দেশের জ্বালানির চাহিদা মেটানোর জন্য আমদানি ছাড়া গত্যন্তর নেই ভারতের। জ্বালানির চাহিদার ৮৯ শতাংশই আমদানি করতে হয় নয়াদিল্লিকে। ইরানের সঙ্গে আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের সংঘাতের ফলে দীর্ঘ দিন হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধ। ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকিও।
এর জেরে হরমুজ়েই আটকে পড়ছে জ্বালানি তেলবাহী বহু জাহাজ। ভবিষ্যতে এই ধরনের পরিস্থিতিতে যাতে জ্বালানি সঙ্কট তৈরি না হয়, তাই বিকল্প ব্যবস্থা বেছে নেওয়ার দিকে ঝুঁকছে ভারত। কয়েক মাস ধরে হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় পশ্চিম এশিয়া থেকে তেলবাহী জাহাজগুলি সংশ্লিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছোতে পারছে না। এই পরিস্থিতিতে ভারতেও যাতে জ্বালানি সঙ্কট তৈরি না হয়, তাই ঘুরপথে অন্য দেশ থেকে জ্বালানি নিয়ে আসা হচ্ছে।
ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় অংশই আসে হরমুজ় প্রণালী দিয়ে। ঘুরপথে জ্বালানি আনা যেমন সময়সাপেক্ষ, তেমনই খরচের পাল্লাও বাড়ছে হুহু করে। পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা বৃদ্ধির কারণে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০৫ ডলারের ঘরে ঘোরাফেরা করছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ভাঁড়ারও দ্রুত নিঃশেষ হচ্ছে।
ইরান সংঘাত চলাকালীন নিজেদের নিরপেক্ষ অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয় ভারত। ফলে যুদ্ধের কারণে হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধ করলেও নয়াদিল্লিকে ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রের তকমা দিয়ে সেখান থেকে কিছুটা খনিজ তেল নিয়ে যেতে দিয়েছে তেহরান। এই সঙ্কটে আরও একটি শঙ্কার মেঘ ঘনিয়েছে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংস সম্প্রতি জানায়, বছর জুড়ে অশোধিত তেলের ব্যারেল গড়ে ১৩০ ডলার থাকলে তার ধাক্কা ভারতের অর্থনীতিতে পড়বে।
এই আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে হরমুজ়ের উপর নির্ভরতা কমাতে নয়াদিল্লি বাধ্য হয়েই নয়া বিকল্পের সন্ধান শুরু করে। পেট্রেলিয়াম মন্ত্রকের সূত্রকে উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারত সরাসরি গভীর সমুদ্রে পাইপলাইনের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিয়ে চলেছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ওমান থেকে সরাসরি পাইপের মাধ্যমে জ্বালানি পৌঁছোবে এ দেশে। খনিজ তেলের থেকেও ভারতের জন্য বেশি চ্যালেঞ্জ তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের আমদানি। এত দিন তার সিংহভাগ নয়াদিল্লিকে সরবরাহ করছিল কাতার। হরমুজ় বন্ধ থাকায় তা একরকম বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তবে সেখানেও রয়েছে একটি বিকল্প রুট, যার নাম ডলফিন গ্যাস পাইপলাইন। সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কটি কাতার থেকে শুরু হয়ে আমিরশাহি ঘুরে ওমানে গিয়েছে।
এই রুটটি ছাড়াও আনুমানিক ৪০,০০০ কোটি টাকা খরচ করে আরও একটি নতুন পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা খতিয়ে দেখতে শুরু করেছে ভারত। পশ্চিম এশিয়া-ভারতের মধ্যে গভীর সমুদ্রে পাইপলাইন বসানোর এক দশকের পুরনো পরিকল্পনাটি পুনরায় বিবেচনা করছে পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক।
ওমানের উপকূলকে সরাসরি ভারতের পশ্চিম উপকূলের গুজরাতের সঙ্গে সংযুক্ত করার জন্য ২,০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন বসানোর অনুমোদন এখন সময়ের অপেক্ষা। গেল ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্ডিয়া লিমিটেড এবং ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশনের মতো রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সংস্থাগুলির কাছে সম্ভাব্য প্রকল্পটি নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির নির্দেশ এসেছে বলে জানা গিয়েছে। একাধিক সংস্থা নিয়ে গঠিত দিল্লিস্থিত কনসোর্টিয়াম সাউথ এশিয়া গ্যাস এন্টারপ্রাইজ় (সেজ়) ইতিমধ্যেই একটি সমীক্ষা চালিয়েছে।
