সংযুক্ত আরব আমিরশাহির (ইউএই) পর ইরাক! এ বার খনিজ তেল রফতানিকারী দেশগুলির সংগঠন ছাড়বে বাগদাদ? সম্প্রতি এই ইস্যুতে আরব রাষ্ট্রটি সুর চড়ানোয় বিশ্বের জ্বালানি বাজারে পড়ে গিয়েছে শোরগোল। ইরান শেষ পর্যন্ত ‘ওপেক’ ত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলে কতটা সুবিধা হবে ভারতের? এ দেশে সস্তা হবে পেট্রল-ডিজ়েল? কূটনৈতিক মহলে ইতিমধ্যেই ঘুরপাক খেতে শুরু করেছে সেই প্রশ্ন।
গত শতাব্দীর ৬০-এর দশকে বিশ্বের খনিজ তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য পশ্চিম এশিয়ার আরব রাষ্ট্রগুলি গড়ে তোলে একটি সংগঠন। এর নাম ‘অর্গানাইজ়েশন অফ পেট্রলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ়’ বা ওপেক। বাগদাদে জন্ম হওয়া সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের মধ্যে অন্যতম হল ইরাক। এ ছাড়া তালিকায় নাম আছে ইরান, কুয়েত, সৌদি আরব এবং ভেনেজ়ুয়েলার। পরে ওপেকের সদস্যসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১২।
বাগদাদে জন্ম হলেও তেল রফতানিকারী এই সংগঠনটির নিয়ন্ত্রণ গোড়া থেকেই রয়েছে সৌদি আরবের হাতে। ফলে ওপেককে সামনে রেখে বিশ্ববাজার থেকে কোটি কোটি ডলার রোজগারের ‘মেগা সুযোগ’ পেয়ে আসছে রিয়াধ। শুধু তা-ই নয়, এর জন্য দীর্ঘ দিন ধরেই একটি সহজ পন্থা অবলম্বন করে আসছে ওই আরব রাষ্ট্র। সেটা হল, কোটা ব্যবস্থা। এর জেরে ইচ্ছামতো তেল উৎপাদন করতে পারে না কোনও ওপেক সদস্য।
সৌদির বক্তব্য, সংগঠনের সকলে তরল সোনার উত্তোলন বৃদ্ধি করলে আন্তর্জাতিক বাজারে সস্তা হবে জ্বালানি। সে ক্ষেত্রে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি হওয়ার কারণে খনিজ তেলের দাম নিম্নমুখী হওয়ার আশঙ্কা ষোলো আনা। এই সমস্যা এড়াতেই কোটা ব্যবস্থা চালু করেছে রিয়াধ। ওপেকের কোন সদস্য কতটা উৎপাদন করবে, এর মাধ্যমে সেটা নির্ধারণ করে থাকে পশ্চিম এশিয়ার ওই আরব রাষ্ট্র।
রিয়াধের তৈরি করা এই কোটা ব্যবস্থার জেরে সব সময়ই চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে একটা ফাঁক থেকে গিয়েছে। ফলে ওপেক গঠনের পর থেকে ক্রমাগত জ্বালানির দরকে ঊর্ধ্বমুখী হতে দেখেছে বিশ্ব। খনিজ তেলের এই মূল্যবৃদ্ধিতে সর্বাধিক লাভবান হচ্ছে এই সংগঠনের অন্যতম সদস্য সৌদি আরব। ফি বছর কোটি কোটি ডলার ঢুকেছে দেশটির কোষাগারে। ইরাকি হুঙ্কারের পর সেই ব্যবস্থার আমূল বদল আসার সম্ভাবনা প্রবল বলেই মনে করছে পর্যবেক্ষক মহল।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ওপেক-ভুক্ত দেশগুলির মধ্যে খনিজ তেলের ভান্ডার সবচেয়ে বড় হওয়ার কারণে কোটা ব্যবস্থার সুবিধা পেয়ে থাকে সৌদি আরব। বর্তমানে দিনে প্রায় ৮৯.৯৬ লক্ষ থেকে এক কোটি ব্যারল তরল সোনা উৎপাদন করছে রিয়াধ। ইরাকের ক্ষেত্রে এই সংখ্যাটা মাত্র ৩৮.৬০ থেকে ৪০ লক্ষ ব্যারেল। এই সংগঠনের দেশগুলির মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম তেলভান্ডারের অধিকারী হওয়ায় সংশ্লিষ্ট নিয়মের বদল চাইছে বাগদাদ।
কিন্তু এই পরিস্থিতিতে গত কয়েক বছর ধরেই উৎপাদন কমাতে ওপেক সদস্যদের উপর চাপ তৈরি করায় সৌদি সরকারের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে ইরাক। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন বাগদাদের তেল মন্ত্রকের মুখপাত্র সেলিম আল-রিকাবি। মার্কিন সংবাদসংস্থা ব্লুমবার্গকে তিনি বলেন, ‘‘সংগঠনকে তেল উত্তোলন বৃদ্ধির অনুমতি দিতে হবে। অন্যথায় ওপেক ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারি আমরা।’’
