তিনি কি আদৌ জীবিত? মৃত? আহত হয়েছেন? সুরক্ষিত কোনও জায়গায় রয়েছেন? গত কয়েক দিন ধরে ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে নিয়ে এ-হেন বহু জল্পনা ছড়িয়েছে আন্তর্জাতিক মহলে। কিন্তু এমন জল্পনার কারণ কী?
কারণ, গত কয়েক দিন ধরে প্রকাশ্যে আসা একাধিক ভিডিয়ো। নেতানিয়াহুর ওই ভিডিয়োগুলি পর পর পোস্ট হওয়ার কারণেই সন্দেহ দানা বেঁধেছে মানুষের মনে। দাবি উঠেছে, ওই ভিডিয়োগুলিতে নেতানিয়াহুকে ‘জোর করে জীবিত দেখানোর’ চেষ্টা চলছে। যদিও কোনও ভিডিয়োরই সত্যতা যাচাই করেনি আনন্দবাজার ডট কম।
কিন্তু ওই ভিডিয়োগুলি প্রকাশ্যে আসার পরেই প্রশ্ন উঠেছে, কোথায় ‘বিবি’ (ইজ়রায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ডাকনাম। রাজনৈতিক মহল এবং গণমাধ্যমেও নামটি বহুল স্বীকৃত)? পাশাপাশি জল্পনা ছড়িয়েছে, তিনি আর বেঁচে নেই। কিন্তু সেই খবর যাতে প্রকাশ্যে না আসে, তাই ওই সব ভিডিয়োর মাধ্যমে তাঁকে জীবন্ত প্রমাণ করার মরিয়া চেষ্টা করছে ইজ়রায়েল।
আমেরিকা-ইজ়রায়েলের সঙ্গে সংঘর্ষের প্রথম থেকেই ইজ়রায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে হত্যার হুমকি দিচ্ছে ইরান। এর পর পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করার পর গত কয়েক দিন ধরে দাবি উঠেছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত হয়েছেন নেতানিয়াহু। তার মধ্যেই ইজ়রায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে পর পর পোস্ট হওয়া ওই ভিডিয়োগুলি তাঁর মৃত্যু-জল্পনার পালে হাওয়া দিয়েছে।
দাবি উঠেছে, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ‘জীবিত থাকার প্রমাণ’ হিসাবে একাধিক ভিডিয়ো প্রকাশ্যে এনে তাঁর মৃত্যু সংক্রান্ত দাবিগুলি খণ্ডন করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে ইজ়রায়েল। তবে সেই ভিডিয়ো ক্লিপগুলো জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটানোর পরিবর্তে নতুন করে সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।
প্রথমে ১৩ মার্চ, পরে ১৫ মার্চ নেতানিয়াহুর একটি করে ভিডিয়ো প্রকাশ্যে আসে। ১৫ মার্চের ভিডিয়োতে তাঁকে একটি কফি কাপ হাতে বক্তৃতা করতে দেখা যায়। সেই ভিডিয়োয় তাঁর মৃত্যুর খবর গুজব বলেও দাবি করতে দেখা যায় খোদ ইজ়রায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে।
১৫ মার্চের সেই ভিডিয়োয় নেতানিয়াহুকে কফির কাপ হাতে বলতে শোনা গিয়েছিল, ‘‘কফির জন্য আমি মরতে রাজি। আমি আমার দেশের মানুষকে ভালবাসি।’’ এর পর তিনি দুই হাতের আঙুল তুলে ক্যামেরায় দেখাতে শুরু করেন। কারণ ১৩ মার্চ ভিডিয়োটি প্রকাশিত হওয়ার পর বিভিন্ন সূত্রে দাবি উঠেছিল যে নেতানিয়াহুর ডান হাতে ছ’টি আঙুল রয়েছে। কিন্তু সেই ভিডিয়োয় ডান হাতের ছ’টি আঙুল দেখা যায়নি।
