১৯৪৮ সালে ইজ়রায়েলের জন্ম। তবে জন্মের পর বিশ্বের একমাত্র ইহুদি দেশটিকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে বিশ্বের প্রায় সমস্ত ইসলামিক রাষ্ট্র-সহ বেশির ভাগ দেশ। স্বাধীন দেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করার পরই ইজ়রায়েল জড়িয়ে পড়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।
১৪ মে স্বাধীনতা ঘোষণা করার পর দিনই ইজ়রায়েল আক্রমণ করে পাঁচটি আরব দেশ (মিশর, জর্ডন, সিরিয়া, ইরাক ও লেবানন)। আরব-ইজ়রায়েল যুদ্ধে সদ্য জন্মানো রাষ্ট্রকে সামরিক সহায়তা দিতে রাজি হয়নি পৃষ্ঠপোষক আমেরিকাও।
সেখানে ব্যতিক্রম ছিল রাশিয়া (সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন)। ১৯৪৭ সালে প্যালেস্টাইনকে বিভক্ত করে পৃথক ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার (জ়ায়নবাদ) রাষ্ট্রপুঞ্জের পরিকল্পনাকে সমর্থন করার ঘোষণা করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। ইজ়রায়েল স্বাধীনতা ঘোষণা করার পর সোভিয়েত ইউনিয়নই ছিল প্রথম দেশ যারা এই দেশটিকে ‘ডি-জুরে’ (পুরোপুরি আইনি) স্বীকৃতি দেয়। অথচ আমেরিকা ইজ়রায়েলকে তখনও ‘ডি-ফ্যাক্টো’ বলেই স্বীকৃতি দিয়েছিল।
সেই ইজ়রায়েল এখন ধারেভারে অনেক বেড়েছে। সমরাস্ত্রের দিক দিয়ে বিশ্বের অন্যতম শক্তিধর সেটি। হাতে পরমাণু অস্ত্র থাকা গুটি কয়েক দেশের মধ্যে অন্যতম। ইজ়রায়েলের হাতে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম সেরা গোয়েন্দাসংস্থা মোসাদ।
জন্মের প্রায় ৮০ বছর পর এখনও ইসলামপন্থী দেশগুলির হুমকির মুখে পড়তে হয় ইজ়রায়েলকে। তা প্রতিহত করতে আগে থেকেই তৈরি থাকে ইহুদি দেশটি। নতুন নতুন কৌশল আঁটে শত্রুদের ঠেকানোর। সংঘর্ষেও জড়ায়।
সেই ইজ়রায়েলই ইরাকের মাটিতে একটি বিশাল সামরিক ঘাঁটি লুকিয়ে রেখেছিল এত দিন। কিন্তু কিছু দিন আগে পর্যন্তও দেশের মরুভূমিতে শত্রুপক্ষের সামরিক ঘাঁটি থাকার কথা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি ইরাক।
ইজ়রায়েল এবং আমেরিকার সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের আবহে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। কিন্তু কী ভাবে তা প্রকাশ্যে এল? পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের আবহে বিষয়টি প্রথম নজরে পড়ে এক মেষপালকের।
ইরাকের ওই মরুভূমি এলাকায় এক স্থানীয় মেষপালক একটি অস্বাভাবিক জিনিস লক্ষ করেন। দেখেন, মরুভূমির খুব নীচ দিয়ে উড়ে যাচ্ছে একের পর এক হেলিকপ্টার।
ইরাকের পশ্চিম মরুভূমির ওই প্রত্যন্ত অঞ্চলে অদ্ভুত সামরিক তৎপরতা দেখে ঘাবড়ে যান মেষপালক। কিন্তু তিনি তখন যা জানতে পারেননি তা হল, তিনি এমন একটি গোপন ঘাঁটির সন্ধান পেয়েছেন যা ইজ়রায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সহায়তার জন্য তৈরি করেছিল।
মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে বায়ুসেনার অভিযান নির্ভুল ভাবে চালানোর জন্য ইরাকের মরুভূমিতে ওই সামরিক ঘাঁটি তৈরি করেছিল ইজ়রায়েল।
