মঙ্গলবার বড় ঘোষণা করেছেন দেশের জনপ্রিয় গায়ক অরিজিৎ সিংহ। জানিয়েছেন, আর কোনও ছবিতে প্লেব্যাক করবেন না শিল্পী। ভক্তকুলকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানিয়ে হঠাৎই সিনেমায় গান গাওয়া থেকে অবসর নেওয়ার কথা ঘোষণা করেন তিনি।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় একটি পোস্টে অরিজিৎ লেখেন, “নতুন বছরের শুভেচ্ছা সকলকে। শ্রোতা হিসাবে এত বছর ধরে আমায় এত ভালবাসা দেওয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। তবে আমি আনন্দের সঙ্গে ঘোষণা করছি, এ বার থেকে আমি আর প্লেব্যাক গায়ক হিসাবে কোনও কাজ করব না। আমি প্লেব্যাক গাওয়া বন্ধ করলাম।”
অরিজিতের এই ঘোষণায় স্তম্ভিত তাঁর অনুরাগীরা। তবে ঠিক কী কারণে এই ঘোষণা করলেন গায়ক, তা এখনও স্পষ্ট নয়। কোনও কোনও সূত্রে খবর, সাময়িক বিরতি নিচ্ছেন অরিজিৎ। গলার বিশ্রামের জন্যই এই পদক্ষেপ তাঁর। তবে এমন কিছু উল্লেখ করেননি গায়ক নিজে। তবে ওই পোস্টের শেষে তিনি লিখেছেন, “এই সফর সত্যিই সুন্দর ছিল।”
অরিজিৎ আরও লিখেছেন, ‘‘আমি ভাল সঙ্গীতের ভক্ত এবং ভবিষ্যতে এক জন শিল্পী হিসাবে আরও শিখব এবং নিজে নিজে আরও কিছু করব। আপনাদের সকলের সমর্থনের জন্য আবার ধন্যবাদ। আমাকে এখনও কিছু প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হবে। সেই কাজগুলি শেষ করব। তাই এ বছর আমার কিছু কাজ মুক্তি পেতে পারে। শুধু স্পষ্ট করে বলতে চাই যে আমি সঙ্গীত তৈরি করা বন্ধ করব না।’’
অরিজিৎ আর প্লেব্যাক না করার সিদ্ধান্তের পর মন ভেঙেছে তাঁর তামাম ভক্তকুলের। তাঁর সুরের জাদুতে মন মজেছে আসমুদ্রহিমাচলের, তাঁর গলায় আর নতুন গান শোনা যাবে না, তেমনটা অনেকেই মেনে নিতে পারছেন না।
তবে অরিজিতের এই আকস্মিক ঘোষণার মাঝেই কৌতূহল তৈরি হয়েছে তাঁর সম্পত্তির পরিমাণ নিয়ে। গায়ক কত টাকার মালিক, তা জানতে আগ্রহ তৈরি হয়েছে তাঁর অনুরাগীদের মধ্যে। অরিজিৎকে ঘিরে নানা গুঞ্জনের মাঝে দেখে নেওয়া যাক, তাঁর মোট সম্পত্তির পরিমাণ কত।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত অরিজিৎ সিংহের মোট সম্পদের পরিমাণ ৪১৪ কোটি টাকা।
গায়কের বিশাল সম্পত্তির মধ্যে রয়েছে নবী মুম্বইয়ে ৮ কোটি টাকার একটি বিলাসবহুল বাড়ি এবং ৩.৪ কোটি টাকারও বেশি দামের বিলাসবহুল গাড়ি। সূত্রের খবর, মুম্বইয়ের বর্সোবাতেও নাকি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে গায়কের।
খবর, অরিজিতের বিলাসবহুল গাড়ির সংগ্রহে একটি রেঞ্জ রোভার, একটি হামার এইচ৩ এবং একটি মার্সিডিজ় রয়েছে। এ ছাড়াও রয়েছে বেশ কয়েকটি গাড়ি। জিয়াগঞ্জের বাড়িতে একটি অতি পরিচিত স্কুটিও রয়েছে। সেটি করেই জিয়াগঞ্জের রাস্তায় ঘুরতে দেখা যায় তাঁকে। সেই স্কুটিতে আন্তর্জাতিক শিল্পী এড শিরানকে চাপিয়েও ঘুরেছেন তিনি।
মুর্শিদাবাদে তাঁর নিজের শহরে ‘হেঁশেল’ নামে একটি পকেটবান্ধব রেস্তরাঁও রয়েছে অরিজিতের বাবার। সাধারণ মানুষের কথা মাথায় রেখে এখনও ৪০ টাকায় খাবার পাওয়া যায় সেই রেস্তরাঁয়।