১৫ মার্চ যে ভিডিয়োটি পোস্ট করা হয়েছিল, তাতে দেখা গিয়েছে ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রীর দু’হাতেই পাঁচটি আঙুল। কফি শপে অন্যান্য ক্রেতার সামনে দাঁড়িয়ে ইরানের যুদ্ধ সম্পর্কে কথাও বলতে দেখা গিয়েছিল তাঁকে। ভিডিয়োটি ভাইরাল হয়। যদিও সেই ভিডিয়োটির সত্যতা যাচাই করেনি আনন্দবাজার ডট কম।
তবে ভিডিয়োটি সমাজমাধ্যম এক্স-এ প্রকাশিত হতেই সেটি ভুয়ো বলে জল্পনা শুরু হয়। এক এক্স ব্যবহারকারী এক্সের চ্যাটবট গ্রোকের কাছে ভিডিয়োটির সত্যতা যাচাই করেন। সেই প্রশ্নের উত্তরে গ্রোক জানিয়েছে, এটি আসলে কৃত্রিম মেধা দিয়ে তৈরি একটি ভিডিয়ো। গ্রোক জানিয়েছে, ভিডিয়োটি ১০০ শতাংশ ডিপফেক। নেতানিয়াহু একটি ক্যাফেতে কফি খাচ্ছেন, বাস্তবে তেমন কিছু ঘটেনি। যেহেতু ভিডিয়োটি নেতানিয়াহুর নিজস্ব সমাজমাধ্যম অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত হয়েছিল, গ্রোকের প্রতিক্রিয়া বিতর্ক আরও উস্কে দেয়।
এর মধ্যেই ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রীর সমাজমাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকে বিভিন্ন ভিডিয়ো পোস্ট করে দাবি করা হয় যে ৭৬ বছর বয়সি ইহুদি নেতা এখনও তেল আভিভেই আছেন। কিন্তু ভিডিয়োগুলি প্রকাশ্যে আসার পর নেতানিয়াহুর অবস্থান বা নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে শুরু করে। তাঁকে হত্যা করা হয়েছে বলে জল্পনা তৈরি হয়।
জল্পনা আরও তীব্র হয় ১৬ মার্চ। ইজ়রায়েলি প্রধানমন্ত্রীর অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশিত একটি নতুন ভিডিয়োয় দেখা যায়, জ়েরুজ়ালেমের রাস্তায় স্বাভাবিক ভাবে হাঁটছেন এবং পথচারীদের সঙ্গে কথা বলছেন নেতানিয়াহু।
কিন্তু সেই ভিডিয়োতেও বিস্তর গোলযোগ খুঁজে পান নেটাগরিকেরা। ভিডিয়োতে যখনই নেতানিয়াহুর দু’হাত দেখা যাচ্ছিল, তখনই তাঁর হাতে থাকা একটি আংটি বার বার অদৃশ্য এবং দৃশ্যমান হতে দেখা যায়। ফলে সেই ভিডিয়োটির সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
নেতানিয়াহুর বেঁচে থাকাকে কেন্দ্র করে সংশয় আর জল্পনা মিলেমিশে যখন একাকার, ঠিক সেই সময় আবার নেতানিয়াহুর এক্স হ্যান্ডল থেকে একটি ভিডিয়ো প্রকাশ করা হয়। সেই ভিডিয়োয় ইরানবাসীদের উদ্দেশে ‘নওরোজ়’ উৎসবের শুভেচ্ছাবার্তা দিতে দেখা গিয়েছে। নেতানিয়াহু বলছেন, ‘‘ইরানের নির্ভীক জনগণকে আমার শুভেচ্ছা। প্রতি বছরই এই আলোর উৎসবে যেমন শুভেচ্ছাবার্তা পাঠাই, এ বার তেমন আপনাদের জন্য রইল অনেক শুভেচ্ছা।’’
ইজ়রায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে আরও বলতে শোনা গিয়েছে যে, ‘‘এ বছরের উৎসবের একটা আলাদা গুরুত্ব আছে। আপনাদের নওরোজ়ের শুভেচ্ছা— স্বাধীনতার বছর। এক নতুন আশার সূচনা।’’ কিন্তু নেতানিয়াহুর সেই ভিডিয়ো ঘিরেও প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
