শৌচাগার যুদ্ধ! আমেরিকার বিমানবাহী রণতরী জেরাল্ড আর ফোর্ডে নিযুক্ত নৌসেনার কর্মীদের শৌচালয় সংক্রান্ত যে সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে, আপাতত তাকে সেই নামই দিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলি। ইরানের সঙ্গে সংঘাতের আবহে আমেরিকার বিমানবাহী ওই রণতরীতে বর্তমানে পাঁচ হাজারেরও বেশি নৌসেনা রয়েছেন। কিন্তু সে তুলনায় শৌচালয় হাতেগোনা। ফলে শৌচাগারের বাইরে লম্বা লাইন থাকছে বেশির ভাগ সময়। মাঝেমধ্যে নৌসেনাদের ৪০-৪৫ মিনিট ধরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। সেই সংক্রান্ত একাধিক ভিডিয়ো ইতিমধ্যেই প্রকাশ্যে এসেছে সমাজমাধ্যমে। যদিও সেই ভিডিয়োর সত্যতা যাচাই করেনি আনন্দবাজার ডট কম।
ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১,১০,০০০ কোটি টাকার এই রণতরীর শৌচাগার সমস্যাটি কেবল সাধারণ ‘ব্লক’ নয়, বরং গভীর নকশাগত ও ইঞ্জিনিয়ারিং ত্রুটি বলেও চিহ্নিত হয়েছে। ২০২০ সালে এই ত্রুটি ধরা পড়ে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি অভিযানে মোতায়েন থাকার কারণে সমস্যা প্রকট হয়েছে।
মূলত জাহাজে প্রচলিত ব্যবস্থার বদলে এর পয়ঃপ্রণালীতে ‘ভ্যাকুয়াম’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু এর পাইপগুলি অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ। ৪৬০০ নাবিকের দৈনিক বর্জ্য বহনের ক্ষমতা এই পাইপলাইনের নেই। তার ওপর সমুদ্রের নোনা জলের প্রভাবে পাইপের ভিতরে ক্যালশিয়াম জমে নিকাশি পথ আরও সরু হয়ে যাচ্ছে। জাহাজটি ১০টি ভ্যাকুয়াম জ়োনে বিভক্ত। একটি শৌচাগারের ভাল্ভ বা সেন্সর বিকল হলে পুরো জ়োনের নিকাশি ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে মাঝেমধ্যেই ‘অ্যাসিড ফ্লাশ’ করতে হচ্ছে, যার প্রতি বারে খরচ পড়ে ৪ লক্ষ ডলার (প্রায় ৩ কোটি ৬৪ লক্ষ টাকা)। এবং এটা জাহাজঘাটায় নোঙর না করে করা সম্ভব নয়। এ ছাড়া প্রতি দিন অন্তত এক বার প্রকৌশলীদের হাতে-কলমে পাইপ পরিষ্কার করতে হচ্ছে। পেন্টাগন দাবি করেছে, এই সমস্যা যুদ্ধ-প্রস্তুতিতে সরাসরি প্রভাব না ফেললেও দীর্ঘ মেয়াদে নাবিকদের সমস্যা তৈরি করবে। কিন্তু অনেকেই জানেন না, এ রকমই শৌচের সমস্যা এক বার কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল জার্মানির এক ডুবোজাহাজের জন্য। মাঝসমুদ্রে ডুবেও যায় জার্মানির সেই ইউ-বোট।
ঘটনাটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের। পৃথিবী জুড়ে তখন চলছে যুদ্ধ। বিশ্বের তাবড় তাবড় দেশের লড়াইয়ের আঁচ পড়েছে ছোট দেশগুলিতেও। চারদিকে গোলাগুলির শব্দ, বারুদের গন্ধ আর রক্ত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এক দিকে ছিল অক্ষশক্তি, অন্য দিকে মিত্রশক্তি। অক্ষশক্তির মধ্যে ছিল জার্মানি, ইতালি এবং জাপান। অন্য দিকে মিত্রশক্তিতে প্রধান দেশগুলি ছিল ব্রিটেন, ফ্রান্স, সোভিয়েত ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চিন। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে পরাজিত হয় অক্ষশক্তির দেশগুলি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ই জার্মান ক্যাপ্টেন কার্ল-আডল্ফ শ্লিটের মলত্যাগের কারণে তাঁর ইউ-বোটে যে বিপর্যয় ঘটেছিল, ও রকম কারণে তার চেয়ে ভয়াবহ আর কোনও বিপর্যয় ইতিহাসে ঘটেনি।
শৌচকর্মের কারণে বিপর্যয়টি ঘটেছিল ১৯৪৫ সালের ১৪ এপ্রিল। জার্মান ডুবোজাহাজ ইউ-১২০৬ তখন ঘাঁটি গেড়েছে স্কটল্যান্ডের অ্যাবারডিনশায়ার উপকূলের কাছে। ইউ-বোট বা জার্মান ভাষায় ‘উনটারসিবুট’-এর অর্থ যে নৌকা সমুদ্রের নীচে চলাচল করে।
জার্মানির সেই ডুবোডাহাজ ছিল সেই সময়ের নিঃশব্দ শিকারি। সমুদ্রের তলা দিয়ে অজ্ঞাতসারে চলাচল করতে এবং শত্রু জাহাজের উপর ধ্বংসাত্মক আগ্নেয়াস্ত্র ছুড়তে সক্ষম ডুবোজাহাজটি মূলত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তৈরি। ট্রান্স-আটলান্টিক শিপিং রুট ধ্বংস করে দিয়েছিল ওই ডুবোজাহাজ।
এমনকি, নিজেদের আকারের ২০ গুণ বড় জাহাজ ধ্বংস করার ক্ষমতা ছিল জার্মান ইউ-বোটগুলির। ১৯১৫ সালে যাত্রিবাহী ব্রিটিশ জাহাজ আরএমএস লুসিতানিয়ার উপর টর্পেডো হামলা করে সেটিকে ডুবিয়ে দিয়েছিল জার্মানির কুখ্যাত ডুবোজাহাজটি। সেই ঘটনায় প্রায় ১২০০ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আরও অত্যাধুনিক কায়দায় সেজে উঠেছিল জার্মান ইউ-বোটগুলি। দু’টি বিমানবিধ্বংসী বন্দুক, পাঁচটি টর্পেডো টিউব এবং আরও অনেক আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে সজ্জিত ছিল ডুবোজাহাজগুলি। কিন্তু সমুদ্রের তলার সেই নিঃশব্দ ঘাতকই ডুবে গিয়েছিল কেবল এক জনের মলত্যাগের কারণে!