উল্লেখ্য, ২০২২ সালে বিশ্বের মোট খনিজ তেলের ৩৮ শতাংশ সরবরাহ করে ওপেক। আনুষ্ঠানিক ভাবে এই গোষ্ঠীর কোনও সুনির্দিষ্ট নেতা নেই। তবে বৃহত্তম উৎপাদক হওয়ায় ঐক্যমতের ভিত্তিতে এখনও পর্যন্ত সেই সম্মান পাচ্ছে সৌদি আরবই। যদিও ইরাকের মতো প্রতিষ্ঠাতা সদস্যকে হারালে সংশ্লিষ্ট সংগঠনটির অস্তিত্ব আদৌ বজায় থাকবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দিহান ওয়াকিবহাল মহল।
এ প্রসঙ্গে ব্লুমবার্গকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বাগদাদ তেল মন্ত্রকের মুখপাত্র বলেন, ‘‘আমাদের ওপেক ত্যাগের কোনও তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা নেই। তবে সংগঠনকে ইরাকের স্বার্থ দেখতেই হবে। সৌদি আরব ও অন্যান্য বন্ধুদের এটা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত। নইলে আমরা বিকল্প কিছু বিবেচনা করতে বাধ্য হব।’’ যদিও কোনও কঠিন পদক্ষেপের সময় এখনও আসেনি বলে আশ্বস্ত করেছেন তিনি।
২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক তেল বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করতে ওপেক ও আরও ১০টি তরল সোনা উত্তোলনকারী দেশকে নিয়ে গঠিত হয় একটি বৃহত্তর সংগঠন। এর পোশাকি নাম ওপেক প্লাস। ওই সময় থেকে তেল উৎপাদনের কোটা বৃদ্ধির জন্য চাপ দিয়ে আসছে ইরাক। বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, বাগদাদের এই দাবি পুরোপুরি অমূলক নয়। এর মাধ্যমে আর্থিক ভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর মরিয়া চেষ্টা রয়েছে পশ্চিম এশিয়ার ওই আরব রাষ্ট্রের।
গত শতাব্দীর ৯০-এর দশকে সামরিক অভিযান চালিয়ে কুয়েত দখল করেন ইরাকের কিংবদন্তি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসেন। ওই সময় রাষ্ট্রপুঞ্জকে সামনে রেখে বাগদাদের উপর কড়া নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ফলে পরবর্তী বছরগুলিতে ভেঙে পড়ে সেখানকার অর্থনীতি। ওই সময় বিপুল খনিজ তেলের ভান্ডার থাকা সত্ত্বেও তা বিশ্ববাজারে বিক্রি করে মোটা অর্থ রোজগার করতে পারতেন না সাদ্দাম।
১৯৯১ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন মিত্র বাহিনীর হস্তক্ষেপে কুয়েত হাতছাড়া হয় বাগদাদের। এর পর গণবিধ্বংসী হাতিয়ার তৈরির অভিযোগ তুলে ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণ করে তারা। ফলে রাতারাতি পতন ঘটে সাদ্দামের। গোপন বাঙ্কারে আশ্রয় নিয়েও শেষরক্ষা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের ফৌজের হাতে গ্রেফতার হতে হয় তাঁকে। ২০০৬ সালে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে ইরাকি প্রশাসন।
বিশ্লেষকদের দাবি, এই পর্বে লাগাতার যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে একরকম ছারখার হয়ে যায় বাগদাদের অর্থনীতি। ২০ বছর পেরিয়ে সেই সঙ্কট ইরাক সরকার এখনও পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের যৌথ বাহিনীর সঙ্গে চলা ইরান যুদ্ধে আরও জটিল হয়েছে পরিস্থিতি। সেটা ওপেক-ভুক্ত ওই আরব রাষ্ট্রের কোটা বৃদ্ধির দাবিকে আরও জোরালো করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইহুদিদের যৌথ হামলা রুখতে লড়াইয়ের শুরুতেই হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধ করে ইরান। পারস্য উপসাগরের ওই সঙ্কীর্ণ সামুদ্রিক রাস্তাটিকে পশ্চিম এশিয়ার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ‘লাইফলাইন’ বললে অত্যুক্তি হবে না। ওই পথেই খনিজ তেল বিভিন্ন রাষ্ট্রকে পাঠিয়ে থাকে ইরাক। এ ছাড়া পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে হরমুজ় ছাড়া বাগদাদের কাছে দ্বিতীয় বিকল্প নেই। ফলে রাস্তা বন্ধ হওয়ায় মারাত্মক চাপে পড়ে তাদের অর্থনীতি।
