ইরান যুদ্ধের আঁচে এ দেশের আমজনতার হেঁশেলে আগুন! হরমুজ় প্রণালী বন্ধ থাকায় তীব্র হচ্ছে রান্নার গ্যাস-সহ পেট্রোপণ্যের সঙ্কট-শঙ্কা। এই পরিস্থিতিতে কালোবাজারি ঠেকাতে ‘অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন’ বা একা (এসেনশিয়াল কমোডিটিজ় অ্যাক্ট) জারি করেছে কেন্দ্র। অন্য দিকে রাজ্যের প্রধান প্রশাসনিক কার্যালয় নবান্ন থেকে এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহের উপর কড়া নজর রাখছে পশ্চিমবঙ্গের সরকার। তবে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জ্বালানির চেয়েও ওত পেতে আছে আরও বড় বিপদ, বলছেন আর্থিক বিশ্লেষকদের একাংশ।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়বে স্মার্টফোন, ইন্ডাকশান ও মাইক্রোওয়েভ অভেন-সহ দৈনন্দিন ব্যবহারের যাবতীয় বৈদ্যুতিন সরঞ্জামের দাম। ইতিমধ্যেই সেই প্রভাব দেখা যাচ্ছে কম্পিউটারের বাজারে। চলতি বছরের মার্চে ল্যাপটপ ও ডেস্কটপের দর অন্তত ১০-১২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এপ্রিল থেকে শুরু হতে চলা নতুন অর্থবর্ষে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে এই সূচক। এ ছাড়া পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের জন্য বৈদ্যুতিন গাড়ি বা ইভির (ইলেকট্রিক ভেহিকল) দাম বৃদ্ধির আশঙ্কাও প্রবল।
কিন্তু, প্রশ্ন হল ইরান যুদ্ধের জন্য কেন মূল্যবৃদ্ধি হবে বৈদ্যুতিন সরঞ্জামের? এর নেপথ্যে মূলত দু’টি কারণকে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথমত, সংঘাত শুরু হওয়া ইস্তক সালফিউরিক অ্যাসিডের সঙ্কটে ভুগছে বাজার। বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম নির্মাণের অন্যতম উপাদান চিপ বা সেমিকন্ডাক্টরের সঙ্গে এটি অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত। দ্বিতীয়ত, মারাত্মক রকমের জ্বালানি সঙ্কটের মুখে পড়তে চলেছে সাবেক ফরমোজ়া তথা তাইওয়ান (রিপাবলিক অফ চায়না)। প্রশান্ত মহাসাগরীয় ওই দ্বীপরাষ্ট্রটিকে বিশ্বের ‘চিপ কারখানা’ বললে অত্যুক্তি হবে না।
সালফিউরিক অ্যাসিডের অন্যতম কাঁচামাল হল সালফার, যেটা আবার খনিজ তেল পরিশোধনের জেরে প্রাপ্ত উপজাত দ্রব্যগুলির অন্যতম। সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ নির্মাণে মূলত তিনটি ধাতুর ব্যাপক ব্যবহার হয়ে থাকে। সেগুলি হল তামা, নিকেল এবং কোবাল্ট। খনি থেকে উত্তোলনের পর চিপ তৈরিতে এগুলিকে সরাসরি ব্যবহার করা যায় না। প্রয়োজন হয় পরিশোধনের। সেই কাজে বিপুল পরিমাণে লাগে অতি শক্তিশালী সালফিউরিক অ্যাসিড।
বর্তমানে ইরান যুদ্ধের জেরে বিশ্ব জুড়ে একরকম খনিজ তেল সরবরাহ বন্ধ রেখেছে পশ্চিম এশিয়ার প্রায় সমস্ত আরব মুলুক। ফলে পেট্রল-ডিজ়েল, রান্নার গ্যাস বা বিমান জ্বালানির পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে সালফারের সঙ্কটও। এর জেরে আগামী দিনে অপ্রতুল হতে পারে সালফিউরিক অ্যাসিড। সেটা যে অবশ্যই চিপ নির্মাণে প্রভাব ফেলবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এর জেরে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে, আমজনতাকে আকাশছোঁয়া দামে কিনতে হবে বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম।
আজকের দুনিয়ায় অধিকাংশ বহুজাতিক সংস্থাকে আবার তাদের প্রয়োজনীয় চিপের সিংহভাগ সরবরাহ করে তাইওয়ান। কিন্তু, সমস্যা হল সেমিকন্ডাক্টর কারখানাগুলিকে চালু রাখতে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রটির চাই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। এর ৪০ শতাংশ তরল প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির (লিকুইফায়েড ন্যাচরাল গ্যাস) সাহায্যে তৈরি করে থাকে সাবেক ফরমোজ়ার প্রশাসন। এটি প্রকৃতপক্ষে মিথেন। এ-হেন এলএনজির মাত্র ১০ থেকে ১২ দিনের ভান্ডার মজুত আছে রিপাবলিক অফ চায়নার কাছে, খবর সূত্রের।
