Shadow Economy of Iran

২০ হাজার কোটি ডলারের গোপন সাম্রাজ্য! মৃত খামেনেইয়ের ‘এটিএম’ কাঁপিয়ে দিচ্ছে আমেরিকা-ইজ়রায়েলকে

যত সময় গড়াচ্ছে ততই ইজ়রায়েল এবং আমেরিকার বিরুদ্ধে প্রতি আক্রমণের ঝাঁজ বাড়াচ্ছে ইরান। যুদ্ধ চালানোর টাকা কী ভাবে জোগাড় করছে তেহরান? পারস্যের ‘ছায়া অর্থনীতি’ নিয়ে তুঙ্গে জল্পনা।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৯ মার্চ ২০২৬ ১৬:০০
০১ ১৮
Iran’s 20 thousand dollars shadow economy may change war with US and Israel

কখনও ‘কামিকাজ়ে’ (আত্মঘাতী) ড্রোন। কখনও আবার ‘হাইপারসনিক’ (শব্দের চেয়ে পাঁচ গুণ গতিশীল) ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। জোড়া হাতিয়ারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজ়রায়েলের মতো ‘সুপার পাওয়ার’ দুই শত্রুর রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে ইরান। এককথায় ‘ঢিল’ মারলে ‘পাটকেল’টি যে খেতে হবে, তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে আমেরিকান ও ইহুদিরা। নিষেধাজ্ঞার জালে আটকে থাকা তেহরান কী ভাবে জোগাড় করছে যুদ্ধ চালানোর খরচ? সংঘাতের মধ্যেই তা নিয়ে প্রকাশ্যে এল চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট।

০২ ১৮
Iran’s 20 thousand dollars shadow economy may change war with US and Israel

বিশ্লেষকদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইজ়রায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ যে আসন্ন, তা অনেক দিন আগেই বুঝেছিল ইরান। আর তাই গত কয়েক বছর ধরে প্রস্তুতি নিয়েছে তেহরান। সম্প্রতি এই ইস্যুতে একটি তদন্তমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করে জনপ্রিয় মার্কিন গণমাধ্যম ব্লুমবার্গ। সেখানে সাবেক পারস্যের ‘ছায়া অর্থনীতি’র (স্যাডো ইকোনমি) বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। এর আকার কম-বেশি ২০ হাজার কোটি ডলার বা তার বেশি হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

০৩ ১৮
Iran’s 20 thousand dollars shadow economy may change war with US and Israel

ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের ছায়া অর্থনীতির মূল কান্ডারি ছিলেন শিয়া ধর্মগুরু তথা সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) আয়াতোল্লা আলি খামেনেই। তাঁর নিয়ন্ত্রণে থাকা আধা সেনা ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসির কমান্ডারদেরও এতে জড়িয়ে নেন তিনি। বর্তমানে অত্যন্ত শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে তেহরানের ছদ্ম অর্থনীতি। এর জোরে আলি খামেনেইকে মেরেও ইরানের কোমর ভাঙতে পারেনি আমেরিকা ও ইজ়রায়েল।

Advertisement
০৪ ১৮
Iran’s 20 thousand dollars shadow economy may change war with US and Israel

১৯৭৯ সালের ইসলামীয় বিপ্লবে রাজতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে কট্টরপন্থী শিয়া ধর্মবলম্বী দেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে ইরান। ওই ঘটনার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তেহরানের উপর বিপুল নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেয় আমেরিকা। বিপ্লবের পরের বছর (পড়ুন ১৯৮০ সাল) সাবেক পারস্য আক্রমণ করে বসে প্রতিবেশী ইরাক। সেই যুদ্ধ টানা আট বছর চলেছিল। ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, ওই কঠিন সময়ে অস্তিত্ব রক্ষায় ছায়া অর্থনীতির জন্ম দেন আলি খামেনেই। পরবর্তী কালে তা শিয়া মুলুকটির বৈদেশিক বাণিজ্যের ‘এটিএম’ হয়ে ওঠে।

