who is rukhsana sultana

নবাব পরিবারের আত্মীয়া, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর পুত্রের ‘ঘনিষ্ঠ’, সারা আলির দিদার সম্পর্ক ছিল হাজি মস্তানের সঙ্গেও

দিল্লির অভিজাত পরিবারের সদস্য থেকে দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক পরিবারের ক্ষমতার অলিন্দে অবাধ প্রবেশ। রুখসানা সুলতানার নজিরবিহীন উত্থান নজর কেড়েছিল কংগ্রেস-সহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলির। জরুরি অবস্থার সময় সঞ্জয় গান্ধীর পৃষ্ঠপোষকতায় পুরনো দিল্লিতে বন্ধ্যত্বকরণ অভিযানের মুখ হয়ে ওঠেন রুখসানা।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৯ এপ্রিল ২০২৬ ১০:১২
০১ ১৯
who is rukhsana sultana

১৯৭৫ সালের ২৫ মে দেশ জুড়ে ইমার্জেন্সি বা জরুরি অবস্থা চালু করেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। সেই উত্তাল সময়ে ইন্দিরা-পুত্র সঞ্জয় গান্ধীর ঘনিষ্ঠ বৃত্তে নজর কেড়েছিলেন এক সুন্দরী বিবাহবিচ্ছিন্না তরুণী। মানেকা গান্ধী, অম্বিকা সোনির মতো কর্মীদের সঙ্গে এক সারিতে উচ্চারিত হতে শুরু করেছিল তাঁর নাম। তিনি রুখসানা সুলতানা ওরফে মীনু বিম্বেট।

০২ ১৯
who is rukhsana sultana

জরুরি অবস্থা জারি হওয়ার পর ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন ইন্দিরা-পুত্র সঞ্জয়। তাঁর প্রস্তাবিত ‘পাঁচ দফা কর্মসূচি’র একটি ছিল পরিবার পরিকল্পনা। ইন্দিরা-পুত্র সঞ্জয় গান্ধীই নাকি এই কর্মসূচির কারিগর ছিলেন। দিল্লির পুরনো শহরাঞ্চল, বিশেষ করে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি বাস্তবায়নে সক্রিয় ভাবে কাজ করেন রুখসানা। অভিযোগ ওঠে, জননিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগ করতেন রুখসানা।

০৩ ১৯
who is rukhsana sultana

দিল্লির অভিজাত পরিবারের সদস্য থেকে দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক পরিবারের ক্ষমতার অলিন্দে অবাধ প্রবেশ। রুখসানার নজিরবিহীন উত্থান নজর কেড়েছিল কংগ্রেস-সহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলির। জরুরি অবস্থার সময় দেশে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যাকে একটি বড় সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন সঞ্জয়। রাজধানীর বুকে একটি বিশেষ এলাকায় জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য রুখসানাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন কংগ্রেসের ‘সেকেন্ড ম্যান’ সঞ্জয়।

Advertisement
০৪ ১৯
who is rukhsana sultana

রাজনৈতিক বিশ্লেষক রশিদ কিদওয়াই উল্লেখ করেছেন যে, সঞ্জয়ের বৃত্তে রুখসানার উপস্থিতিতে অনেকেরই কপালের ভাঁজ চওড়া হয়েছিল। দামি শিফন শাড়ি থেকে শুরু করে চড়া প্রসাধনী এবং সিগনেচার গোলাপি রঙের রোদচশমায় চোখ ঢেকে দলীয় কাজে যোগ দিতে আসতেন রুখসানা। জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি নিয়ে প্রচার চালানোর সময় প্রায়শই সুগন্ধিতে ভেজা রুমাল আলতো করে মুখে বুলিয়ে নিতে দেখা যেত তাঁকে।

