সস্তার ড্রোন। আর কম খরচের ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। এই দুই হাতিয়ারে ‘সুপার পাওয়ার’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজ়রায়েলকে নাস্তানাবুদ করে তুলেছে ইরান। পারস্যের জোড়া ‘সস্তাস্ত্রের’ সামনে ডাহা ফেল কয়েক কোটি ডলারের আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থা! তেহরানের এ-হেন যুদ্ধকৌশলে হতবাক বিশ্ব। সংঘাতের গোড়াতেই যে ভাবে জলের মতো টাকা খরচ হচ্ছে, তাতে ইহুদি এবং আমেরিকানদের ‘হাঁপিয়ে’ ওঠা একেবারেই আশ্চর্যের নয়।
পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধে টমাহক ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষার ইন্টারসেপ্টর রকেট বহুল পরিমাণে ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্র। এর প্রতিটির আনুমানিক দাম ১০-৩০ লক্ষ ডলার। অন্য দিকে, মাত্র ৮-১০ লক্ষ ডলার খরচ করে এক একটি ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে ইরান। অস্ত্রনির্মাণে ব্যয়বরাদ্দের এই বৈষম্যই পশ্চিম এশিয়ার লড়াইয়ে আমেরিকার ‘গলার কাঁটা’ হয়ে উঠছে, বলছেন বিশ্লেষকেরা।
একই ছবি দেখা গিয়েছে ড্রোনের ক্ষেত্রে। মার্কিন সৈন্যের হাতে আছে এমকিউ-৯ রিপার নামের একটি পাইলটবিহীন বিমান। এর দাম কম-বেশি তিন কোটি ডলার। সংশ্লিষ্ট ড্রোনটি ‘হেলফায়ার’ নামের ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম। তার আবার খরচ আলাদা। অন্য দিকে লড়াইয়ে তুলনামূলক ভাবে অনেক সস্তার ‘কামিকাজ়ে’ (আত্মঘাতী) শ্রেণির শাহেদ নামের মানববিহীন উড়ুক্ক যান ব্যবহার করছে তেহরান।
একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের দাবি, শাহেদ ড্রোন তৈরি করতে ইরানের খরচ হচ্ছে মেরেকেটে ৩০-৫০ হাজার ডলার। এর সাহায্যে পশ্চিম এশিয়ার একাধিক মার্কিন ঘাঁটি এবং দূতাবাসে নির্ভুল আক্রমণ শানিয়েছে তেহরানের ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি। এর মধ্যে অন্যতম হল বাহরিনের নৌসেনা ছাউনি। সেখানে শাহেদ আছড়ে পড়ার পর দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে দেখা গিয়েছে।
তেহরানের দাবি, সস্তার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে কাতারে মোতায়েন উপসাগরীয় এলাকায় আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী রেডার ব্যবস্থাকে উড়িয়েছে আইআরজিসি। সংশ্লিষ্ট রেডারটির পোশাকি নাম ‘এএন/এফপিএস-১৩২’। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সেটা পশ্চিম এশিয়ায় চোখ ও কানের কাজ করছিল বললে অত্যুক্তি হবে না। রেডারটির পাল্লা ৫,০০০ কিলোমিটার এবং আনুমানিক মূল্য ১১০ কোটি ডলার বলে জানা গিয়েছে।
ভারতীয় সেনার অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিক কর্নেল রাজীব আগরওয়ালের কথায়, ‘‘ইরানি ফৌজ যে কায়দায় কাতারের রেডার স্টেশন উড়িয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। কম ব্যয়ে শত্রুর বিপুল লোকসান কৌশল ভালই আয়ত্ত করেছে তেহরান। হাতিয়ার নির্মাণে খরচের বৈষম্য কিন্তু ইজ়রায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সমস্যা তৈরি করবে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দুই ‘সুপার পাওয়ার’-এর পক্ষে বিপুল সংখ্যায় ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা বেশ কঠিন।’’