ইউ-১২০৬ ডুবোজাহাজটিতে বর্জ্য নিষ্কাশনের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল। জাহাজে বর্জ্য সংরক্ষণের পরিবর্তে সরাসরি তা ফেলে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল সমুদ্রে। এর ফলে ডুবোজাহাজটির মধ্যে জায়গা এবং ওজন— উভয়েরই সাশ্রয় হয়েছিল। ডুবোজাহাজের উন্নত প্রযুক্তির কারণে ক্যাপ্টেন শ্লিট বা নৌসেনার অন্য কোনও কর্তার মনে সন্দেহের কোনও অবকাশই ছিল না যে, মলত্যাগের মতো সামান্য কারণে সেটি ডুবে যাবে।
১৯৪৫ সালের ১৪ এপ্রিল ডুবোজাহাজটি সমুদ্রে নামার পর শৌচালয়ে যান ক্যাপ্টেন শ্লিট। অত্যাধুনিক ভাবে সজ্জিত নির্দিষ্ট ওই ডুবোজাহাজটিতে তার আগে কেউ শৌচালয় ব্যবহার করেননি। শ্লিটই ছিলেন প্রথম।
তবে শৌচকর্ম শেষের পর শ্লিট বুঝতে পারেন, শরীর থেকে বেরোনো বর্জ্য কী ভাবে ‘ফ্লাশ’ করতে হবে তা তাঁর জানা নেই। ডুবোজাহাজের বর্জ্য নিষ্কাশনের পদ্ধতি নতুন হওয়ায় স্বাভাবিক ভাবেই নৌসেনা কর্মীদের তা নিয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছিল। মনে করা হয়, শ্লিট হয় প্রশিক্ষণে যোগ দেননি অথবা প্রক্রিয়াটি কী তা ভুলে গিয়েছিলেন।
ফলে সাহায্যের জন্য ডুবোজাহাজে থাকা এক জন ইঞ্জিনিয়ারকে ডেকে আনেন শ্লিট। দু’জনেই মল নিষ্কাশনের চেষ্টা করছিলেন। জানা যায়, সেই প্রচেষ্টা চালানোর সময় একটি ভুল ভাল্ভে চাপ দিয়ে দেন ওই ইঞ্জিনিয়ার। তৎক্ষণাৎ শৌচাগার মল এবং সমুদ্রের জলে ভরে যেতে শুরু করে। সেই জল শৌচালয় থেকে হু হু করে বেরিয়ে অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে।
আবার অনেকের দাবি ওই ইঞ্জিনিয়ার নন, কাণ্ডটি ঘটিয়েছিলেন খোদ শ্লিট। কেউ কেউ আবার মনে করেন, দোষ কারও ছিল না। আসলে সমুদ্রের গভীরে জলের চাপে বর্জ্য নিষ্কাশন প্রক্রিয়া ঠিকমতো কাজ করেনি এবং সেই কারণেই বিপর্যয় ঘটে।
কারণ যা-ই হোক, মোট কথা প্রক্রিয়াটি ব্যর্থ হয়েছিল। ফলে অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয় শ্লিট এবং ডুবোজাহাজে থাকা অন্য নৌকর্মীদের। চারদিকে মল ছড়িয়ে পড়ে। জলও ঢুকতে থাকে ডুবোজাহাজে। শৌচাগারটি ডুবোজাহাজের ব্যাটারি কক্ষের ঠিক উপরে ছিল। মলমিশ্রিত সমুদ্রের জল সেখানে প্রবেশের পর ক্লোরিন গ্যাস তৈরি হয়।
বিষাক্ত ধোঁয়া এবং জলের কারণে সমুদ্রের উপরে ভেসে ওঠা ছাড়া আর কোনও বিকল্প ছিল না ডুবোজাহাজটির। ফলে ডুবোজাহাজের ওজন কমাতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও টর্পেডো ছোড়ার নির্দেশ দেন শ্লিট। কিন্তু এর ফল হয়েছিল উল্টো।
টর্পেডো নিক্ষেপের পর ডুবোজাহাজটি সমুদ্রপৃষ্ঠে ভেসে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তা ব্রিটেনের নৌবাহিনীর নজরে পড়ে। ডুবোজাবাজটিকে লক্ষ্য করে গুলি চালাতে শুরু করে তারা। ডুবোজাহাজ ছেড়ে কোনও মতে পালিয়ে যান শ্লিট। ওই ডুবোজাহাজে থাকা প্রায় ৫০ জনকে যুদ্ধবন্দি হিসাবে গ্রেফতার করা হয়। নিহতও হন চার জন। সমুদ্রে ডুবে যায় ইউ-১২০৬।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এর পর আর বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। বিশ্বযুদ্ধ শেষের বহু বছর পর ১৯৭০ সালে ইউ-১২০৬ ডুবোজাহাজটির ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার হয়। সমুদ্রে নীচে তেলের পাইপলাইনের কাজ হওয়ার সময় উদ্ধার করা হয় সেটি।
সব ছবি: সংগৃহীত।