০৫ ১৮
Iran’s 20 thousand dollars shadow economy may change war with US and Israel

ইরানি অর্থনীতির মূল সমস্যা হল এর একমুখিতা। পারস্য উপসাগরের কোলের দেশটিতে রয়েছে বিপুল পরিমাণ খনিজ তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস। কিন্তু তা বিক্রি করে পশ্চিম এশিয়ার অন্য আরব রাষ্ট্রগুলির মতো তেহরান কখনওই সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠতে পারেনি। কারণ, দীর্ঘ দিন তাদের তরল সোনার ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করত ব্রিটিশরা। গত শতাব্দীর ৫০-এর দশক থেকে বার বার রাজনৈতিক অস্থিরতাও তাদের বৈদেশিক বাণিজ্যে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Advertisement
০৬ ১৮
Iran’s 20 thousand dollars shadow economy may change war with US and Israel

মার্কিন গণমাধ্যমটির দাবি, অর্থনীতি মজবুত করতে না পারলে দেশ চালানো যে কঠিন হবে, সেই আঁচ পেতে আলি খামেনেইয়ের বেশি সময় লাগেনি। আর তাই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার নজর এড়িয়ে খনিজ তেলের চোরাচালান শুরু করেন তিনি। এ ব্যাপারে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় চিন। গত কয়েক বছরে ডলারের বদলে স্থানীয় মুদ্রা রেনমিনবি (যার ইউনিট হল ইউয়ান) দিয়ে বিপুল পরিমাণে ইরানি তরল সোনা আমদানি করে গিয়েছে বেজিং।

০৭ ১৮
Iran’s 20 thousand dollars shadow economy may change war with US and Israel

তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ডলারের মতোই আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসাবে রেনমিনবির স্বীকৃতি রয়েছে। ফলে সেটা কোষাগারে আসতেই আইআরজিসির শক্তি সঞ্চয়ে টাকা ঢালতে আলি খামেনেইয়ের অসুবিধা হয়নি। গত শতাব্দীর ৮০-এর দশক থেকে দূরপাল্লার ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি নিয়ে কাজ শুরু করে তেহরান। ৯০-এর দশকে পরমাণু অস্ত্র তৈরির দিকে নজর পড়ে ইরানের। এগুলির জন্য বিপুল ব্যয়বরাদ্দের অনেকটাই এসেছে তেল বিক্রির টাকায়, বলছে ব্লুমবার্গ।

Advertisement
০৮ ১৮
Iran’s 20 thousand dollars shadow economy may change war with US and Israel

তদন্তমূলক প্রতিবেদনটিতে খামেনেইয়ের তেল চোরাচালানের ডান হাতকে ‘হেক্টর’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দাদের একাংশের অনুমান, ওই ব্যক্তি হলেন তেহরানের ধনকুবের ব্যবসায়ী হুসেন শামখানি। তাঁরা বাবা আলি শামখানি ছিলেন আইআরজিসির নৌসেনার পদস্থ আধিকারিক। বহু বছর ধরেই হুসেন অবশ্য ইরানের স্থায়ী বাসিন্দা নন। তরল সোনার লেনদেনের একাধিক ভুয়ো সংস্থা এবং হাওয়ালার টাকা নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি।

০৯ ১৮
Iran’s 20 thousand dollars shadow economy may change war with US and Israel

২০২১ সালের মার্চে ২৫ বছরের জন্য ইরানের সঙ্গে একটি কৌশলগত সহযোগিতা চুক্তি করে চিন। তেহরানের অপরিশোধিত খনিজ তেলের ব্যবসাকেও এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। ব্লুমবার্গের দাবি, সব জানা সত্ত্বেও এ ব্যাপারে কিছুই করতে পারেনি আমেরিকা। কারণ, তরল সোনা চোরাচালানে জড়িত হয়ে পড়ে আইআরজিসি। ভিন্‌রাষ্ট্রের পতাকাবাহী জাহাজে সংশ্লিষ্ট তেল হরমুজ় প্রণালী পার করে দিয়ে থাকে তারা। পাশাপাশি, ক্রুডের চরিত্র বদলাতে তাতে রাসায়নিক মেশানোর অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

