা বিবৃতিতে ইরান জানিয়েছে, সমঝোতার নামে চাপ বাড়াতে একের পর এক মিথ্যা বলছেন ট্রাম্প। কালিবাফের দাবি, এক ঘণ্টার মধ্যে অন্তত সাতটি অসত্য বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্রের হুঁশিয়ারির মধ্যেই পুনরায় হরমুজ় অবরোধের ইঙ্গিত দেন তিনি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শেষ পর্যন্ত সেই পথেই হাঁটল তেহরান। ফলে নতুন করে আন্তর্জাতিক বাজারে খনিজ তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম ঊর্ধ্বমুখী হতে চলেছে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
১৭ তারিখ ইরানের তরফে হরমুজ় খোলার ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে নিম্নমুখী হয় তরল সোনার দর। সংবাদসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, আপাতত ১১ শতাংশ কমেছে এর দাম। ওই দিন ভারতীয় সময় রাত ১০টা নাগাদ ব্যারেলপ্রতি ৮৮.৯৭ ডলারে নেমে আসে ব্রেন্ট ক্রুড, এ দেশের মুদ্রায় যা প্রায় ৮,০০০ টাকা।
হরমুজ় নিয়ে অবশ্য ইতিমধ্যেই নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে নয়াদিল্লির কূটনৈতিক শিবির। ভারতের স্পষ্ট বক্তব্য, আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে সংশ্লিষ্ট সামুদ্রিক রাস্তাটিকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করছে যুদ্ধরত দুই রাষ্ট্র, যা থেকে বিরত থাকতে ট্রাম্প এবং ইরানি বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিকে ইতিমধ্যেই অনুরোধ করেছে ভারত। সে ক্ষেত্রে কোনও পক্ষই নেওয়া যে সম্ভব হবে না, তা একরকম বুঝিয়ে দিয়েছে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার।
ভারতে ব্যবহৃত ‘লিকুইফায়েড পেট্রোলিয়াম গ্যাস’ বা এলপিজির ৬০ শতাংশ আসে বিদেশ থেকে। এর ৯০ শতাংশ আবার হরমুজ় প্রণালী বেয়ে পৌঁছোয় এ দেশের কোনও না কোনও বন্দরে। ফলে সংশ্লিষ্ট জলপথটি ব্যবহারে শর্ত ও জটিলতা বাড়লে, পণ্য পরিবহণ, পরিকাঠামো, এমনকি গৃহস্থালির জ্বালানি খরচ হু-হু করে বৃদ্ধি পাওয়ার থাকছে আশঙ্কা। এর জেরে তেহরানের সিদ্ধান্তে নয়াদিল্লির কপালের ভাঁজ যে চওড়া হল, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
সংবাদসংস্থা রয়টার্স আবার জানিয়েছে, নতুন করে হরমুজ় অবরোধের পর ওই রাস্তায় আসা দু’টি ট্যাঙ্কারকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে ইরানি ফৌজ। অন্য দিকে সংবাদসংস্থা ব্লুমবার্গের দাবি, সংশ্লিষ্ট জলপথটি পেরোতে না পেরে ফিরে গিয়েছে চারটি ভারতীয় এবং দু’টি গ্রিক জাহাজ। আগামী দিনে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায় সেটাই এখন দেখার।
সব ছবি: সংগৃহীত।