০৫ ১৯
who is rukhsana sultana

পটৌদীর নবাব পরিবারের সঙ্গেও একটি সম্পর্ক ছিল রুখসানার। তাঁর মেয়ে বলিউড অভিনেত্রী অমৃতা সিংহ। অভিনেতা সইফ আলি খানের প্রথম স্ত্রী অমৃতা। ২০০৪ সালে বিচ্ছেদের পথে হেঁটেছিলেন অমৃতা ও সইফ। রুখসানার নাতনি বলিউড অভিনেত্রী সারা আলি খান ও নাতি ইব্রাহিম আলি খান। তবে রুখসানা নিজে মুসলিম হলেও বিয়ে করেছিলেন ভিন্‌ ধর্মে। অমৃতার বাবা, রুখসানার স্বামী ছিলেন পঞ্জাবি, নাম শিবেন্দ্র সিংহ বির্ক।

Advertisement
০৬ ১৯
who is rukhsana sultana

সঞ্জয় গান্ধীর এতটাই ঘনিষ্ঠ ছিলেন রুখসানা যে, তাঁর দলে উপস্থিতি নিয়ে সঞ্জয়ের স্ত্রী মানেকা এবং মা ইন্দিরা প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছিলেন। সেই সমস্ত আপত্তিতে কর্ণপাত করেননি সঞ্জয়। উল্টে রুখসানাকে জামা মসজিদের কাছে অবৈধ নির্মাণ অপসারণের দায়িত্ব দিয়েছিলেন তিনি। ধীরে ধীরে সঞ্জয়ের ভরসার জায়গা হয়ে ওঠেন সুন্দরী, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী রুখসানা।

০৭ ১৯
who is rukhsana sultana

তৎকালীন বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, সঞ্জয় গান্ধী রুখসানা সুলতানাকে ৮,০০০ মুসলিম পুরুষের বন্ধ্যত্বকরণের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। পুরনো দিল্লির ঘিঞ্জি গলিতে কান পাতলে রুখসানা সম্পর্কে নানা গুঞ্জন ভেসে আসত। শোনা যায়, নির্দেশিত সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি, প্রায় ১৩,০০০ মুসলিম পুরুষের বন্ধ্যত্বকরণের অস্ত্রোপচার করিয়েছিলেন তিনি। তাঁর নামই মুসলিম পুরুষদের মধ্যে ত্রাসের সঞ্চার করেছিল। যখনই তিনি জামা মসজিদ বা তুর্কমান গেটের পাশ দিয়ে যেতেন, সেখানকার মুসলিম পুরুষেরা ঘরে লুকিয়ে পড়তেন বলে শোনা যায়।

Advertisement
০৮ ১৯
who is rukhsana sultana

জরুরি অবস্থার সময় পুরনো দিল্লিতে বন্ধ্যত্বকরণ অভিযানের মুখ হয়ে ওঠেন রুখসানা। বন্ধ্যত্বকরণ অভিযানে তাঁর অতি উৎসাহী ভূমিকা নিয়েও সরব হয়েছিলেন অনেকে। আকর্ষণীয় তরুণী সমাজকর্মী এবং বুটিক-মালিক রুখসানার নাম জড়িয়ে গিয়েছিল তুর্কমান গেট অভিযানের সময়। সঞ্জয় গান্ধী চেয়েছিলেন তুর্কমান গেট থেকে জামা মসজিদ স্পষ্ট ভাবে দৃশ্যমান হোক। তাই ওই অঞ্চলের বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

০৯ ১৯
who is rukhsana sultana

মহিলা এবং শিশুরা বুলডোজ়ার থামাতে জড়ো হয়। নিরাপত্তাবাহিনী বলপ্রয়োগ করে এবং গুলি চালানো হয়। সরকারি রেকর্ড অনুসারে ১৪ রাউন্ড গুলি চালানো হয়েছিল। তার ফলে ছ’জন নিহত হয়েছিলেন। প্রবীণ সাংবাদিক কুলদীপ নায়ার তাঁর ‘দ্য জাজমেন্ট’ বইয়ে লিখেছেন যে, পুলিশের গুলিতে ১৫০ জন নিহত হয়েছিলেন। এই মর্মান্তিক ঘটনার পরে বিশৃঙ্খলা ছড়ানোর দায় চেপেছিল রুখসানার কাঁধে।