১০ ১৮
Iran’s 20 thousand dollars shadow economy may change war with US and Israel

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, হাওয়ালা ও ভুয়ো সংস্থাকে বাদ দিলে গত কয়েক দশকে তেল বিক্রি করে ক্রিপ্টো মুদ্রাতেও মোটা টাকা রোজগার করেছে ইরান। এর অঙ্ক ৭৮০ কোটি ডলার হতে পারে। ব্লুমবার্গের অনুমান, হাতিয়ার ও গোলা-বারুদ কিনতে ওই ডিজিটাল মুদ্রাও যথেচ্ছ পরিমাণে ব্যবহার করেছে তেহরান। একাধিক অ্যাকাউন্ট ঘুরিয়ে তা চলে গিয়েছে চিন ও রাশিয়ার কাছে। বর্তমানে তারাই সাবেক পারস্যের মূল অস্ত্র সরবরাহকারী।

১১ ১৮
Iran’s 20 thousand dollars shadow economy may change war with US and Israel

সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে মুখ খুলেছেন ইজ়রায়েলের তেল আভিভ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালায়েন্স সেন্টার ফর ইরানিয়ান স্টাডিজ়ের অধ্যাপক মেইর লিটভাক। তাঁর কথায়, ‘‘তেহরানের ছায়া অর্থনীতি অক্টোপাসের মতো। আমেরিকার প্রতিটা শত্রু দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে তাদের। সেই তালিকায় অবশ্যই থাকবে রাশিয়া, চিন, কিউবা, উত্তর কোরিয়া (ডেমোক্র্যাটিক পিপল্‌স রিপাবলিক অফ কোরিয়া ডিপিআরকে) এবং ব্রাজ়িলের নাম। আবার ভারতের মতো নিরপেক্ষ দেশের হাতও ছাড়েনি তারা।’’

১২ ১৮
Iran’s 20 thousand dollars shadow economy may change war with US and Israel

২১ শতকে আর্থিক আধিপত্য বজায় রাখতে একাধিক দেশের উপর নিষেধাজ্ঞা চাপাতে থাকে আমেরিকা। লিটভাক জানিয়েছেন, খুঁজে খুঁজে তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছে তেহরান। এতে এক দিকে যেমন তাদের ঘরোয়া চাহিদা পূরণ হয়েছে, অন্য দিকে তেমনই বৈদেশিক বাণিজ্য কখনও ভেঙে পড়েনি। ইরানি ছায়া অর্থনীতির দ্বিতীয় স্তম্ভ হল পশ্চিম এশিয়ায় একাধিক বিদ্রোহী গোষ্ঠী। এদের জন্ম থেকে শুরু করে যাবতীয় কার্যকলাপের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে আইআরজিসির।

১৩ ১৮
Iran’s 20 thousand dollars shadow economy may change war with US and Israel

মার্কিন গোয়েন্দাদের দাবি, উপসাগরীয় আরব দেশগুলিতে ইরান মদতপুষ্ট মূলত তিনটি প্যালেস্টাইনপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠী রয়েছে। সেগুলি হল, লেবাননের হিজ়বুল্লা, গাজ়ার হামাস এবং ইয়েমেনের হুথি। পর্দার আড়ালে থেকে এদের যাবতীয় হাতিয়ার সরবরাহ করে থাকে তেহরান। সংশ্লিষ্ট বিদ্রোহীদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার সঙ্গেও জড়িত আইআরজিসি। বিনিময়ে তাদের থেকে মোটা টাকা পেতে থাকে সাবেক পারস্যের এই শিয়া ফৌজ।

১৪ ১৮
Iran’s 20 thousand dollars shadow economy may change war with US and Israel

