চলতি বছর ফিফা আয়োজিত ফুটবল বিশ্বকাপে দেখা যাচ্ছে নানা অবাক করা বিষয়। নামকরা ঐতিহ্যবাহী ফুটবল দলগুলির থেকে ফুটবলপ্রেমীরা যেমন পারফরম্যান্স আশা করছেন, তারা অনেকেই সেই আশা পূরণ করতে পারছে না। আবার ছোট দল, যাদের পাতেও রাখছেন না ফুটবলপ্রেমীরা, তারা মাঠে ‘জাদু’ দেখাচ্ছে।
এমনকি ক্লাব ফুটবলে বা বিগত বিশ্বকাপে একের পর এক গোল করে যাওয়া বহু ফুটবলারের চলতি বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স ঘিরেও উঠছে নানা প্রশ্ন। তাঁরা নাকি আগের মতো আর খেলতে পারছেন না। বল মার্ক করা, লক্ষ্য স্থির রেখে জালে বল ঢোকানোর মতো মাঠের নানা বিষয়ে তাঁরা আর আগের মতো নিজেদের মেলে ধরতে পারছেন না। তেমনটাই মত ফুটবলপ্রেমীদের।
মঙ্গলবার মধ্যরাতে ঘানার সঙ্গে ইংল্যান্ডের খেলা ছিল। সে খেলায় ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেনের খেলা দেখে হতাশ হয়েছেন ফুটবলপ্রেমীরা। পায়ে যে বল পাননি তা নয়, কিন্তু একটি বলও তিনি জালে ঢোকাতে পারেননি। হ্যারি কেন নিজেও তাঁর এই পারফরম্যান্সে হতাশ হয়েছেন, যা তাঁর মুখভঙ্গিতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। ম্যাচটি গোলশূন্য ড্র-এ শেষ হয়।
তবে হ্যারি কেনের এই রূপ আশীর্বাদ হয়ে নেমে এসেছে ঘানার জাতীয় দলের জন্য। দীর্ঘ ১৬ বছরের মধ্যে প্রথম বার ঘানা ফুটবল বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে খেলার খুব কাছাকাছি পৌঁছোল। হয়তো ঘানাবাসীরা নিজেও এই ফলাফল আশা করেননি।
তবে গোলশূন্য এই ম্যাচ ফুটবলের ইতিহাসের পাতা উল্টে পুনরায় সামনে এনেছে ঘানার এক সুপরিচিত ওঝার নাম। হ্যারি কেনের এই অভাবনীয় পারফরম্যান্সের পর থেকে শুরু হয়েছে তাঁকে নিয়ে আলোচনা। যদিও তিনি নিজেই আলোচনায় আসার জন্য বিস্ময়কর এক দাবি করেছেন।
ঘানার সেই আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বের নাম নানা কুয়াকু বনসাম। নানার দাবি, তাঁর অভিশাপেই নাকি ইংল্যান্ড তথা বায়ার্ন মিউনিখ ক্লাবের তারকা ফুটবলার মঙ্গলবার মধ্যরাতে কোনও গোল করতে পারেননি। তিনি চেয়েছিলেন বলেই নাকি ইংল্যান্ডের সঙ্গে ঘানার ম্যাচে হ্যারি কেনের পারফরম্যান্স নজরকাড়া ছিল না। সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে এমনটাই জানিয়েছেন নানা।
তবে এ বারই প্রথম নয়। ২০১৪ সালে ফুটবল বিশ্বকাপ চলাকালীনও নানা এ রূপ দাবি করেছিলেন। সেই সময় পর্তুগালের তারকা ফুটবলার ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর উপর তন্ত্রমন্ত্র করেছিলেন বলে দাবি করেছিলেন নানা। সেই বিশ্বকাপে রোনাল্ডোর হাঁটুতে চোট লাগে। তাই সেই বিশ্বকাপে গোল করলেও দেশের জন্য নিজের সবটুকু দিয়ে খেলতে পারেননি সিআরসেভেন। ঘানার বিরুদ্ধে ম্যাচেও রোনাল্ডোর পারফরম্যান্স তেমন নজরকাড়া ছিল না। নানা দাবি করেছিলেন, তাঁর অভিশাপের জন্যই নাকি রোনাল্ডো চোট পান।
এর পর থেকেই সকলের মনে প্রশ্ন জাগছে, কে এই নানা কুয়াকু বনসম? তাঁর এই ‘অসীম ক্ষমতা’র রহস্যই বা কী? ১৯৭৩ সালে অগস্টের ২০ তারিখ ঘানায় জন্ম নানার। তাঁর নামের শেষ শব্দ ‘বনসাম’-এর আফ্রিকার স্থানীয় ভাষায় অর্থ ‘শয়তান’। নিজের উল্লেখযোগ্যতা বাড়ানোর লক্ষ্যে নানা নিজেই নিজেকে এই উপাধি দিয়েছেন।
নানা ঘানার আক্রায় তিনটি উপাসনালয় পরিচালনা করেন। তিনি নিজেকে ‘দ্য গ্রেট অথেন্টিক ম্যান’ নামে পরিচয় দেন। নানার দাবি অনুযায়ী, তিনি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কোফি উ কোফির আধ্যাত্মিক শক্তির মাধ্যমে অসহায়দের সাহায্য করে আসছেন। ভেষজ প্রতিকারও দিয়ে থাকেন।