সাবেক সেনাকর্তাদের একাংশ মনে করেন, যে গতিতে লড়াইয়ের তীব্রতা বাড়ছে তাতে অচিরেই ইহুদি ও আমেরিকার অস্ত্রের ভাঁড়ারে পড়বে টান। ইরানের এই সমস্যা নেই। কারণ, ঘরের মাটিতেই ‘দামে কম মানে ভাল’ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তৈরি করছে তারা। শুধু তা-ই নয়, তেহরানের কাছে আছে ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্রের শহর (মিসাইল সিটি)। ফলে প্রয়োজনে আরব দুনিয়ায় আরও বড় কাণ্ড ঘটনার সক্ষমতা রয়েছে আইআরজিসির।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইহুদি-মার্কিন যৌথ ভাবে ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করলে বেধে যায় যুদ্ধ। সংঘর্ষের চার দিনের মাথায় ‘গ্রাউন্ড জ়িরো’র পরিস্থিতি নিয়ে একটি বিস্ফোরক রিপোর্ট প্রকাশ করে আমেরিকার জনপ্রিয় গণমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট। যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দফতরের (ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার) সদর কার্যালয় পেন্টাগনের একটি সূত্র উদ্ধৃত করে চার দিনের মাথায় (পড়ুন ৩ মার্চ) তারা জানায়, পরিস্থিতি যা তাতে খুব দ্রুত শেষ হতে পারে প্যাট্রিয়ট এবং টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র।
মার্কিন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের অনুমান, পশ্চিম এশিয়ার রণাঙ্গনে প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আনুমানিক ৬০০-৭০০টি রকেট মোতায়েন রেখেছে পেন্টাগন। কিন্তু সমস্যা হল, এক একটি ইরানি ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আটকাতে চার থেকে ছ’টি করে ইন্টারসেপ্টর ছুড়তে হচ্ছে তাদের। সেই হিসাবে ৩ মার্চের মধ্যেই ১৫০-২০০টি রকেট খরচ করে ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্রের ফৌজ। তেহরান আক্রমণের ঝাঁজ বাড়ালে সংশ্লিষ্ট ইন্টারসেপ্টরের ভাঁড়ার ফুরিয়ে যেতে সময় লাগবে বড়জোর সাত দিন।
সূত্রের খবর, এই পরিস্থিতিতে জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া বা আরওকে (রিপাবলিক অফ কোরিয়া) থেকে প্যাট্রিয়ট এয়ার ডিফেন্সের বেশ কিছু ইন্টারসেপ্টর পশ্চিম এশিয়ায় নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে আমেরিকা। যুক্তরাষ্ট্র বছরে গড়ে ৬০০-৬৫০টা পর্যন্ত এই রকেট উৎপাদন করতে পারে। এই সংখ্যা সাপ্তাহিক ২৫০-৪০০টি খরচের সঙ্গে কোনও ভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একই অবস্থা টমাহক ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্রেরও।
জোড়া ‘মহাশক্তি’র বিরুদ্ধে যুদ্ধরত তেহরানের ছবিটা কিন্তু একেবারেই আলাদা। ব্রিটিশ বিদেশ মন্ত্রকের অনুদানে চলা সংস্থা সেন্টার ফর ইনফরমেশন রেজিলিয়েন্স জানিয়েছে, সামরিক ড্রোন প্রস্তুতকারী দেশগুলির মধ্যে বিশ্বে প্রথম সারিতে রয়েছে ইরান। মাসে প্রায় ১০ হাজার পাইলটবিহীন ‘ফিঁদায়ে’ বিমান তৈরির সক্ষমতা রয়েছে তাদের। পাশাপাশি, আইআরজিসির ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ২০-৫০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে, প্রতিরক্ষা সূত্রকে সামনে রেখে দাবি করেছে রয়টার্স।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের বড় অংশই মনে করেন, সংশ্লিষ্ট ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের সাহায্যে হরমুজ় প্রণালী আগামী কয়েক মাস পর্যন্ত বন্ধ করে রাখতে পারবে ইরান। পারস্য ও ওমান উপসাগরের সংযোগকারী ওই সরু একফালি সামুদ্রিক রাস্তাটির কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। ১৬৭ কিলোমিটার লম্বা এবং ৩৩-৩৯ কিলোমিটার চওড়া ওই পথে পরিবহণ হয় আন্তর্জাতিক খনিজ তেলের প্রায় ২০ শতাংশ। যুদ্ধ শুরু হতেই সেই পথ আটকে রেখেছে তেহরান।