বিশেষজ্ঞদের কথায়, হাতে থাকা তরল প্রাকৃতিক গ্যাস ফুরিয়ে গেলে তাইওয়ানে ব্যাহত হতে পারে বিদ্যুৎ পরিষেবা। সেই বিপদ আঁচ করে দ্রুত বিকল্প হিসাবে কয়লাকে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করছে সাবেক ফরমোজ়ার প্রশাসন। যদিও এই পরিবর্তন একেবারেই সহজ নয়। ফলে আগামী দিনে চাহিদামাফিক চিপ বা সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন না-ও করতে পারে তাইপে।
আর্থিক বিশ্লেষকদের অনুমান, পশ্চিম এশিয়ার লড়াই আরও দু’মাস চললে চিপের আকালে ভুগবে বৈদ্যুতিন সরঞ্জামের বাজার। ইতিমধ্যেই সেমিকন্ডাক্টর মজুত শুরু করে দিয়েছেন ডিলারদের একাংশ। সঙ্কট আরও তীব্র হলে চিপের উপর ছাড় পুরোপুরি প্রত্যাহার করবেন তাঁরা। তখন বেশি টাকা খরচ করে সংশ্লিষ্ট সেমিকন্ডাক্টর কিনতে হবে স্মার্টফোন, স্মার্টটিভি, ডেস্কটপ-ল্যাপটপ, ইন্ডাকশান কুকার বা মাইক্রোওয়েভ অভেন নির্মাণকারী সংস্থাকে। ফলে পণ্যের দাম বৃদ্ধিতে একরকম বাধ্য হবে তারা।
বৈদ্যুতিন সরঞ্জামকে বাদ দিলে ইরান যুদ্ধের জেরে জামাকাপড়ের দাম বৃদ্ধিরও মিলেছে ইঙ্গিত। বস্ত্রশিল্পে সর্বাধিক ব্যবহৃত কৃত্রিম তন্তুগুলির অন্যতম হল পলিয়েস্টার। এটিও খনিজ তেলের একটি উপজাত। পলিয়েস্টারের দর ইতিমধ্যেই ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তা ছাড়া শার্ট, প্যান্ট, শাড়ি বা সালোয়ার-কামিজ বিক্রির ক্ষেত্রে প্যাকেজিং বা মোড়ক গুরুত্বপূর্ণ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেখানেও প্লাস্টিকভিত্তিক উপকরণ ব্যবহৃত হয়। খুব অল্প দিনের মধ্যে এর দাম দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে।
কেন্দ্রীয় বস্ত্র মন্ত্রক সূত্রে খবর, জামাকাপড়ের ক্ষেত্রে মোট উৎপাদনের ৫-৭ শতাংশ প্যাকেজিংয়ে ব্যয় করে থাকে নির্মাণকারী সংস্থা। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের চলতি মূলধনের উপর চাপ যে বাড়তে চলেছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কিছু ক্ষেত্রে অবশ্য বিকল্পের সন্ধান করছেন এ দেশের কাপড় ব্যবসায়ীরা। ফলে কাগজভিত্তিক মোড়কের চাহিদা হঠাৎ করে কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে তাতে মূল্যবৃদ্ধি কতটা ঠেকানো যাবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
পোশাক তৈরিতে বহু ছোট ছোট উপাদানের গুরুত্ব রয়েছে। উদাহরণ হিসাবে জ়িপার, লেবেল বা বোতামের কথা বলা যেতে পারে। এগুলির অনেকগুলোই তৈরি হয় প্লাস্টিক বা পেট্রোরাসায়নিক উপজাত দ্রব্য দিয়ে। কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধিতে সংশ্লিষ্ট পণ্যগুলির মারাত্মক রকম ব্যয়বহুল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যেটা জামাকাপড়ের দাম বৃদ্ধির কারণ হতে চলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে এর উল্টো মতও রয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, ইরান যুদ্ধের জেরে অপরিশোধিত খনিজ তেল নিয়ে তেমন চিন্তা নেই ভারতের। কারণ, তরল সোনার জন্য শুধুমাত্র পশ্চিম এশিয়ার উপর নির্ভরশীল নয় নয়াদিল্লি। গত কয়েক বছর ধরে অন্তত ৪০টি দেশ থেকে অপরিশোধিত খনিজ তেল আমদানি করছে কেন্দ্র। কিন্তু তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের হিসাব একেবারে আলাদা। এ দেশে ব্যবহৃত এলএনজির সিংহভাগ আসে হাতে গোনা দু’-তিনটি আরব রাষ্ট্র থেকে।
