যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে পশ্চিম এশিয়া। একাধিক আরব রাষ্ট্রে ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। শুধু তা-ই নয়, পারস্য ও ওমান উপসাগরের সংযোগকারী হরমুজ় প্রণালী ‘বন্ধ’ করে পণ্যবাহী জাহাজ ধ্বংসের হুঁশিয়ারিও দিতে শোনা গিয়েছে তেহরানকে।
সব মিলিয়ে পশ্চিম এশিয়ার আকাশে এখন বারুদের গন্ধ। সেই গন্ধ ছড়িয়েছে অন্য একাধিক দেশে। তবে খামেনেইয়ের মৃত্যু নিয়ে এখনও পর্যন্ত কোনও বিবৃতি দেয়নি নয়াদিল্লি। জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যথেষ্ট সাবধানি বিদেশ মন্ত্রক। আপাতত পশ্চিম এশিয়ায় আটকে পড়ে ভারতীয়দের উদ্ধারে বেশি উদ্যোগী হচ্ছে কেন্দ্র। পাশাপাশি, যুদ্ধের জেরে উদ্ভূত জ্বালানিসঙ্কটের দিকে কড়া নজর রেখেছে সরকার।
ইরানের সঙ্গে আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের সংঘাতে নয়াদিল্লি এখনও পর্যন্ত কোনও পক্ষ না নিলেও ভারতের অর্থনীতিতে কিন্তু এই সংঘর্ষের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞেরা মনে করছেন, ইরান যুদ্ধের কারণে ভারতীয় অর্থনীতি ইতিমধ্যেই বিভিন্ন ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং যুদ্ধ দীর্ঘ দিন স্থায়ী হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে। সরাসরি লোকসানের মুখ দেখবে বহু ব্যবসা। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক তালিকায় কী কী রয়েছে।
ইরানে আমেরিকা-ইজ়রায়েলের হামলা ও তেহরানের পাল্টা আক্রমণে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে আমদানি-রফতানি ঘিরে। বিশেষত ভারত থেকে পশ্চিম এশিয়া, ইউরোপে পণ্য কী ভাবে সরবরাহ করা হবে তা নিয়ে বাড়ছে চিন্তা।
গত বছর রাশিয়া থেকে ভারতে দিনে ২০ লক্ষ ব্যারেল অশোধিত তেল আমদানি করা হত। মস্কোর তেল কেনার শাস্তি হিসাবে এ দেশের পণ্যে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপানো শুল্কের ধাক্কায় তা প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। ফেব্রুয়ারিতে দিনে এসেছে ১০ লক্ষ ব্যারেলের মতো। কিন্তু পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল বহনকারী জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হওয়ায় এ বার ফের ভ্লাদিমির পুতিনের দেশের দিকে নজর দিচ্ছে ভারত। ক্রেমলিনেরও বার্তা, ভারতের চাহিদা অনুসারে তেল সরবরাহ করতে তারা তৈরি।
ওমান ও ইরানের মাঝে হরমুজ প্রণালী ধরেই ভারতে রোজ প্রায় ২৫-২৭ লক্ষ ব্যারেল অশোধিত তেল আসে, যা দেশের আমদানি করা তেলের অর্ধেক। কিন্তু আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের হামলার কারণে ইরান এখন এই পথে জাহাজ চলাচল বন্ধ করেছে। মোট ৩৭টি ভারতীয় জাহাজ সেখানে আটকে পড়েছে জানিয়ে কেন্দ্রের হস্তক্ষেপ দাবি করেছে তাদের সংগঠন।
ভারতকে চাহিদার ৮৮% তেল আমদানি করতে হয়। হরমুজ দীর্ঘ দিন বন্ধ থাকলে সঙ্কট চরমে উঠবে। এই অবস্থায় রাশিয়া ভারতের সহায় হয়ে উঠতে পারে বলে ধারণা শিল্পমহলের। তাদের মতে, ভারতে সপ্তাহখানেকের মধ্যে প্রায় ৯৫ লক্ষ ব্যারেল তেল পাঠাতে পারে মস্কো। দেশের কাছেই সমুদ্রে তাদের বিভিন্ন জাহাজে তা মজুত রয়েছে।
তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘ দিন চললে তেলের সরবরাহে সমস্যা দেখা দিতে পারে। এই পরিস্থিতিতে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে তা মুদ্রাস্ফীতির দিকে চালিত করতে পারে ভারতকে, যা প্রত্যক্ষ ভাবে প্রভাব ফেলবে দেশের অর্থনীতিতে।
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি তেলের সঙ্গে সঙ্গে চিন্তা বাড়াচ্ছে রান্নার গ্যাস (এলপিজি) থেকে গাড়ি, কলকারখানায় ব্যবহৃত গ্যাসের জোগান নিয়েও। ইরানের হামলার কারণে ‘কাতার এনার্জি’ তরল প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এর ফলে ভারত-সহ সারা বিশ্বে এই গ্যাসের সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে।
