দিন দিন কমছে রিটার্ন। আর তাই ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও ব্যাঙ্কের প্রথাগত বিনিয়োগের থেকে মুখ ফিরিয়ে স্টক বা মিউচুয়াল ফান্ডে লগ্নিতে মেতেছে আমজনতার একাংশ। আর্থিক বিশ্লেষকদের দাবি, লগ্নিকারীদের এ-হেন ‘স্বাদবদলে’ ব্যাপক ভাবে কমে যাচ্ছে ব্যাঙ্কের হাতে থাকা নগদ অর্থ। অন্য দিকে হু–হু করে বাড়ছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাস্থ্য বিগড়োনোর আশঙ্কা।
স্বাধীনতার পর ভবিষ্যৎ সঞ্চয়ের সবচেয়ে ভাল মাধ্যম হিসাবে ব্যাঙ্কে লগ্নিকে পাখির চোখ করে এ দেশের সাধারণ মানুষ। বিনিয়োগকারীদের প্রায় সকলেই স্থায়ী আমানত বা এফডি (ফিক্সড ডিপোজ়িট) বা মেয়াদি আমানত বা আরডিতে (রেকারিং ডিপোজ়িট) টাকা রাখতেন। কিন্তু, ২১ শতকের প্রথম দশক কাটার পর লাফিয়ে লাফিয়ে নামতে থাকে এগুলির সুদের হার। ফলে ঝুঁকি নিয়েই বেশি লাভের আশায় শেয়ার বাজার, মিউচুয়াল ফান্ড, সোনা-রুপো বা ক্রিপ্টো মুদ্রার দিকে নজর ঘুরিয়েছেন লগ্নিকারীরা।
বিনিয়োগের এই কাঠামোগত পরিবর্তন নিয়ে সম্প্রতি একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (আরবিআই)। সেখানে বলা হয়েছে, ব্যাঙ্কে গৃহস্থালি লগ্নির পরিমাণ মাত্র সাত শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে এফডি এবং আরডির মতো প্রকল্পগুলি অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ, গত ১০ বছরের নিরিখে গৃহস্থালি বিনিয়োগে সবচেয়ে কম টাকা রেখেছে ভারতের আমজনতা। ফলে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাঙ্কগুলির হাতে থাকা নগদ বা পুঁজির পরিমাণ কমতে শুরু করেছে।
আরবিআইয়ের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৪-’২৫ অর্থবর্ষের শেষে হিন্দু অবিভক্ত পরিবারগুলির হাতে থাকা স্থায়ী বা মেয়াদি আমানতের পরিমাণ ৪৫.৭৭ শতাংশে নেমে আসে। ২০২০-’২১ সালে এই পরিমাণ ছিল ৫০.৫৪ শতাংশ। চলতি আর্থিক বছরে (২০২৫-’২৬) এই সূচক আরও নিম্নমুখী হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, এটি ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, কোভিড অতিমারি চলাকালীন রেপো রেট ১২৫ পয়েন্ট হ্রাস করে আরবিআই। পরবর্তী পর্যায়ে এটিকে ২২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। ২০২৫ সালে মোট চার বার হ্রাস পায় রেপো রেট। ফলে ফের ১২৫ পয়েন্ট কমে গিয়ে বর্তমানে ৫.২৫ শতাংশে নেমে এসেছে এটি। তার পরেও লগ্নিকারীরা যে এফডি বা আরডিতে বিনিয়োগের জন্য ব্যাঙ্কমুখী হয়েছেন, এ কথা বলা যাবে না। সরকারি-বেসরকারি ব্যাঙ্কগুলিকে যে সুদের হারে আরবিআই ঋণ দিয়ে থাকে, অর্থনীতির পরিভাষায় সেটাই হল রেপো রেট।
রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের রিপোর্ট অনুযায়ী, চলতি আর্থিক বছরের (২০২৫-’২৬) তৃতীয় ত্রৈমাসিকে (অক্টোবর-নভেম্বর) স্টক ও মিউচুয়াল ফান্ডে লগ্নির পরিমাণ ৩১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছে। তা ব্যাঙ্কে জমা থাকা স্থায়ী আমানতের চেয়ে অনেকটাই বেশি। তবে আশার কথা হল, গত পাঁচ বছরে (২০২০-’২৫ সাল) এফডিতে বিনিয়োগের ৭৭ শতাংশ স্থিতিশীল রয়েছে। যদিও মিউচুয়াল ফান্ডের অ্যাকাউন্টের পরিমাণ লাফিয়ে লাফিয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ভারতের মিউচুয়াল ফান্ডগুলিতে লগ্নি করেছেন ২৩ কোটি গ্রাহক। এঁদের ৯১ শতাংশই খুচরো বিনিয়োগকারী। অথচ মাত্র চার বছর আগে (পড়ুন ২০২১ সালের মে মাসে) এ দেশে মিউচুয়াল ফান্ডের মোট গ্রাহকসংখ্যা ছিল ১০ কোটি। এর জেরে সংশ্লিষ্ট তহবিলগুলির ব্যবস্থাপনার অধীনে থাকা সম্পত্তি বা এইউএম (অ্যাসেট্স আন্ডার ম্যানেজমেন্ট) বৃদ্ধি পেয়েছে তিন গুণ।
২০২০ সালের শেষ দিকে ভারতের মিউচুয়াল ফান্ডগুলির হাতে থাকা এইউএম-এর পরিমাণ ছিল ২২.২৬ লক্ষ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের এপ্রিলে পৌঁছে সেটাই বেড়ে ৬৯.৫০ লক্ষ কোটিতে গিয়ে দাঁড়ায়। খুচরো লগ্নিকারীদের একটা বড় অংশ এই হারে মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ শুরু করায় বিপাকে পড়েছে সরকারি এবং বেসরকারি ব্যাঙ্ক। এফডি ও আরডিকে তাদের মূল তহবিল বা নগদের উৎস বলা যেতে পারে। সেই পুঁজিতে টান পড়ায় উদ্বেগ বেড়েছে।