১০ ১৯
who is rukhsana sultana

১৯৩৪ সালে পঞ্জাবের জালন্ধরে জন্ম হয় রুখসানা ওরফে মীনু বিম্বেটের। তাঁর বাবা মদনমোহন বিম্বেট ছিলেন ভারতীয় বিমানবাহিনীর আধিকারিক। মীনুর মা জ়ারিনা হক ছিলেন উদার মুসলিম পরিবারের মেয়ে। ১৯৫০-এর দশকের মুম্বইয়ের (সাবেক বোম্বে) চলচ্চিত্র তারকা বেগম পারার বোনঝি ছিলেন জ়ারিনা। গ্ল্যামার এবং সিনেমার জগতের সঙ্গে মীনুর যোগসূত্র ঘটান এই বেগমই। পরে জ়ারিনার পরিবার মদনমোহনকে ধর্মান্তরিত হওয়ার জন্য চাপ দেওয়ায় দু’জনের মধ্যে প্রবল মতবিরোধ দেখা দেয়। স্বামীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ হয় জ়ারিনার।

১১ ১৯
who is rukhsana sultana

বিচ্ছেদের পর জ়ারিনা মেয়ে মীনুকে ধর্মান্তরিত করে নাম রাখেন রুখসানা সুলতানা। দিল্লিতে পড়াশোনা করা মীনু ছোটবেলা থেকেই ছিলেন আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। নতুন পরিচয়ে জীবন শুরু হয় তাঁর। স্পষ্টবাদী এবং প্রচণ্ড স্বাধীনচেতা ছিলেন মীনু ওরফে রুখসানা। অল্প বয়সে দিল্লির অভিজাত মহলে একটি পাকাপাকি জায়গা তৈরি করে ফেলেন তিনি। দিল্লির অভিজাত এলাকা কনট প্লেসে একটি বুটিক খোলেন। সেখানে তিনি কমিশনে দামি হিরের গয়না বিক্রি করতেন।

১২ ১৯
who is rukhsana sultana

শিখ ধর্মাবলম্বী ভারতীয় সেনাবাহিনীর আধিকারিক শিবিন্দর সিংহ ভির্ককে বিয়ে করেন রুখসানা। শিবিন্দর বিখ্যাত লেখক খুশবন্ত সিংহের ভাইপো ছিলেন। অমৃতার যখন ১১ বছর বয়স তখনই শিবিন্দর ও রুখসানার বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে।

১৩ ১৯
who is rukhsana sultana

এই বুটিকেই ভাগ্যক্রমে সাক্ষাৎ হয়েছিল সঞ্জয়ের সঙ্গে। স্বল্প সময়ের মধ্যেই রুখসানার ব্যক্তিত্বের আকর্ষণে মুগ্ধ হয়েছিলেন গান্ধী পরিবারের পুত্র। দলের কর্মী হিসাবে রুখসানাকে স্বীকৃতি দেন তিনি। শোনা যায়, দলে রুখসানার জায়গা পাওয়া নিয়ে অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন ইন্দিরাও। সরাসরি ছেলেকে কিছু না বললেও অম্বিকা সোনির মাধ্যমে সঞ্জয়কে সতর্ক করেছিলেন। সাংবাদিক প্রমীলা কল্হণের ১৯৭৭ সালে রচিত বই ‘ব্ল্যাক ওয়েনস্‌ডে’তে এই বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছিল।

১৪ ১৯
who is rukhsana sultana

রুখসানার চর্চিত প্রেমিক হিসাবে উঠে আসে মুম্বইয়ের অন্ধকার জগতের অন্যতম মাথা হাজি মস্তানের নাম। শোনা যায় অপরাধজগতের সদস্যদের নিজের ব্যক্তিত্ব ও সৌন্দর্য দিয়ে বশে রাখতেন রুখসানা। দিল্লির অভিজাত পরিবারের আদবকায়দায় বেড়ে ওঠা মিনু ওরফে রুখসানার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন মুম্বইয়ের ডন।