অরিজিৎকে সঙ্গীতজগতের ‘সুপারস্টার’ বলা যেতেই পারে। গায়কের অসাধারণ প্রতিভার প্রতিফলন মেলে তাঁর আয়ের পরিমাণে। দেশের সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক নেওয়া গায়কদের মধ্যে অন্যতম অরিজিৎ।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অরিজিতের আনুমানিক বার্ষিক আয় ৭০ কোটি টাকা। বলিউডে প্রতিটি গান গাওয়ার জন্য ১০ লক্ষ টাকা করে পারিশ্রমিক নেন তিনি। লাইভ পারফর্ম্যান্সের জন্য নেন, ৫০ লক্ষ থেকে ১.৫ কোটি টাকার মধ্যে। বিদেশে শো হলে টাকার অঙ্ক অনেকটাই বেশি।
আবার কোনও কোনও সূত্রে জানা যায়, একটি কনসার্টের জন্য ২ কোটি টাকা নেন অরিজিৎ। দুই ঘণ্টার লাইভ পারফর্ম্যান্সের জন্য নেন প্রায় ১৪ কোটি টাকা, যা তাঁকে কেবল ভারতেরই নয়, বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত সঙ্গীতশিল্পীদের একজন করে তুলেছে।
পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে জন্ম অরিজিতের। জিয়াগঞ্জে বেড়ে ওঠা। সেখান থেকে এখন বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় প্লেব্যাক গায়ক তিনি।
২০০৫ সালে ‘ফেম গুরুকুল’ নামে একটি রিয়্যালিটি শোয়ের মাধ্যমে গায়ক হিসাবে পথচলা শুরু করলেও সেই অনুষ্ঠানে নিজের ব্যর্থতায় মুষড়ে পড়েননি অরিজিৎ। নিজের প্রতিভাকে আরও শান দিয়েছেন গায়ক। তার ফলও পেয়েছেন হাতেনাতে।
২০১১ সালে ‘মার্ডার ২’ ছবির ‘ফির মহব্বত’ গানের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করেন গায়ক। তবে তাঁর প্রকৃত উত্থান ২০১৩ সালে ‘আশিকি ২’-এর ‘তুম হি হো’ গানটির মাধ্যমে। সেই গান গেয়ে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন তিনি। গানটি সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দেয় এবং বছরের সবচেয়ে বড় হিট গানগুলির মধ্যে একটি হয়ে ওঠে। তার পর থেকে অরিজিৎকে কেউ থামাতে পারেনি। তিনি হয়ে ওঠেন অদম্য। বাকিটা ইতিহাস।
হিন্দি, বাংলা, মরাঠি এবং তেলুগু-সহ বিভিন্ন ভাষায় ৩০০টিরও বেশি গান গেয়েছেন অরিজিৎ। তাঁর মধ্যে বেশির ভাগ গানই সুপারহিট এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের মন জয় করেছে।
অরিজিতের গাওয়া জনপ্রিয় গানগুলির মধ্যে রয়েছে ‘চান্না মেরেয়া’, ‘আগর তুম সাথ হো’, ‘গেরুয়া’, ‘অ্যায় দিল হ্যায় মুশকিল’, ‘কেসরিয়া’, ‘ফির লে আয়া দিল’, ‘খয়রিয়াত’, ‘শায়দ’ ইত্যাদি। বলিউডের আসন্ন ছবি ‘ও রোমিও’তে ‘হাম তো তেরে হি লিয়ে হ্যায়’ গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি।
কয়েক বছরের কেরিয়ারে গান গাওয়ার জন্য বহু পুরস্কার জিতেছেন অরিজিৎ। জিতেছেন জাতীয় পুরস্কারও। সঙ্গীতে অবদানের জন্য ২০২৫ সালে তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’তে ভূষিত করা হয়।
গান শোনার অন্যতম জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম স্পটিফাই। সেই প্ল্যাটফর্ম পর পর সাত বছর ‘ভারতের শীর্ষ শিল্পী’ হিসাবে মনোনীত করেছে অরিজিৎকে।
আট থেকে আশি অরিজিতের গানের ভক্ত। সেই গায়কেরই সাম্প্রতিক ঘোষণায় মুষড়ে পড়েছেন দেশের তামাম সঙ্গীতপ্রেমী মানুষ। অরিজিতের ঘোষণার পর সঙ্গীতজগতের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন।
সুরকার এবং গায়ক অমল মালিক জানিয়েছেন, খবরটি শোনার পর তিনি হতাশ বোধ করছেন। তবে তিনি অরিজিতের সিদ্ধান্তকে সম্মান করেন। তাঁর কথায়, তিনি আজীবন অরিজিতের ভক্ত থাকবেন। র্যাপার বাদশাও অরিজিৎকে এই প্রজন্মের সেরা শিল্পী বলে অভিহিত করেছেন।
সব ছবি: সংগৃহীত।