কেবল ঘানা নয়, নিউ ইয়র্ক, আমস্টারডম, বার্লিন এবং ইটালির বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষজনও নানার ‘জাদু’র কৃপাপ্রার্থী। সে সমস্ত অঞ্চলে নানা কর্মসূত্রে ভ্রমণে যান। কর্ম এটাই হয়, সেখানকার মানুষদের টোটকা দিয়ে সাহায্য করা। সে সমস্ত জায়গায় যাওয়ার আগে নানা সমাজমাধ্যমে এবং নিজের ওয়েবসাইটে তা নিয়ে প্রচার করেন। তার পর সেখানে যাওয়ার পর নানার ভক্তেরা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসেন।
তন্ত্রমন্ত্রের পথে নানার প্রবেশ ঘটল কী ভাবে? ছোটবেলা থেকে নানা আফ্রিকার আকান নামের এক প্রজাতির মানুষদের মাঝে বড় হয়ে উঠেছেন। এই প্রজাতির মানুষজনের মধ্যে তন্ত্রসাধনার বেশ প্রচলন রয়েছে।
নানা মানুষ হন তাঁর কাকা পাপা কুমা কোফি অতসিওয়ার কাছে। তৎকালীন সময়ে ওঝা হিসাবে পাপার বেশ নামডাক ছিল। কাকার সঙ্গে থাকাকালীন সময় থেকেই তিনি আধ্যাত্মিক বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে থাকেন। এরই সঙ্গে সেখানকার স্থানীয় গির্জায় বিভিন্ন ধরনের কাজ করতেন নানা। সেই সময়ই ঘটে তাঁর সঙ্গে এক অদ্ভুত কাণ্ড।
নানার দাবি, ১৯ বছর বয়সে একদিন গির্জায় যাওয়ার পথে তাঁর উপর বিদ্যুতের ঝলক এসে পড়ে। তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। চৈতন্য ফেরার পর তিনি বুঝতে পারেন যে তাঁদের স্থানীয় আত্মিক সত্তা কোফি ওডুর দ্বারা তিনি আবিষ্ট। আকান প্রজাতির মানুষদের কাছে কোফি ওডু সামুদ্রিক দেবতা হিসাবে পরিচিত। এর পর থেকে নানাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তাঁর জনপ্রিয়তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে।
আধ্যাত্মিক বিষয়ের বাইরেও নানার জীবন বেশ রঙিন। ইটালির নামী সংস্থার জামাকাপড় পরেন তিনি। বিলাসবহুল গাড়িও চালান। কেবল এখানেই শেষ নয়। ঘানার নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন নানা। ২০২০ সালে নানা ঘানার সাংসদীয় নির্বাচনে অফিনসো নর্থ নির্বাচনী এলাকা থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে ভোটে দাঁড়ান। হাজারেরও বেশি মানুষ তাঁকে ভোট দেন।
আধ্যাত্মিক জীবন নিয়ে নানা কথা বলে চললেও, ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সে ভাবে প্রকাশ্যে আলোচনা করেন না নানা। তবে ইতিমধ্যেই তিনি একাধিক বিয়ে করেছেন যেগুলির কোনওটাই সফল হয়নি। তার কারণ নানার বহু সম্পর্কের প্রতি আসক্তি থাকা। দ্বিতীয় বিয়ের বিচ্ছেদের পরে সংবাদমাধ্যমকে নানা জানিয়েছিলেন যে তিনি এক সম্পর্কে খুশি থাকতে পারেন না। বহু সম্পর্কে জড়িয়েই নানা প্রকৃত সুখ খুঁজে পান।
ঘানার বাইরেও ছড়িয়ে রয়েছেন নানার প্রেমিকারা। কর্মসূত্রে আর্ন্তজাতিক সফরে গিয়ে নানা সে সমস্ত প্রেমিকাদের সঙ্গে দেখাও করেন। নিয়মিত ফোনালাপ হয় তাঁদের মধ্যে। কিন্তু বিয়ে মাঝপথে ভেঙে গেলেও, নানার সন্তানদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। একটি জাতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নানার সন্তানসংখ্যা ১৪। তাঁদের কেউ কেউ ইতিমধ্যে কলেজের গণ্ডিও পার করে ফেলেছেন।
নানার দাবি, প্রতি দিন প্রায় ২৫ জন মহিলা তাঁর কাছে বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আসেন। সেগুলির মধ্যে বেশির ভাগই হয় দাম্পত্য বা সম্পর্কজনিত সমস্যা। নানার বিখ্যাত জাদুটোনা ‘জুজু’ প্রয়োগের আবেদন নিয়ে তাঁরা নানার কাছে ছুটে আসেন। তেমনটাই মত ঘানার ‘শয়তান’-এর।
কালাজাদু বলে আদৌ কিছু হয় কি না তা নিয়ে কোনও প্রমাণ আদতে নেই। ২০১৪-তে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো বা ২০২৬-এ হ্যারি কেনের খেলার হাল বিগড়োনোর পিছনে যে নানাই রয়েছেন তা-ও কেউ হলফ করে বলতে পারবেন না। তবে নানা যে বাকি পাঁচজন সাধারণ মানুষের থেকে বেশ আলাদা, সে বিষয়ে সন্দেহ পোষণেরও কোনও জায়গাই নেই।
সব ছবি: রয়টার্স, পিটিআই, সংগৃহীত এবং এআই সহায়তায় তৈরি।