হরমুজ় প্রণালী বন্ধ হতেই আন্তর্জাতিক বাজারে হু-হু করে বাড়ছে তরল সোনার দর। ইতিমধ্যেই তাতে ১২ শতাংশ বৃদ্ধি দেখতে পাওয়া গিয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার অপরিশোধিত তেলের দাম বর্তমানে ৮২-৮৪ ডলারের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। কৌশলগত পদক্ষেপের মাধ্যমে তা ২০০ ডলারে নিয়ে যাওয়ার ছক রয়েছে ইরানের আইআরজিসির। সে ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধির আঁচে আমেরিকা-সহ গোটা বিশ্বকে যে পুড়তে হবে, তা বলাই বাহুল্য।
বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই গণমাধ্যমের কাছে মুখ খুলেছেন ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের সিনিয়র গবেষক ফারজ়িন নাদিমি। তাঁর কথায়, ‘‘ইরানি শাহেদ-১৩৬ ড্রোনগুলির পাল্লা ৭০০ থেকে হাজার কিলোমিটার। ফলে নিজের ভূখণ্ডে দাঁড়িয়েই অনায়াসে হরমুজ়ে থাকা কোনও রণতরী বা পণ্যবাহী জাহাজকে নিশানা করতে পারবে তেহরান।’’ তা ছাড়া সংশ্লিষ্ট লড়াইয়ে আরও এক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিপদ বাড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লেবাননের হিজ়বুল্লা এবং ইয়েমেনের হুথির মতো প্যালেস্টাইনপন্থী বিদ্রোহীদের ময়দানে নামিয়েছে তেহরান। তাদেরও বিপুল পরিমাণে কম দামি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সরবরাহ করেছে ইরানের আইআরজিসি। এর জেরে পশ্চিম এশিয়ার একাধিক ফ্রন্টে সংঘর্ষের মুখে পড়তে হচ্ছে মার্কিন ও ইহুদি ফৌজকে। এর ফলে তাদের যুদ্ধের খরচ আরও বাড়তে পারে।
গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সাল) জুনে ইজ়রায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে ইরান। তাতে বেশ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন খরচ করেছিল আইআরজিসি। ইহুদিদের গুপ্তচর সংস্থা মোসাদের রিপোর্ট অনুযায়ী, এতে ক্ষেপণাস্ত্র ও পাইলটবিহীন বিমানের যে ঘাটতি তৈরি হয়, তা ইতিমধ্যেই পূরণ করে ফেলেছে তেহরান। তবে সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারগুলির উৎক্ষেপণের সরঞ্জাম (লঞ্চার) নিয়ে কিছুটা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে পারে তারা।
২০২৫ সালের জুনের ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের একগুচ্ছ লঞ্চার ধ্বংস করে ইজ়রায়েলি বিমানবাহিনী। ব্রিটিশ সংস্থা সেন্টার ফর ইনফরমেশন রেজিলিয়েন্সের দাবি, এ বারও সেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। তবে অভিযানের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের আনুমানিক খরচ হয়েছে ৭৭.৯ কোটি ডলার। পরবর্তী তিন দিনে সেটা বেড়ে ১২৪ কোটি ডলারে পৌঁছেছে বলে মনে করা হচ্ছে। ব্যয়ের বহর যে আমেরিকার জন্য যথেষ্ট উদ্বেগের তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
যদিও এ সবের কোনও কিছুকেই পাত্তা দিচ্ছেন না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আপাতত তাঁর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে ‘ছাড়পত্র’ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্ট ‘কংগ্রেস’। এই আবহে আমেরিকার কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড সেন্টকমের প্রধান ব্র্যাড কুপার বলেছেন, ‘‘আমরা সমুদ্রতল, মহাকাশ ও সাইবার-সহ সমস্ত দিক দিয়ে ২৪x৭ ফরম্যাটে ধারাবাহিক ভাবে ইরানে হামলা চালাচ্ছি। পারস্যের কাছে আমাদের ৫০ হাজার সেনা, ২০০টির বেশি যুদ্ধবিমান এবং দু’টি বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন রয়েছে।’’
সব ছবি: সংগৃহীত ও এআই সহায়তায় প্রণীত।