’৭৯ সালের বিপ্লবের পর রাজতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত ধনী পরিবারগুলির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে শুরু করে তেহরান। কট্টরপন্থী শিয়া ধর্মগুরুদের এ-হেন সিদ্ধান্তে আতঙ্কিত অনেকেই তখন দেশ ছেড়ে চম্পট দেন। তাদের ফেলে যাওয়া সম্পদও রাতারাতি চলে যায় আইআরজিসির কব্জায়। ব্লুমবার্গ মনে করে, পরবর্তী সময়ে হাতিয়ার কেনা এবং তার গবেষণায় সেই অর্থও ব্যবহার করেছে তারা।

১৫ ১৮
Iran’s 20 thousand dollars shadow economy may change war with US and Israel

১৯৮৯ সালে মৃত্যু হয় ইরানি বিপ্লবের প্রাণপুরুষ তথা ইসলামীয় প্রজাতন্ত্রের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা রুহুল্লা খোমিনির। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন আলি খামেনেই। শীর্ষ নেতৃত্বের পরিবর্তনে সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের পরিমাণ হ্রাস পাবে বলে মনে করা হয়েছিল। যদিও বাস্তবে তা হয়নি। উল্টে আলি খামেনেই একে আরও সম্প্রসারিত করেন। শুধু তা-ই নয়, এর প্রতিবাদে বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিলে তাতে কঠোর দমন পীড়ন চালাতে দ্বিধা করেননি তিনি।

১৬ ১৮
Iran’s 20 thousand dollars shadow economy may change war with US and Israel

বাজেয়াপ্ত করা সম্পত্তির থেকে ইরানি সর্বোচ্চ নেতার আয় সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন ২০১৩ সালে প্রকাশ করে সংবাদ সংস্থা রয়টার্স। সেখানে বলা হয়, ওই খাতে ৯,৫০০ কোটি ডলার রোজগার করেছেন আলি খামেনেই। পাশাপাশি রিয়েল এস্টেটের স্থাবর সম্পত্তি থেকে অতিরিক্ত ৫,২০০ কোটি ডলার গিয়েছে তাঁর পকেটে। বিদেশে বেনামে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি কিনে রাখার অভিযোগ রয়েছে তাঁর ছেলে মোজ়তবার বিরুদ্ধেও।

১৭ ১৮
Iran’s 20 thousand dollars shadow economy may change war with US and Israel

ব্লুমবার্গ অবশ্য জানিয়েছে, ব্যক্তিগত জীবনে ছায়া অর্থনীতি থেকে রোজগার করা টাকায় (পড়ুন ডলার) হাত দেননি আলি খামেনেই। দৈনন্দিন জীবনে ধর্মযাজকের ভূমিকা পালন করতেন তিনি। গত ৩৭ বছরে এক বারও ব্যক্তিগত বিমানে বিদেশ সফরে যেতে দেখা যায়নি তাঁকে। অন্য দিকে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা যাবতীয় অভিযোগ খারিজ করেছে তেহরান। ছায়া অর্থনীতিকে ‘মিথ্যা কল্পনা’ বলতেও ছাড়েনি উপসাগরীয় ওই শিয়া মুলুক।

১৮ ১৮
Iran’s 20 thousand dollars shadow economy may change war with US and Israel

মার্কিন গণমাধ্যম হওয়ায় ব্লুমবার্গের এই প্রতিবেদন নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা যেতেই পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা যে তেহরানের অর্থনীতির কোমর ভাঙতে পারেনি তা একরকম স্পষ্ট। শুধু তা-ই নয়, এই আবহে ফের হুঁশিয়ারি দিয়েছে আইআরজিসি। বলেছে, আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের বিরুদ্ধে আরও আক্রমণাত্মক যুদ্ধের জন্য তাদের কাছে ছ’মাসের রসদ তৈরি আছে। এই কোমরের জোর পুরোটাই কি ছায়া অর্থনীতির? আগামী দিনে মিলবে তার উত্তর।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
আরও গ্যালারি