আর্থিক বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, সরকারি ও বেসরকারি ব্যাঙ্কের হাতে থাকা নগদ কমে গেলে বাড়তে পারে বাড়ি, গাড়ি বা অন্যান্য খাতে নেওয়া ঋণের সুদ। সেই বাড়তি বোঝা বইতে হবে আমজনতাকেই। এ ব্যাপারে পরিষ্কার ছবি পেতে ২০২৪ সালে সমীক্ষা করে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক। তার রিপোর্ট ওই বছরের ডিসেম্বরে প্রকাশ্যে এনেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। ফলে একাধিক বিস্ফোরক তথ্য সামনে চলে আসে।
রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের সমীক্ষা রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদে বিনিয়োগকারী পরিবারের অনুপাত ছিল ১৫.৭ শতাংশ। ২০২২ সালে সেটা বেড়ে ১৭.৮ শতাংশে পৌঁছে যায়। সমীক্ষকেরা জানিয়েছেন, আর্থিক সঞ্চয়কে পুরোপুরি উপেক্ষা করা পরিবারের সংখ্যা সারা দেশে যথেষ্টই হ্রাস পেয়েছে। বরং অতিমারি-পরবর্তী সময়ে এ দেশের আমজনতা লগ্নিতে বেশি করে মন দিয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না।
গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সাল) বার্ষিক প্রতিবেদনে আরও একটি ব্যাপারে ইঙ্গিত দেয় আরবিআই। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কটি জানিয়েছে, ২০২০-’২১ আর্থিক বছরে মোট জাতীয় ব্যয়যোগ্য আয়ের নিরিখে গৃহস্থালি লগ্নির (এফডি ও আরডি) পরিমাণ ছিল ৬.২ শতাংশ। ২০২৩-’২৪ অর্থবর্ষে সেটা আরও কমে ৪.৫ শতাংশে নেমে আসে। এই সময়সীমার মধ্যে শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ ০.৫ শতাংশ থেকে ০.৯ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
আরবিআইয়ের সমীক্ষকদের দাবি, আরও একটি কারণে ব্যাঙ্কের থেকে মুখ ফেরাচ্ছেন এ দেশের সাধারণ মধ্যবিত্ত। গত কয়েক বছরে অর্থনীতির বাজারে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছে একাধিক ফিনটেক সংস্থা। গ্রাহকদের প্রায়ই বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষ সুযোগ দিয়ে থাকে তারা। এর জেরে আমজনতার হাতে একাধিক বিকল্প চলে এসেছে। ফলে প্রথাগত লগ্নিতে দিন দিন উৎসাহ হারাচ্ছেন তাঁরা।
তবে ব্যাঙ্কগুলির হাতে থাকা নগদ পুঁজি হ্রাস পাওয়ার কিছু সুবিধাও রয়েছে। চলতি বছরের (২০২৬ সাল) ১ ফেব্রুয়ারি সংসদে বাজেট পেশ করেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ। তার কয়েক দিন আগে ব্যাঙ্কগুলির শীর্ষ আধিকারিকদের সঙ্গে বেশ কয়েক বার বৈঠক করতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। সূত্রের খবর, সেখানে স্থায়ী আমানতের মাধ্যমে নগদ পুঁজি বাড়াতে আয়করে বেশ কিছু সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
ব্যাঙ্কের আধিকারিকেরা চাইছেন, লগ্নি বাড়াতে এফডির সুদের উপর করছাড়ের ঊর্ধ্বসীমা বৃদ্ধি করুক কেন্দ্র। সে ক্ষেত্রে সুদ থেকে কাটা যাবে কম টাকা। ফলে লাভবান হবেন বিনিয়োগকারীরা। পাশাপাশি, স্থায়ী আমানতকে দীর্ঘমেয়াদি লগ্নির ক্ষেত্র হিসাবে তুলে ধরতে চাইছেন তাঁরা।
সূত্রের খবর, আগামী দিনে ব্যাঙ্কগুলির নগদ পুঁজি বৃদ্ধি করতে টিডিএসের (ট্যাক্স ডিডাকটেড অ্যাট সোর্স) ঊর্ধ্বসীমা বৃদ্ধি করতে পারে কেন্দ্র। বিশেষত, প্রবীণ নাগরিকদের এতে সুরক্ষা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এতে এক দিকে যেমন জমা থাকা টাকা থেকে বেশি রিটার্ন পাবেন লগ্নিকারী, অন্য দিকে তেমনই বাঁচবে তাঁর কর।
গত বছর (পড়ুন ২০২৫ সাল) থেকে জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির জেরে বার বার অস্থির হয়েছে শেয়ার বাজার। ফলে কখনও কখনও এক দিনে কয়েক লক্ষ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে লগ্নিকারীদের। সেই অবস্থা এখনও বজায় রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্তেরা ফের প্রথাগত বিনিয়োগের দিকে ফেরেন কি না, সেটাই এখন দেখার।
সব ছবি: সংগৃহীত।