মোদী সরকারের বাণিজ্য ও পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক সূত্রে খবর, বর্তমানে আলজেরিয়া, অ্যাঙ্গোলা, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম, ব্রাজ়িল, ব্রুনাই, কানাডা, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, মিশর, নিরক্ষীয় গিনি, ঘানা, গ্রিস, গিনি, ইরাক, ইজ়রায়েল, দক্ষিণ কোরিয়া (রিপাবলিক অফ কোরিয়া), কুয়েত, লিবিয়া, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, নেদারল্যান্ডস, নাইজ়েরিয়া, নরওয়ে, ওমান, পানামা, কাতার, সেনেগাল, টোগো, তুরস্ক, আমিরশাহি, ব্রিটেন, আমেরিকা এবং ভেনেজ়ুয়েলা-সহ ৪০টি দেশ থেকে ঘুরপথে তেল আনা হচ্ছে। তালিকায় রয়েছে রাশিয়ার নামও।
আগে ২৭টি দেশ থেকে অপরিশোধিত খনিজ তেল কিনত নয়াদিল্লি। সেটাই বাড়িয়ে ৪০ করা হয়েছে। অন্য দিকে কেন্দ্রীয় বাণিজ্যমন্ত্রী গোয়লের দাবি, অন্যান্য দেশে যে জ্বালানি সঙ্কট তৈরি হচ্ছে, ভারতের ক্ষেত্রে এখনও সেই পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তবে পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকেরা তাই মনে করেন, ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তরল সোনার ক্ষেত্রে খুব একটা সমস্যায় পড়বে না নয়াদিল্লি। প্রয়োজনে বেশি টাকা খরচ করে জ্বালানির প্রয়োজনীয়তা মেটাতে পারবে কেন্দ্র। রান্নার গ্যাসে কিন্তু সেই সুবিধা নেই। আর তাই ইতিমধ্যেই ঘরোয়া সিলিন্ডারের দাম ৬০ টাকা বৃদ্ধি করতে বাধ্য হয়েছে সরকার। বেড়েছে সিএনজির দামও। সঙ্কট আরও তীব্র হলে দাম যে আরও বাড়বে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
১২ মার্চ ইরানের নবনির্বাচিত সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেই গুরুতর জখম হয়েছেন বলে খবর প্রকাশ করে ব্রিটিশ গণমাধ্যম ‘দ্য সান’। কিন্তু, সেই দাবি উড়িয়ে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁর বিবৃতি প্রকাশ করে তেহরান। সেখান ইজ়রায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রকে চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি, হরমুজ় প্রণালী যে আপাতত খোলা হচ্ছে না, তা একরকম স্পষ্ট করে দিয়েছে সাবেক পারস্যের ওই শিয়া ধর্মগুরু।
ইহুদি ও আমেরিকাকে দেওয়া হুমকিতে নিহত আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের ৫৬ বছর বয়সি পুত্র তথা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বলেছেন, ‘‘যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে যাঁরা নিহত হয়েছেন এ বার তাঁদের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়াই হবে আমাদের প্রধান লক্ষ্য। শত্রুর উপর চাপ তৈরির রণকৌশল হিসাবে আপাতত অবরুদ্ধ থাকবে হরমুজ়।’’ ইতিমধ্যেই সঙ্কীর্ণ একফালি ওই সামুদ্রিক রাস্তায় মার্কিন পণ্যবাহী জাহাজকে নিশানা করতে শুরু করেছে তাঁর নিয়ন্ত্রণে থাকা ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি।
পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের জেরে রান্নার গ্যাস এবং পেট্রোপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও সঙ্কটকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকারের বিরুদ্ধে সুর চড়াতে শুরু করেছে বিরোধীরা। সংসদ ভবন চত্বরে ইতিমধ্যেই বিক্ষোভ দেখিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। বৈদ্যুতিন পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে অবশ্য নীরব রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা। এর বাজার কী ভাবে নিয়ন্ত্রণ হবে, সেটাই এখন দেখার।
ছবি: সংগৃহীত ও এআই সহায়তায় প্রণীত।