এক বছরে দুর্নীতি কমেছে ভারতের। তবে দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়া নিয়ে যতটা হইচই হয়, বাস্তবে দেখা গেল ফল ততটা ভাল নয়। কয়েক ধাপ উঠলেও তালিকার নীচের দিকেই স্থান পেয়েছে ভারত। গত কয়েক বছরের মতো এ বছরও সেই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেনি। সাম্প্রতিক সমীক্ষার রিপোর্ট প্রকাশ হতেই দেখা গিয়েছে ‘দুর্নীতি হটাও’ স্লোগান কার্যকরী হয়ে ওঠেনি এ দেশে।
সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে বিশ্ব দুর্নীতি সূচকের রিপোর্ট। সেখানে দেখা গিয়েছে, দুর্নীতিমুক্ত দেশগুলির ধারেকাছেও আসতে পারেনি ভারত। তবে গত বছরের চেয়ে তালিকার কয়েক ধাপ উপরে উঠতে পেরেছে দেশ। গত ১০ ফেব্রুয়ারি করাপশন পারসেপশন্স ইনডেক্স বা সিপিআই প্রকাশ্যে এসেছে। ২০২৫ সালে কোন দেশ কতটা দুর্নীতির পাঁকে নিমজ্জিত হয়েছে, সেই র্যাঙ্কিং তুলে ধরে এই সমীক্ষা।
আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সর্বশেষ সিপিআই অনুসারে, ভারতের নম্বর আগের বছরের তুলনায় এক পয়েন্ট বেড়েছে। আর তাতেই পাঁচ ধাপ এগিয়ে গিয়েছে। বার্লিনভিত্তিক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই)-এর বার্ষিক রিপোর্ট জানাচ্ছে, গত এক বছরে দুর্নীতির ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান কিছুটা হলেও উপরের দিকে উঠেছে। ১৮২টি দেশ নিয়ে এই তালিকা প্রতি বছর প্রকাশ করে টিআই।
সিপিআই বিশ্বব্যাপী ১৮২টি দেশ এবং অঞ্চলকে সরকারি খাতের দুর্নীতির মাত্রা অনুসারে স্থান দেয়। ১৯৯৫ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত, সূচকটি ১০ থেকে শূন্যের মধ্যে স্থির করা হয়েছিল। ২০১২ সাল থেকে দুর্নীতির সূচক ১০০ (পরিচ্ছন্ন) থেকে ০ (অত্যন্ত দুর্নীতিগ্রস্ত) স্কেলে পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে।
কোন দেশ দুর্নীতিতে কতটা জর্জরিত, তা-ই জানানো হয় সেই রিপোর্টে। ২০২৫ সালের শেষে কোন দেশ দুর্নীতিতে ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে, তার রিপোর্ট ২০২৬ সালে সর্বসমক্ষে আনে ‘ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল’। রিপোর্ট বলছে, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের স্থান ভারতের থেকেও নীচে। সূচক-তালিকায় তারা রয়েছে যথাক্রমে ১৩৬ এবং ১৫০ নম্বরে।
বিশ্বের ১৮২টি দেশের মধ্যে ভারতের ঠাঁই হয়েছে ৯১ নম্বরে। গত বছর ছিল ৯৬তম স্থানে। ২০২৪ সালে ভারতের র্যাঙ্কিং ছিল ৯৩তে। ২০২৫ সালে ভারতের তিন ধাপ অবনমন ঘটেছিল। ১০০-এর মধ্যে কোন দেশ কত নম্বর পাচ্ছে, তার ভিত্তিতে এই তালিকা তৈরি করে জার্মান সংস্থাটি। ২০২৫ সালের বিচারে ভারত পেয়েছে ৩৯ নম্বর। ইরাক, পাকিস্তান দুই দেশই পেয়েছে ২৮। বাংলাদেশের স্থান হয়েছে পাকিস্তানের নীচে। প্রাপ্ত নম্বর ২৪। শ্রীলঙ্কার ফল তুলনামূলক ভাবে ভাল। গত বছরের চেয়ে ১৪ ধাপ এগিয়েছে প্রতিবেশী দ্বীপরাষ্ট্রটি।
প্রতিবেদনে ভারতকে দুর্নীতির খবর খুঁড়ে বার করা সাংবাদিকদের জন্য ‘বিপজ্জনক দেশ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারের কাজ নিয়ে অনুসন্ধান শুরু হলেই শাস্তির খাঁড়া নেমে আসে বলে অভিযোগ। তথ্য বলছে গণতন্ত্রে নাগরিক স্বাধীনতা মাপার যত রকম সূচক আছে, প্রতিটিতে ভারতের স্থান নিম্নগামী। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১৪২তম।