১৫ ১৯
who is rukhsana sultana

বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে দাবি করা হয় রুখসানার প্রতি তাঁর মুগ্ধতা প্রকাশ করতে এমন একটি ঘটনা ঘটিয়েছিলেন হাজি মস্তান, যার ফলে তাঁর সঙ্গে রুখসানার সম্পর্ক ঘিরে চর্চা আরও বেড়ে যায়। রুখাসানার বিদেশি সাবানের প্রতি দুর্বলতা ছিল। আর একটি বিশেষ ব্র্যান্ডের বিদেশি সাবান তখন ভারতে পাওয়া যেত না। চোরাকারবারিদের মাধ্যমে সেই সাবান আসত ভারতে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকার দাবি, মুম্বইয়ে এক বার গাড়ি থামিয়ে রুখসানা সেই সাবান খোঁজাখুঁজি করছিলেন। সর্বত্র খোঁজাখুঁজি করে জানতে পারেন যে চোরাকারবারিরাও গত কয়েক দিন ধরে সেই সাবান পাচ্ছেন না। হতাশ হয়ে গাড়িতে ফিরতেই দেখতে পান সেই বিশেষ ব্র্যান্ডের বিদেশি সাবানে ভরিয়ে দেওয়া হয়েছে তাঁর গাড়ি।

১৬ ১৯
who is rukhsana sultana

উৎসুক জনতার ভিড়ের মাঝে কে এই কাজ করেছিলেন তা খুঁজতে গিয়ে রুখসানার নজরে পড়ে সাধারণ পোশাক পরা এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছেন। অনেকেই কৌতূহলবশত তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিলেন। কিন্তু সেই ব্যক্তি কেবল রুখসানার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। হাসিমুখে নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন সাদা পোশাক পরা সেই ব্যক্তি। তিনি আর কেউ নন, মুম্বইয়ের অপরাধজগতের ত্রাস হাজি মস্তান।

১৭ ১৯
who is rukhsana sultana

খ্যাতনামী এক লেখিকা একটি ব্লগে লিখেছিলেন, রুখসানার সাক্ষাৎকার নিতে তিনি একসময় তাজ হোটেল গিয়েছিলেন। সেখানে বিলাসবহুল একটি সুটে রুখসানা তাঁর কিছু ব্যবসায়িক সহযোগীর সঙ্গে দেখা করতে বলেছিলেন। সেই লেখিকা রুখসানার এক সহযোগীকে দেখে চমকে উঠেছিলেন। সেই সহযোগী ছিলেন হাজি মস্তান।

১৮ ১৯
who is rukhsana sultana

তুর্কমান গেটের সেই ঘটনার পর রাজনীতি থেকে দূরে সরে এসেছিলেন রুখসানা। মেয়ে অমৃতা বলিউডে পা রাখার পর তারকা জগতের মধ্যেই বিচরণ করতেন তিনি। ১৯৯৬ সালে মারা যান রুখসানা। মৃত্যুর বহু বছর পর রুখসানার পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে জটিলতা শুরু হয়। তাঁর বাবা মদনমোহন দ্বিতীয় বার বিয়ে করেছিলেন। সেই পক্ষের একটি ছেলে ও মেয়ে ছিলেন। উত্তরাখণ্ডে মদনমোহনের কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তি রয়েছে।

১৯ ১৯
who is rukhsana sultan

২০১৯ সালে অমৃতার সৎমামা অর্থাৎ রুখসানার সৎভাই মারা যাওয়ার পর ক্লিমেন্ট টাউনে সেই থাকা সম্পত্তির দাবিতে স্থানীয় আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন অমৃতা ও সারা। উল্টো দিকে মদনমোহনের মেয়ে তাহিরা বিম্বাটও তাঁর সম্পত্তির দাবিতে মামলা করেন। মামলা খারিজের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কেউ না থাকায় ফেব্রুয়ারিতে আদালত অমৃতা ও তাঁর সৎবোন তাহিরার পক্ষে রায় দেয়।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
আরও গ্যালারি