তা ছাড়া এই লড়াইয়ে ইরাকের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে যথেচ্ছ হামলা চালিয়েছে ইরানি আধা সেনা ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। তাদের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও আত্মঘাতী ড্রোনের আঘাত মাঝেমধ্যেই সহ্য করতে হচ্ছে বাগদাদকে। ফলে পরিকাঠামো ক্ষেত্রে ক্ষতি এড়াতে পারেনি তারা। এই অবস্থায় দেদার তেল বিক্রি করে বেশি পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে চাইছে পশ্চিম এশিয়ার ওই আরব রাষ্ট্র।
চলতি বছরের মে মাসে কোটা ব্যবস্থার বিরোধিতা করে ওপেক ছাড়ে আমিরশাহি। এর জেরে সংগঠনের সদস্যসংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১১। বর্তমানে আগামী বছরের তেল উৎপাদনের ভিত্তিস্তর ঠিক করতে লাগাতার বৈঠক করতে দেখা যাচ্ছে তাদের। ঠিক সেই সময় ইরাক হুমকি দেওয়ায় সৌদি আরব যে চাপে পড়ল, তা বলাই বাহুল্য। তবে বাগদাদকে ধরে রাখতে রিয়াধ কোনও চেষ্টাই করছে না, এমনটা নয়।
সংবাদসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমিরশাহির ওপেক ত্যাগের পর ঘাটতি পূরণে ইরাকের দৈনিক উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১.৮৮ লক্ষ ব্যারেল বৃদ্ধিতে সম্মত হয় সংশ্লিষ্ট সংগঠন। কিন্তু, তার পরেও বাগদাদ খুশি হয়নি। তরল সোনার উৎপাদন এক লাফে দেড় গুণ বৃদ্ধি করতে চায় তারা। এ ব্যাপারে আপত্তি জানিয়ে সরকারি ভাবে অবশ্য কোনও বিবৃতি দেয়নি সৌদি আরব-সহ অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্র।
সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে হায়দার আল-আবৌদি নামের ইরাক সরকারের এক পদস্থ আধিকারিক বলেছেন, ‘‘আমরা দ্রুত অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে চাইছি। হরমুজ় অবরুদ্ধ থাকায় আমাদের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রভূত লোকসান হয়েছে। সেই ফাঁক মিটিয়ে ফেলতে দৈনিক তেল উৎপাদন বাড়িয়ে ৭০ লক্ষ ব্যারলে নিয়ে যেতে হবে। ওপেককে যা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওদের এ বার সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’’
বিশেষজ্ঞদের বড় অংশের ধারণা, ইরাক শেষ পর্যন্ত ওপেক ত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলে আখেরে লাভ হবে ভারতের। বর্তমানে সিংহভাগ খনিজ তেল রাশিয়ার থেকে আমদানি করছে নয়াদিল্লি। বাগদাদ সস্তায় তরল সোনা দিতে রাজি হলে সেখানকার জ্বালানি আমদানি বৃদ্ধির পথে হাঁটতে পারে কেন্দ্র। সে ক্ষেত্রে কম ডলার খরচ করে বেশি তেল ঘরে আনতে পারবে নরেন্দ্র মোদী সরকার।
কোটা ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে সৌদির ‘দাদাগিরি’র কারণে গত সাত বছর ধরে ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে ওপেক। ২০১৯ সালে এই সংগঠন ছেড়েছে কাতারও। এর পর ২০২০ সালে ইকুয়েডর, ২০২৩ সালে অ্যাঙ্গোলা এবং ২০২৬ সালে আমিরশাহিকে একই সিদ্ধান্ত নিতে দেখা গিয়েছে। সেই তালিকায় ইরাকের নাম যুক্ত হয় কি না, তার উত্তর দেবে সময়।
সব ছবি: সংগৃহীত।