এর কয়েক ঘণ্টা পর এক্স হ্যান্ডল থেকে আরও একটি ভিডিয়ো পোস্ট করেন ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রী। শুধু তা-ই নয়, মৃত্যু-জল্পনা উড়িয়ে দিয়ে, আবারও তাঁকে বলতে শোনা গিয়েছে, ‘‘আমি বেঁচে আছি।’’ কিছুটা রসিকতার সুরেই এ কথাগুলি বলতে শোনা গিয়েছে তাঁকে। যে ভিডিয়োটি নেতানিয়াহু প্রকাশ করেছেন, সেখানে তাঁর সঙ্গে দেখা যাচ্ছে আরও এক ব্যক্তিকে। তিনি আর কেউ নন, ইজ়রায়েলে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি।
যে ভিডিয়োটি প্রকাশ্যে এসেছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে, নেতানিয়াহু এবং হাকাবি পাশাপাশি হাঁটছেন। খুব হালকা চালে কথা বলছেন তাঁরা দু’জনে। হাকাবিকে বলতে শোনা যাচ্ছে, ‘‘মিস্টার প্রাইম মিনিস্টার, আপনি সুরক্ষিত আছেন কি না তা খোঁজ নিতে প্রেসিডেন্ট (ডোনাল্ড ট্রাম্প) আমাকে এখানে পাঠিয়েছেন।’’ তার উত্তরে নেতানিয়াহু হাসতে হাসতে বলছেন, ‘‘অবশ্যই, মাইক। আমি বেঁচে আছি এবং সুস্থ আছি।’’ এ কথা শুনে হাকাবি বললেন, ‘‘আপনি সুরক্ষিত আছেন, এটা দেখে আমি খুবই খুশি। কিন্তু প্রেসিডেন্ট বার বার জানতে চাইছিলেন আপনার বিষয়ে।’’ তবে এই ভিডিয়োও ডিপফেক ব্যবহার করে তৈরি কি না, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
দাবি উঠেছে, ইজ়রায়েলি প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যু হয়েছে বলেই তাঁকে জীবন্ত প্রমাণ করার মরিয়া চেষ্টা চলছে। প্রতি দিন নিত্যনতুন ভিডিয়ো পোস্ট করা হচ্ছে। আর তা করতে গিয়ে ভুয়ো ভিডিয়ো অবধি পোস্ট করে ফেলছে ইজ়রায়েলি প্রশাসন। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা-সমালোচনার ঢেউ উঠেছে সমাজমাধ্যমে। নেতানিয়াহুর বেঁচে থাকা নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। নানা মত প্রকাশ করেছেন নেটাগরিকেরা। জল্পনা অবশেষে এই দাবিতে পরিণত হয়েছে যে, নেতানিয়াহু বিমান হামলায় গুরুতর আহত বা নিহত হয়েছেন।
তবে শুধু ভিডিয়ো নয়, নেতানিয়াহু যে বেঁচে নেই, তেমনটা জল্পনা ছড়ানোর কারণ রয়েছে আরও। গত সপ্তাহ থেকে টিভিতে সরাসরি কোনও বার্তা দিতে দেখা যায়নি নেতানিয়াহুকে। আবার নেতানিয়াহুর পুত্র ইয়াইর নেতানিয়াহু সর্ব ক্ষণ সমাজমাধ্যমে সক্রিয় থাকেন। দিনে বহু পোস্ট করেন তিনি। রহস্যজনক ভাবে ইয়াইরও একেবারে চুপ। সমাজমাধ্যমে গত ৯ মার্চ থেকে তিনি নিষ্ক্রিয়। আর সেই বিষয়টিও নেতানিয়াহুর মৃত্যু-জল্পনাকে আরও উস্কে দিয়েছে।
এ-ও শোনা যাচ্ছে, ইরানের সঙ্গে সংঘাতের আবহে সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুপস্থিত ছিলেন নেতানিয়াহু। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি, টানা সাতটি বৈঠক এড়িয়ে গিয়েছেন তিনি, যা তাঁর স্বাস্থ্য এবং অবস্থান সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছে।
যদিও ইজ়রায়েলি কর্তৃপক্ষ নেতানিয়াহুর বেঁচে থাকা নিয়ে সংশয় এবং মৃত্যু নিয়ে দাবিকে গুজব বলেই উড়িয়ে দিয়েছেন। নেতানিয়াহু সুস্থ আছেন এবং বহাল তবিয়তে রয়েছেন বলেই জানাচ্ছে তেল আভিভের সরকারি সূত্রগুলি।
সব ছবি: সংগৃহীত।