২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রস্তাবিত পথ বরাবর ৩,০০০ মিটার পরীক্ষামূলক পাইপলাইন স্থাপন করেছে সেজ়। উদ্দেশ্য, এই অ়ঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের হালহকিকত জানা। সেজ়ের করা এই প্রাথমিক সমীক্ষার উপর ভিত্তি করে বিস্তৃত এক প্রতিবেদন তৈরি করবে ভারতীয় সংস্থাগুলি। এই পাইপলাইনটি ওমানের রাস আল জিফান থেকে শুরু হয়ে আরব সাগরের নীচ দিয়ে সরাসরি গুজরাতের পোরবন্দর উপকূলে যুক্ত হবে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩,৪৫০ মিটার (প্রায় ৩.৫ কিমি) গভীরে বসবে পাইপলাইন। বিশ্বের গভীরতম পাইপলাইনগুলির মধ্যে জায়গা পেতে পারে ভারত-ওমান দ্বিপাক্ষিক সহায়তায় তৈরি হওয়া এই নয়া প্রকল্পটি।
চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে প্রকল্পটি নির্মাণ করতে প্রায় ৫ থেকে ৭ বছর সময় লাগতে পারে। করিডরটি তৈরি হলে শুধু ওমান নয়, বরং সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, সৌদি আরব, কাতার, এমনকি তুর্কমেনিস্তানের গ্যাসভান্ডারের সঙ্গেও যুক্ত হওয়ার নতুন দরজা খুলে যাবে নয়াদিল্লির। বিশেষজ্ঞদের মতে, এলএনজি আমদানির তুলনায় এই পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস আনা হলে ভারত বছরে প্রায় ৭,০০০ কোটি টাকা সাশ্রয় করতে পারবে।
মন্ত্রকের শীর্ষ আধিকারিকদের মতে, পাইপলাইনটি ভূ-রাজনৈতিক সংবেদনশীল এলাকা এড়িয়ে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মধ্য দিয়ে আরব সাগরের ওপর দিয়ে ভারতে পশ্চিম উপকূলে শেষ হবে। তেলসম্পদের জরিপ অনুসারে এই অঞ্চলটিতে ২,৫০০ লক্ষ কোটি ঘনফুট গ্যাসের সম্ভার রয়েছে।
যুদ্ধ থামার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল গত এপ্রিলে। শেষমেশ যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হলেও হরমুজ় দিয়ে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল সেই তিমিরেই। তবে গত দু’মাসে আমেরিকা-ইরান সংঘাতের আবহে মাত্র ১৩টি ভারতীয় জাহাজ হরমুজ় পেরোতে পেরেছে। এলপিজি ট্যাঙ্কার সাইমি বুধবার হরমুজ় প্রণালী পেরিয়ে এসেছে। আর একটি এলপিজিবাহী জাহাজ এনভি সানশাইন বৃহস্পতিবার ওই জলপথ পার করেছে।
সাইমি ১৯৯৬৫ টন এলপিজি বহন করছে। গুজরাতের বন্দরে তার পৌঁছোনোর কথা আগামী ১৬ মে। দ্বিতীয় জাহাজটিতে রয়েছে ৪৬৪২৭ টন এলপিজি। নিউ মেঙ্গালুরু বন্দরে আগামী ১৮ মে পৌঁছোবে সেটি।
বর্তমানে পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ ভারতকে মোক্ষম শিক্ষা দিয়েছে। একটি-দু’টি দেশের উপর বাণিজ্য নির্ভরতা যে দুর্ভোগ ডেকে আনতে পারে, তা ঠেকে শিখেছে নয়াদিল্লি। ফলে বিশ্ব জুড়ে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে তুলতে মরিয়া ভারত। সোমবার কেন্দ্রীয় বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়াল জানিয়েছেন, এ বার ওমানের সঙ্গে বাণিজ্যে জোট গড়ে তুলতে আগ্রহী নয়াদিল্লি।
সেই লক্ষ্যে সে দেশের বাণিজ্যমন্ত্রী আনওয়ার বিন হিলাল বিন হামদৌন আল জাবরির সঙ্গে এ দিন কথা হয়েছে তাঁর, যাতে দু’দেশের মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধির পাশাপাশি পারস্পরিক লগ্নির পরিবেশ চাঙ্গা হয় সেটিও বিবেচনা করছে দু’পক্ষই।
যুদ্ধের কারণে হরমুজ় পুরোপুরি অবরুদ্ধ হবে, সেটা কোনও দিনই ভাবেননি বিশ্ববাসী। অদূর ভবিষ্যতে বহু দেশের মতো ভারতেরও ‘বাইপাস’ রাস্তাই ভরসা। নইলে আন্তর্জাতিক বাজারে খনিজ তেলের দামের দৌড়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে অর্থনীতির সাড়ে সর্বনাশ ঠেকানো বেশ কঠিন। কারণ জ্বালানি সঙ্কটে দুনিয়া জুড়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা আন্তর্জাতিক মহলে।
অবরুদ্ধ হরমুজ়কে তোয়াক্কা না করে সম্পূর্ণ অন্য রাস্তায় তরল সোনা ও এলপিজির (লিক্যুইফায়েড পেট্রোলিয়াম গ্যাস) সরবরাহ শুরু করাতে ভারতের লাভ বই ক্ষতি নেই। এই নতুন পাইপলাইনটি তৈরি হলে ভবিষ্যৎ বিপদের মধ্যেও নয়াদিল্লি কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পারবে বললেও অত্যুক্তি হবে না।
ছবি: সংগৃহীত।