মঙ্গলবার থেকে দেশে বিভিন্ন সংস্থা সরবরাহ কমিয়েছে ৪০% পর্যন্ত। সরকারের তরফে চাহিদামাফিক গ্যাসের জোগান নিয়ে আশ্বস্ত করা হয়েছে। দেশের বাজারে গ্যাস বুকিং-এর পরে ২-৩ দিনের মধ্যে তা পাওয়াও যাচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্ট মহলের আশঙ্কা, যুদ্ধের এই অবস্থা আরও দিন সাতেক বহাল থাকলে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যেতে পারে। সরকারি সূত্র অবশ্য জানাচ্ছে, ভারতে বর্তমানে ৩০ দিনের মতো এলপিজি মজুত রয়েছে। আর এলএনজি রয়েছে ২০ দিনের মতো। তবে সেই সংখ্যাটা কতটা ঠিক, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।
তেহরানের সঙ্গে তেল আভিভ এবং ওয়াশিংটনের সংঘাতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য পণ্য পরিবহণ এবং বিমা ব্যয়বহুল হয়ে ওঠতে পারে। ফলে লাভের গুড় খুব একটা বেশি আসবে না, যা প্রভাব ফেলবে দেশের অর্থনীতিতে।
আমদানি ব্যয়বহুল হওয়ার কারণে মার্কিন ডলারের তুলনায় ভারতীয় রুপির দাম আরও কমতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের পরিস্থিতিতে দেশ জুড়ে অনেক বিমান বাতিলের আশঙ্কা করা হচ্ছে। ব্যবসায়িক ভ্রমণ কমে যাওয়ার ফলে অর্থনীতির উপর সরাসরি প্রভাব পড়বে বলেও মনে করা হচ্ছে। প্রবাসী ভারতীয়দের থেকে রেমিট্যান্স বৃদ্ধি পেলেও গৃহস্থালির খরচ কমতে পারে। সে ক্ষেত্রেও বাণিজ্য কম হওয়ার কারণে দেশের অর্থনীতিতে কুপ্রভাব পড়তে পারে।
তেল এবং বিমান পরিবহণ খাতে দেশের অর্থনীতি ইতিমধ্যেই সরাসরি প্রভাবিত হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞেরা যেমন মনে করছেন, তেমনই মনে করছেন কিছু ব্যবসা রয়েছে যা আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হবে আমেরিকা-ইজ়রায়েল এবং ইরানের সংঘাতের কারণে।
এর মধ্যে প্রথমেই রয়েছে চাল। ভারতের বাসমতী চালের বৃহত্তম ক্রেতা ইরান। তার পরেই ইরাক। অন্য দিকে, ভারতের বাসমতী চালের ৫০ শতাংশের এরও বেশি রফতানি করা হয় পশ্চিম এশিয়ার জিসিসি (গাল্ফ কো-অপারেশন কাউন্সিল) দেশগুলিতে।
পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের কারণে এই মুহূর্তে ভারতের ২০০,০০০ টনেরও বেশি বাসমতী চাল বিভিন্ন বন্দরে আটকে রয়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধ যদি দীর্ঘ দিন চলতে থাকে, তা হলে ভারতে মজুত চালের পরিমাণ অনেক বা়ড়বে বলেই আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞেরা। ফলে চালের দাম কমে যেতে পারে। প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে।
নামীদামি রত্ন থেকে গয়না— ভারতে প্রচুর পরিমাণ সোনা এবং না-কাটা হিরে আমদানি হয় দুবাই থেকে। কিন্তু সংঘাতের পরিস্থিতির কারণে বর্তমানে সেই আমদানি ব্যাহত। দীর্ঘ দিন এমন পরিস্থিতি চললে সুরতের হিরে ব্যবসায়ীদের ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে। অন্য দিকে, সোনার আমদানি কমে দাম আরও বাড়তে পারে হলুদ ধাতুর।
ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে সুরতের কাপড় ব্যবসায়ীদেরও। পলিয়েস্টার সুতো দিয়ে তৈরি কাপড় সংগ্রহের খরচ বেড়ে যাওয়া, লাভ কমানো এবং পোশাক রফতানির খরচ বেড়ে যাওয়ায় কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন ওই কাপড় ব্যবসায়ীরা। পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের কারণে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি হওয়ায় রং, টায়ার, রাসায়নিক শিল্পও সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে ওই শিল্পগুলিতে পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেতে পারে।
আবার ভারতীয় কৃষকেরা জমিতে যে সালফার ব্যবহার করেন, তার প্রায় ৭০ শতাংশ আমদানি হয় উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলি থেকে। ফলে পশ্চিম এশিয়ায় দীর্ঘ সংঘাত চললে জুন মাসের আসন্ন কৃষি মরসুমে ভারতে খাদ্যদ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা।
সব ছবি: সংগৃহীত এবং ফাইল।