প্রতিবেদনে বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে এক সারিতে রাখা হয়েছে ভারতকেও। সেই সমস্ত দেশে দুর্নীতির তদন্তের জন্য সাংবাদিকদের আক্রমণ করা হয় বা হত্যা করা হয়। সিপিআইয়ের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে ২০১২ সাল থেকে, বিশ্বব্যাপী সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল ছাড়াও ৮২৯ জন সাংবাদিক খবর খুঁজতে গিয়ে মারা গিয়েছেন। হত্যাকাণ্ডের ৯০ শতাংশেরও বেশি ঘটনা ঘটেছে সেই সব দেশে যাদের সিপিআই স্কোর ৫০-এর কম। দেশগুলির মধ্যে রয়েছে ব্রাজ়িল (৩৫), ভারত (৩৯), মেক্সিকো (২৭), পাকিস্তান (২৮) এবং ইরাক (২৮)। এই সমস্ত দেশগুলি দুর্নীতি নিয়ে খবর করা সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ ভাবে বিপজ্জনক বলে উঠে এসেছে বিশ্ব দুর্নীতির সূচকে।
রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চিনে দুর্নীতির পরিমাণ অপরিবর্তিত। তালিকার উপরের দিকে স্থান না পেলেও ভারতের থেকে বেশ কয়েক ধাপ এগিয়ে ড্রাগনভূমি। শি জিনপিংয়ের দেশ ৪৩ নম্বর পেয়ে ৭৬তম স্থান ধরে রেখেছে।
২০২৫ সালের সিপিআই-তে জায়গা করে নেওয়া ১৮২টি দেশের মধ্যে প্রথম তিন দেশ হল ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড এবং সিঙ্গাপুর। সূচকের শীর্ষে ডেনমার্ক ৮৯ পয়েন্ট পেয়ে বাকি দু’টি দেশকে পিছনে ফেলে দিয়েছে। ফিনল্যান্ড এবং সিঙ্গাপুর যথাক্রমে ৮৮ ও ৮৪। বিশ্বের দুর্নীতিমুক্ত প্রথম তিনটি দেশের মধ্যে দু’টি ইউরোপের স্ক্যান্ডিনেভীয় অঞ্চলের কম জনবহুল দেশ। দুর্নীতি বন্ধে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলির সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে দীর্ঘ আন্দোলন। সেখানে সামাজিক সুরক্ষা সুদৃঢ়।
সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত হিসাবে বিবেচিত দেশগুলির মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ সুদান, সোমালিয়া এবং ভেনেজ়ুয়েলা। তালিকার শেষ প্রান্তে রয়েছে দক্ষিণ সুদান এবং সোমালিয়া, উভয় দেশই ৯ পয়েন্ট অর্জন করেছে। তার পরে রয়েছে ভেনেজ়ুয়েলা। যদিও গত বছরের তুলনায় শীর্ষ তিনটি দেশের স্থান পরিবর্তন হয়নি।
এই তালিকায় বিশ্বের অন্যতম সুপার পাওয়ার দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২৯তম স্থান পেয়েছে। কম দুর্নীতির দেশ হিসাবে নাম রয়েছে ব্রিটেনেরও। আমেরিকার তুলনায় বেশ কয়েক ধাপ এগিয়ে ২০তম স্থানে রয়েছে ব্রিটেন।
অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা বা অস্বচ্ছতা নিয়ে বিভিন্ন সূচকের উপর সমীক্ষা চালিয়ে এই রিপোর্ট তৈরি করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল। তথ্য নেওয়া হয় বিশ্বব্যাঙ্ক, আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক, আইএমডি বিজনেস স্কুলের মতো প্রথম সারির আর্থিক বা বিজনেস ম্যানেজমেন্ট সংস্থার কাছ থেকে। তার ভিত্তিতেই নম্বর দেওয়া হয় এবং তৈরি হয় তালিকা।
২০১২ সাল থেকে ৩১টি দেশ তাদের দুর্নীতির মাত্রা উল্লেখযোগ্য ভাবে হ্রাস করতে সফল হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মত, এই সব দেশ রাতারাতি স্বপ্নের দেশে রূপান্তরিত হয়নি। সেখানেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। যেমন ডেনমার্কে সপ্তদশ শতাব্দীতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হল, ঘুষকে দণ্ডনীয় অপরাধ ঘোষণা করা।
সুশীল সমাজের সংগঠনগুলি, যারা সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলে তাদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। মানহানি, রাষ্ট্রদ্রোহ, হিংসাত্মক বক্তব্য, আদালত অবমাননার অভিযোগে, এমনকি বিদেশি তহবিল সংক্রান্ত মামলায় জড়াচ্ছে তারা। ভারতের মতো আরও বেশ কয়েকটি দেশে এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে রিপোর্টে।
ছবি: সংগৃহীত ও এআই সহায়তায় প্রণীত।