সংঘাত শুরু হওয়ার ঠিক আগেই তৈরি করা হয়েছিল ঘাঁটিটি। ইজ়রায়েলের ভূখণ্ড থেকে ইরান প্রায় হাজার মাইল দূরে অবস্থিত। তবে ইরাকের সামরিক ঘাঁটি সেই দূরত্বকে উল্লেখযোগ্য ভাবে কমিয়ে এনেছিল, যা তেল আভিভের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিমান অভিযান পরিচালনাকে আরও সহজ করে তুলেছিল।
ইরাকে যে তারা গোপন সামরিক ঘাঁটি তৈরি করেছে, সে কথা আমেরিকাকে জানিয়েছিল ইজ়রায়েল। তবে ইরাক টের পায়নি। জানা গিয়েছে, ঘাঁটিটিতে ইজ়রায়েলের বিশেষ বাহিনী থাকছিল এবং এটি ইজ়রায়েলি বিমানবাহিনীর জন্য একটি রসদ সরবরাহ কেন্দ্র হিসাবে কাজ করত।
ওই সামরিক ঘাঁটিতে অনুসন্ধান এবং উদ্ধারকারী দলও মোতায়েন ছিল, যাঁরা শত্রুর এলাকায় কোনও ইজ়রায়েলি পাইলট জখম হলে দ্রুত তাঁকে উদ্ধারের জন্য প্রস্তুত থাকত। আর এই পুরো ব্যবস্থাই ইজ়রায়েল করেছিল ইরাকের নাকের নীচে।
মার্চের শুরুতেই ইজ়রায়েলের গোপন ঘাঁটি বিপজ্জনক ভাবে ফাঁস হতে চলেছিল। ইরাকের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, এক মেষপালক ইরাকের পশ্চিম মরুভূমি এলাকায় অস্বাভাবিক সামরিক কার্যকলাপের বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করেন।
এর পরেই ওই এলাকায় তদন্তের জন্য সেনা পাঠায় ইরাকি সামরিক বাহিনী। তাদের ঘটনাস্থলে পৌঁছোনো ঠেকাতে বিমানহামলা চালায় ইজ়রায়েল। সেই ঘটনায় ইরাকের এক সেনা নিহত এবং দু’জন আহত হন।
এর পর পশ্চিম মরুভূমির ওই এলাকায় তল্লাশির জন্য আরও দুই ইউনিট সেনা পাঠায় ইরাক। ওই দু’টি ইউনিট তল্লাশি চালিয়ে প্রমাণ নিয়ে ফেরে। নিশ্চিত করে যে সম্প্রতি সেখানে সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি ছিল। তত দিনে সেখান থেকে পাততাড়ি গুটিয়েছে ইজ়রায়েল।
গোপন ইজ়রায়েলি ঘাঁটির উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার পর ইরাকি সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্তা তথা জয়েন্ট অপারেশন্স কমান্ডের ডেপুটি কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল কাইজ় আল-মুহাম্মাদাওয়ি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘‘এই বেপরোয়া অভিযানটি কোনও সমন্বয় বা অনুমোদন ছাড়াই চালানো হয়েছিল। মনে হচ্ছে, হামলার আগে থেকেই একটি নির্দিষ্ট বাহিনী ওই ঘাঁটিতে ছিল। আমাদের না জানিয়েই ওই ঘাঁটি ওখানে ছিল।’’
পরে বিষয়টি নিয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করে ইরাক। অনুমোদন ছাড়া সামরিক ঘাঁটি তৈরি এবং সেই ঘাঁটির অনুসন্ধানে যাওয়া সেনার উপর হামলার জন্য ইজ়রায়েলের পাশাপাশি আমেরিকাকেও দায়ী করে তারা। তবে এক মার্কিন সামরিক কর্তা ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’কে জানিয়েছেন, ওই নির্দিষ্ট হামলায় আমেরিকার কোনও হাত ছিল না।
বিশাল এবং প্রায় জনবসতিহীন হওয়ায় পশ্চিম ইরাকের ওই মরুভূমি গোপন সামরিক কার্যকলাপের জন্য একটি আদর্শ স্থান। ১৯৯১ এবং ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর সময় মার্কিন বাহিনীও ওই একই অঞ্চল ব্যবহার করেছিল।
সব ছবি: সংগৃহীত।